‘১৯৬৮ সালের শেষের দিকে আমার বারো বছর বয়সে যখন বাবার মুম্বই থেকে কলকাতায় বদলির খবর শুনলাম, আমি খুব উল্লসিত হয়ে উঠেছিলাম। কলকাতার পুরোন গরিমা তখনো অস্ত যায়নি। তখনো কলকাতা পাট, চা, কয়লা, লোহা ও স্টিল এর কর্মচঞ্চল বাণিজ্যিক নগর। …ভারতে সবচেয়ে বড়ো ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ফুটপাথের বইয়ের দোকান, প্রাণচঞ্চল কফি হাউস, আর ফার্পো’র মতো রেস্তোঁরার মনোরম কেক এর নগর ছিল কলকাতা’। শশী থারুরের স্মৃতিতে কলকাতার বৈভব ও আকর্ষণের চিত্রমালার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফার্পোর রেস্তোঁরা।
১৮৬৯ সাল। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মেয়ো’র শেফ হিসেবে ইতালি থেকে কলকাতায় এসেছিলেন রন্ধন শিল্পী ফেদেরিকো পেলিতি। তাঁর সহকারী হিসেবে ছিলেন জেনোয়া থেকে আগত এঞ্জেলো ফার্পো। ইতালীয় রন্ধনশিল্পের, বিশেষ করে কেক, পেস্ট্রি ও পাউরুটির, সুক্ষ্ম ব্যাপারগুলো ফার্পো আয়ত্ত করেছিলেন পেলিতি’র কাছে।

১৯১৭ সালে ফার্পো স্বাধীনভাবে একটি রেস্তোঁরা খুললেন চৌরঙ্গীতে। প্রথমে মূলত এটি ছিল ‘টী রুম’, যেখানে খাদ্যও পরিবেশন করা হত। কালক্রমে ‘ফার্পো-জ’ রেস্তোঁরার সঙ্গে জুড়ল কেক-পেস্ট্রী-রুটি ও কেটারিং বিভাগ। ফার্পো’র পাউরুটির চাহিদা ছিল সারা বাংলায়।

ফেদেরিকো পেলিতি
তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড আরউইন ফার্পো’র খাবারের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তিনি ও তাঁর সঙ্গীসাথীরা নাকি প্রতি রবিবারেই ফার্পো’জ এ লাঞ্চ করতে আসতেন। বিজ্ঞাপনে লেখাও থাকত — “Caterers by appointment to His Excellency The Lord Irwin, Viceroy and Governir General of India”। ফলে ফার্পো’জ সেই সময়ের গণ্যমাণ্য ও অভিজাত মহলে খুব পরিচিত হয়ে উঠেছিল। উচ্চপদস্থ ইংরেজরা ছাড়াও, ভারতীয় রাজা মহারাজাদেরও প্রিয় মিলনস্থান ছিল ফার্পোর রেস্তোঁরা। নেপালের রাজা-রাণী, ক্রুশ্চেভ, আগা খান, নেহরু — কে না আসতেন সেখানে! কুচবিহারের রাজকন্যা ও পরবর্তীকালে জয়পুরের মহারাণী গায়ত্রীদেবীর সঙ্গে প্রণয়পর্বে জয়পুরের মহারাজার প্রিয় মিলনস্থান ছিল ফার্পো’জ। লুসি মুর তাঁর “Maharanis : A family saga of four queens” বইতে ফার্পোকে কলকাতার সবচেয়ে ফ্যাশনেবল রেস্তোঁরা বলে উল্লেখ করেছেন।

এঞ্জেলো ফার্পো
তখন একমাত্র ফার্পোর রেস্তোঁরাতে ছিল ক্যাবারে ও লাইভ ব্যান্ড। অর্কেষ্ট্রা ব্যান্ড ছিলো ট্রাম্পেট, স্যাক্সোফোন, ট্রমবোন প্রভৃতি বাদ্যযণ্ত্রে সমৃদ্ধ। ইউরোপ থেকে নর্তকীরা আসতেন এখানে ক্যাবারে নাচবার জন্যে। ক্যাবারের জন্য “লিডো রুম”এ ছিল নাচের উপযোগী ‘স্প্রাং ফ্লোর’, যা তখন ভারতের কোন হোটেলেই ছিল না। প্রথম বাঙালী ক্যাবারে নর্তকী ‘সন্ধ্যা রাতের’ শেফালী তাঁর নর্তকী জীবন শুরু করেছিলেন ফার্পোর লিডো রুমে, সাতশো টাকা মাইনেতে।

মিস শেফালী
ফার্পোর খাবারের মান ও স্বাদের সুক্ষ্মতা খাদ্যবিলাসীদের আপ্লুত করে রেখেছিল। বৃটিশ সেনাবাহিনীর সেবিকা জয়েস টেলর ভুলতে পারেননি ফার্পোর আইসক্রীমের স্বাদ। ১৯৪৪ সালে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘হট চকোলেট সস্ দেওয়া ফার্পোর আইসক্রীম— সে এক স্বর্গীয় স্বাদ!’ খাদ্যরসিকদের কাছে ফার্পোর স্টীক আর বিয়ার ছিল এক অতুলনীয় যুগলবন্দী। ফোর কোর্স মিল এর স্মৃতিচারণ করে একজন লিখেছেন, —’ক্রীম অফ চিকেন স্যুপ, ফ্রায়েড ফিস অ্যান্ড চিপস্, রোস্ট চিকেন উইথ ব্রাউন গ্রেভি , ভ্যানিলা আইসক্রীম উইথ হট চকোলেট সস্ — প্রতিটি ডিশে ফার্পোর উৎকর্ষ ছাপমারা!’ তবে, শুধু উঁচু মানের ‘খানা’, আর রকমারি ‘পিনা’ নয়, ফার্পোর আভিজাত্য ছিল খানাপিনার পরিবেশে, ওয়েটারদের আদবকায়দায়, পরিবেশনের নিপুণতায় আর আতিথ্যের আন্তরিকতায়। আচারে-ব্যবহারে, পোশাকে-পরিচ্ছদে কেতাদুরস্ত এঞ্জেলো ফার্পো নিজে তদারকি করতেন অতিথিদের।

এঞ্জেলো ফার্পো অনেক সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক পত্র পত্রিকায় প্রচারও পেয়েছিলেন। তিনি বৃটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং রাজা পঞ্চম জর্জ তাঁকে OBE সম্মান দিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি লন্ডনে মারা যান।
একাধিক বইতে তাঁর রেস্তোঁরার নাম স্থান পেয়েছে। যেমন, ডমিনিক ল্যাপিয়ের এরট ‘ফ্রীডম অ্যাট মিডনাইট’, ‘সিটি অফ জয়’, ফসকো মারাইনি’র ‘পিলগ্রিম ইন এশিয়া’, ‘সিক্রেট টিবেট’। ‘প্রিজনার্স ব্লাফ’ বইতে রলফ ম্যাগনার-এর স্মৃতিচারণে রয়েছে যে ঘটনাক্রমে যুদ্ধবন্দী হয়ে জার্মান ম্যাগনার বৃটিশ সেজে কীভাবে কলকাতায় এসেছিলেন এবং ফার্পোর রেস্তোঁরাতে খেয়েছিলেন। ফার্পো’জ কে তিনি Calcutta’s most exclusive restaurant বলে উল্লেখ করেছেন।

সত্তরের দশকের শেষ অবধি, প্রায় ছয় দশক ব্যাপী ছিল ফার্পো’জ এর স্বর্ণযুগ। ঐ সময়ে ফার্পোজ লিমিটেড এর কর্মী ছিল পাঁচশো জনেরও বেশী এবং টার্ন ওভার ছিল তৎকালীন ইতালীয় মুদ্রায় এক বিলিয়ন লিরা। কিন্তু আশির দশক থেকে বিভিন্ন কারণে ফার্পোর কতৃপক্ষ ব্যবসা চালাতে অসুবিধা বোধ করছিলেন। অবশেষে আশির দশকের শেষের দিকে ফার্পো বন্ধ হয়ে গেল। বাড়িটি এক মার্কেটে রূপান্তরিত হয়ে গেল। শেষ হয়ে গেল কলকাতার বর্ণময় ও সুস্বাদু এক অধ্যায়। কেবল রেশ রয়ে গেল বিভিন্ন মানুষের স্মৃতিতে আর বইয়ের পাতায়।
তথ্যসূত্র :
ওয়েবসাইট : Window on Travel, Enrico de Berbieri
বই : THE Elephant, THE Tiger and THE cell phone : Shashi Tharoor, Maharanis: A family saga of four queens Lucy Moore
Very goods
অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ ও সুলিখিত রচনা যা কলকাতার এক হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দিলো । আলোকিত হলাম লেখাটা পড়ে ।
উৎসাহ পেলাম, আনন্দ পেলাম, মতামত জানতে পেরে।
মনে পড়ে বাবা কলকাতায় গেলে ফারপোর পাউরুটি আনতেন।অনবদ্য প্রবাদ,ভোলা যায় না সেই স্মৃতি গুলো।
বাবা আবার কবে কলকাতা যাবেন আবার ঐ পাউরুটি আনবেন এসব নিয়ে ভাবনা থাকতো আমাদের ভাইবোনেদের মনে।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, শুভেচ্ছা নিন।