পুরোনো কলকাতার ইতিহাস মাছে-মাছে ছয়লাপ৷ ট্যাংরা, তপসিয়া, চিংড়িঘাটা, বেলেঘাটা, চেতলা, কৈখালি, পুঁটিয়ারি, বানতলা,-এসব অঞ্চলের নামকরণে মৎস্য অবতারের কারিকুরি৷ মানসচক্ষে দেখি কয়েকশো বছর আগে আদিগঙ্গার পাড়ে চেতলায় চিতল মাছের বাজারে পাগড়ি হাঁকিয়ে ঘোড়ার গাড়ি, গোরুর গাড়ি চেপে কলকাত্তাই বাবুরা চিতলপেটির দরদামে ব্যস্ত। মাছে-ভাতে বাঙালি কলকাতা শহরটিকে মাছ ও বিড়ালতপস্বীর শহরে পরিণত করেছিল৷ রুইকাতলা, পুঁটিমাছের প্রাণ, চুনোপুঁটি, গভীর জলের মাছ, রাঘববোয়াল, ঘোলাজলে মাছ ধরা, কইমাছের জান, জলের মাছ ডাঙায়, বিড়াল বলে মাছ খাব না কাশী যাব, মাছের তেলে মাছ ভাজা,–এসব মুখরোচক বাংলা প্রবচন মনে করিয়ে দেয় বাঙালির মৎস্যপ্রীতির কথা৷
সত্যি কথা বলতে কী, বাঙাল-ঘটির দ্বন্দ্বে ইলিশ ও চিংড়ির যুদ্ধ বটতলা সাহিত্যের কাছে কিঞ্চিৎ ঋণী৷ বটতলার রঙিন কাঠখোদাইয়ে প্রায়শ চিংড়ি ও ইলিশের দেখে মেলে৷ চিংড়ি হাতে ঘটিবাবুর আগমন, ইলিশ মাথায় বাঙালবৃত্তান্ত, সবই বটতলার রঙিন কাঠখোদাই, কালীঘাটের পটে উঁকি মেরে গেছে৷ ভবিষ্যৎ কলকাতায় ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের সমর্থকবিভাজন ঘটিয়ে ছেড়েছে৷ জোব চার্নক ১৬৯০-এ কলকাতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলে কী হয়, বড়িশার সাবর্ণ চৌধুরীদের কাছ থেকে কেনা তিনটি তালুক থেকে মাছের আঁশটে গন্ধ তিনি দূর করতে পারেননি৷ বড়িশা নামটির উৎপত্তিতে সংস্কৃত ‘বড়িশ’ শব্দের কলকাঠি৷ বড়িশ মানে বঁড়শি৷ ‘বড়িশামিষ’ মানে ছিপ ফেলে ধরা মাছ-কুঁচে-বান-এর সমৃদ্ধ প্রোটিন৷ সাবর্ণ চৌধুরীদের জমিদারিতে বৃহৎ পুষ্করিণী ছিল অঢেল৷ এখনকার মতো মাছ ধরার জন্য পাস দেওয়ার প্রথা তখন ছিল কিনা জানা যায় না, তবে রহিস আদমিদের সন্তুষ্টি বিধান করতে মাছ ধরার নেশায় কুলোর বাতাস দেওয়ার রেওয়াজটা তখনও ছিল বোধহয়৷ এমনই এক দিনে জোব চার্নক মাছ ধরতে (অ্যাঙ্গলিং) সাবর্ণ চৌধুরীদের বড়ো পুকুরে এসেছিলেন হয়তো৷ তারপরের ঘটনা তো একটা শহরের ইতিকথা৷ বড়িশায় যদি ছিপ ফেলে বঁড়শিতে মাছ গাঁথার ইতিহাস কড়া নাড়ে, তবে পাশের বেহালায় তখন রাঘববোয়ালদের বসবাস৷ কথিত আছে বেহালা আসছে ‘বহুলা’ শব্দটি থেকে৷ প্রচীন কলকাতায় ‘বহুলা’ বলে কোনো জায়গা বা নদী সত্যি ছিল কিনা, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে দ্বিমত আছে৷ ও বঙ্গের দিঘাপতিয়া রাজবংশের এক জমিদার দিঘাপতিয়া থেকে বোয়ালিয়া পর্যন্ত একটি রাস্তা তৈরি করেছিলেন৷ তাই মনে সন্দেহ দেখা দিচ্ছে, সত্যিই ‘বহুলা’ থেকেই বেহালা আসছে কিনা৷
আমার মতে, বেহালা আসছে বোয়ালিয়া থেকে৷ বোয়ালমাছ বাঙালরাই শুধু ভালোবাসে না, ঘটিরাও যথেষ্ট ভালোবাসে৷ আর সরশুনা জায়গাটিতে সরপুঁটি ও চুনোপুঁটির আড়ত ছিল৷ সর-চুনা থেকেই সরশুনা৷ বড়িশা-বেহালা-সরশুনা, এই তিন অঞ্চলের নামের মধ্যে মাছের গন্ধ ম-ম করছে৷ ঠিক সৌরভ গাঙ্গুলির ব্যাটিংয়ের মতো৷ প্রাচীন কলকাতায় তখন কমলাদিঘি, বিমলাদিঘি, গোলদিঘি, হেদুয়া প্রভৃতি বিরাট জলাশয়৷ ছিল আদিগঙ্গা, ছিল গঙ্গা থেকে ক্রিক রো-চিহ্ণিত অংশ দিয়ে ধাপা পর্যন্ত একটি টলটলে জলপূর্ণ খাল৷ পুরোনো কলকাতা ছিল খাল-বিল-পুকুরে পরিপূর্ণ একটি গ্রামীণ জনপদ৷
মৎস্যবতার বাঙালিকে জন্ম-ইস্তক মাছের পেছনে ছুটে কাটাচ্ছে৷ গ্রাম কলকাতা জমাট বেঁধে যখন শহর-কলকাতা হল, তখন শহরের নামে নামে গেঁথে গেল গ্রামীণ মেছো কলকাতার ফসিল৷ বঙ্গকাব্যে মাছ যত না জীবিত, তার চেয়ে বেশি মৃত৷ ‘মরা মাছের চোখ’ নিয়ে বাঙালি কবিদের সুররিয়্যালিজম৷ তবে জসীমুদ্দিনের কবিতায় ছেলেবেলায় মাছের গন্ধ ম-ম করত৷ ‘বছিরুদ্দিন মাঝ ধরিতে যায়’-এর মতো লাইন মাছের কাঁটার মতো টাকরায় গেঁথে আছে৷ ‘রোহিত বোয়াল মাছেরা দেয় ফাল/কই মাগুরের দল ছুটিছে ধরি গাঁয়ের আঁকাবাঁকা খাল৷’ এখন রঙিন মাছ থাকে অ্যাকোয়ারিয়ামে৷ আধুনিক কবিদের বোষ্টমীরা মাঝে মাছে তা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলে৷ সে যা-ই হোক, মাগুরের কথা লিখতেই ওপার বাংলার মাগুরা পরগনার কথা মনে পড়ে গেল৷ বড়িশার সাবর্ণ চৌধুরীদের পূর্বপুরুষ কামদেব ব্রহ্মচারীর হারানো পুত্রকে উদ্ধার করে আকবরের সেনাপতি মানসিংহ তাকে মাগুরা পরগনা দান করেছিলেন৷ সেই ছেলের নাম লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার৷ ইনিই বড়িশার সাবর্ণ চৌধুরীদের সাক্ষাৎ পূর্বপুরুষ৷
কে যেন গান বেঁধেছিল — ‘দুধ না খেলে হবে না ভালো ছেলে’৷ ট্যাংরা, তপসিয়া, বোয়াল, বেলেমাছ কই-মাগুর-শিঙি নিয়ে ভালোই আছে শহর কলকাতা৷ চিংড়ি-ইলিশের দ্বন্দ্বমূলক ফুটবলবাদটাও খুলেছে ভালো৷ বিশেষজ্ঞদের মতে অধুনা বাংলাদেশের পাবনা শহরের নামটি নাকি এসেছে ‘পুণ্ড্রবর্ধন’ থেকে৷ এটা মনে হয় কষ্টকল্পিত ধারণা৷ ‘পাবদা’ মাছ থেকেই এসেছিল পাবনা৷ পাবদা>পাবদাঁ>পাবনা৷ বাংলাদেশে ইলিশপুর, কাতলাপুর প্রভৃতি স্থানের দেখা মেলে৷ তেমনভাবেই এ-বঙ্গের ডায়মণ্ডহারবার বিরাজ করছে ‘ভেটকিপুর’৷ জোড়াসাঁকো-ঠাকুর বংশের আদি নিবাস যশোরের ‘চিঙ্গটিয়া’ পরগনা আসছে ‘চিঙ্গট’ থেকে৷ ‘চিঙ্গট’ মানে চিংড়ি৷