বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়ে গেল পাঁচ রাজ্য — পাঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড, গোয়া, মণিপুর এবং উত্তরপ্রদেশের ভোট। তবে ভোট পাঁচ রাজ্যার হলেও গোটা দেশের নজর কিন্তু একটি রাজ্যের দিকেই। সে রাজ্যের নাম অবশ্যই উত্তরপ্রদেশে। প্রথমত; উত্তরপ্রদেশ হল হিন্দি বলয়ের প্রাণকেন্দ্র। সেদিক থেকে বিচার করলে উত্তরপ্রদেশ হাতছাড়া হওয়ার মানে হল ২০২৪ সালের ফাইনাল রাউন্ডের আগে বিজেপির কাছে এক চরম ধাক্কা। অর্থাৎ উত্তরপ্রদেশ জয় করাই এখন বিজেপির কাছে অন্যতম লক্ষ্য। সবদিক থেকেই তাই উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন সেমি-ফাইনাল রাউন্ড।
জনমত সমীক্ষা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সবারই বক্তব্য, পাঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড এবং গোয়া — এই তিন রাজ্যেই বিজেপি এবার প্রথম থেকেই ব্যাকফুটে রয়ে গিয়েছে। এবার কথা হল তারা নিজেরা কি ভাবছে। যা জানা বোঝা গিয়েছে তাতে বিজেপিও ধরে নিচ্ছে এই তিন রাজ্যে তাদের পারফরম্যান্স এবার খুব কিছু ভাল হবে না। যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বুধবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই আত্নপ্রত্যয়ের কারণ কি, তার মধ্যে না ঢুকে অন্তত এটুকু তো বলাই যায়, বৃহস্পতিবার উত্তরপ্রদেশের যে অংশে প্রথম দফার নির্বাচন হল, সেই পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে যে কেন্দ্রগুলি রয়েছে সেগুলি হল, শামলি, মুজাফফরনগর, মিরাট, বাগপত, গাজিয়াবাদ, হাপুর, গৌতম বুদ্ধ নগর, বুলন্দশহর, আলিগড়, আলিগার্গ, মথুরা এবং আগ্রা। ২০১৭ সালে এই কেন্দ্রগুলির মধ্যে ৯০ শতাংশ আসনে জিতেছিল বিজেপি। কিন্তু এবার তাদের লড়াই খুব একটা সহজ অবস্থায় ছিল না।
গত এক বছর ধরে সারা দেশ জুড়ে যে কৃষক আন্দোলন চলেছিল তাতে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশ থেকেও এক বিরাট সংখ্যক কৃষকেরা অংশ নিয়েছিল। ফলে সেই কৃষক আন্দোলন উত্তরপ্রদেশেও বিজেপিকে সবথেকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। তার ওপর ভোটের ঠিক আগেই কৃষক সংগঠনগুলি বিজেপিকে ভোট না দেওয়ার আওয়াজ দিয়ে বিজেপিকে আরও বড় অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। এছাড়া দলিত, কৃষক এবং জাঠ সম্প্রদায় বিজেপির উপর ক্ষুব্ধ। তারও একটা চাপ রয়েছে বিজেপির ভোটব্যাঙ্কের ওপর।
উত্তরপ্রদেশে ভোটের আগে থেকেই পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের মুসলিম-জাঠ ও যাদব সমাজ বিজেপির বিরুদ্ধে জোট বাঁধার ইঙ্গিত দেয়। তার প্রেক্ষিতে যথেষ্ট আশাবাদী হয়ে ওঠে সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্ব। এই অবস্থায় বিজেপি নেতারা মেরুকরণের হাওয়া উস্কে মুসলিম-জাঠ বোঝাপড়ার বিরোধী কৌশল ভেস্তে দিয়ে লখনউয়ের মসনদ ধরে রাখার চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে বলে মনে করেছিলেন। সব দিক থেকে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে হওয়া প্রথম দফার ভোট, রাজ্যের মসনদে কে বসতে চলেছেন, সেই ভাগ্য ঠিক করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ঠ দাবিদার।
উত্তরপ্রদেশের ভোটের প্রচারে গিয়ে ঝড় তুলেছেন স্বয়ং বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অখিলেশের সঙ্গে মমতা ভার্চুয়াল সভা করেছেন। প্রচারের মঞ্চ থেকে তিনি বিজেপি হটানোর বার্তা দিয়েছেন। অখিলশকে সমর্থন করে সবাইকে এককাট্টা হওয়ারও ডাক দিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এও বলেছেন, উত্তরপ্রদেশে বিজেপি হারলে, সারা দেশে হারবে। বিজেপি দেশের সর্বনাশ করেছে। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা এবার বিজেপি বিরোধী ভোট বিভাজনের সম্ভাবনাও কম বলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, এবারের লড়াই সরাসরি বিজেপি বনাম সমাজবাদী পার্টির। মোদী–যোগী বনাম অখিলেশ যাদবের। তাই বিজেপি বিরোধী ভোট এবার বিভাজিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া বহুজন সমাজ পার্টি কিংবা কংগ্রেস এই নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার যে ৫৮টি আসনে ভোট হল, গত নির্বাচনে সেগুলির মধ্যে ৯০ শতাংশ আসনে জিতেছিল বিজেপি। কিন্তু এবার তাদের ওই ভাবে জিতে ফেরা খুব সহজ হবে না। কারণ কোভিড পরিস্থিতিতে উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছিল। কোভিড রোগীর দেহ গঙ্গা দিয়ে ভেসে চলেছে, এই ছবি ভাইরাল হয়। সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি নিয়ে গোটা দেশে হইচই পড়ে যায়। যোগীকেই তার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। কেবল তাই নয়, মুখ্যমন্ত্রী কোভিড পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।
চলতি বিধানসভা ভোটে বিজেপি–কে চাপে রেখেছে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি। ভোটের আগে বিজেপি থেকে একাধিক ওবিসি (পিছিয়ে পড়া শ্রেণী) নেতা–মন্ত্রী সমজবাদি পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। এর ফলে ওবিসি ভোটের একটা বড় অংশ যে এবার সপা-র দখলে আসতে চলেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উত্তরপ্রদেশের বেশ কয়েকটা আসনে কিন্তু এই জাট ভোট একটা বড় ফ্যাক্টর। পাশাপাশি যাদব আর সংখ্যালঘু ভোট বরাবরই সপা-র অনুগত। সুতরাং এবারের বিধানসভা ভোটে যোগীর গদি উল্টে যাপয়ার সম্ভবনা রয়েছে যথেষ্ট।