এডগার এলান পো’র (১৮০৯-১৮৪৯) ‘কালো বিড়াল’ (‘The Black Cat’)
এডগার এলান পো (Edgar Allan Poe) বিশ্বসাহিত্যে প্রথম ছোটগল্প সম্পর্কে ধারণা দেন। নাথানিয়েল হথর্ণ (Nathaniel Hawthorne)-এর ‘Twice-Told Tales’ (১৮৪২) গল্পগ্রন্থটি সমালোচনার সময় এলান পো ছোটগল্পের ধারণাটি ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে তাঁকে প্রথম গোয়েন্দা কাহিনির লেখকও বলা হয়। আমেরিকার ছোটগল্পের সঙ্কেত দিয়েছিলেন ওয়াশিংটন আরভিং (১৭৮৩-১৮৫৯)। পো তাকে শিল্পরূপ প্রদান করেন। সেদিক থেকে তিনিই আমেরিকার প্রথম ছোটগল্পকার। তাঁর ব্যক্তিজীবনের ছায়া তাঁর সৃষ্টিতেও কায়া বিস্তার করে। মাত্র চল্লিশ বছর বেঁচে ছিলেন। তীব্র জীবনযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়। তাঁর বাবা-মা বোস্টনের অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন। বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান, মায়ের পরান্নজীবীর সঙ্গে কলঙ্কিনীর বোঝা নিয়ে মৃত্যু হয়। তখন পো’র বয়স মাত্র দুই বছর। জন এলান নামে রিচমণ্ডের এক ব্যবসায়ীর কাছে মানুষ হলেও তাঁদের প্রীতির সম্পর্ক ছিল না। অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনসংগ্রামে স্বাভাবিভাবেই দুঃস্বপ্ন নেমে আসে। ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। চিররুগ্না স্ত্রীর মৃত্যুতে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন পো। অপরিমিত সুরাপানে মেতে ওঠেন। দুর্বিষহ জীবন বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। বাল্টিমোরের এক ময়লা নর্দমায় মধ্য অচৈতন্য হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পো’র গল্পেও সেই মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব ও বিভীষিকাময় জীবনদৃষ্টির পরিচয় নিবিড় হয়ে উঠেছে। ছায়াছন্ন বিষণ্নতা, শ্বাসরোধী রহস্য ও নারকীয় বীভৎসতা তাঁর গল্পের মধ্যে স্বাভাবিকতা লাভ করে। গথিক উপন্যাসের মতো ভয়ার্ত পরিবেশ তাঁর গল্পেও ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর কয়েকটি স্মরণীয় গল্প ‘The Black Cat’, ‘The Pit and the Pendulum’, ‘The Fall of the House of Ushers’, ‘The Masque of the Red Death’, ‘The Tell-Tale Heart’ প্রভৃতি। পো ছিলেন ম্যাগাজিনের গল্পকার। গ্রাহাম ম্যাগাজিন, হার্পারস ম্যাগাজিন, পুট্নামস্ ম্যাগাজিন, আটলান্টিক ম্যাগাজিন প্রভৃতি ম্যাগাজিনে তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে ‘The Black Cat’ গল্পটি তাঁর প্রতিনিধিস্থানীয় বিখ্যাত গল্প। গল্পটি ‘The Saturday Evening Post’ পত্রিকায় ১৮৪৩-এর ১৯ আগস্ট প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি একটি রহস্যমুখর বিভীষিকাময় ছোটগল্প। প্লুটো (Pluto) নামক কালো বিড়ালের হত্যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত গল্পটিতে হত্যাকারীর মানসিক বিপর্যয় ও বিকারের পরিচয় নানাভাবে উঠে এসেছে। খেয়ালের বশে মানসিক বিকারের স্বীকার হয়ে বিড়ালটিকে হত্যা করার পর সেই কালো বিড়ালটির মতোই দেখতে অন্য বিড়ালের অন্যত্র তার বিচরণে বিস্মিত হয়ে মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বে ভোগা হত্যাকারীর পরিচয়ই গল্পটির উপজীব্য। সেখানে নানা রকম মিথ ও সংস্কারের প্রতীক হয়ে ওঠে প্লুটো।

গী দ্য মোপাসাঁ’র (১৮৫০-১৮৯৩) ’দ্য নেকলেস’ (‘The Necklace’)
ফরাসি ছোটগল্পের শ্রেষ্ঠ গল্পকার গী দ্য মোপাসাঁ (Guy de Maupassant)। কবি হিসাবে সাহিত্যজীবন শুরু করলেও অচিরেই ছোটগল্পে চলে আসেন। ন্যাচারালিজমের প্রবক্তা কথাসাহিত্যিক জোলাকে কেন্দ্র করে একদল তরুণের সাহিত্যিকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল যাকে ‘ন্যাচারালিস্ট স্কুল’ নামে অভিহিত করা হয়। ১৮৭০-এর যুদ্ধের পটভূমিকায় সেই দলের সকলেই একটি করে গল্প লেখেন। সেই সংকলনের শ্রেষ্ঠ গল্পটি লিখেছিলেন মোপাসাঁ। সেই ‘Buil de suif’(‘চর্বির গাদা’)। ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের পটভূমিকায় এক অসহায় পতিতা নারীকে নারীদেহ লোলুভ জার্মান সৈন্যদের হাতে তুলে দিয়ে একদল সুবিধাবাদী মানুষের স্বার্থ রক্ষার নির্মম গল্পটির মাধ্যমে মোপাসাঁ তাঁর গুরু তথা তৎকালীন প্রভাবশালী সাহিত্যিক ফ্লবেয়ারের অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র কুড়ি। অন্যদিকে তাঁর প্রিয় শিষ্যকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন ফ্লবেয়ার। কিন্তু মোপাসাঁর মন থেকে জীবনের অন্ধকারকে আলোর দিকে ফেরাতে পারেননি তিনি। বিষাদব্যাকুল জীবনে শুধু অনাস্থা ও অবিশ্বাসে তাঁর নিরাসক্ত মনে শুধুই নিরাশার হাতছানি। এজন্য তাঁকে মুগ্ধ করেছিল জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের দুঃখবাদী দর্শন, ‘মেলাঙ্কোলিয়া’ যার মর্মসহচর। ব্যক্তিগত ভাবে ব্যাধিগ্রস্ত জীবনও তাঁকে মানসিক স্বস্তি দিতে পারেনি। সর্বদা ব্যর্থ জীবনের আত্মগ্লানিবোধে পীড়িত মোপাসাঁ জীবনকে নেতিবাচক ভাবে দেখানোর প্রবণতা থেকে সরে আসতে পারেননি। তার প্রতিফলন তাঁর গল্পে নিবিড় হয়ে ওঠে। সেখানে তৎকালীন ফ্রান্সের চূড়ান্ত রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আত্মিক পরাভবের পরিচয় উঠে এসেছে। সেই সময়ের তিক্ত, ক্ষিপ্ত ও আদর্শহীন যাপিত জীবনের অভিব্যক্তি মপাসাঁর গল্পে ভাষা লাভ করেছে। ‘Pointing finger’ তাঁর গল্পে নির্মম ভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে। এজন্য গল্পগুলির পরিণতিতে চাবুক হাঁকড়ানো পরিণতি লক্ষ্যভেদী হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে তাঁর গল্পের মধ্যে দুটি সত্তা বর্তমান। একদিকে নরম্যাণ্ডির জীবনরসিক সজীব মানুষের, অন্যদিকে পারীর বিষাক্ত নাগরিক জীবনের বিধ্বস্ত বিষণ্ণ পথিকের। শেষোক্ত সত্তার গল্পে স্বাভাবিক ভাবেই নেমে এসেছে তাঁর তীব্র ব্যঙ্গবিদ্রুপ ও নির্মম কশাঘাত। Anti-climax-এ গল্পগুলির আকস্মিক পরিণতি তাঁর গল্পের স্বাভাবিক বিশেষত্ব। নিরাশাবাদী মোপাসাঁর লেখনীই ফরাসি ছোটগল্পে প্রাণ সঞ্চার করেছিল। ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ পর্যন্ত তিনি প্রায় তিনশো গল্প লিখেছেন। তার মধ্যে জীবনরসিক মোপাসাঁর গল্পে ক্ষমাসুন্দর উদারতা বর্তমান। যেমন, ‘Miss Harriett’, ‘M. Parent’, ‘Histoire d’une filled u ferme’(‘চাষার মেয়ের গল্প’) প্রভৃতি। অন্যদিকে নাগরিক জীবনের বিধ্বস্ত পথিকের গল্পের পরিসর আরও সুবিস্তৃত। তার মধ্যে উল্লেখ্য ‘Coco’ ‘Les Bijoux’(‘গয়না’), ‘Qui Sait’ প্রভৃতি গল্প। কিন্তু যে গল্পটির মধ্যে মোপাসাঁর জীবনদৃষ্টি ব্যঙ্গবিদ্রুপে অসামান্য নৈপুণ্যের পরিচয়ে লক্ষ্যভেদী সাফল্য লাভ করেছে, সেটি তাঁর ‘The Necklace’। গল্পটি ১৮৮৪-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি ‘Le Gaulois’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। গল্পটির মধ্যে ধনীর আভিজাত্যকামী জীবনের ট্রাজিক পরিণতিকে অসাধারণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কেরানির বৌ হলেও মাতিলদে উন্নাসিকমনা। এজন্য সে সর্বদা হীনমন্যতায় ভোগে। ধনীর অভিজাত পার্টিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণে যাওয়ার জন্য স্বামীর দেওয়া ৪০০ ফ্রাঙ্ক দিয়ে পোষাক হলেও সাজগোজের প্রয়োজনে শেষে বন্ধু ফোস্টিয়ারের কাছে থেকে একটি বহু মূল্যের নেকলেস ধার করে আনে। সেই নেকলেসই পার্টিতে গিয়ে হারিয়ে যায়। এজন্য তার পরিবর্তে ঐরকম একটি নেকলেস কিনতে গিয়ে মাতিলদে জানতে পারে তার দাম ৪০ হাজার ফ্রাঙ্ক। সেটা ৩৬ হাজারে সেই সময়ে পাওয়া যেতে পারে। সেই অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে মাতিলদে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে এবং শেষে স্বামীকেও হারায়। দশ বছর পরে শোকেতাপে জর্জরিত হয়ে বয়সের পূর্বেই বয়স্কা হয়ে ওঠা মাতিলদে পথের মধ্যে ফোস্টিয়ারকে দেখে লুকোতে চাইলেও তার বান্ধবী চিনে ফেলে। সব জেনেশুনে বিস্মিত ফোস্টিয়ার যে উত্তর দেয়, তাই গল্পটির রসক্ষরণে অব্যর্থ হয়ে ওঠে : ‘Oh, my poor Matilda ! Mine were false. They were not worth over five hundred francs.’ সেদিক থেকে কৃত্রিম আভিজাত্যের দায়ে বিপর্যস্ত জীবনের নির্মম পরিণতিকে মোপাসাঁ তাঁর ‘দ্য নেকলেস’ গল্পে ‘pointing finger’-এর মাধ্যমে Anti-climax উপসংহারে অসাধারণ ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন। সময়ের অনুবাদ হিসাবে ছোটগল্পের বুনিয়াদি চেতনাতেও গল্পটি হীরকদ্যুতি ছড়িয়ে দেয় যা সমকালীন হয়েও চিরকালীন মনে হয়।

আন্তন চেকভের (১৮৬০-১৯০৪) ‘কেরানির মৃত্য’ (‘Death of a Clerk’)
রাশিয়ার ছোটগল্পের শ্রেষ্ঠ গল্পকার আন্তন চেকভ (Anton Chekov)। ফ্রান্সের মোপাসাঁর মতো রাশিয়ার চেকভও আন্তর্জাতিক ছোটগল্পে জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বিস্তারে প্রাসঙ্গিকতা লাভ করেন। দুজনেই সমসাময়িক এবং ব্যঙ্গবিদ্রুপে শানিত। অথচ দুজনের পথ ও মত স্বতন্ত্র। মোপাসাঁ নির্মোহ দৃষ্টিতে লক্ষ্যভেদী আঘাতে সক্রিয় থেকেছেন, চেকভ সরসে তাঁর লক্ষ্যে উপনীত হয়েছেন। প্রথমজন যেখানে নিরাশাবাদী, দ্বিতীয় জন সেখানে আশাবাদী। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘সাহিত্য ছোটগল্প’-এ দুজনের তুলনা প্রসঙ্গে জানিয়েছেন :‘মোপাসাঁর সম্পদ বৈচিত্র্যে, চেকভের মহিমা গভীরতায়। মোপাসাঁ আগুন জ্বালিয়েছেন আর সে আগুনে যেমন আবর্জনা পোড়াচ্ছেন, তেমনি ভাবে নিজেও দগ্ধ হচ্ছেন ; অন্যদিকে চেকভের হাতে রয়েছে একটি ‘বুল্স্-আই’ লণ্ঠন–তা যার ওপরে গিয়ে পড়ছে তাকে উদ্ভাসিত করে দিচ্ছে, আর মনে করিয়ে দিচ্ছে–যারা আমাদের অতি কাছের–প্রতিদিনের পরিচিত, তাদের সম্বন্ধেই আমরা কতটুকুই-বা জানি।’ অন্যদিকে চেকভকে ছোটগল্পের ‘The Master’ বলা হয়। যেকোনো সাধারণ বিষয়কে নিয়েই তিনি অসাধারণ গল্প রচনা করতে পারতেন। তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘Everything in nature has a meaning’। সেক্ষেত্রে তারকে সেতার বানানো তাঁর সহজাত প্রতিভা। অন্যদিকে চিকিৎসা ছিল তাঁর পেশা। ছাত্রজীবনে অর্থের টানে কৌতুক গল্প লিখতে গিয়ে সাহিত্যের পথে আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন। নাটক ও গল্পে সাহিতিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেলেও চিকিৎসক হিসাবেই নিজেকে মনে করতেন। তাঁর সেই বিখ্যাত অভিমত, ‘Medicine is my lawful wife and literature is my mistress’। অন্যদিকে সাহিত্যচর্চায় তাঁর চিকিৎসক মনের প্রভাব পড়েছে, সেকথাও অকপটে জানিয়ে দিয়েছেন। তাঁর গল্পের মধ্যে সেই চিকিৎসক মনের পরিচয় নিবিড় হয়ে উঠেছে বলেই গল্পগুলির মননের গভীরতা তীব্র ব্যঞ্জনাবহ হয়ে উঠেছে। তাঁর প্রথমদিকের দুটি লঘুরসের গল্পগ্রন্থ ‘Stories of Melpomena’ (১৮৮৪) ও ‘Metley Stories’ (১৮৮৫)। অন্যদিকে নির্মোহ ও নিরাসক্ত ভাবে চেকভ একের পর এক অসাধারণ গল্প লিখেছেন। সেখানে লঘু চালে গুরু কথা বলার স্বকীয়তা ছোটগল্পের আঙ্গিকেও স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তুলেছেন তিনি। তাঁর ‘Sleepy’, ‘The Horse Stealers’, ‘Ward no 6’, ‘The Lady with the Dog’, ‘The Darling’, ‘A Dreary Story’, ‘The Kiss’, ‘The School Mistress’, ‘ The Mask’, ‘chameleon’, ‘The New Villa’ প্রভৃতি অসংখ্য গল্পে গল্পকারসত্তার পরিচয় সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সময়ের অনুবাদে ছোটগল্পের অপরিহার্য ভূমিকায় আন্তন চেকভের অসাধারণ লেখনী সেখানে সমান সক্রিয়। যুগের যন্ত্রণা তাঁর গল্পের মূর্ত হয়ে উঠেছে। এরকমই একটি গল্প ‘Death of a clerk’ তথা ‘কেরানির মৃত্যু’। গল্পটি ‘Oskolki Magazine’-এ ১৮৮৩-এর ২ জুলাই প্রকাশিত হয়। সেই সময়ের রুশীয় ব্যুরোক্রেসির প্রচণ্ড প্রতাপে মেরুদণ্ডহীন আমজনতার বিভীষিকাময় জীবনের ছবি যেন গল্পটিতে কথা বলে ওঠে। রাত্রিবেলায় দ্বিতীয় সারিতে বসে অপেরা দেখতে গিয়ে অফিসের কেরানি চেরভিয়াকভ্ মহানন্দে উপভোগের মধ্যেই হাঁচি সামলাতে না পেরে বিপর্যয় ডেকে আনে। হাঁচির শব্দে ও স্পর্শে যিনি বিরক্তির শিকার হয়েছেন স্বয়ং যোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী সিভিল জেনারেল ব্রিঝালভ। তাঁর পরিচয় পেয়েই চেরভিয়াকভ অপেরার মনটি মন্ত্রীর দিকে নিমগ্ন হয়ে পড়ে। তাঁর অধীনে কাজ না করলেও মনকে সে কিছুতেই প্রবোধ দিতে পারে না। বারবার ক্ষমা চেয়েও তার ভয় যায় না, উল্টে আরও তাঁর বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে। পর পর দুদিন ধরে মন্ত্রীর বাড়িতে গিয়ে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করে বিরাগভাজন হতে হতে ভয়ানক ভাবে বিতাড়িত হয়ে শেষে অফিসের পোষাকেই সোফায় উপরে বসেই তার মৃত্যু হয়। উল্লেখ্য, ‘চেরভিয়াকভ্’-এর রুশ অর্থ ‘শ্রী পোকা’। সাধারণ মানুষ সেখানে কীভাবে পোকার জীবনে অভ্যস্ত ছিল, তার পরিচয় হাস্যরসের মাধ্যমে অসাধারণ ভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে গল্পটিতে। অন্যদিকে মোপাসাঁরও কেরানিকে নিয়ে একটি গল্প আছে। সেই ‘The Story of a Clerk’-তে ধনবতী বৃদ্ধা শাশুড়ির সম্পত্তি পাওয়ার আশায় জনৈক দরিদ্র কেরানির ব্যর্থতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। স্ত্রী-শ্যালিকা নিয়ে যখন সেই কেরানি মৃত শাশুড়ির সম্পত্তি ভাগাভাগি করে ফেলেছে, তখন আবার সেই শাশুড়ি বিছানা উঠে বসে পড়ে। সেদিক থেকে চেকভ যেখানে লঘু ব্যঙ্গে সুগভীর ট্রাজেডি সৃষ্টি করেছেন, মোপাসাঁ সেখানে নিয়তির নির্মতায় পরিহাসমুখর হয়েছেন।

অস্কার ওয়াইল্ড (১৮৫৪-১৯০০)-এর ‘সুখী রাজপুত্র’ (‘The Happy Prince’)
কবিতা ও নাটকের দেশ ইংল্যান্ডে ছোটগল্পের বিস্তার সেভাবে ঘটেনি। তার মধ্যেও যিনি গল্পের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণীয় তিনি আইরিশ কবি ও নাট্যকার এবং ঔপন্যাসিক অস্কার ওয়াইল্ড (Oscar Wilde)। অবশ্য তাঁর গল্পগুলি রূপকধর্মী থেকে রূপকথাধর্মী হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য, তিনি ছিলেন কলাকৈবল্যবাদী ‘Art for art’s sake’-এর প্রচারকও ছিলেন। অথচ তাঁর গল্পেও মানুষের যন্ত্রণাকাতর জীবনের কথা নানাভাবে উঠে এসেছে। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ছেচল্লিশ বছরের জীবন নানা বিপর্যয়ে ভরা। শেষ জীবনে (১৮৯৫-১৯৯৭) সমকামিতা ও অসামাজিক কাজের জন্য জেলে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। অবশ্য তাঁর পূর্বেই তাঁর সাহিত্য প্রতিভার পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাঁর দুটি গল্প ‘The Happy Prince’ এবং ‘The Selfish Giant’ দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতীকধর্মী গল্পে তাঁর অসাধারণ প্রতিভার পরিচয়ে গল্পদুটি বিশ্বনন্দিত। তাঁর গল্পের বই ‘The Happy Prince and Other Tales’(১৮৮৮)-এ উক্ত দুটি গল্প আরও তিনটি অসামান্য গল্প বর্তমান। সেগুলি হল, ‘The Nightingale and the Rose’, ‘The Devoted Friend’ ও ‘Remarkable Rocket’। অন্যদিকে অস্কার ওয়াইল্ডের গল্পে রূপকের আড়ালে জীবনযন্ত্রণার কথাই আবেদনক্ষম হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, সেখানে মানবতার আদর্শই প্রাধান্য লাভ করেছে।। ‘The Happy Prince’ গল্পে সুখী রাজপুত্রের সুখের পরিচয়কে মূর্ত করে তুলতে গিয়ে গল্পকার সেবা ও ত্যাগের চিরায়ত মানবিক আদর্শকেই তার অভিমুখ করে তুলেছেন। রাজপুত্র তাঁর মৃত্যুর পর শহরের মাঝখানে সুউচ্চ মহার্ঘ মূর্তিতে সুশোভিত হয়ে জীবিতকালে প্রাচীরবেষ্টিত সুখস্বাচ্ছন্দমুখর জীবনের বাইরের সাধারণ্যে যন্ত্রণাকাতর অসহায় দুঃখী মানুষের পার্থক্য গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। এজন্য তার নিরসনে মিশরগামী হয়ে তাঁর দু’পায়ের ফাঁকে আশ্রিতা ছোট্ট সোয়ালো পাখির সাহায্যে নিজের সর্বস্ব (দুচোখের উজ্জ্বল নীলকান্ত মণি, তরবারির লাল চুনি ও সোনার দেহাবরণ প্রভৃতি) দিয়ে গরীব দুঃখী মানুষকে সাহায্য করতে করতে একসময় তাঁরা উভয়েই দেহত্যাগ করেন। রাজপুত্রের মূর্তি ও ছোট্ট পাখির মাধ্যমে অলৌকিক গল্পকে বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে মহত্তর চেতনায় উদ্দীপ্ত করে যেভাবে তার সমাপ্তি টানা হয়েছে, তাতে শুধু শৈল্পিক চেতনাকেই সৌন্দর্যমুখর করে তোলেনি, বরং সত্যনিষ্ঠায় ও নৈতিক আদর্শের মেলবন্ধনে অপূর্ব সুন্দর মূর্তি মানবিক প্রতিমায় সুরভিত হয়ে উঠেছে।

ও হেনরি (১৮৬২-১৯১০)-এর ‘মেজাইয়ের উপহার (‘The Gift of the Magi’)
আমেরিকার ছোটগল্পের জনপ্রিয় গল্পকার ও হেনরি (O. Henry)। তাঁর আসল নাম William Sydney Porter। তিনি বিচিত্র জীবনের অধিকারী। ব্যাঙ্কে কাজ নিয়ে সাংবাদিকতা থেকে বেআইনিভাবে অর্থ আত্মসাৎ, কুখ্যাত দস্যুদের সঙ্গে বাস প্রভৃতি নানা ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। অন্যদিকে কুড়ি বছর বয়সে স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ভাষা শিখেছিলেন। তার পূর্বে কাকার ওষুধের দোকানে কাজ করতে গিয়ে ক্রেতাদের অসঙ্গত আচার-আচরণের স্কেচ আঁকতেন। আবার শেষে অর্থ তছরূপের বিচারে কারাগারে থাকার সময় গল্প লিখে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। সাময়িক পত্রিকায় পাঠানোর সময় তিনি O. Henry ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ দশবছর ছোটগল্পকার হিসাবে ও হেনরি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যান। দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতাই তাঁর গল্পে আলোকিত। সেক্ষেত্রে তাঁর গল্পে ঘটনার আকস্মিকতায় গল্পের পরিণতে Anti-climax স্বাভাবিক বিশেষত্ব হয়ে ওঠে। এজন্য তাঁকে আমেরিকার মোপাসাঁ বলা হয়। চরিত্রের চেয়ে ঘটনার দিকেই ও হেনরির গল্পগুলি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নিউ ইয়র্কের রাস্তায় দেখা অতি সাধারণ পথচারী, পুলিশ, দুষ্কৃতকারী প্রভৃতি নানা চরিত্রের ক্ষণিকের যাপিত জীবন তাঁর গল্পে আন্তরিক হয়ে উঠেছে। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘Cabbages and Kings’(১৯০৪) বিপুল সাড়া ফেলেছিল। লিখেছেন অসংখ্য গল্প। তার মধ্য স্মরণীয় গল্পগুলি হল ‘The Gift of the Magi’, ‘An Unfinished Story’, ‘The Skylight Room’ ‘The Last Leaf’, ‘The Ransom of Red chief’, ‘After twenty Years’ প্রভৃতি। তার মধ্যে ও হেনরির ‘The Gift of the Magi’ গল্পটি সবচেয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে। সেটি তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘The Four Million’(১৯০৬)-এর অন্তর্ভুক্ত। গল্পটি প্রথমে ১৯০৫-এর ১০ ডিসেম্বর ‘The New York Sunday World’ পত্রিকায় ‘Gifts of the Magi’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে সেটি বই-এ ‘The Gift of the Magi’ হয়ে ওঠে। প্রেমের গল্প হিসাবে গল্পটি বিশ্বনন্দিত। জিম ও ডেলার ভালোবাসার অপূর্ব প্রকাশ গল্পটিকে মহিমামান্বিত করেছে। খ্রিষ্টমাস পালনে সেরা উপহার দেওয়ার জন্য দুজনেই উদগ্রীব। তাদের কাছে যথেষ্ট পয়সা নেই। অবশেষে তারা পরস্পরের অমূল্য সম্পদ বিক্রি করে উপহার দিতে গিয়ে অবাক হয়ে যায়। ডেলা তার মাথার সুদীর্ঘ সুন্দর চুল বিক্রি করে জিমের দামি ঘড়ির জন্য রূপার চেন কেনে। জিম সেই ঘড়ি বিক্রি করে ডেলার জন্য রত্নে মোড়া চিরুণি নিয়ে আসে। কেউই সেই উপহার ব্যবহার করতে না পারলেও একেঅপরের ভালোবাসার পরিসর জেনে গেল। আত্মত্যাগের আলোয় সেই উপহার ‘The Gift of the Magi’ হয়ে গেল। ‘বাইবেল’ অনুসারে মেজাইরাই যীশুর জন্মের পরে তাঁর জন্য মহার্ঘ উপহার নিয়ে হাজির হয়েছিলেন।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।