আজ ফের পথে নেমেছেন দিল্লি সীমানায় আন্দোলনকারী কৃষকেরা। তবে আজ জয় উদযাপন করে ভিক্ট্রি মার্চ করবেন তাঁরা। গত ১৫ মাস ধরে গাজিপুর, টিকরি, সাঙ্গু সীমানায় অবস্থান বিক্ষোভ করেছেন যারা। তাবু খাটিয়ে চালিয়েছেন অবস্থান বিক্ষোভ। শীতের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, বর্ষার তুমুল ঝড়-বৃষ্টি, গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহ, কোনও কিছুই যাদের জেদকে দমাতে পারেনি। দু-এক দিন নয়, নিজেদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে অবিচল থেকে গত ১৫ মাস ধরে হাজার হাজার কৃষক আন্দোলন চালিয়ে অবশেষে ছিনিয়ে নিয়েছেন জয়।
মোদী সরকার কৃষি আইন বাতিল করার পরেও তাঁরা আন্দোলন জারি রেখেছিলেন। কারণ যতক্ষণ না সরকার কাগজে কলমে কৃষি আইন বাতিল করছে ততদিন আন্দোলন প্রত্যাহারের প্রশ্ন ওঠে না বলে জানিয়েছিলেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেটা মেনে নিয়ে তাঁদের ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। ইতিমধ্যে কৃষক নেতা রাকেশ টিকাইত সরকারী ব্যাঙ্কগুলির বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামবেন বলে জানান। তিনি বলেন, সারা দেশে ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে একই ধরনের আন্দোলনের প্রয়োজন আছে।
আন্দোলন করে শেষ পর্যন্ত জয় পেয়েছেন কৃষকেরা। সেই জয় উদযাপনেই আজ ভিক্ট্রি মার্চ করতে করতে বাড়ি ফিরছেন। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা আগেই এই কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছিল। কেবলমাত্র কৃষি আইন বাতিলের সাফল্যের কারণেই এই ভিক্ট্রি মার্চ নয়, কৃষক আন্দোলন চলাকালীন যাঁরা মারা গিয়েছেন তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানাতেই এই ভিক্ট্রি মার্চ। উল্লেখ্য, বিগত ১৫ মাসে ৭০০ জন কৃষকের মৃত্যু হয়েছিল। যদিও মোদী সরকার দাবি করে কোনও কৃষকের মৃত্যু হয়নি।
স্বাধীনতার পর এত বড় কৃষক আন্দোলন এবং জয়, সমগ্র বিশ্বে এটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কৃষকরা কি ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে, সঙ্ঘবদ্ধ আন্দোলন চালানো কি তাদের পক্ষে সম্ভব এসব প্রশ্ন আন্দোলনের গোড়া থেকেই উঁকিঝুঁকি দিয়েছে। কৃষকদের আপোষহীন আন্দোলন সে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে দাবি আদায় করে। এ লড়াইয়ে কোনও লাভ নেই, যা আইন হয়ে গিয়েছে তার আর পরিবর্তন হবে না, অতএব সময় নষ্ট— এ রকম ভাবনাও ওঁদের আন্দোলন চলাকালে চারপাশ থেকে বহু হয়েছে। তারা এবার কৃষকদের থেকে শিক্ষা নেবেন নিশ্চয়। কিন্তু সেখানেও থেমে থাকেনি, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কুৎসা ও অপপ্রচার চালানো হয়েছে, ‘সন্ত্রাসবাদী’, ‘পাকিস্তানি’, ‘খলিস্তানি’, অপবাদে ভূষিত করা হয়েছে কৃষক আন্দোলনের নেতাদের।

কাঁদানে গ্যাস, জলকামান, লাঠিচার্জ, রাস্তায় ফেলে মার, বোল্ডার দেওয়া, খাল কেটে দেওয়া, কাঁটা জলুই পোঁতা, মিথ্যা মামলা, মিছিলে মন্ত্রীর ছেলের গাড়ি চালিয়ে দেওয়া, দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা, মেয়েদের হয়রান করার চেষ্টার পাশাপাশি আন্দোলন তোলার জন্য হুমকি, পেটোয়া কমিটি গঠন, কৃষি আইনের পক্ষে স্বাক্ষর জোগাড়, শীর্ষ আদালতে মামলা- এতসব চেষ্টার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্ষমা চাইলেন ৫ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যিনি কোনও চ্যালেঞ্জের সামনেই তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে এক চুল সরেন না, মাথাও নত করেন না। ৫ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে এই প্রথম তিনি সিদ্ধান্ত বদলালেন। পাশাপাশি কৃষকদের এই বিশাল জয় ঘিরে লোক সভায় বিরোধীরা গলা ফাটানোরও কোনও সুযোগ পেলেন না! ২৯ নভেম্বর পার্লামেন্টের দুই কক্ষেই The Farm Laws Repeal Bill, 2021 বা Bill No. 143-C of 2021 পাশ হতে সময় লাগলো মাত্র কয়েক মিনিট। বিতর্কেরও কোনও অবকাশ পেল না।
সবাই বলছেন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু কিসের জন্য মোদী ক্ষমা চাইলেন? তাঁর বা তাঁর সরকারের কৃতকর্মের জন্য নাকি কর্পোরেট পুঁজিপতিদের হাতে দেশের কৃষিব্যবস্থাকে তুলে দেওয়ার জন্য যে রাস্তা চওড়ার কাজ হচ্ছিল তার জন্য তিনি ভুল স্বীকার করেছেন? বিগত বছরে যে ৭০০ জন কৃষক মারা গিয়েছেন তাদের জন্যও না, বরং ১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় সরকারের ‘কৃষক ও কৃষি কল্যাণ মন্ত্রক’ লোকসভায় বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে কৃষক মৃত্যুর কোনও রেকর্ড সরকারের কাছে নেই।
প্রধানমন্ত্রী এ কথাও স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি এবং তাঁর সরকার কৃষি আইনগুলি কৃষকদের সুবিধার্থেই আনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দেশের সমস্ত কৃষকসমাজকে তা সরকার বোঝাতে পারেনি তাই তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। মোদীর এই ক্ষমা চাওয়াটা কি সরাসরি আন্দোলনকারী কৃষকদের কাছে? অবশ্যই নয়। খুব গভীরে না গিয়েও বিষয়টা কিন্তু বোঝা যায়। এভাবে চিন্তা করলে কৃষকদের আন্দোলনের সম্মান-গৌরব-মহিমাতে এতটুকু আচড় লাগে না। কিন্তু মোদীর ক্ষমা চাওয়া কিম্বা তাঁর সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেওয়া বিষয়গুলিকে যদি কৃষক আন্দলনে জয়ের সবথেকে বড় সাফল্য মনে করি, তবে ভুল হবে।