এটি সর্বজনবিদিত যে, বাঙালির ‘বারো মাসে তেরো পার্বন’। নানা ধর্মের ধর্মসাধনার পীঠস্থান আমাদের দেশ। প্রাণপ্রাচুর্য্যতায় ভরা এবং মহৎ জীবনবোধের প্রতিচ্ছবির ইঙ্গিত থাকে উৎসবগুলোর মধ্যে। শুভ চেতনার স্পর্শ পেতে নিয়ম-নিষ্ঠা-উপোসের বেড়াজালের মধ্যে পালিত হয় লোকাচার। প্রতিটা ধর্মের রীতিতে উপবাস বা উপোসের প্ৰচলন রয়েছে।
উপবাস হলো একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কাজ যেখানে লক্ষ্য শরীর ও মনকে শুদ্ধ করা এবং ঈশ্বরের কৃপা অর্জন করা। উপ + বাস, উপ শব্দের অর্থ সমীপে অর্থ্যৎ উপবাসের মধ্যে ‘দেবতার সঙ্গে সমীপে বাস।’
রহস্যময় জগতের রহস্য অন্তহীন। ব্রহ্মজ্ঞানী ঋষিমুনিরা জগৎ কল্যাণের জন্য আলোর পথ প্রদর্শন করেছেন। আদিশক্তি বিভিন্ন রূপে ও নামে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে। তেমনই উপোস নামক আচরণ খ্যাত বিভিন্ন ক্ষেত্রে। যেমন সনাতন হিন্দুধর্মে না খেয়ে ঈশ্বরের আরাধনা করাকে বলে ‘উপবাস’, ইসলাম ধর্মে মুসলিমরা রোজা করলে বলে ‘সিয়াম’, খ্রিস্টধর্মে বলে ‘ফাস্টিং’। বিপ্লবীরা, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের উপবাস হয়ে যায় ‘অনশন’, চিকিৎসাশাস্ত্রে একে বলে ‘অটোফেজি’।

সমাজে কিছু মানুষ নিজের শরীরকে স্লিম রাখতে উপোস করেন আবার যাদের কাছে ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ তারা উপবাস করেন অভাবের তাড়নায়।
সাধনক্ষেত্রে আরাধনা করার জন্য ইন্দ্রিয় সংযম ও উপবাস করলে ইষ্টদেবতার সান্নিধ্য লাভ করা যায়। আধ্যাত্মিক ভাবনায় ঋদ্ধ ব্যক্তিগণ দেহ ও মন সুস্থ রাখার জন্য একাদশী তিথিতে, অমাবস্যা বা পূর্ণিমায়, বিশেষ পূজা-অর্চনাদির সময় উপবাস পালন করেন।
সনাতন ধর্মে উপবাসের নিয়ম থাকলেও বিশেষ কয়েকটি ব্রতে উপবাস প্রধান।
“শয়ন উত্থান পাশমোড়া।/ তার মধ্যে ভীমে ছোঁড়া।।/ দুই ছেলের জন্মতিথি।/ অষ্টমী নবমী দুটি।।/ পাগলার ছৌদ্দ পাগলীর আট। এই নিয়ে কাল কাট”…
অর্থ্যৎ ‘শয়ন, উত্থান আর পর্শে একাদশী। শ্রীরাম নবমী আর শিব চতুর্দশী।। ভীম একাদশী, জন্মাষ্টমী, মহাষ্টমী। ধর্ম্মাথ্যেতে উপবাস করো গিয়া তিনি। এই কয় দিনেতে যে উপবাস করে। বহু পুণ্যফল সেই লভে লোকান্তরে।’…
খনার বচন।
ইসলাম ধর্মে উপবাস ‘রোজা’। রোজা রাখার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। সূর্য্য উদয়ের আগের মুহূর্ত থেকে অস্ত যাওয়া অবধি উপবাস পালন করা হয়। এর আগে বা পরে আহার গ্রহণ করা যেতে পারে। রোজা মানুষকে ত্যাগ ও সংযমের শিক্ষা দেয়, বেঁধে রাখে সৌভ্রাতৃত্ত্ব ও পারস্পরিক সহমর্মিতায়।
গরমকালের এক দুপুরে দক্ষিণেশ্বরে মন্দিরে কলকাতা থেকে কিছু ভক্ত স্ত্রীলোক দেখা করতে একদিন রামকৃষ্ণ দেবের সঙ্গে। ঠাকুরকে এসে তারা প্রণাম করলেন। ঠাকুর তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘তোমাদের মুখ কেন শুকনো গা!’
স্ত্রীলোকদের মধ্যে কিছুজন বিধবা মহিলা ছিলেন। তারা বলেন, আজ যে একাদশী।
ঠাকুর বললেন, ‘নির্জলা কেন! আগে জল খাও। আমি মায়েদের শুকনো মুখ দেখতে পারি না।’
উপোসের ফলে কতখানি শারীরিক উপকার হয়, তা নিয়ে দ্বিমত আছে। তবে সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এবং ডায়েটিসিয়ান, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে করলে উপকার পাওয়া যায়। কেবলমাত্র ফিগার মেইনটেইন নয়, সঠিক পদ্ধতিতে উপোস করলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, রক্তে টোটাল কোলেস্টেরল কমাতে এটি সহায়তা করে।
আমেরিকায় National Institute on Aging-এর এক গবেষণায় (ইঁদুরের উপর করা) মাঝে মাঝে উপবাস স্মরণশক্তি বৃদ্ধি সহায়তা করে। বিখ্যাত গোয়েন্দা শার্লক হোমস চিন্তা করার সময় না খেয়ে থাকতে পছন্দ করতেন।

জাপানের কোষ জীবতত্ত্ববীদ ডা. ইয়োশিনোরি ওহসুমি ২০১৬ সালে মানব শরীরে ‘অটোফেজি’-র কার্যকারিতা রহস্য উন্মোচনে অসামান্য অবদান রাখায় মেডিসিনের উপর নোবেল পুরষ্কার পান।
অটো অর্থ ‘নিজ’ এবং ফেজি অর্থ ‘খাওয়া’—নিজে নিজেকে খাওয়া।
কম্পিউটারে যেমন ‘রিসাইকেল বিন’ থাকে তেমনি কোষের মধ্যে থাকে ডাস্টবিন। কোষগুলো ব্যস্ত থাকার কারণে ডাস্টবিন পরিস্কার করার সময় পায়না। ফলে জমা হয় টক্সিন। যার থেকে বিভিন্ন রোগের সূত্রপাত হয়। মানুষ যখন খালি পেটে থাকে, কোষগুলো নিজেরাই ক্ষতিকর কোষগুলি খেয়ে ফেলে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একেই বলে ‘অটোফেজি’।
উপবাস বা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এর উপকারী দিক যেমন আছে, তেমনই অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বা নিয়মনীতি না মেনে ইচ্ছামতো পালন করে উপবাস করলে শরীরে অনেক ক্ষতি হতে পারে।
যেমন— মাথা ঘোরা, আলস্য, ডায়রিয়া, আবার কিছু ক্ষেত্রে কোষ্ঠকাঠিন্য, আসিড রিফ্লাক্স, নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ….এমনকি অনিয়মিত উপোসের কারণে বিশেষত বয়স্কদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ওষুধের কার্যকারীতা হ্রাস পায়।
উপোস ভাঙার ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হবে। আহার গ্রহণ শুরু করা মাত্রই ভারী বা মশলাদার খাবার খাবেন না। ঈষদুষ্ণ জল ও ফল খাওয়া যেতে পারে। খাবারে সব্জির পরিমাণ বেশি রাখতে হবে। রোজা ভাঙার পর মুসলিমদের আহার গ্রহণ পদ্ধতি বেশ বিজ্ঞানসম্মত।
উপোস করলে শরীরে ডিহাইড্রেশনের আশঙ্কা থাকে। যা এড়াতে অবশ্যই জলের দরকার। উপবাসের শেষে খিদে না থাকলেও খালি পেটে শুতে না গিয়ে সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে রেস্ট নিন। উপোসের সময় প্রখর রোদে না বেরোনোই ভালো।
শুধুমাত্র ঈশ্বরের আরাধনা নয়, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করতে উপবাসের ভূমিকা অপরিসীম। এর জন্য দরকার সঠিক মানসিক প্রস্তুতি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিকিৎসক বা ডায়াটিসিয়ানের তত্ত্বাবধানে উপবাস করলে কাঙ্খিত ফললাভ সম্ভব।
সেন্ট জন ক্রাইসোস্টমের সেই বিখ্যাত উক্তি—“Fasting of the body is food for the soul.” মনে করিয়ে দেয়, ভক্তির জন্য উপবাস শরীরের পক্ষে শুভ।
সারাদিন উপোষের পর রান্না করা খাবার খেতে পারলে একটু শক্তি যোগায়।