দেশে মেয়েদের সংখ্যা বাড়লেও ভাবাচ্ছে কন্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনা। তা প্রায় কমেনি বললেই চলে! শহর ও মফঃস্বলের পাড়ায় পাড়ায় তেলেভাজার দোকানের মত বাড়ছে ‘অ্যাবরশন ক্লিনিক’, আলট্রাসাউন্ডে ঘোষিত হচ্ছে কন্যাসন্তানদের ভাগ্য। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার পঞ্চম দফাতেও দেখা গেল এব্যাপারে ‘ন্যাস্টি স্টেটস’ বলে চিহ্নিত হরিয়ানা, পাঞ্জাব, চণ্ডীগড়, দিল্লি, রাজস্থান, ওড়িশা এবং মহারাষ্ট্রের অবস্থা খুব একটা বদলায়নি। তারা আগের তুলনায় কিঞ্চিৎ এগিয়েছে এইমাত্র। ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ এর ডাক দিয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু না বাঁচলে মেয়েরা স্কুলে যাবে কি করে?
১৯৯৪ সাল থেকেই চালু হয়ে গেছে ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ ও কন্যাভ্রুণ হত্যা রোখার আইন। সব নার্সিংহোম আর ক্লিনিকে ঝুলছে – এখানে লিঙ্গ নির্ধারণ হয়না, এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ নোটিস। তবুও অবস্থা বদলায়নি। নির্বিচারে ভ্রূণহত্যার কারণে দেশের ২২টা রাজ্যের ১৮টিতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের জন্মহার কম। শুধু পিছিয়ে থাকা নয়, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল রাজ্যগুলিতে কন্যাভ্রূণ হত্যা এবং সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের প্রবণতা বাড়ছে। প্রগতিশীলতা ও অগ্রগতির উদাহরণ হিসেবে কথায় কথায় কেরালার নাম আসে, সেখানেও কমছে মেয়েদের জন্মহার। তামিলনাডুতেও বাড়ছে এই প্রবণতা।

আমরা জানতাম, শহর মানুষকে আধুনিকতার মন্ত্রে দীক্ষা দেয়, তার মনে বোনে যুক্তির বীজ। গ্রামের মানুষের মধ্যে অন্ধবিশ্বাস ও অযৌত্তিক চিন্তাভাবনা বেশি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে নগরায়ন বাড়লেও নাগরিক মানসিকতার প্রসার ঘটেনি। গ্রামের তুলনায় শহরে কন্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনা বেশি। অথচ মেয়েদের সাফল্য ও সম্ভাবনার ব্যাপারে শহরের মানুষই সবথেকে বেশি ওয়াকিবহাল। শহরে মানুষের রোজগার, সচেতনতা, শিক্ষা আগের তুলনায় বেড়েছে। মেয়েদের অগ্রগতিতে সহায়তা করার জন্য সরকারি যোজনার সুবিধাও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু কোনকিছুই এই মানসিকতাতে বদল আনতে পারছে না। কুসংস্কারাচ্ছন্ন গণ্ডগ্রাম নয়, বংশে বাতি দেওয়ার জন্য পুত্রসন্তানের কামনা শহরের শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে এখনও বহাল তবিয়তে বিরাজ করছে।
অথচ বহু পরিবারে মেয়েটিই একমাত্র রোজগেরে কিংবা সে বাড়ির পুত্রসন্তানটির তুলনায় বেশি আয় করে। এককথায় সে কোনভাবেই বোঝা নয়। তবুও তার প্রতি বাড়ির লোকেদের ধারণা বদলায়না। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বোঝা ভাবার প্রবণতা লিঙ্গ নির্ধারণের মানসিকতার গোড়ায় বাতাস দিচ্ছে। বাসের কনডাক্টরদের মুখে অনেক সময় শুনি – পিছনে এগিয়ে যান। আমরা যেন সেই পিছনে এগিয়ে যাচ্ছি! প্রযুক্তির ভালোটা না নিয়ে নিচ্ছি খারাপটাই। ১৯৯০ নাগাদ চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রয়োজনেই এল আলট্রাসাউন্ড টেকনোলজি। আমরা তাকে বানিয়ে ফেললাম লিঙ্গনির্ণয়ের যন্ত্র। ১৯৯৪ এ আইন করে প্রয়োজন ছাড়া আলট্রাসাউন্ড টেস্ট বন্ধ হয়েছে। তবুও ভ্রূণহত্যার মত নৃশংসতায় তার ব্যবহার কমেনি।

দেশের ২০০১ এবং ২০১১’র জনগণনায় এই প্রবণতার আভাস পাওয়া গিয়েছিল। রাজ্য, জেলা, গ্রাম সর্বস্তরে সেসময় থেকেই কন্যাভ্রূণ হত্যার চেহারাটা স্পষ্ট হতে থাকে। তখন বিশ্বে প্রতি হাজার জন ছেলেপিছু মেয়েদের জন্মহার ছিল ৯৫২ জন। ২০১১’র জনগণনায় আমাদের দেশে তা দাঁড়িয়েছিল ৯১০জন। ২০১৯-২১ এ জাতীয় পরিবার সমীক্ষায় তা দাঁড়িয়েছে প্রতি হাজার ছেলেপিছু ৯২৯ জন। কোভিডের কারণে এবারের জনগণনা হয়নি, তাতে কি ছবি পাওয়া যাবে আমরা জানিনা। কন্যাভ্রুণ হত্যার ঘটনা সবথেকে বেশি হরিয়ানায়। তাই ২০১৫ সালে হরিয়ানার সোনপেট থেকে ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ এর ডাক দিয়েছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই প্রবণতা প্রকল্পের সাফল্য নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
আজকের ছোট পরিবার চাইছে তাদের মনপসন্দ শুধু একটি পুত্রসন্তান। কন্যাসন্তান বহু পরিবারের অ্যাজেন্ডাতে নেই। ছেলে, মেয়ে যাইহোক না কেন তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করার বদলে সেখানে শুধুই কষা হচ্ছে লাভক্ষতির হিসেব। মেয়ে হলে তাকে বিয়ে দিতে হবে, পাত্রকে দিতে হবে পণ, লেখাপড়া শেখাতে হবে – শুধু খরচ আর খরচ। আর ছেলে মানেই তো রোজগারের উৎস। বাড়িতে থেকে বাবা মাকে দেখবে, আবার বিয়েতে পণ নিয়েও কিছু নগদ প্রাপ্তিযোগ ঘটবে। এই মনোভাবই কন্যাভ্রূণ হত্যার সংখ্যা বাড়াচ্ছে।