সে দিনা ছিল পয়লা বৈশাখ, ১২৯৩ সাল, সোমবার। ইংরেজি ১৩ এপ্রিল, ১৮৮৬। স্থান উত্তর কলকাতার কাশীপুর উদ্যানবাটি। সময় প্রাতঃকাল বেলা ৮টা/৯টা হবে। উদ্যানবাটির উপরতলার বড় ঘরটিতে কণ্ঠরোগে আক্রান্ত শ্রীরামকৃষ্ণ স্বীয় শয্যায় বসে আছেন। “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে”র বর্ণনায় ১১৫ বছর আগেকার বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটির এক চিত্তাকর্ষক ও প্রাণবন্ত ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সেদিনের প্রসঙ্গ স্মরণ করার আগে আমরা একটিবার পুরনো কয়েকটি ঘটনা স্মরণ করে নিতে চাই। ইংরেজি ১৮৮৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কণ্ঠ রোগে আক্রান্ত শ্রীরামকৃষ্ণকে চিকিৎসার প্রয়োজনে দক্ষিণেশ্বর থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। তারপর উত্তর কলকাতার ৫৫ নম্বর শ্যামপুকুর স্ট্রিটে একটি ভাড়া বাড়িতে তাঁকে নিয়ে আসা হয়, ২ অক্টোবর। এই বাড়ি এখন ভক্তজনের কাছে ‘শ্যামপুকুর বাটি’ নামে পরিচিত এবং শ্রীরামকৃষ্ণ-তীর্থে রূপান্তরিত। এই বাড়িতেই ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার তাঁর চিকিৎসার ভার গ্রহণ করেন।
এক খোলামেলা জায়গা এবং প্রশস্ত স্থানের জন্য ১৮৮৫ সালের ১১ ডিসেম্বর শ্রীরামকৃষ্ণকে ভক্তরা নিয়ে আসেন কাশীপুর উদ্যানবাটিতে। এখানেই তিনি নরলীলার শেষদিন পর্যন্ত (১৮৮৬ সালের ১৬ আগস্ট) অবস্থান করেন। এই উদ্যানবাটির মালিক ছিলেন রানী কাত্যায়নী জামাতা গোপালচন্দ্র ঘোষ। শ্রীরামকৃষ্ণের পরম ভক্ত ডা. রামচন্দ্র দত্ত বাড়ি ভাড়ায় যোগাড় করেন। এই বাড়িতেই শ্রীরামকৃষ্ণ ১৮৮৬ সালের পয়লা জানুয়ারি গৃহী-ভক্তদের সামনে আত্মপ্রকাশ ও কৃপা করেন। কল্পতরুরূপে। বর্তমানে এই বাড়ি রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের অন্যতম শাখাকেন্দ্র।
বাংলা ১২৯৩ সালের পয়লা বৈশাখ শ্রীরামকৃষ্ণ এই কাশীপুর উদ্যানবাটির দোতলায় বড় ঘরটিতে অবস্থান করছিলেন। তিনি তখন গুরুতর অসুস্থ। ওই বাড়িরই উত্তর-পূর্ব কোণের ছোট ঘরটিতে থাকতেন জননী সারদামনি। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, এই ঘরেই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর এগারোজন ত্যাগী ভক্তকে গেরুয়া বসন ও রুদ্রাক্ষের মালা দিয়ে ভারতের দ্বিতীয় সন্ন্যাসী সংঘের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত করেছিলেন।
শ্রীম কথিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত অনুসরণ করে জানতে পারি, সিঁদুরিয়া পট্টি নিবাসী মণি মল্লিক আগের দিন রাত্রে দক্ষিণেশ্বরেই অবস্থান করেন। নববর্ষের প্রথম প্রভাতে তিনি গঙ্গাস্নান করে এলেন, তারপর শয্যায় উপবিষ্ট শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম করলেন। পরম ভক্ত তিনি। তারপরই কলকাতা থেকে দক্ষিণেশ্বরে সেই পবিত্র প্রভাতে এসে উপস্থিত হলেন ডা. রামচন্দ্র দত্ত, তিনিও শ্রীরামকৃষ্ণের পরম ভক্ত এবং তাঁকে ‘অবতার’ বলে জনসমক্ষে প্রচার করেন। পূর্ব কলকাতার কাঁকুড়গাছিতে শ্রীরামকৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে তিনি এক বাগান বাড়ি কেনেন এবং সেখানে বিখ্যাত ‘যোগোদ্যান’ প্রতিষ্ঠা করেন।
রাম দত্ত ভাগ্যবান পুরুষ। তাই নরলীলায় অবতীর্ণ শ্রীরামকৃষ্ণ-মহাজীবনের শেষ নববর্ষের শুভলগ্নে তাঁকে প্রণাম করে ধন্য হলেন। তিনি এই শুভ-দিনে ঠাকুরকে পূজা করার জন্য ফুল নিয়েই এসেছেন। সেই ফুল নিবেদন করে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণে়র চরণপ্রান্তে উপবেশন করলেন।
সেদিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কথামৃতকার বলছেন, ভক্তরা অনেকেই নিচে বসে আছেন। দুই একজন ঠাকুরের ঘরে আছে। রাম দত্ত ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ প্রশ্ন করছেন রাম দত্তকে— ‘কি রকম দেখছ?’ অর্থাৎ ঠাকুরকে দেখে তাঁর কি রকম মনে হচ্ছে। দত্ত মশাই ভাবলেন নববর্ষের প্রথম দিনে আবার অসুখ-বিসুখ নিয়ে আলোচনা কেন? তিনি ঠাকুরের প্রশ্নাকে এড়িয়ে গিয়ে বললেন ‘আপনার সবই আছে। এখনই রোগের সব কথা উঠবে’। অন্তর্যামী শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তের মুখে এরকম একটা উত্তর শুনে একটু হাসলেন। তাঁর বেশি কথা বলা বারণ, তাই সঙ্কেত করে রামচন্দ্রকে আবার জিজ্ঞেস করছেন ‘রোগের কথাও উঠবে?’
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, সে দিনটা ছিল ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ১৮৮৬ সালের ১৩ এপ্রিল। আর শ্রীরামকৃষ্ণ মহাসমাধিতে লীন হন ১৮৮৬ সালের ১৬ আগস্ট। মাত্র চারমাসের ব্যবধানে। তাই আনন্দময় শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের রোগ নিয়ে রহস্য করতেও ছাড়লেন না।
ওই সময় ঠাকুর একজোড়া চটি জুতো ব্যবহার করছিলেন। কিন্তু অনভ্যাসের জন্য সেই চটি ঠাকুর ব্যবহার করতে পারেন না। পায়ে লাগে, তাঁর গলরোগের চিকিৎসা করছিলেন বৌবাজারের বিখ্যাত ধনী অক্রুর দত্তের বংশধর তখনকার খ্যাতনামা হোমিও চিকিৎসাক ডা. রাজেন্দ্রলাল দত্ত। তিনি প্রথমে এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা করতেন, পরে হোমিও চিকিৎসায় বিশ্বাসী হন। চটিজুতো ঠাকুর পরতে পারেন না বলে তিনি তাঁর পায়ের একটা মাপ চেয়েছিলেন। তিনি পছন্দমতো জুতো এনে দেবেন।
সেদিন পয়লা বৈশাখের শুভলগ্নে শ্রীরামকৃষ্ণের পবিত্র পদযুগলের মাপ নেওয়া হল। সেই মাপ অনুসারে ডা. দত্ত ফরমাশ দিয়ে তৈরী করা মখমলের যে কোমল জুতো জোড়া এনে স্বয়ং ঠাকুরকে পরিয়ে দিয়েছিলেন, আজও তা বেলুড় মঠে পূজিত হয়।
কথামৃত অনুসরণ করে দেখছি, জুতোর মাপ নেওয়ার পরই শ্রীরামকৃষ্ণ মণিকে সঙ্কেত করছেন, ‘কই, পাথর বাটি?’ তাঁর একটি পাথর বাটির প্রয়েজন ছিল। বছরের প্রথম দিনেই সেই পাথর বাটির কথা ঠাকুর মণিকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। পরমভক্ত মণি সেই শুভদিনে নতুন বাজারের জোড়াসাঁকো চৌমাথার এক দোকান থেকে সাদা পাথরবাটি কিনলেন। তারপর দুপুরে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে ফিরে এলেন এবং ঠাকুরকে প্রণাম করে বাটি তাঁর সামনে রাখলেন। ‘ঠাকুর সাদা বাটি হাতে করিয়া দেখিতেছেন’।
ইতিমধ্যে বছরের প্রথম দিনই শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম করতে একে একে অনেকেই উপস্থিত হতে থাকেন। এলেন ডা. রাজেন্দ্র দত্ত। একটি গীতা হাতে নিয়ে এলেন শ্রীমান ডাক্তার। এই শ্রীমান ডাক্তার ছিলেন বেদান্তবাদী। ঠাকুরের অন্তিম অসুখের সময় তিনি চিকিৎসক হিসাবে শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসেন। এলেন রাখাল হালদার— ঠাকুরের স্নেহধন্য আরেকজন ডাক্তার। থাকতেন বৌবাজারে। ধীরে ধীরে আরও কয়েকজন এসে উপস্থিত হলেন। এই শুভদিনে সকলেই শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম করার সৌভাগ্য অর্জন করতে চায়। ঘরে তখন উপস্থিত রয়েছেন রাখালচন্দ্র ঘোষ— পরবর্তীকালে স্বামী ব্রহ্মানন্দ, শশিভূষণ চক্রবর্তী— পরবর্তীকালের স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ, ছোট নরেন প্রমুখ আরও অনেকেই। ‘ডাক্তারেরা ঠাকুরের পীড়া সম্বন্ধে সমস্ত সংবাদ লইলেন’। নববর্ষের এই আনন্দসভায় নিরানন্দে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন সকলেই, সকলেই উদ্বিগ্ন শ্রীরামকৃষ্ণের কঠিন অসুখ নিয়ে।
তারপর শুরু হল নানা প্রসঙ্গে আলোচনা। ঠাকুরের কথা বলা বারণ। তবুও তিনি কথা বলে চলেছেন— কোন ক্লান্তি নেই। কর্মফল, প্রারব্ধ, জগন, ভক্তি, কামজয়— ইত্যাদি কত না প্রসঙ্গ।
একটু পরেই পাগলী এসে উপস্থিত। বছরের এই প্রথম দিনে তিনিও ঠাকুরকে প্রণাম করে ধন্য হতে চান। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী সুগায়িকা এই পাগলীকে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে নিয়ে আসেন। দক্ষিণেশ্বর ও কাশীপুরে যখন তখন এসে তিনি ঠাকুরকে গান শোনাতেন। ভক্তরা তাঁকে ঢুকতে দিতে চাইত না, তবুও তিনি জোর করে ঢুকতেন। সেদিনও পাগলী এসে উপস্থিত।
ধীরে ধীরে ভক্ত সমাগম বাড়তে থাকে। নববর্ষারম্ভের এই পবিত্র দিনে মেয়ে ভক্তরাও অনেক এসেছেন। তাঁরা ঠাকুরকে ও জননী সারদামণিকে প্রণাম করলেন ও তাঁদের আশীর্বাদ নিলেন। বলরাম বসুর পরিবার এসেছেন। বাগবাজারে এই বলরাম বসুর ঐতিহাসিক বাড়িাই ছিল ‘শ্রীরামকৃষ্ণের দ্বিতীয় কেল্লা’— এখন সেটাই রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের শাখাকেন্দ্র ‘বলরাম মন্দির’। এলেন মণিমোহনের পরিবার। এলেন বাগবাজারের ব্রাহ্মণী। এছাড়া ‘অন্যান্য অনেক স্ত্রীলোক ভক্তরা আসিয়াছেন। কেহ কেহ সন্তানাদি লইয়া আসিয়াছেন’।
তাঁরা সকলেই শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম করতে দোতলার ঘরে এলেন। কেউ কেউ ঠাকুরের পায়ে ফুল ও আবির দিলেন। ভক্তদের দুটি নয়-দশ বছরের মেয়ে ঠাকুরকে গান শোনাচ্ছেন—
‘জুড়াইতে চাই, কোথায় জুড়াই,
কোথা হতে আসি, কোথা ভেসে যাই।
ফিরে ফিরে আসি, কত কাঁদি হাসি,
কোথা যাই সদা ভাবি গো তাই’।
ভক্ত ভৈরব গিরিশচন্দ্রের ‘বুদ্ধচরিত’ নাটকের এই গান শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের খুবই প্রিয় ছিল। পরপর গান চলল। আনন্দসভা দিব্যসভায় পরিণত হল। আনন্দস্বরূপ শ্রীরামকৃষ্ণ তখন দিব্যভাবে বিভোর।