চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার দেশে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির সংখ্যা প্রকাশ করেছে কেন্দ্র। বাগাড়ম্বর করে বলা হচ্ছে, তাক লাগানো বৃদ্ধি হয়েছে। সেসব কথাতে পরে আসছি। তবে ভারতের আর্থিক হাল কতটা ভালো, সেটা বোঝার একটা উপায় হলো, এ দেশে ব্যাবসা বাণিজ্যে বিদেশিরা কতটা টাকা ঢালছে। বিদেশি পুঁজি মূলত দু’ধরনের। প্রথম ধরনটি সেই পুঁজি, যারা এ দেশে কল কারখানা, নানা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। ধরা যাক, বিদেশ থেকে কোনো কর্পোরেট সংস্থা এ দেশে এসে তাদের শাখা গড়ে তুলল বা ভারতে থাকা কোনো ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান পুরোটা বা আংশিক ভাবে কিনে নিল। ভারতের মাটিতে তাদের কল কারখানা, অফিস, নানা কেন্দ্র ইত্যাদি স্থাপিত হলো, সেগুলিতে লোকজন কাজ করতে শুরু করল, তাতে উৎপাদন হতে লাগল। এটা প্রথম ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ, যাকে পোশাকি ভাষায় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট, সংক্ষেপে এফডিআই বলে।

দ্বিতীয় ধরনটা হলো এ দেশে সরাসরি ব্যাবসা না করে শেয়ার কেনা। ধরা যাক ইংলন্ডের কোনো হেজ ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, বিমা সংস্থা বা বিনিয়োগকারী ব্যাঙ্ক ভারতের শেয়ার বাজারে পাউন্ড খাটাচ্ছে। শেয়ারের দাম বাড়লে তাদের লাভ, উল্টোটাও সত্যি। এরা এ দেশের ব্যাবসা পরিচালনা করছে না, শুধু ভারতের নানা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মালিকানার একটা অংশ কিনছে, আবার লাভের মুখ দেখলে বিক্রি করে লাভ ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। এটাকে টেকনিক্যাল ভাষায় বলে ফরেন ইনস্টিটিউশন্যাল ইনভেস্টমেন্ট বা সংক্ষেপে এফআইআই।

প্রথম পন্থা, অর্থাৎ এফডিআই থেকে দেশের অর্থনীতি সরাসরি লাভবান হতে পারে, যদি দেশের সরকার সমস্ত নিয়ম বিধি ঠিক মতো লাগু করে। এ দেশে এফডিআই আসার চিত্রটা কী রকম? এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ভারতে বিদেশি বিনিয়োগ আসা কমে যাচ্ছে।
সারণি ১
প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে (শত কোটি ডলারে)
দেশ অক্টো’২০-মার্চ’২১ এপ্রিল’২১-সেপ্টে’২১
চিন ১৪৪ ১৭৭
ইউএসএ ১১৫ ১৪৯
ইউকে ২০ ৪৬
কানাডা ৮ ২৬
আর্জেন্টিনা ২.৮৯ ৪.০৬
ব্রাজিল ১৬.০৪ ২২.৫০
ইন্দোনেশিয়া ৭.৯১ ১১.৫৬
রাশিয়া ১১.৪৬ ১১.৩২
ভারত ৪৭.০৭ ২২.৯৩
দেখা যাচ্ছে, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের আগমন চলতি আর্থিক বছরে প্রায় সব দেশেই বেড়েছে। রাশিয়াতে সামান্য কমেছে। কিন্তু আমাদের দেশে ওই বিনিয়োগ অর্ধেকেরও কম হয়ে গেছে। এই দেশগুলির শতাংশে বৃদ্ধি-হ্রাস এরকম—

সারণি ২
বিদেশি বিনিয়োগেবৃদ্ধি ও হ্রাস (শতাংশ)
দেশ অক্টো’২০-মার্চ’২১ থেকে এপ্রিল’২১-সেপ্টে’২১
চিন ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি
ইউএসএ ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি
ইউকে ১৩০শতাংশ বৃদ্ধি
কানাডা ২২৫ শতাংশ বৃদ্ধি
আর্জেন্টিনা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি
ব্রাজিল ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি
ইন্দোনেশিয়া ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি
রাশিয়া ১.২২ শতাংশ হ্রাস
ভারত ৫১.২৮ শতাংশ হ্রাস
ভারতে জিডিপি বৃদ্ধির শোরগোল উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, বলা হচ্ছে ভারত বিশ্বে সর্বাধিক গতিতে উন্নয়ন করছে, তাহলে এই তথ্য কী ভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে? বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ধর্ম হলো, যে দেশে তারা আসতে চায়, বা তেমন প্রস্তাব বিবেচনা করে, সে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক পরিস্থিতির বিচার তারা করে। এই সব বিচারেই ভারত এফডিআই আসার পক্ষে প্রতিকূল বলেই ভাবছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা, অন্তত গত ছ’মাসের তথ্য তাই বলছে। ঠিক এই জায়গাটাতেই লুকিয়ে আছে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির ধোঁকার টাটি।

জিডিপি বৃদ্ধির প্রকৃত চিত্রটা ঠিক কী রকম? গত বছরে লকডাউনের সময়ে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত সময়টা হলো এপ্রিল থেকে জুন ত্রৈমাসিক। ওই তিন মাসে ভারতের অর্থনৈতিক উৎপাদন ২৪.৪ শতাংশ সংকুচিত হয়ে যায়। সহজ কথায় এর অর্থ হলো, ২০১৯ সালের একই সময়ে যদি ১০০ টাকা উৎপাদন হয়ে থাকে, তাহলে ২০২০ সালের এপ্রিল-জুন মাসে উৎপাদন হয়েছিল ৭৫ টাকা ৬০ পয়সা। গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে জিডিপি আবার সংকুচিত হয়েছিল ৭.৪ শতাংশ। উপরের পদ্ধতিতে হিসেবটা হবে, ২০১৯ সালের একই সময়ে যদি ১০০ টাকার উৎপাদন হয়ে থাকে, তবে ২০২০ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছিল ৯২ টাকা ৬০ পয়সায়। ২০২০-২১ অর্থবর্ষের পরের দু’টি ত্রৈমাসিকে জাতীয় উৎপাদন যথাক্রমে ০.৫ ও ১.৬ শতাংশ বেড়েছিল। ০.৬ শতাংশ বাড়ার অর্থ প্রায় একই থাকা, ১.৬ শতাংশ বাড়া মানে খুবই সামান্য বাড়া। এবার আসুন চলতি অর্থবর্ষের হিসেবে। ২০২১ সালের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে ভারতের উৎপাদন বৃদ্ধি হলো ২০.১ শতাংশ হারে। আর এই নিয়ে চিল চিৎকার শুরু হলো।

কিন্তু ঠান্ডা মাথায় হিসেবটা কষলে কী দাঁড়ায়? আগের উদাহরণ অনুয়াযী ২০২০ সালের এপ্রিল-জুন তিন মাসে উৎপাদন হয়েছিল ৭৫ টাকা ৬০ পয়সা। এবারে তার থেকে ২০.১ শতাংশ বাড়ল, কত হলো? সহজ অঙ্কেই পাওয়া যায়, এবার উৎপাদন হলো ৯১ টাকা ১৭ পয়সা, যা ২০১৯-এর একই সময়ে থেকেও কম। একই ভাবে ২০২১-এর জুলাই-সেপ্টেম্বরে জাতীয় উৎপাদন বাড়ল ৮.৪ শতাংশ বেড়েছে, এই বৃদ্ধি ২০২০ সালের ৯২ টাকা ৬০ পয়সার তুলনায়। যার অর্থ, ২০১৯ সালের একই সময়ে ১০০ টাকার উৎপাদন হলে এবার হয়েছে ১০০ টাকা ৩৮ পয়সা। অর্থাৎ ২০১৯ সালের পর্যায়েই রয়েছে উৎপাদন। এটা অস্বীকার করা যায় না, করোনা অতিমারি প্রবল আঘাত হেনেছে অর্থনীতির উপর। কিন্তু মিথ্যা বৃদ্ধির লোকঠকানো হট্টগোলে আসল সত্যটাই তো চাপা পড়ে যাচ্ছে। আমজনতার কাছে তা চাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা নেওয়া সহজ, কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সব বুঝেশুনেই এগোয়। তাদের হিসেবে ভারত মোটেই গন্তব্যস্থল হতে পারে না। এই বাস্তবতা কে অস্বীকার করতে পারে? আর সামাজিক ও অন্য ক্ষেত্র? তা নিয়েও রয়েছে গাদা প্রশ্ন, সেটা পরের লেখার জন্য তুলে রাখা যাক।