কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কুইনাইনের তিক্ততা সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘কুইনাইন অসুখ সারায় কিন্তু কুইনাইন সারাবে কে?’
ম্যালেরিয়া রোগের উপশমে ব্যবহার করা হয় তেতো কুইনানিন। সম্প্রতি করোনা অতিমারীতে হাইড্রোক্সীক্লোরোকুইনের সঙ্গে পরিচিত কমবেশি সকলেই। যার উচ্চারণ নিয়েই ট্রোলড হতে হয় আবার হুমকিও শুনতে হয়েছিলো তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে। এই দুটি দরকারী ঔষধের উৎপত্তি কিন্তু একটি গাছের ছাল থেকে…সিঙ্কোনা। আজ হবে ঐতিহাসিক সেই সিঙ্কোনা গাছের গল্প।
সিঙ্কোনার আদি বাসস্থান দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের একটি ছোট দেশ পেরু। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সেখানকার স্প্যানিশ ভাইসরয় বা লাটসাহেব ছিলেন চতুর্থ কাউন্ট অফ সিনকেন।দক্ষ প্রশাসক হিসাবে তার বেশ নামডাক ছিলো। স্ত্রীর সঙ্গে থাকতেন পেরুর রাজধানী লিমায়।তাঁর স্ত্রী একবার প্রবল জ্বরে পড়লেন। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে আর জ্বর ছাড়ে প্রচুর ঘাম দিয়ে বারবার। কিছুতেই রোগ সারতে চায়না। লাটসাহেব পড়লেন ভারী চিন্তায়।

এমন এক সময়, স্প্যানিশ সরকারের এক পরিষদ ভাইসরয়কে চিঠি লিখে এক টোটকা বাতলে দিলেন। জানালেন, স্থানীয় এক গাছের ছাল খেয়ে এমনই জ্বর থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছেন। একথা জানা মাত্রই সিনকেন যত দ্রুত সম্ভব লিমার প্রাসাদে সেই গাছ আনার ব্যবস্থা করলেন। সত্যিই ম্যাজিকের মতো কাজ করলোসেই টোটকা। জ্বর মুক্ত হলেন লেডি ভাইসরয়। ম্যালেরিয়া চিকিৎসায় এই গাছের গুণের কথা ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস ১৭৪২ সালে পেরুর সেই সময়কার ভাইসরয়ের পত্নী কাউন্টেস অফ সিনকোনের নাম অনুসারে গাছটির নামকরণ করেন সিঙ্কোনা।
নিম্ন তাপমাত্রার কম্পন থেকে রক্ষা পেতে পেরু, বলিভিয়া ও ইকুয়েডর অঞ্চলের কুইচুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ সিঙ্কোনা গাছের পাতা ব্যবহার করতো। ‘ফিভার ট্রি’ অর্থাৎ জ্বর গাছের গুনাগুন সম্বন্ধে ইউরোপকে সচেতন করেন অষ্টাদশ শতকের এক ভূপর্যট চার্লস মেরি ডে লা কন্ডামিন। জেসুইট মিশনারীগণ ইউরোপে সিঙ্কোনা গাছ প্রথম ইউরোপে নিয়ে আসেন।

কাউন্টেস অফ সিনকোনো
১৮২০ সালে কুইনানিন এর যুগান্তকারী আবিস্কার করেন দুই ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়ের জোসেফ পেলেটির ও জোসেফ বিয়েনেম কোভেন্টু। সিঙ্কোনা গাছের ছালে থাকা কুইনিনই আসলে ম্যালেরিয়া সারাতে কার্যকরী ভূমিকা নেয়।শুরু হয় পরীক্ষানিরীক্ষা গবেষণাগারে। ফলে আবিষ্কার হয় অনেকগুলো ওষুধ, যাদের মধ্যে সব চেয়ে বেশি সাফল্য পেলো ক্লোরোকুইন।
মশা ও মানুষের সহাবস্থানের দরুণ সম্ভবত ম্যালেরিয়ার আগমন। ম্যাল এরিয়া অর্থ্যৎ খারাপ বাতাস। এর প্রকোপে পৃথিবীর একের পর এক জনবসতি উধাও হয়ে গেছে।
উইলিয়াম কুলেনের মেটেরিয়া মেডিকা অনুবাদের সময় হোমিওপ্যাথির জনক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান খেয়াল করেন ম্যালেরিয়া সারাতে সিঙ্কনা গাছের ছালের ব্যবহার উল্লেখ করা আছে। সিঙ্কোনা গাছের ছাল ভীষণ তেতো, আবার ম্যালেরিয়া হলে রোগীর মুখ এমনি তেতো হয়ে যায়।এই দুই তেতো ভাবের কোন সম্পর্ক আছে কী নেই বুঝতে টানা দু-সপ্তাহ ধরে সিঙ্কোনার ছাল সেবন করেন।শুধু তিনি নন, সেবন করালেন কিছু পরিবারের আত্মীয়ও বন্ধুদের। এরপর হ্যানিম্যান এবং অন্যান্যদের মধ্যে ম্যালেরিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। লক্ষণগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখলেন। এই ঘটনাগুলো অনুধাবন করে চিকিৎসক উপলব্ধি করেন ‘লাইক কিওরস লাইক’। আবিষ্কার হয় হোমিওপ্যাথির।

ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়ের জোসেফ পেলেটির ও জোসেফ বিয়েনেম কোভেন্টু
ভারতে চা আর সিঙ্কোনার আবাদ শুরু হয় কাছাকাছি সময়ে। ১৮৬১ সালে নীলগিরিতে সিঙ্কোনার চাষ শুরু হয়। দার্জিলিংয়ে দক্ষিণ আমেরিকার গাছের চারা এসে তখনো পৌঁছায়নি। এর কিছু বছর পর দার্জিলিং, আসাম ও সিকিমে সরকারী ও বেসরকারি উদ্যোগে সিঙ্কোনা বাগান গড়ে ওঠে। সিঙ্কোনার ক্ষেত্রে সাহেবরা অবশ্যি খাজনা নয়, মানবকল্যাণের কথাই বলেছেন বলে শোনা যায়। সিঙ্কোনা গাছের থেকে প্রাপ্তি কুইনাইনের কল্যাণেই বাংলা ম্যালেরিয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিলো। ম্যালেরিয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ডাকঘরের মারফত নামমাত্র মূল্যে কুইনানিন বিলি করা হতো। দার্জিলিং জেলার মংপুতে সিঙ্কোনা চাষের সেবা স্বাস্থ্যরক্ষার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

মংপুতে মনমোহন সেন-মৈত্রেয়ী দেবীর বাসভবন
তবে মংপুর ইতিহাস কেবল চাষ বলেই খ্যাত নয়, আছে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট। ১৯৪০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন পালন উপলক্ষে মৈত্রেয়ী দেবী ভেঙেছিলেন মংপুর সাহেবি প্রথা। আমন্ত্রণ করলেন বাগানের শ্রমিকদের। ঘটনাটি ভালো চোখে দেখেননি ব্রিটিশরা। ১৯৪২ সালে দাঙ্গা বাঁধলে বাঙালি সিঙ্কোনার শ্রমিকদের কোন ব্যবস্থা হয়নি। মৈত্রেয়ী দেবী তবু কাজ চালিয়ে যান তাদের নিয়ে। তৈরি করেন শ্রমিক কল্যাণ কেন্দ্র। যদিও আজ তার অধিকাংশই অতীত।
বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে পরিবর্তন হয়েছে ম্যালেরিয়া বা করোনার চিকিৎসা পদ্ধতি কিন্তু গুরুত্ব হারায়নি এই গাছ। একসময় যেভাবে সিঙ্কোনা পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ডের ইতিহাস ভূগোলের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলো, আজ অবধি এমন কোন গাছ নিয়ে হয়নি।
Onek kicchu jante parlam… thanks for the update