সুস্থ থাকার জন্য বিশুদ্ধ খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ এ বিখ্যাত প্রবচনটি খাদ্য হিসেবে মাছের প্রতি আমাদের আকর্ষণ, প্রয়োজনীয়তা ও নির্ভরতার সূচক নির্দেশ করে। মাছ বিশেষ করে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে, তাই এটি প্রায়সই ‘দরিদ্র মানুষের জন্য সমৃদ্ধ খাবার’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এমনটাই জানিয়েছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞ সুমন কুমার সাহু। বিশেষ করে সুস্থ ও সবল শরীরের জন্য মিনারেলসের সহজলভ্য উৎস্য হল মাছ। বেশ কিছু মাছ আছে মানুষের শরীর গঠনে যাদের তুলনা নেই। যেসব খাদ্য সাহায্য করে তা হলো প্রোটিন, ফ্যাট এবং শর্করা। প্রাণিজ প্রোটিনের একটি প্রধান উৎস মাছ। কিন্তু এসব পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি শরীরের দরকার সঠিক পরিমাণে কিছু মিনারেল বা খনিজ পদার্থ।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, মিনারেল বা খনিজ পদার্থ শরীরের জন্য খুবই দরকারী উপাদান। খুব অল্প পরিমাণে জরুরি হলেও, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসগুলি ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্টসের সঙ্গে মিলে শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখে। পাশাপাশি শরীরে শক্তি যোগায়, মেটাবলিজম ঠিক রাখে, হাড় মজবুত করে, এবং মানসিক শান্তি যোগায়। মাছ বিশেষত ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লোহা, তামা এবং সেলেনিয়াম এবং জিঙ্কের মতো খনিজগুলির একটি উল্লেখযোগ্য উৎস। বিশেষজ্ঞ সুমন কুমার সাহুর মতে, মাছে ক্যালসিয়াম থাকে, যা শরীরের সবচেয়ে বেশি পরিমাণে খনিজ। তাছাড়া কাঁকড়া, লবস্টার এবং চিংড়ি সহ বেশ কয়েকটি শেলফিশে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। ম্যাগনেসিয়াম মাছে পাওয়া আরেকটি প্রয়োজনীয় খনিজকে প্রতিনিধিত্ব করে। শরীরের ম্যাগনেসিয়াম ক্যালসিয়ামের সাথে একসাথে কাজ করে। ফলে শরীরের হাড় তৈরি করে। এছাড়াও, ম্যাগনেসিয়াম সঠিক পেশীর কার্যকারিতা হৃদয়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। প্রসঙ্গত, টাইপ-2 ডায়াবেটিসের বিকাশকে প্রতিরোধ করতে পারে। উল্লেখ্য, সেলেনিয়াম একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা কোষের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং পারদের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় সাহায্য করতে পারে। এছাড়া কোষের বৃদ্ধি এবং ইমিউন সিস্টেমের স্বাস্থ্যের জন্য জিঙ্ক এবং আয়রন প্রয়োজন। এমনকি আয়োডিন থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা বজায় রাখতেও সাহায্য করে। তখন লোহা লাল রক্তকণিকা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রসঙ্গত, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যের অংশ হিসাবে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার মাছ খাওয়ার পরামর্শ দেয়। মাছে অবস্থিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানের গড় মান যদি দেখা যায় তাহলে দেখতে পাওয়া যাবে সোডিয়াম — 72 (mg/100g), পটাসিয়াম(K) 278 (mg/100g), ক্যালসিয়াম (Ca) 79 (mg/100g), ম্যাগনেসিয়াম (Mg) 38 (mg/100g), ফসফরাস (P) 190 (mg/100g)।

উল্লেখ্য, মিষ্টি জলের মাছের সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ইলিশ, ভেটকি, রূপচাঁদা, চিংড়ি, লোটে ইত্যাদি।এ সমস্ত মাছে আছে প্রচুর মিনারেল (খনিজ উপাদান)। মিষ্টি জলের মাছের চেয়ে সামুদ্রিক মাছে লবণ, সোডিয়াম বেশি থাকে,যা হাড় গঠনে সাহায্য করে। আবার মিষ্টি জলের ছোট মাছে আছে প্রচুর ক্যালসিয়াম। কাঁটা-সহ ছোট মাছ ক্যালসিয়ামের এক অনন্য উপাদান। মৌরলা, ঢেলা, চাঁদা, ছোট পুঁটি, স্বরপুঁটি, ছোট চিংড়ি, কই, শিং, মাগুর, ইত্যাদি জাতীয় মাছে প্রচুর ক্যালসিয়াম বিদ্যমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে,মানবদেহে দৈনিক প্রচুর ক্যালসিয়ামের চাহিদা থাকে। বিশেষ করে বাড়ন্ত শিশু, গর্ভবতী মা এবং প্রসূতি মায়েদের ক্যালসিয়ামের চাহিদা আরও বেশি। হাড় ও দাঁত গঠনে ক্যালসিয়াম অত্যন্ত দরকারি। তাই প্রতিদিন আমাদের ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ ছোট মাছ খাওয়া উচিত। দৃষ্টিশক্তির জন্যও ছোটো মাছ দরকার। যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ ছোটো মাছ তাদের ব্ল্যাডপ্রেসার কমাতে সাহায্য করবে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খনিজ লবণ সমৃদ্ধ ছোটো মাছ উপকারী। হৃদরোগী, স্ট্রোকের রোগীর ও গর্ভবতী মা ও দুগ্ধদানকারী মায়ের জন্য ছোটো মাছ খুবই উপকারী। প্রতি ১০০ গ্রাম পুঁটি মাছে আছে ১০৬ ক্যালরি শক্তি। এর ১১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম। দাঁত ও হাড়ের গঠনে এটি সাহায্য করে। ১০০ গ্রাম ট্যাংরা মাছে ১৪৪ ক্যালরি শক্তি মিলবে। এতে ক্যালসিয়াম ২৭০ মিলিগ্রাম। আয়রন আছে ২ মিলিগ্রাম। রক্তশূন্যতার রোগীদের ট্যাংরা মাছ খাওয়া উচিত। রাতকানা রোগ, ভিটামিন ‘এ’-র স্বল্পতাজনিত চোখের সমস্যা রোধে মৌরলা মাছ খুবই কার্যকর। এতে ক্যালসিয়াম থাকে অনেক। ১০০ গ্রাম মৌরলা মাছে প্রায় ৮৫৩ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম আছে। আরও আছে ৫.৭ মিলিগ্রাম আয়রন, এবং ৩.২ মিলিগ্রাম জিংক। ফলুই মাছ কাঁটাযুক্ত। এই মাছের প্রতি ১০০ গ্রামে ক্যালসিয়াম ১০৩ মিলিগ্রাম, আয়রন ১.৭ মিলিগ্রাম ও ফসফরাস ৪৫। মাছ পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস কারণ এটি প্রোটিন, ভিটামিন, চর্বি, লিপিড, খনিজ পদার্থ ইত্যাদির একটি উল্লেখযোগ্য ভারসাম্য প্রদান করে এবং এতে ক্যালরির পরিমাণ খুবই কম।

সুমনবাবু আরও জানান, মাছের পুষ্টিগুণ এবং স্বাস্থ্য উপকারিতা অস্বীকৃত এবং অবমূল্যায়িত। মানুষের স্বাস্থ্যের অনেক উপকারিতা সত্ত্বেও, মানুষ এখনও আছে সেই সুবিধাগুলো সম্পর্কে অজ্ঞ। তাই মাছ খাওয়ার পুষ্টিগুণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। এদিকে পুষ্টিবিজ্ঞানীদের পরামর্শ সপ্তাহে ৩৫০-৪০০ গ্রাম মাছ খেতে পারলে অনেক অসুখকে দূরে সরিয়ে রাখা যাবে। ছোট থেকেই মাছ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে ভাল হয়। ইলিশ হোক বা পোনা, পাতে রাখুন এক টুকরো মাছ। মাছের উপকারিতা অনেক। মানুষের পুষ্টির জন্য শুধু মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্টই সরবরাহ করে না, মাছ ও মৎস্য চাষ অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের অনেক দরিদ্র পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এবং আয় বৃদ্ধিতেও অবদান রাখে।
Bah bah darun khabor bisesato bangali der jonnyo.