গত পর্বের মতোই শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তীর ‘নেতাজি সঙ্গ ও প্রসঙ্গ — দ্বিতীয় খণ্ড’ থেকে উদ্ধৃত করছি:-
“নেতার খাজাঞ্চি মেজ বৌদিদি কলকাতায় নেই। আর কার কাছেই-বা চাইবেন? এক মা। কিন্তু তাঁর অবস্থা না জেনে চাইলে তিনি হয়তো বিব্রত হয়ে পড়বেন।
“অন্তত আটকবন্দীরা যদি স্বেচ্ছায় কিছু কিছু দেয়, খানিকটা সুরাহা-যে হয়, সন্দেহ নেই। কিন্তু নেতা নারাজ।
“অনেক চিন্তার পর পথ ও পাথেয় দুই-ই মিলল। ইলার কাছে একদা নেতা নাকি শ তিনেক টাকা রেখেছিলেন। মনে পড়ে গেছে। আর ভাবনা নেই। এতবড় মোটা টাকার অঙ্ক। নেতা খুশিতে ঝলমল করে ওঠেন।
“কিন্তু নমো নমো করেও হাজার দুয়েক কয়েদীকে একদিনও যদি প্রসাদ দিতে হয়, তাতেই-যে কমপক্ষে পাঁচ শো চাই। আবার দুশ্চিন্তা আসে ভিড় করে।
“নাম-করা কয়েকটা মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে জানানো হল। অন্য কিছু নয়, কিছু বোঁদে। অন্তত হাত ভরে যদি সবাইকে একদিনও বোঁদে দেয়া যায়, — ওতেই ওরা খুশিতে উপচে পড়বে। ওতো শুধু বোঁদে নয়, ও যে মায়ের প্রসাদ।
“কলকাতা প্রেসিডেন্সী জেলে মহাপূজো শুরু হয়ে গেল।
প্রতিমা এল। বোধন হল।”
“তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম্ম
তুমি হৃদি তুমি মর্ম্ম
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে ৷
বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে ৷” ~ ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ থেকে।
তারপর নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী লিখেছেন : —
“মহাসপ্তমী। প্রথম যে-মহলে আমরা ছিলাম, সেই মহলে পূজার স্থান হয়েছে। সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। দেবীর প্রতিমা এসে গেছে। এসেছে রাজবন্দীরা।
“বেশ সকাল সকাল আমরা ঘুম থেকে উঠলাম। স্নান সেরে মণ্ডপে যেতে হবে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল পরিধেয় নিয়ে। নেতার একখানা গরদের ধুতি ছিল। আমার ধুতি ছিল না, ছিল মটকার চাদর। দুটো মিলিয়ে একজনের হয়। কিন্তু সে-একজন কে হবে?
“ওঁর ঘরে গিয়েছিলাম রেডিও খুলতে। দেখি রেডিওর ওপর একটা কাগজের মোড়ক। খুলতেই বেরিয়ে পড়ল গরদের কয়েক গজ কাপড়। কেউ পাঠিয়েছে জামা করিয়ে নিতে। নিয়ে এলাম।
“ছোট বহরের কাপড়। গায়ে পেঁচিয়ে দু কাঁধের ওপর দিয়ে দিলাম ঝুলিয়ে। পিন দিয়ে আটকে দিলাম। খুলে না যায়। গলার দুপাশে ঝুলে থাকল দুটি প্রান্ত। চাদরের মতো। চমৎকার লাগছিল দেখতে। প্রথমটায় একটু খুঁতখুঁত করছিলেন। আর্শি সামনে ধরলাম। হাসি ফুটে উঠল মুখে। সেপাইকে ডেকে দরজায় তালা লাগানো হল। আমাদের রওনা হবার ঠিক মুখে সার্জেন্ট এসে দাঁড়াল। ইন্টারভিউ।
“কাগজখানা হাতে নিয়েই চেঁচিয়ে বলে উঠলেন: ‘মহাদেব এসেছেন। (মহাদেব দেশাই, গান্ধীজির একান্ত সচিব) নিশ্চয়ই গান্ধীজি পাঠিয়েছেন।’
“অবাক হবারই কথা। ক’মাস হয়ে গেল। কই, কোন খবরই তো ওঁরা নেননি। অকস্মাৎ এই বার্তাবহ এলেন কেন? তবে কি ওঁদের মতিগতির পরিবর্তন হয়েছে?
“একসঙ্গেই আমরা বেরুলাম। গেট পার হয়ে জেতে হয় মণ্ডপে। নেতা ভেতরে গেলেন। আমি গেলাম মণ্ডপে।
“পুরোহিত চণ্ডীপাঠ করছিলেন। আমিও চণ্ডী খুলে বসলাম। কিন্তু একটা বর্ণ না পড়া হলো, না হোল শোনা। মনের ভেতর শুধু একটি কথাই তোলপাড় করতে লাগল : মহাদেব এলেন কেন?
“চোখের ওপর ভেসে উঠছে নেতার মুখখানা। মহাদেব এসেছেন শুনে নেতার কী উল্লাস। চোখ-মুখ ফুঁড়ে উল্লাস ঠিকরে পড়ছিল। ভাবছিলাম, এই মানুষকে ওরা বলে গান্ধী-বিরোধী! গান্ধী নন, তাঁর একজন লোক এসেছেন। এতেই এত আনন্দ। এ-মানুষকে ওরা চেনেনি। ভুল করেছে। আগাগোড়া ভুল।
সেদিন, পরবর্তীকালে এবং আজও কেউ কেউ বলেছে এবং বলতে চায় যে, সুভাষচন্দ্র ছিলেন গান্ধী-বিরোধী। কথাটা শুধু ভুল নয়, অসত্য। গান্ধী তো দূরের কথা, এই মানুষটি কোনদিনই কোন ব্যক্তি-বিশেষকে শত্রুও ভাবেননি, আর তা ভেবে তার বিরোধিতাও করেননি। অজাতশত্রু কথাটা খুবই ব্যাপক। ও-কথাটা তাই ব্যবহার করব না। কিন্তু একথাটা অত্যন্তই সত্য যে, সুভাষচন্দ্রের প্রকৃতিতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুব কমই প্রভাব বিস্তার করবার অবকাশ পেয়েছে। নিছক সম্পর্ক ধরে তিনি সঙ্গী নির্বাচন করেননি। আবার সম্পর্কের অভাবে কেউ তাঁর শত্রুও কোনদিন হয়নি।
“গান্ধীকে সুভাষচন্দ্র কতখানি শ্রদ্ধা করতেন এবং কী ভাবে তাঁর অবদান মুক্তকণ্ঠে বলতেনও, তার সাক্ষ্যের জন্য বেশি গবেষণা না করেও নির্দ্বিধায় একথা বলা চলে যে, তাঁর মতো গান্ধীকে অমন নিবিড়ভাবে ও অন্তর দিয়ে কেউ বোঝেওনি আর ভালোও বাসেনি। সেদিনও না, পরেও নয়। সত্যিকারের ভালোবাসার মধ্যে স্বার্থবোধ থাকে না। থাকতে নেই। সুভাষচন্দ্রেরও ছিল না। কিন্তু গান্ধীর চাইতেও দেশ ছিল তাঁর আরও প্রিয়। প্রিয়তম।
“আর ঠিক এই কারণেই দীর্ঘ পরাধীনতার পর একান্ত প্রত্যাশিত স্বাধীন ভারতবর্ষের আংশি্ক কর্তৃত্বের সুযোগ তাঁর জীবনে যে-দিন আর যে-মুহূর্তে দেখা দিল, তার পরক্ষণেই এই গান্ধীকেই সর্বপ্রথম তিনি ঘোষণা করেছিলেন ‘জাতির জনক’ বলে। পরিচিত এবং অতি-খ্যাত গান্ধী-ভক্তরা তাঁর বলবার পূর্বে এ-কথা বলবার সুযোগই পেলেন না।
“কিন্তু এসব কথা বলব পরে।
“একঘণ্টা কাটিয়ে নেতা এলেন। আমার পাশেই বসে পড়লেন। খুলে নিলেন চণ্ডী। খুব ছোট আকার। একটা নস্যির ডিবের মতো।
“মুখের দিকে স্পষ্ট করে তাকাতে ভরসা পাচ্ছিলাম না। আবার অদম্য কৌতূহল চেপে রাখাও কঠিন। আড়চোখে তাকালাম। গম্ভীর মুখ। ভাবান্তর নেই কোন। একমনে চণ্ডী পড়ে চলেছেন। পুরোহিত তখন পাঠ করছিলেন:
“দুবৃত্তবৃত্তশমনং তব দেবি শীলং
রূপং তথৈতদবিচিন্ত্যমনমতুল্যমন্যৈঃ।
বীর্য্যঞ্চ হন্তৃ হৃতদেব পরাক্রমাণাং
বৈরিষ্বপি প্রকটিতৈব দয়া ত্বয়েত্থম্।।
“শত্রুকেও দয়া করা তোমাকেই সাজে। তুমি যে দেবী। আমরা মানুষ। মিত্রকেও তাই ভালবাসতে ভরসা পাইনে।
“স্থির হয়েছিল মহাষ্টমীর দিন এক সঙ্গে সবাই-এর খাওয়া হবে। আর প্রসাদ বিতরণ হবে ঐ দিনই। দুপুরে আমরা ডেরায় ফিরে এলাম। ওপরে পা দিতে-না-দিতে নেতা বললেন: ‘না, মহাত্মাজি মহাদেবকে পাঠাননি।’
‘ঊর্মিলা দেবীর (দেশবন্ধুর ভগ্নী) ধর্মছেলে ধীরেন মুখুজ্যেও আটক-বন্দী হয়েছিলেন ভারত-রক্ষা আইনে। তাঁর সম্পর্কে কিছু বলতে ঊর্মিলা দেবী মহাদেবকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। মহাদেব দেশাইও ঊর্মিলা দেবীকে ‘মা’ ডাকতেন। কলকাতায় যখন এসেই পড়েছেন, নেতার সঙ্গে তিনি দেখা করে গেলেন।
“দুর্ভাবনা কেটে গেল। আকাশ-পাতাল ভাবছিলাম। জট পাকিয়ে উঠছিল মনের ভেতর। আজও অঘটন ঘটে বৈকি। অহরহই ঘটে চলেছে। গান্ধী যদি পাঠাতেন মহাদেবকে সুভাষ বোসের সঙ্গে দেখা করতে, তাও তো হত অঘটনই। কিন্তু ঘটল না। বাঁচা গেল।
“ওয়ার্কিং কমিটির বিনা অনুমতিতে সুভাষচন্দ্র কারাবরণ করে যে মহাপাতকের ভাগী হয়েছিলেন, সেটাই তো একটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। তার পরক্ষণেই সেই কৃতকর্মের পরিণতির রূপ নিয়ে যা ঘটল, তা আরও গুরুতর ও মর্মান্তিক। সত্যাগ্রহের প্রবর্তক ও উদ্গাতা গান্ধীর বিনা সহযোগিতায়, কংগ্রেস তথা ওয়ার্কিং কমিটির বিনা সাহায্যে সত্যাগ্রহে সাফল্য লাভ করা কাম্য তো ছিলই না, সঙ্গতও কি হয়েছিল?
“ভারতবর্ষের বুকে সুভাষ-জীবনের শেষ ঐতিহাসিক প্রত্যক্ষ অভিযান ছিল এই সত্যাগ্রহ। সাফল্যের বিজয়মালা সেদিন দেশবাসী সাদরে পরিয়ে দিয়েছিল এই নির্যাতিত নায়কের গলায়। কিন্তু গান্ধী একটি কথা উচ্চারণও করেননি। তাঁরই প্রবর্তিত সত্যাগ্রহের সফলতা চোখে দেখেও করতে পারেননি।”
বি: দ্র: অনুগ্রহ করে এই পর্বে যে রাজনীতির কথা উদ্ধৃত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকবেন। নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী যা লিখেছেন সেটা তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী থেকে লেখা। আর লেখাটার মধ্যে অনেক শ্লেষও লুকিয়ে আছে। সুভাষ চন্দ্র বসু একটা চিঠিতে গান্ধীজীকে লিখেছিলেন, “I am son of a gentleman and as such I am a gentleman.” আর মোহনদাস গান্ধী নিজের পিতৃদেবের অনেক নিন্দে করে গেছেন তার বইতে। পরে সেই বদগুণ গুলো অবশ্য আমরা তাঁর মধ্যেই দেখতে পেয়েছি।
যাইহোক, এই উদ্ধৃতিগুলো ১৯৪০ সালের মহাসপ্তমীর দিন নেতাজী কি করছিলেন, সেকথা জানাবার জন্য লেখা এই ভেবে যে বইটা হয়তো অনেকের কাছে নেই।
আবারও জানাচ্ছি যে এগুলো শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী লেখা ‘নেতাজি সঙ্গ ও প্রসঙ্গ – দ্বিতীয় খণ্ড’ থেকে নেওয়া। বইটার প্রকাশক গ্রন্থপ্রকাশ, কলিকাতা-১২; আর আমার কাছে যেটা রয়েছে সেটা বইটার দ্বিতীয় মুদ্রণ – আষাঢ়, ১৩৭৪। [এই খণ্ডটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২৩ জানুয়ারি ১৯৬৬ তারিখে।] বানান যথাসম্ভব অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। [ক্রমশ]
৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২
Great info