| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নবনীতা দেবসেন : বাংলার নারীবাদী চেতনায় বিপ্লবী কণ্ঠস্বর : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ২৪০১ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২১

সৃজনবিশ্বে লেখনীধারণ করে নবনীতা সেন (১৯৩৮-২০১৯) তাঁর নারীমনস্কতাকে নানাভাবে মেলে ধরার অবকাশে নারীবাদে সোচ্চার না হয়েও তার অস্তিত্বকে আজীবন বয়ে চলেছেন। এজন্য তাঁর প্রকাশে কোনোরকম প্রতিবাদী চেতনার বিস্ফোরণ নেই। দুঃসাহসী দামাল নবনীতার অকুতোভয় প্রকৃতি সেখানে ডালপালা মেলেনি। এজন্য তাঁর নারীবাদী চেতনায় বিদ্রোহী বিকার নেই, রয়েছে স্বাধিকারবোধে অসহনীয় আত্মপ্রত্যয়। সেই আত্মপ্রত্যয়েই তিনি পুরুষতন্ত্রকে আত্মজিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করিয়েছেন, কোনোভাবেই তাতে পুরুষবিদ্বেষ নেই। অথচ এজন্য তিনি নারীদের স্বতন্ত্র অবস্থানকে কখনও হেয় করে দেখেননি, আত্মমর্যাদায় আত্মসচেতন করে তুলেছেন, আত্মপ্রত্যয়ী করায় সক্রিয় ছিলেন আজীবন। নবনীতার সাহিত্যচর্চাতেও তাঁর নারীকেন্দ্রিক জীবনদৃষ্টির সচেতন প্রয়াস। ‘দেশ’ পত্রিকায় উপন্যাস লেখার আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি লিখেছিলেন ‘আমি, অনুপম’ (১৯৭৬)। সেই প্রথম উপন্যাসটি যে তাঁর একমাত্র পুরুষকেন্দ্রিক উপন্যাস, তা জানানোর মধ্যে তাঁর মানসিকতায় নারীর দৃষ্টিভঙ্গির চেতাবনি আপনাতেই প্রকাশমুখর। সেক্ষেত্রে তাঁর সাহিত্যচর্চায় নারীবাদী চেতনার বিস্তার স্বাভাবিকতা লাভ করে।

সময়ের দাবিতে দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্যে কীভাবে পুরুষশাসিত রক্ষণশীল মানসিকতার পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তাতে নবনীতার গবেষকের অন্তর্দৃষ্টি তাঁর সাহিত্যের চর্চায় নবদিগন্তের পরিচয়কে নিবিড় করে তুলেছে। সেখানে পুরুষের আধিপত্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির মূলে তাঁর লেখনীর অনুসন্ধানী সক্রিরতা লক্ষ্যভেদী হয়ে উঠেছে। মহাকাব্যিক ঐতিহ্য পরম্পরায় যে পৌরুষিক আধিপত্যকামী মূল্যবোধের পরিচয় নানাভাবে প্রবাহিত হয়েছে, তার মধ্যে যেমন বিচিত্র রূপান্তর লক্ষণীয়, তেমনই দৃষ্টিভঙ্গিতেও এসেছে নবধারা। আদিকাব্য রামায়ণের অসংখ্য রূপ ও রূপান্তর নিয়ে নবনীতার একাডেমিক নিবিড় গবেষণাতেই নারীর দৃষ্টিভঙ্গিতে তার ভিন্নতর রূপায়ণ আবেদনক্ষম হয়ে উঠেছে। সীতার দৃষ্টিতে রামায়ণে সীতায়ণের পরিচয় উঠে এসেছে। তাতে সাহিত্যের ইতিহাসবিদদের কাছে মূল্য না পেলেও নবনীতার কাছে অমূল্য মনে হয়। তাঁর নারীবাদী ভাবনায় সেই  একাডেমিক গবেষণার বৈপ্লবিক প্রয়াসে তাঁর সৃজনবিশ্ব মূর্তি থেকে প্রতিমায় পরিণত হয়েছে। সেখানে আমাদের বোজা চোখকে খুলে দেওয়ার মানসে উপন্যাসকে আয়না করে তুলেছেন। তাঁর ‘বামাবোধিনী’ (১৯৯৭), ‘মায়া রয়ে গেল’ (২০০১) প্রভৃতি উপন্যাসে তার পরিচয় বিদ্যমান। প্রথম উপন্যাসে সেই রামায়ণ নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে নবনীতা তাঁর নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে আন্তরিক করে তুলেছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস বাদে সবগুলিই নারীকেন্দ্রিক। ‘বামাবোধিনী’র মুখ্যচরিত্র অংশুমালার দেশের বিচিত্র প্রকৃতির রামায়ণ অনুসন্ধানের মধ্যে নবনীতার রামায়ণচর্চার ছায়া কায়া লাভ করে। সেখানে ষোড়শ শতকের কিশোরগঞ্জের ফুলেশ্বরীর পাড়ের দ্বিজবংশীদাসের কন্যা চন্দ্রাবতীর রামায়ণ থেকে অন্ধ্রপ্রদেশের নেল্লরের গোপভরমের কুমোর কন্যা মোল্লাকের তেলেগু ভাষার রামায়ণের কথা প্রাধান্য লাভ করে। সেক্ষেত্রে সংস্কৃত ভাষাই শুধু পরিবর্তিত হয়নি, দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে গেছে।

আখ্যান অপরিবর্তিত হলেও তার উপস্থাপনের অভিমুখে রামের পরিবর্তে সীতার মাহাত্ম্য কীর্তিত হয়েছে। সীতার জন্ম থেকে তাঁর বিবাহ, সন্তানধারণ থেকে প্রসব সবেতেই সীতাকথার বিস্তার। শুধু তাই নয়, রাম-রাবণের নামমাত্র যুদ্ধের কথা বলেই কথকের মুখে সীতার বেদনাতুর জীবনের কথা প্রাধান্য লাভ করেছে। অন্যদিকে অযোধ্যা ধবংসের জন্য রামকেই দায়ী করা হয়েছে। পুরো কাহিনিই সীতাময়। সেক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ কন্যা চন্দ্রাবতী ও শুদ্র কন্যা তথা বারাঙ্গনা মোল্লার রামায়ণে সীতার মধ্য দিয়ে তাঁদের প্রার্থিত নারীর মূল্য ও প্রত্যয়ী মনোভাবের পরিচয়ে নবনীতা তাঁর নারীভাবনার অভিমুখকে প্রকট করে তুলেছেন। অংশুমালীর স্বামী মলয় তার স্ত্রীর কাজে তীব্র অসন্তুষ্ট। তার খেদ সজোরে বেরিয়ে আসে, ‘তুমি একটা উচ্চশিক্ষিত কালচার্ড পার্সন কী করে যে ওই ঝি-আয়াদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করো অংশু, আমি বুঝতে পারি না।’ শুধু তাই নয়, রামভক্তের প্রতাপ যেখানে ক্রমশ তীব্র প্রকাশমুখর, সেখানে অংশুমালার রামায়ণচর্চায় অকুতোভয় প্রকৃতি নবনীতার প্রখর আত্মসচেতনতায় পাঠককে সচকিত করে তোলে। মলয়ের চেতাবনিতে তার পরিচয় বিদ্যমান : ‘যখন সারাটা দেশ রাম রাম করে খেপে রয়েছে, ঠিক তক্ষুণি তোমাকে প্রবন্ধ লিখতে হল কোন দেশের রামায়ণে বাল্মীকি সীতার প্রেমিক-কাম-পালকপিতা, আবার কোথায় যেন রাম-লক্ষ্মণ দুই ভাই-ই সীতাকে নিয়ে সুখে ঘরকন্না করেন—দ্রৌপদী স্টাইলে—রামভক্তরা এসব নোংরা কথায় খেপে উঠবে না ভেবেছ ?’ অংশুমালার ভয় না পাওয়াই স্বাভাবিক। সে যে নবনীতারই মানসকন্যা। তাকে যে সীতা থেকেই শুরু করতে হবে। রামরাজত্বেই যে সীতার মধ্যে নারীর অমানবিক অস্তিত্ব প্রকট হয়ে উঠেছে! সেখানে রামায়ণের চেয়ে সীতায়ণের পাঠে নবনীতার সক্রিয়তা স্বাভাবিক মনে হয়।

রক্ষণশীল পুরুষশাসিত সমাজে ধর্মীয় পরিসরের মধ্যে দৈবিক চেতনা বিস্তারের মাধ্যমে নারীদের মানবিক অস্তিত্বকে বশীভূত করার সংস্কারে সামিল না হওয়াটাও সেক্ষেত্রে সমাজের বিরুদ্ধাচারণ হয়ে ওঠে। ‘মায়া রয়ে গেল’ উপন্যাসে নবনীতা সেদিকেও তাঁর লক্ষ্যকে নারীর প্রতিকূল জীবনের অন্তরায়গুলিকে আন্তরিক করে তুলেছেন। উপন্যাসে হিন্দু মহাসভার কর্মী পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসাবে উচ্চশিক্ষিত ডাক্তার প্রসেনজিৎ ‘হিন্দুনারী সুরক্ষা সমিতি’ গড়ে তোলেন। অথচ সেখানে নারীর সুরক্ষার চেয়ে সংস্কারের অধীন নারীকে সুরক্ষিত করাই লক্ষ্য। অন্যদিকে যেখানে নারী হয়ে ওঠাটায় প্রতিকূলতার চূড়ান্ত, সেখানে তার আনুকূল্য প্রত্যাশা না জাগানোই দস্তুর। এজন্য প্রসেনজিতের স্ত্রী সুষমা স্বকীয় ব্যক্তিত্বে অগ্রস্রর হয়ে সেটিকে ভেঙে ‘বালিকা সুরক্ষালয়’ গড়ে তোলেন। তাতে স্বাভাবিক ভাবেই প্রসেনজিতের বিরূপ মনোভাব প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। সুষমাকে সে জানিয়ে দেয় : ‘যত রাজ্যের ভিকিরি আর বেশ্যাদের নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি। সাধুসন্ন্যাসিনীদের সঙ্গ তোমার মোটে ভালই লাগল না।’ নারীর স্বাধীনতা সেখানে পুরুষের চোখে ব্যাভিচার। আর সেই ব্যাভিচারী দৃষ্টিভঙ্গির মূলে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের সংস্কারে সমাজে নারীর সক্রিয় ভূমিকার প্রতিও নবনীতা সমান লক্ষ্যভেদী। প্রসেনজিত সেই সংস্কারান্ধ মা লীলাবতীরই সন্তান। বন্ধ্যা ভেবে সুষমাকে কথা শোনানো লীলাবতীই পুত্রবধূর সন্তানসম্ভাবনাতেও তাঁর নারীর প্রতি হেয় মানসিকতায় স্পষ্টবাক্‌মূর্তি ধারণ করে বলেছেন : ‘আমাদের কোনও ভাবনা নেই আপনার মেয়েকে নিয়ে। হবে তো মায়ের মতনই যমজ মেয়ে—ও থাকল কি গেল, আমাদের এসে যাবে না।’ সমাজে নারীদের অমানবিক বৈষম্যমূলক স্থিতির জন্য পুরুষের প্রতি শ্রেয়বোধের সংস্কারের জন্য শুধু পুরুষের আধিপত্যবাদী চেতনাই দায়ী নয়, নারীদের তার প্রতি অন্ধ আনুগত্যও সমান প্রাসঙ্গিক। সেখানে পুরুষবিদ্বেষ নয়, পুরুষতন্ত্রের প্রতি নবনীতার প্রত্যয়ী লেখনী বিপ্লবের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এজন্য তাঁর অংশুমালা, সুষমারা অকুতোভয় নারীপ্রতিভূ। অন্যদিকে নবনীতা পুরুষকেন্দ্রিক নারীচেতনায় অভ্যস্ত পথে চলার মধ্যেই নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার পরিসর সংকোচনের বিষয়টি নানাভাবে তুলে ধরেছেন। সেদিক থেকে নারীর স্বকীয় অস্তিত্বে আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার প্রতি তাঁর সজাগ দৃষ্টি পুরুষতন্ত্রের স্বরচিত বৃত্ত থেকে গুটি কেটে প্রজাপতির পথ দেখায়। বিদ্রোহ নয়, নীরবে বিপ্লবই তাঁর লক্ষ্য। এজন্য নবনীতার মধ্যে নারীবাদ নিয়ে সোচ্চার বিদ্রোহ ঘোষিত হয়নি। অথচ তাঁর নারীদের স্বকীয় পথের অভিযান নানাভাবেই প্রকাশমুখর।

বৈদগ্ধ্য ও রসিকতা সহযোগে যখন সরস গল্প লিখেছেন, সেখানেও তার চলনে স্বতন্ত্র পথের দিশা। ‘ভালোবাসা কারে কয়’ গল্পে নবনীতা প্রেমের পরিণতি বিবাহের ছকবন্দি চেতনাই ভেঙে দিয়েছেন : ‘প্রেমকে যদি ধরে রাখতে চাও, বিয়ের মধ্যে টেনে নিয়ে যেও না। একটু দূরত্ব ভালো। স্বার্থহীন না হলে প্রেম থাকে না। বিয়ের মানেই স্বার্থ। দুটো পরস্পরবিরোধী। রাধা কি শ্যামের বউ ছিলেন ? ছিলেন না। থাকতে পারেন না।’ সেখানে নবনীতার বুদ্ধিদীপ্ত রসবোধে নারীপুরুষের সম্পর্কের ছকবন্দি বুনিয়াদী চেতনায় মুক্ত পরিসর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। শুধু তাই ন্য়, তাঁর নারীকেন্দ্রিক চেতনা পুরুষতান্ত্রিক চেতনায় মহার্ঘ লাভে আবর্তিত না হওয়ায় তার প্রতিবাদী চেতনা সর্বদা অন্ধ আগ্রাসী আক্রমণে সামিল না হওয়ায় তার কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসার আত্মপ্রত্যয় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এজন্য তাঁর নারীবিশ্বে যেমন আবেদন-নিবেদন নেই, তেমনই নেই প্রতিবাদ বা বিদ্রোহের রণহুঙ্কার, আছে শুধু নারীবিশ্বের আত্মপ্রত্যয়ী স্বতন্ত্র পরিসর। সেই পরিসরের সম্প্রসারণে নবনীতা তাঁর বহুমুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আজীবন সক্রিয় ছিলেন।

নবনীতার কবিসত্তাতেও নারীজীবনের বহুমাত্রিক প্রতিবাদী চেতনা সবাক্‌মূর্তি লাভ করেছে। তাঁর প্রথম কাব্য ‘প্রথম প্রত্যয়’ (১৯৫৯)-এর পরবর্তীতে সেই মূর্তি ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ‘নারী তুমি অর্ধেক আকাশ’, ভালোবাসা কারে কয়’, ‘সাত কন্যের দেশে’ প্রভৃতি কাব্যনামেই তাঁর কবিসত্তায় নারীবিশ্বের পরিচয় উঠে এসেছে। সেখানে নারী-পুরুষের ‘ভালবাসা’ও ‘ভাল’ ও ‘বাসা’য় আপেক্ষিক হয়ে পড়ে। তাঁর ‘ভালবাসা’ কবিতায় কবি নবনীতা সেনের অন্তর্দৃষ্টি সংবেদী পাঠককে সচকিত করে তোলে : ‘ ‘ভাল : তোমার ভাল, আমার ভাল/ ভাল এখন নয় তো, ‘আমাদের’—/কখন ভালর ‘ভাল’টা ফসকাল / ভাল এখন ওদের তাদের। / বাসা : তোমার বাসা, আমার বাসা / বাসা এখন নয় তো, ‘আমাদের’/ কখন ভাসায় শাপ দিয়ে দুর্বাসা / বেঁটে দিলেন এদের ওদের তাদের।’ তাতে অবশ্য কবির লেখনীর আক্ষেপ ব্যক্ত হয়নি, বরং তাঁর সত্যপ্রকাশের লক্ষ্য আরও প্রত্যয়মুখর হয়ে উঠেছে : ‘পালাক ভাল, যাক না উড়ে বাসা / জগৎটাকে দিচ্ছি তবু ফাঁকি / চিতার ভস্মে নাভির কুণ্ডু বাকি ; / তোমার আমার উহ্য ভালবাসা।’ শুধু তাই নয়, যে সমাজে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ববোধে পুত্রের জন্মে সৌভাগ্যের কল্পনায় কন্যার দুর্ভাগ্যে পুন্নাম নরকের দ্বার খুলে যায়, সেখানে নারীর অভিশপ্ত জীবন সংস্কারে পরিণত হয়। নবনীতা তাঁর কবির অন্তর্দৃষ্টিতে সেই মূলেরও উন্মীলন ঘটিয়েছেন। তাঁর ‘উত্তরপুরুষ’ কবিতায় সেই পুন্নামের সংস্কার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে : ‘ স্তন্যের বদলে ধরলি সন্তানের ওষ্ঠপুটে / —জল। / অগ্নির বদলে রাখলি সন্তানের মর্ম মূলে, / —জল।/ ……/ শুক্রের বদলে পুরলি সন্তানের অণ্ডকোষে /—জল।/ জলের শরীর গড়ে স্বেচ্ছালুপ্তি / —হা পিতৃপুরুষ।/ নিজের বরাদ্দ রাখলি অনন্ত পুন্নাম / চিরতৃষ্ণা,—নির্জলা জ্বলন।’ সেই পিতৃতান্ত্রিকতা থেকে মুক্তিপিয়াসী নবনীতা ত্রাতা হিসাবে পুরুষের রাজকীয় ভূমিকাকে মেনে নিতে পারেননি। এজন্য তাঁর রূপকথার গল্পে রানি গিয়ে রাজাকে উদ্ধার করে। সেখানে পুরুষের একাধিপত্যের সংস্কারকেই নবনীতা বদলে দিয়েছেন। অথচ তা নিয়ে তাঁর দেখনদারি বা রণহুঙ্কার নেই, আছে সংযত অথচ আত্মপ্রত্যয়ী বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

আবার সেই পদক্ষেপ যখন পূর্বসূরির লেখায় খুঁজে পেয়েছেন, সেখানেও তিনি সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। আশাপূর্ণা দেবী তাঁর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি (১৯৬৪) উপন্যাসের জন্য যে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার(১৯৭৬) পেয়েছিলেন, তার নেপথ্যে নবনীতার সক্রিয় উদ্যোগ বর্তমান। তিনিই সাহিত্য অকাদেমির অন্য সদস্যদের উপেক্ষাকে অস্বীকার করে তাঁদের সেই উপন্যাসপাঠে সামিল করেছিলেন। সেকথা তিনি ‘দেশ’-এর বই সংখ্যা ২০০৯-এ জানিয়েছেন। আশাপূর্ণা দেবী সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন, ‘ মেয়েদের জীবন যে আপাতদৃষ্টিতে রান্নাঘর থেকেও আরও বড় জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে, উনি তার অন্যতম উদাহরণ।’ অন্যদিকে সেই ‘বড় জায়গা’ থেকে নারীর সার্বিক ব্যক্তিত্বের প্রকাশমুখর প্রকৃতি কত তীব্র আবেদনক্ষম হয়ে উঠতে পারে, তাঁর পরিচয়ে নবনীতার ভুমিকা দৃষ্টান্তে আপনাতেই অনন্যা হয়ে উঠেছে। সেখানে তাঁর বহুমুখী কর্মতৎপরতায় নারীবিশ্বের আকাশ ক্রমশ বিস্তার লাভ করেছে। শুধু নিজের লেখালেখিই নয়, অন্য লেখিকাদের সংগঠন গড়ে তোলা থেকে তার বহুমুখী বিস্তারে তাঁর উদ্যোগী ভুমিকা থেকে ‘সই’ (রাধারানী দেবীর জন্মদিনে, ২০০০-এর ৩০ নভেম্বর), ‘সই সম্মান’, ‘সই সাবুদ পত্রিকা’ (২০১৩), ‘সই-মেলা বই-মেলা ২০১৩’ প্রভৃতির জন্ম নবদিগন্তের সূচনা করেছে।

অন্যদিকে নবনীতার লেখনীও ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক বনেদিয়ানা লাভ করেছে।  ছোটবেলায় ‘প্রতিদিন’ পত্রিকায় যে মেয়েটি রবিবারের পাতায় ‘ঘুলঘুলি’  লিখেছিলেন, সেই মেয়েটিই সময়ান্তরে স্বনামেই তাঁর লেখনীকে আবেদনক্ষম করে তোলেন। ‘বাংলা লাইভ’-এর পত্রিকায় দীর্ঘ পাঁচবছর ধরে চলা পাক্ষিক কলম ‘নবনীতার নোটবই’ থেকে জীবনের অপরাহ্নবেলায় ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর ‘রোববার’-এ আমৃত্যু চলতে থাকা ধারাবাহিক রচনা ‘ভাল-বাসার বারান্দা’য় তার বনেদি পরিসর বিস্তৃত। শুধু তাই নয়, নবনীতার সাহিত্যের বহুমুখীর প্রতিভায় গড়ে তোলা ভাবমূর্তিতে তাঁর লেখনীপ্রতিভার আবেদনও আন্তরিক হয়ে উঠেছে। সেখানে ভ্রমণ, উপন্যাস, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, গল্প, আত্মকথা, কবিতা, নাটক, অনুবাদ কবিতা নিয়ে তাঁর ‘নব-নীতা’র (১৯৯৯-এ অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত) পরিচয়ে সেই অতিপ্রজ লেখক না হয়েও বহুপ্রজ লেখকসত্তার আবেদন নিবিড় হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে নবনীতা স্বকীয় নারীব্যক্তিত্বের বহুধা বিস্তৃতির মাধ্যমে যেভাবে তাঁর পরিসরকে প্রকাশমুখর করে তুলেছেন, তার মধ্যেও নারীবাদের স্বতন্ত্র অথচ উদার আকাশ রঙিন হয়ে উঠেছে। সেক্ষেত্রে তাঁর অভিভাবকত্বও পাথেয় মনে হয়।

বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকা ‘প্রথম আলো’ (২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)-কে তাঁর দেওয়া সাক্ষাৎকারে (‘চট করে লেখা কিছু মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায় না’) সে কথাই প্রত্যয়সিদ্ধ হয়ে ওঠে : ‘আমি নিশ্চয় নারীবাদী লেখক ; কিন্তু তাঁর মানে এই নয় যে আমি পুরুষবিরোধী। নারীবাদ মানে পুরুষ বিদ্বেষ নয়। নারীবাদ নারীকে সম্মান দেয়, পুরুষকে অসম্মান করে না। হ্যাঁ, আমরা পিছিয়ে আছি অনেকটা।’ শুধু  তাই নয়, পুরুষদের লেখাতেও যে নারীবাদের পরিচয় বর্তমান, নবনীতা সেকথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখেরাও লেখায় নারীবাদী ছিলেন। অন্যদিকে তাঁদের সময়ে ‘কলমে বোরকা পড়ানো থাকত’ বলার মধ্যে দিয়ে নবনীতা শুধু নারীদের লেখকসত্তার প্রতিকূলতার কথাই ব্যক্ত করেননি, তার উত্তরণের অবকাশ যে সচল সক্রিয়, তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সেখানে তাঁর নীরবে নারীবাদী ভাবনা আত্মপ্রত্যয়ের পথ বেয়ে অংশুমালা, সুষমারা শেষে নবনীতা দেবসেনে অবিসংবাদী ব্যক্তিত্বে আত্মপরিচয় খুঁজে ফেরে।

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev