বাণিজ্যিক চাষ। চাষিদের আর্থিক মেরুদণ্ড শক্ত করতে পারে এই চাষ। কেবল তাই নয়, বেকার যুবকদের স্বনির্ভর হওয়ার পথ দেখাচ্ছে। যা ইউরোপে শুরু, তা আজ সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। পিছিয়ে নেই পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্য সরকার এই চাষে বিশেষভাবে নজর দিয়েছে। মাশরুম চাষের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটেছে এ রাজ্যে। বর্তমানে ১৮.২ মিলিয়ন টন উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে ভারত। কেবল নিজের দেশে নয়, ভারতের বাইরে রফতানি করেও আর্থিক উপার্জনের পথ দেখাচ্ছে। তাতে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। উপযুক্ত দাম, সেই সঙ্গে মাশরুমকে ঘিরে শিল্প গড়ে উঠছে। এমনকী রাজ্যে মাশরুম-স্পন নিজেরাই তৈরি করে কর্মসংস্থানের পথ খুলে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গ সরকারও এগিয়ে এসেছে এই মাশরুম চাষে। চাষিদের পাশে সবরকম সহায়তা করছে। প্রতিটি ব্লকে কৃষি বিষয়বস্তু বিশেষজ্ঞরা এই চাষের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। আগ্রহী হচ্ছেন চাষিরা। এগিয়ে এসেছে বহু বেকার ছেলে-মেয়েরাও। চুপচাপ বসে নেই কিছু বেসরকারি সংস্থাও। বিশেষ করে রামকৃষ্ণ মিশন এগিয়ে এসেছে এই মাশরুম চাষে। বেকার ছেলেমেয়েদের হাতে-কলমে শিখিয়ে মাশরুম-স্পন বীজ হাতে তুলে দিচ্ছে। ওই মাশরুমের স্পন বীজ চাষ করে অসংখ্য বেকার ছেলে লাভের মুখ দেখছেন। এমনকী,বাড়িতে বসেও এই চাষ সম্ভব। উল্লেখ্য, ২০০ বছর ধরে চলে আসছে এই চাষ। ভারতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়েছে। উচ্চ পুষ্টি সম্পন্ন মাশরুম আজ মানুষের সুস্বাস্থের অধিকারী।
প্রোটিন কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার, খনিজ, ফলিক অ্যাসিড যুক্ত এই খাবার এখন কদর বাড়ছে রান্নাঘরে। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, অ্যানেমিয়া রোগাক্রান্ত, ডায়াবেটিস ও হার্টের রোগীদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উপযোগী। তাছাড়া আয়রন সমৃদ্ধ। এক একথায় সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে জুড়িমেলা ভার এই মাশরুম। তাই চাইনিজ ফুড রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে হোটেল, ক্লাব, বাড়িতে সমানভাবে চাহিদা বাড়ছে। যত চাহিদা বাড়ছে তত চাষও বাড়ছে। লাভবান হচ্ছেন চাষিরা।
উল্লেখ্য, করা যেতে পারে, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, জম্মু ও কাশ্মীর, রাজস্থান, হিমাচল প্রদেশে শুরু হয়েছে মাশরুম চাষ। বর্তমানে বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের মাশরুম চাষ হচ্ছে ।তবে আমাদের দেশে বাটন মাশরুমের চাষ বেশি লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া ঢিংরি ও মিল্কী মাশরুম চাষও হচ্ছে। তবে পরিশ্চমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যে ৮৫ শতাংশ বাটন মাশরুমের চাষ হচ্ছে। বিশ্বে মোট ৬০ ধরনের মাশরুম চাষ হয়। বিশ্বের কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্রগুলিতে মাশরুম নিয়ে শুরু হয়েছে বিস্তর গবেষণা। বাটন ও মিল্কী মাশরুমকে আরও কীভাবে উন্নত প্রযুক্তিতে চাষ করে উৎপাদন বাড়ানো যায় সে নিয়ে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

বর্তমানে মাশরুম-স্পন কৃষিখামারগুলিতে তৈরি করা হচ্ছে। ১২ থেকে ২২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় বাটন মাশরুম ভালো চাষ হয়। সময় লাগে ২ মাস। আবার ঢিংরি বা ওয়েস্টার মাশরুম চাষ ১৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা হল উপযুক্ত। অর্থাৎ শীতের মরশুমে এই জাতের মাশরুম চাষের উপযুক্ত সময়। এদিকে সরকারি স্তরে প্রায় প্রতিটি ব্লকে মাশরুম চাষের জন্য চাষিদের সহায়তা করা হচ্ছে। এমনকী প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এগিয়ে এসেছে মাশরুম চাষের লক্ষ্য নিয়ে। একদিকে চাষিদের আর্থিক শিরদাঁড়া মজবুত করতে, অন্যদিকে বেকার ছেলেমেয়েদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা হল মুখ্য উদ্দেশ্য। সেই সঙ্গে ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনে শিক্ষিত বেকারদের আগ্রহী করে তোলা। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি এগিয়ে এসেছে রামকৃষ্ণ মিশনের পল্লিমঙ্গল। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি দফতরের কাছ থেকে সক্রিয় সাহায্য ও সহযোগিতায় প্রত্যয়িত বীজ দেওয়া শুরু হয় চাষিদের। ২০০৮-এ মাশরুমের বীজ অর্থাৎ স্পন উৎপাদন সফলভাবে তৈরি হয়ে আসছে। এরপর থেকে বাণিজ্যিক ও স্বনির্ভর হওয়ার পথ দেখা শুরু করেছে চাষিরা। তবে বর্তমান রাজ্য সরকার মাশরুম বীজ অর্থাৎ স্পন তৈরি করে ব্যাপকহারে চাষের জন্য এগিয়ে এসেছে। এজন্য বেকার ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বেশ কিছু কৃষিখামারে এর প্রশিক্ষণ চলছে। রামকৃষ্ণ মিশন পল্লিমঙ্গলের সহায়তায় বহু বেকার ছেলে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাশরুম চাষে নেমেছে। পল্লিমঙ্গল ওই সমস্ত ছেলেদের স্পন দিয়ে সাহায্য করছে চাষে। উল্লেখ করতেই হয় কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মিশন পল্লিমঙ্গল ও বেলদিহা রামকৃষ্ণ পল্লিমঙ্গলের কথা। কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মিশন পল্লিমঙ্গলের পক্ষ থেকে জানানো হয় বেশ কয়েক বছর হল মাশরুম চাষের পদ্ধতি হাতে-কলমে শেখানো হচ্ছে। বেকার ছেলে ও স্থানীয় আগ্রহী চাষিদের স্পন দিয়ে মাশরুম চাষ শুরু হয়েছে বেশ কিছু এলাকায়। একদিকে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। অপরদিকে বেকার ছেলেরা স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
কম খরচে ও সহজে সংরক্ষিত করার জায়গাও তৈরি হয়েছে। উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ মাশরুম যাতে সকলের হাতে পৌঁছায় এবং রফতানি করা যায় তাও ভাবছে রাজ্য সরকার। রাজ্য কৃষি বিপণন দফতর মারশরুম সংরক্ষণ নিয়ে কিছু জায়গা তৈরি করেছে। রামকৃষ্ণ মিশন পল্লিমঙ্গলও এগিয়ে এসেছে মাশরুম সংরক্ষণে। ক্ষুদ্র ও গ্রামীণ শিল্প গড়ে উঠেছে এই চাষকে কেন্দ্র করে। মাশরুম চাষ করে আয় ও স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ ঘটছে।