প্রায় এক বছর আগে কেন্দ্রের পাশ করা তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে দিল্লির তিন সীমান্ত-টিকরি, সিঙ্ঘু ও গাজিপুরে অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে কৃষকরা। তাদের দাবি ওই তিনটি কৃষি আইন চালু হলে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা এমএসপি ব্যবস্থা উঠে যাবে, এছাড়াও তাদের স্বার্থের ক্ষতি হবে। তাই কৃষি আইন বাতিল করে এমএসপি সুনিশ্চিত করার আইনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। কেন্দ্রের সঙ্গে কৃষকদের একাধিকবার বৈঠক হলেও কেন্দ্রের অনমনীয় পদক্ষেপের কারণে সমাধানসূত্র বেরোয়নি। প্রসঙ্গত, ২৬ নভেম্বর কৃষকদের আন্দোলনের এক বছর পূর্ণ হবে। এবার ওই দিনটিকেই আলটিমেটাম হিসেবে ঘোষণা করেছেন কৃষক নেতা রাকেশ টিকায়েত।
দিল্লি সীমান্তে অবস্থান বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের সরানোর ব্যাপারে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। তারই পালটা হিসাবে নতুন করে সুর চড়িয়েছেন রাকেশ টিকায়েত। হুঁশিয়ারি দিয়ে কৃষক নেতা এবার সরকারকে একেবারে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ২৬শে নভেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের সময় রয়েছে। তারপর ২৭শে নভেম্বর থেকে ট্রাক্টরে চেপে গ্রাম থেকে দিল্লির প্রতিবাদস্থলের দিকে এগোতে থাকবেন কৃষকরা। তাঁরা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করবেন, প্রতিবাদস্থলেই তাঁবু খাটাবেন।
যদিও এটা স্পষ্ট নয় যে ২৬শে নভেম্বর তারিখটি কৃষি আইন বাতিলের জন্য কেন্দ্রকে শেষ সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নাকি পরবর্তী আলোচনার জন্য কৃষকদের ডাকার শেষ সময়সীমা। তবে টিকায়েত হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, ২৬তারিখের মধ্যে মোদী সরকার কৃষিবিল প্রত্যাহার না করলে তাঁরা ট্রাক্টর নিয়ে দিল্লি সীমানায় হাজির হবে। এবং সেখানে আন্দোলন জোরদার করবে। মনে হচ্ছে কৃষক আন্দোলন ফের আগ্রাসী ভূমিকা নিতে চলেছে। মোদী সরকারকে শুধু সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নয়, রীতিমতো হুঁশিয়ারি দিয়ে কৃষক নেতা রাকেশ টিকাইত বলেছেন, যদি দিল্লি সীমানা থেকে কৃষকদের জোর করে উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় তাহলে দেশের সব সরকারি অফিসকে সবদি মন্ডিতে পরিনত করবেন তাঁরা।
কৃষাণ মোর্চার অভিযোগ পুলিশ প্রশাসন কৃষকদের তাঁবু উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। মোদী সরকার সেটা যদি করে তাহলে কৃষকরা থানায় এবং জেলা শাসকের দফতরে তাঁবু ফেলবে, তিরকি, সিঙ্ঘু এবং গাজিপুরে বিক্ষোভ আরও জোরদার করবে। মোদি সরকার দিল্লির সীমানায় কৃষকরা রাস্তা আটকে রেখেছে বলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল। কৃষক সংগঠনের তরফে পালটা দাবি করা হয়েছে যে তারা দিল্লির সীমানা আটকে রাখেনি, পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে আটকে রেখেছে।
ইতিমধ্যে গাজিপুর ও টিকরি সীমান্ত থেকে পুলিশ ব্যারিকেড তুলে নেওয়া শুরু করলেও ১১বার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেও কেন্দ্র কৃষি আইন নিয়ে নমনীয় পদক্ষেপ করেনি।
উল্লেখ্য, দিন কয়েক আগেই উত্তর প্রদেশের লখিমপুর খেরিতে কৃষকদের উপর গাড়ি চালিয়ে পিষে দেওয়ার মত নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটয়ায় অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে।মন্ত্রী পুত্রের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হলেও এখনও তাঁকে গ্রেফতার করা হয়নি। কিষাণ মোর্চা মন্ত্রী পুত্রের গ্রেফতারি দাবি করেছে। সুপ্রিম কোর্টে এই নিয়ে মামলা চলছে। কেন মন্ত্রীপুত্রকে গ্রেফতার করা হল না তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে উত্তর প্রদেশ পুলিশকে ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীপুত্র হাজিরা দিলেও তিনি গ্রেফতার হননি। মন্ত্রী দাবি করেছেন তাঁর ছেলে সেদিন ঘটনাস্থলে ছিলেন না।
কৃষি আইন নিয়ে যদিও প্রথম থেকেই চাপে রয়েছে মোদি সরকার। কিন্তু আইন প্রত্যাহারেরর দাবিতে কেন্দ্র কিছুতেই পিছু হঠছে না। যে কারণে বৈঠক বারবার ভেস্তে গিয়েছে। ওদিকে পাঞ্জাব-উত্তর প্রদেশের ভোট এগিয়ে আসছে। তার আগে ফের জোরদার হয়ে উঠবে কৃষক আন্দোলন, অন্যদিকে ভোটের উত্তাপ চড়বে দুই রাজ্যে। পাঞ্জাব এবং উত্তর প্রদেশ দুই রাজ্যেই সরকার গঠন হয় কৃষকদের ভোটে। এদিকে পাঞ্জাবের কৃষকরা প্রথম থেকেই মোদি সরকারের কৃষি আইনের বিরুদ্ধে। পরে হলেও উত্তর প্রদেশের কৃষকরাও কৃষক আন্দোলনে সামিল হয়েছেন। এতে যে মোদী সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তার ওপর পাঞ্জাবে অমরিন্দর সিং-এর গড়া নতুন দলের সমর্থন পেতে হলেও মোদিকে কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে হবে বলে শর্ত রেখেছেন অমরেন্দ্র।
কৃষকরা কৃষি আইন প্রত্যাহারেরর জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন আর কিছুতেই পিছু হঠতে রাজি নয় মোদী সরকার- এর জেরে বারবারই ভেস্তে গিয়েছে কেন্দ্রের সঙ্গে কৃষকদের বৈঠক। যদিও কৃষকদের আন্দোলন করোনা সংক্রমণ ও লকডাউনের জেরে অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে কিন্তু কৃষকেরা তাদের দাবি থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হটেননি, সরকারের সঙ্গে কোনও আপোষ মীমাংসাতেও যান নি, বরং সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছেন। কিন্তু এটা স্পষ্ট নয়, তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের জন্য কৃষকরা আগামী ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন; এরপর তারা কি বৃহত্তর আন্দোলনে নামবেন নাকি কেন্দ্রের তরফে তাদের আলোচনায় ডাকার সময় সীমা? তবে ২৭শে নভেম্বর থেকে কৃষকরা যদি ট্রাক্টরে চেপে গ্রাম থেকে দিল্লির প্রতিবাদস্থলের দিকে এগোতে থাকেন তবে তা আটকাতে প্রশাসন বাঁধা দেবেই। তেমনটা ঘটলে সংঘাত অনিবার্য। দুই রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে কি মোদি সরকার সেই পথে এগবে?