১৮৯৯ সালের ৫ জানুয়ারি। অধুনা বাংলাদেশের অন্তর্গত রাজশাহির ঘোড়ামারার অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের বাসভবন ‘অক্ষয় নিকেতন’ থেকে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হল। অন্য ধরনের পত্রিকা। এতে গল্প-কবিতা নেই। আছে শুধু ইতিহাসের আলোচনা। বাংলা ভাষার প্রথম ইতিহাসভিত্তিক পত্রিকা। পত্রিকাটি ছাপা হল রাজশাহির বাণীপ্রেস থেকে। পত্রিকার প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।
পত্রিকাটির বিষয় আলোচনার আগে এর জনকের কথা জেনে নেওয়া যাক। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় [১৮৬১-১৯৩০] এখন বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেলেও তিনি ছিলেন বাংলাভাষায় আধুনিক ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ। অন্ধকূপ হত্যার দায়িত্ব ইংরেজরা সিরাজদৌল্লার উপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করলে প্রতিবাদ করেন অক্ষয়কুমার। তাঁর সেই গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ এশিয়াটিক সোসাইটির সভায় উত্থাপিত হয়েছিল। ওকালতি ব্যবসার পাশাপাশি তিনি নিযুক্ত ছিলেন ইতিহাসচর্চায়। তাঁর লেখা প্রকাশিত হত বঙ্গদর্শন, ভারতী, সাহিত্য, প্রবাসী ইত্যাদি পত্রিকায়। অক্ষয়কুমারের ইতিহাসচর্চার ফসল : সিরাজদৌল্লা, মীরকাসিম, সমরসিংহ, সীতারাম রায়, ফিরিঙ্গি বণিক প্রভৃতি।
শ্রীহরিমোহন মুখোপাধ্যায় প্রণীত ‘বঙ্গভাষার লেখক’ গ্রন্থে অক্ষয়কুমারের ‘আত্মকথা’ থেকে জানা যায় রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে তিনি ত্রৈমাসিক ‘ঐতিহাসিক চিত্র’ নামক পত্রিকা প্রকাশে উৎসাহিত হন। তিনি পত্রিকার উদ্দেশ্য ও আদর্শ নিয়ে রচনা করেন একটি প্রস্তাবপত্র, যাকে তখন ‘অনুষ্ঠানপত্র’ বলা হত। সেই পত্র তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রেরণ করেন। এ ভাবেই তিনি জনমত গঠন করতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তখন সম্পাদনা করছিলেন ‘ভারতী’। ভারতীর পাতাতেও অক্ষয়কুমারের অনুষ্ঠানপত্র মুদ্রিত হয়। পত্রিকার ‘প্রসঙ্গকথায়’ তিনি অক্ষয়কুমারের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান। বলেন যে অক্ষয়কুমার ‘আধুনিক বাঙালি ইতিহাস লেখকগণের মধ্যে শীর্ষ-স্থানীয়।’
প্রস্তাবপত্রে অক্ষয়কুমার লিখেছিলেন, ‘আমাদের ইতিহাসের অনেক উপকরণ বিদেশীয় পরিব্রাজকগণের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ; তাহা বহুভাষায় লিখিত বলিয়া আমাদের নিকট অপরিজ্ঞাত ও অনাদৃত। মুসলমান বা ইউরোপীয় সমসাময়িক ইতিহাসলেখকগণ যে সকল বিবরণ লিখিয়া গিয়াছেন, তাহারও অদ্যাপি বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয় নাই। পুরাতন রাজবংশের কাগজপত্রের মধ্যে যে সকল ঐতিহাসিক তত্ত্ব লুক্কায়িত আছে তাহার অনুসন্ধান লইবার ব্যবস্থা দেখা যায় না।
‘নানাভাষায় লিখিত ভারত ভ্রমণকাহিনি ও ইতিহাসাদি প্রামাণ্য গ্রন্থের অনুবাদ, অনুসন্ধানলব্ধ নবাবিষ্কৃত ঐতিহাসিক তথ্য, আধুনিক ইতিহাসাদির সমালোচনা এবং বাঙালি রাজবংশ ও জমিদারবংশের পুরাতত্ত্ব প্রকাশ করাই মুখ্য উদ্দেশ্য।’
রবীন্দ্রনাথ ‘ঐতিহাসিক চিত্র’ কে স্বাগত জানিয়ে লেখেন, ‘পরের মুখে নিজেদের কথা না শুনিয়া ভারতের প্রকৃত ইতিহাস উদ্ধার এবার বুঝি সম্ভব হইবে। হউক বা না হউক আমাদের ইতিহাসকে আমরা পরের হাত হইতে উদ্ধার করিব। … আমাদের ভারতবর্ষকে আমরা স্বাধীন দৃষ্টিতে দেখিব, সেই আনন্দের দিন আসিয়াছে। উপযুক্ত সম্পাদক উপযুক্ত সময়ে এ কার্যে অগ্রসর হইয়াছেন ইহা আমাদের আনন্দের বিষয়।’
কিন্তু দুঃখের বিষয় পত্রিকার আয়ু ছিল মাত্র এক বৎসর। অর্থাৎ পত্রিকার মোট চারটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। যাঁদের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছিল সংখ্যাগুলি তাঁরা হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, ভবানীগোবিন্দ চৌধুরী, শশিভূষণ বিশ্বাস, প্রসন্ননারায়ান চৌধুরী, নিখিলনাথ রায় প্রভৃতি।
দ্বিতীয় পর্যায়ে মাসিক হিসেবে এই পত্রিকা মুর্শিদাবাদ থেকে প্রকাশ করেন নিখিলনাথ রায়। দ্বিতীয় পর্যায়েরও আয়ু ছিল এক বছর ১৯০৪-১৯০৫। তৃতীয় অর্থাৎ শেষ পর্যায়ের আয়ু ছিল পাঁচ বছর ১৯০৭-১৯১২।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় সেকালের একজন বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ছিলেন তো বটেই। তাছাড়া তিনি একজন বিশিষ্ট সাহিত্যসেবী ছিলেন। রংপুর সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত থেকে উত্তরবঙ্গের ভাষা ও সাহিত্য চর্চার জন্য নানা ধরনের চেষ্টা করেছিলেন। এই সম্পর্কে লিখেছেন বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ। ছিলেন উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনের (১৩১৫ বঙ্গাব্দ) সভাপতি। তবে দুঃখের বিষয়, এখনও পর্যন্ত অক্ষয়কুমারের লেখাপত্র নানা সাময়িক পত্রে প্রকাশিত হলেও, সেসব সংগ্রহ করে তাঁর রচনাবলী প্রকাশিত হয়নি। এবিষয়ে এখনই উদ্যোগ নেওয়া দরকার।