হরিয়ানার বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অভিযোগ, কৃষক আন্দোলনের জেরে সে রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে করোনার বাড়বাড়ন্ত অবস্থা। পঞ্জাবের গ্রামগুলিতে করোনা সংক্রমণের জন্যও কৃষক আন্দোলনকে দায়ী করেছে কেন্দ্র। কিন্তু এইসব অভিযোগকে হেলায় উড়িয়ে দিয়ে কৃষক আন্দোলনের নেতারা দাবি করেছেন, দেশে ফের করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার জন্য একমাত্র দায়ী নরেন্দ্র মোদী সরকারের ব্যর্থতা।
কেবল তাই নয়, ঝড়-জল উপেক্ষা করে, কেন্দ্রের নেতা-মন্ত্রী এবং শাসকগোষ্ঠী আরএসএস-বিজেপি’র লাগাতার হামলা, কুৎসা, ষড়যন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে লড়াই থেকে এক পাও সরে আসেনি কৃষকরা। বরং কেন্দ্রের নতুন তিন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে দিল্লি সীমানায় তাদের আন্দোলন ছ’মাস পূর্ণ করলেন তাঁরা। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এদিন ৪০টি কৃষক সংগঠনকে নিয়ে গঠিত সংযুক্ত কিসান মোর্চা ‘কালা দিবস’ পালনের ডাক দেয়।
২৬ মে দিনটিতে কৃষক আন্দোলন যেমন ছ’মাসে পা রাখলো, অন্যদিকে এই দিন মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার ৭ বছরে পা দিল। আন্দোলনকারীদের মতে এই সরকার কৃষি বিরোধী। তাই এই দিন তারা দেশজুড়ে কালা দিবস পালনের ডাক দিয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে কৃষকরা জড়ো হয়ে আন্দোলন করছেন না। বদলে নিজেদের বাড়ি, ট্রাক্টর, দোকানে কালো পতাকা ঝুলিয়ে প্রতিবাদ জানান। পাশাপাশি, ওইদিন বিভিন্ন জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়।
প্রসঙ্গত, গত বছর সংসদের বাদল অধিবেশনে কৃষি সংক্রান্ত তিনটি বিল পাশ করিয়ে কেন্দ্র আইনে পরিণত করে। সংসদের বাইরে-ভিতরে বিক্ষোভের মধ্যেই সেই বিলগুলি পাশ হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি সেগুলিতেই স্বাক্ষরও করেন। বিলগুলি নিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের কৃষকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ, এই বিলকে হাতিয়ার করেই ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ছেঁটে ফেলা হবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর তরফে সেই অভিযোগ নস্যাৎ করা হয়।
পরবর্তীতে কেন্দ্রের বিতর্কিত এই কৃষি আইনের বিরুদ্ধে ‘দিল্লি চলো’ পদযাত্রায় অংশ নিয়ে জলকামান এবং পুলিশের ব্যাপক বাধার পরেও ২৬ নভেম্বর প্রচুর কৃষক দিল্লির সীমানায় হাজির হয়ে যান। এরপর সারাদেশের হাজার হাজার কৃষক রাজধানীর আশেপাশে টিকরি, সিংহু এবং গাজিপুর সীমানায় প্রতিবাদে যোগ দেন। কংগ্রেস-সহ দেশের ১৪টি প্রধান বিরোধী দল সংযুক্ত কিসান মোর্চার আহ্বানে সমর্থন জানায়।

এদিনও সংযুক্ত কিষান মোর্চার ‘কালা দিবস’ আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি জানায় দেশের ১২টি বিরোধী রাজনৈতিক দল। আগেই এক যৌথ বিবৃতিতে বিরোধী নেতৃবৃন্দ সংযুক্ত কিষান মোর্চার ডাকে দেশজোড়া প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তারা পূর্ণ সমর্থন জানায়। শান্তিপূর্ণ এবং বীরত্বপূর্ণ কৃষক সংগ্রামের ছ’মাস পূর্তির দিনে এই প্রতিবাদ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। ‘অন্নদাতা’দের ন্যায্য দাবি মেনে অবিলম্বে কেন্দ্রের তিন কৃষি আইন বাতিল এবং এমএসপি’র আইনি স্বীকৃতির দাবিও জানায় বিরোধী নেতারা।
এদকে কৃষক আন্দোলন যখন ছ’মাস পূরণ করছে সেই সময় ফসল বোনার মরশুম শেষ, তাই আবার দলে দলে কৃষক দিল্লি সীমান্তে লড়াইয়ের সড়কে হাজির হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে গাড়ি-ট্রাক্টরের বিরাট কনভয়ে চেপে হরিয়ানা থেকে হাজার হাজার কৃষক ও খেতমজুর সিঙ্ঘু সীমান্তে পৌঁছে গেছেন। লড়াকু কৃষকরা গত সোমবার হরিয়ানার কৃষকবিরোধী মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খাট্টারের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের দাবিতে হিসারে পুলিশ কমিশনারের দপ্তর ঘেরাওয়ের ডাক দিয়েছিলেন। হরিয়ানায় বিজেপি শাসিত সরকারের এই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই পুলিশ আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর বেপরোয়া হামলা চালায়। কৃষকনেতারা জানান, হিসারের আন্দোলনে হামলাকারী পুলিশ অফিসারদের শাস্তির দাবিও তোলা হয়।
অনেকেই ভেবেছিলেন কৃষক আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়েছে। কিন্তু দিল্লি সীমান্ত-সহ সারা দেশে কৃষক আন্দোলন আরও জোরালো হয়ে উঠতে চলেছে বলেই মনে হচ্ছে। ২৬ মের কৃষকদের প্রতিবাদ কর্মসূচির সমর্থনে একযোগে বিবৃতি দিয়েছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি, জেডি(এস) নেতা তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবেগৌড়া, এনসিপি প্রধান শারদ পাওয়ার, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা টিএমসি প্রধান মমতা ব্যানার্জি-সহ বহু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা।
ইতিমধ্যে কৃষক আন্দোলনের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সরকার দাবি না মেনে নেওয়া পর্যন্ত কৃষক আন্দোলন চলবে। ওই বিবৃতিতে সই করেছেন বলবীর সিং রাজেওয়াল, ড.দর্শন সিং, হান্নান মোল্লা, গুরনাম সিং চাধুনি, জগজিৎ সিং দালেওয়াল, যোগীন্দর সিং উগ্রাহন, যূধবীর সিং, যোগেন্দ্র যাদব, অভিমন্যু কোহাদের মতো কৃষকনেতারা।
পাশাপাশি আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন তারা ফের বৈঠক চান এবং তাঁদের হুঁশিয়ারি, এই আলোচনা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে সদর্থক জবাব না মিললে আন্দোলনের ঝাঁজ আরও বাড়ানো হবে। এর আগে বিতর্কিত তিন কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে কেন্দ্রীয় সরকার এবং কৃষকদের মধ্যে ১১ দফা আলোচনা হয়েছে। শেষ দফা বৈঠকে আইন প্রণয়ন ১৮ মাসের জন্য পিছিয়ে দিতে রাজি হয় মোদি সরকার। কিন্তু সেই প্রস্তাবে রাজি হননি কৃষকরা। বদলে তাঁরা আইন বাতিলের দাবিতে সরব হন।
এদিকে করোনা পরিস্থিতিতেও দিল্লির সিংঘু, গাজিয়াবাদ, তিখড়ি, ধানসা ও শাহজাহানপুরে প্রতিবাদ করছেন কৃষকরা। কোভিডে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন আন্দোলনকারীর মৃত্যুও হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীদের ঘরে ফিরে যাওয়া উচিৎ বলেও মনে করছিলেন কেউ কেউ। তবে নিজেদের দাবি থেকে পিছু হঠতে রাজি নন কৃষকরা। তাঁরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কৃষি আইন বাতিল করতেই হবে। তাঁদের দাবি, এই বৈঠক নিয়ে কেন্দ্র ইতিবাচক পদক্ষেপ না করলে কোভিড পরিস্থিতির মধ্যেই দেশজুড়ে আন্দোলনের ঝাঁজ বাড়াবেন কৃষকরা।
শেষ পর্যন্ত কি কৃষকেরা কেন্দ্রের কাছ থেকে তাদের দাবি আদায় করতে পারবে!
কেন্দ্রীয় সরকার আর কৃষক নেতারা ১১ বার বৈঠকে বসে আলোচনা করেছেন, কোনও সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসেনি, কৃষক
নেতারা প্রতিবারই হুমকি দিয়েছেন কাজ হয়নি, শেষ পর্যন্ত কি হবে বলা মুশকিল।