গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে আমি প্রেসিডেন্সি জেল সুপারিন্টেনডেন্টকে ঠিক ৮২ বছর আগে ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৪০ তারিখে ইংরেজিতে লেখা সুভাষচন্দ্র বসুর একটা চিঠির অনুলিপি পোস্ট করেছিলাম আমার ফেসবুকের পাতায়। পাঠকদের সুবিধার্থে আমি আনন্দ প্রকাশন দ্বারা প্রকাশিত ‘শ্রী সুভাষচন্দ্র বসু সমগ্র রচনাবলী’-র নবম খণ্ড থেকে শ্রী ভবানীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় দ্বারা অনূদিত সেই চিঠিটাও এই পোস্টের অ্যাট্যাচমেন্ট হিসাবে সংযোজিত করলাম। তবে আমি সবাইকে ইংরেজিতে লেখা নেতাজীর মূল চিঠিটা পড়তে অনুরোধ করব।
ইতিপূর্বে বার্মার মান্দালয় জেলে থাকার সময়ও ১৯২৫ সালে সুভাষচন্দ্র বসু জেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দুর্গাপূজা করার অনুমতি আদায় করে দুর্গাপূজা করেছিলেন। সে বছর — ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে – ২৩ সেপ্টেম্বর ছিল মহাষষ্ঠী আর পূজা শেষ হয়েছিল ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯২৫ তারিখে, বিজয়া দশমীর দিন। সেবার পুজোর পরে, পুজোর খরচ নিয়ে রাজবন্দীদের সাথে সরকারের বিস্তর ঝামেলা হয়েছিল এবং এর ফলস্বরূপ রাজবন্দীদের অনশন পর্যন্ত করতে হয়েছিল ১৯২৬-এর ফেব্রুয়ারি-মার্চে। সেটা সম্বন্ধে পরে কখনও লেখার চেষ্টা করব।
১৯৪০ সালে প্রেসিডেন্সি জেলে সুভাষচন্দ্র বসুর সাথে একমাত্র রাজবন্দী ছিলেন নেতাজীর একান্ত অনুগত শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী। আজ আমি শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তীর ‘নেতাজি সঙ্গ ও প্রসঙ্গ, দ্বিতীয় খণ্ড’, থেকে কিয়দংশ উদ্ধৃত করছি। এখানে বলে রাখা ভালো যে লেখকের লেখা বানান যথাসম্ভব অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাকি অংশ পরে আবার উদ্ধৃত করতে চেষ্টা করব। শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী লিখেছেন:-
“সহসা আলোচনা থেমে যায়। মেজর পাটনি এসে পড়েছেন। দুর্গোৎসব আসন্ন। নেতা জেল কর্তৃপক্ষকে পূর্বাহ্ণেই তাঁর সঙ্কল্পের কথা জানিয়েছেন। পাটনি এসেছেন সেই সম্পর্কে আলোচনা করতে।
“বাইরে থেকে পুরোহিত, তন্ত্রধারক, প্রতিমা আর পূজোর উপকরণ আনাতে হবে। যদি কেউ বাইরে থেকে ভোগের বা পূজোর জন্য কিছু পাঠায়, তাও নিতে দিতে হবে। এই সব কথা নেতা জানিয়েছিলেন।
“ওদের আপত্তি নেই বেশির ভাগ ব্যাপারেই। আপত্তি করবার উপায় কি ছিল? একগুঁয়ে, নাছোড়বান্দা এই লোকটি ওদের অজানা নন। মান্দালয়ের কথাও মনে আছে বিলক্ষণ। পূজো নিয়ে শেষে প্রায়োপবেশন। তারপর সরকারের নতি স্বীকার। এই সব মনে করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পাটনির উপর সব ভার ছেড়ে দিয়েছে। এখানেই পাটনির চিন্তা। নেতার তুষ্টি আর কর্তৃপক্ষের সন্তুষ্টি, এক কথা নয়। দ্বন্দ্ব বেধে যাবে না তো?
“ঢাক, বড় ঘণ্টা, কাঁসর, পূজোর অঙ্গ। হিন্দু মাত্রেরই পূজোয় যোগদান-আকাঙ্ক্ষা মজ্জাগত এবং স্বাভাবিক। নেতার দাবী, সকল হিন্দুকে পূজোয় অংশ নিতে অনুমতি দিতে হবে। সবাই, – অবশ্য যাদের ইচ্ছা হবে, অঞ্জলি দেবে। প্রসাদ নেবে। আরতি দেখবে।
“আর কিছুতে আপত্তি উঠবে না। কিন্তু জেলের মধ্যে অন্তত গোটা পাঁচের ঢাক যদি এক সঙ্গে বেজে ওঠে, সে কী ভয়ানক ব্যাপার ঘটবে। পাটনি ভেবে অস্থির। আর ঐ বড় ঘণ্টা। ওরই শব্দ প্রহরে প্রহরে সময় জানিয়ে দেয়। ওরই আকস্মিক আর অনবরত ধ্বনি জানিয়ে দেয় বিপদ-আপদের বার্তা। যার নাম জেল পরিভাষায় পাগলা ঘণ্টী। যদি ফ্যাসাদ বেধে ওঠে!
“আমরা দুজন ছাড়াও তখন রাজনৈতিক বন্দীর সংখ্যা অনেক। বিভিন্ন মহলে তারা থাকে। সবাইকে অন্তত পূজো আর প্রসাদ নেবার সময় একসঙ্গে থাকতে দিতে হবে। তাছাড়া অন্যান্য কয়েদী। তার সংখ্যাও হাজার দুয়েকের কাছাকাছি। সমস্যা সামান্য নয়।
“নেতাকে আর একটু ভেবে দেখবার অনুরোধ জানিয়ে পাটনি বিদায় নিলেন। আরম্ভ হল আমাদের পরামর্শ। বড় সমস্যা হল অর্থ।” [ক্রমশ]
বি:দ্র: ‘নেতাজী সঙ্গ ও প্রসঙ্গ’ তিন খণ্ডে লিখেছেন শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী। প্রথম দুই খণ্ডে লেখক নেতাজীকে বোঝাতে বরাবর ‘নেতা’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। তৃতীয় খণ্ডে অবশ্য তিনি ‘নেতাজি’ সম্ভাষণটি ব্যবহার করেছেন।
২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২২