| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নিম্ন দামোদর অববাহিকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কিছু বাস্তব সমস্যা : দেবাশিস শেঠ

Reporter
দেবাশিস শেঠ / ১৩৭৯ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০২২

নদী স্বভাবতই ভীষণ অভিমানী। তার মন না বুঝে মানুষ যতবার তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেছে, সে যোগ্য প্রত্যুত্তর দিয়েছে। মহাত্মা গান্ধীজি একবার বলেছিলেন, ‘প্রকৃতিকে শৃংখল দিয়ে বাঁধতে যেও না তাতে বিপর্যয় হবে।’ এই কথার মূল্য আজ আমরা মর্মে মর্মে অনুভব করছি। নিম্ন দামোদর অববাহিকার বিশেষ করে উদয়নারায়নপুর, খানাকুল, পুড়শুড়া ইত্যাদি হাওড়া এবং হুগলি জেলার একটা বড় অংশের যে অবর্ণনীয় দুর্দশা, একদিন তা মানুষই রচনা করেছে। করেছে খেয়ালী নদীর গতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে। তাই এর থেকে উদ্ধার পেতে মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে সচেতন ভাবে।

ইতিহাসের দিকে যদি তাকাই, খানাকুল এবং উদয়নারায়নপুরের ২০১৩ সালের বন্যা আমাদের নতুন কিছু কথা শোনালো। ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত এই এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতা, দুর্গাপুর ব্যারেজ দেড় লক্ষ্য কিউসেক জল ছারলেই খানাকুল ভেসে যেত, কিন্তু উদয়নারায়নপুরে তার তেমন কোন প্রভাব পড়তো না। ২০০৯ সাল থেকে ছবিটা পাল্টাতে শুরু করলো। ২০০৯ সালের বন্যায় আমরা দেখলাম খানাকুল প্লাবিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে উদয়নারায়নপুর এবং তার সংলগ্ন খানাকুলের বেশ বড়সড় এলাকা তার চেয়েও বেশি ভয়ংকর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১০ সালের ছবিটা আরও স্পষ্ট। ১ লক্ষ ৭০ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হলো দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে।

দেখা গেল দামোদরের পশ্চিমপাড় উপচে সেই জল প্লাবিত করল হাওড়া এবং হুগলির একটা বড় অংশকে। অর্থাৎ এই পরিমাণ জলে এর আগে এই এলাকার মানুষের যে অভিজ্ঞতা এবার তার সঙ্গে মিলল না। ২০১৩ সালের বন্যায় আরো প্রকট হলো সেই অভিজ্ঞতা। দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে সর্বোচ্চ জল ছাড়া হয়েছিল ১ লক্ষ ৬৩ হাজার ২৫০ কিউসেক। খানাকুলের মানুষ পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে যতটা আতঙ্কিত হয়েছিল ফল কিন্তু এই এলাকাকে ততটা প্রভাবিত করেনি। সেবার খানাকুলের বন্যা দুর্গতদের জন্য মোটে চারটি শিবির করতে হয়েছিল, মোট ৫০০ জনের মত লোককে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় দিতে হয়েছিল। কিন্তু এই সময়ে উদয়নারায়ণপুর এলাকার মানুষদের দুর্দশার সীমা ছিল না। হাওড়া এবং হুগলির বেশ কিছু অংশের মানুষ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই বন্যা থেকে। কেন এই পরিবর্তন? সে কথায় পরে আসছি।

আরামবাগ মহকুমাকে শাসন করে মূলত দামোদর, দামোদরের শাখা নদী মুণ্ডেশ্বরী ও দ্বারকেশ্বর। দামোদরের মোট দৈর্ঘ্য ৫৪১ কিঃমিঃ। হুগলিতে তার ব্যাপ্তি ৪৫ কিলোমিটার। ছোটনাগপুর মালভূমির পালামৌ থেকে উৎপন্ন হয়েছে এই নদী। এরপর বিভিন্ন গিরিখাত ও স্রোতধারা মিলে একে পুষ্ট করেছে। পালামৌ থেকে ২৯০ কিঃমিঃ আসার পর রানীগঞ্জের কাছে দামোদর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে প্রবেশ করেছে। তারপর বর্ধমানের শেষ প্রান্তে বেগুয়া বা বেগো-তে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এক ভাগ আমতা হয়ে শ্যামপুরে হুগলি নদীতে মিশতো। পরে তার শেষ অংশ মজে যাওয়ায় ১৯৭৮ সালে আমতার কিছু পর থেকে একটি খাল কেটে দামোদর কে গড়চুমুকে হুগলি নদীর সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। বেগুয়া থেকে অন্য শাখাটি মুণ্ডেশ্বরী নাম নিয়ে খানাকুল পার হয়ে রূপনারায়ণের মিশেছে।

এই মিলিত স্রোতধারা গেঁওখালি তে হুগলি নদীর সঙ্গে মিশেছে। শাখা নদী হলেও প্রাকৃতিক কারণে মুণ্ডেশ্বরী ক্রমশ দামোদরের চেয়ে প্রবল হয়ে উঠেছিল। ২০ সালের বন্যায় ১৩২০ (ইং ১৯১৩) দেখা গিয়েছিল এর ভয়ংকর রূপ। তখন থেকেই মুণ্ডেশ্বরীর খাত অনেক গভীর হয়ে যায়। দামোদরের শতকরা ৭০ ভাগ জল যেত মুণ্ডেশ্বরী দিয়ে বাকিটা দামোদর দিয়ে। এই সময়ে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল খানাকুলের। তারপর থেকে প্রবল প্রতাপের সঙ্গে প্রায় ১০০ বছর রাজত্ব করেছে মুণ্ডেশ্বরী। কিন্তু গত ২০০৮ সাল থেকে চিত্রটা পাল্টাতে শুরু করল। কারণ সেই সময় মুণ্ডেশ্বরীর চাপ কমানোর জন্য কৃত্রিমভাবে বেগুয়ায় মুন্ডেশ্বরীর মুখে কিছুটা অবরোধ করে দামোদরের দিকে ড্রেজিং করে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রত্যাশিতভাবেই মুণ্ডেশ্বরীর চাপ কমতে থাকে এবং দামোদরের চাপ বাড়তে থাকে।

আরো একটি বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত হয়। সেটি হল পুরশুড়া এলাকায় দামোদর থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রচুর পরিমাণে বালি তোলা। এর ফলে দামোদরের এই অংশের গভীরতা এবং জল ধারণের ক্ষমতা, বেশ কিছুটা বেড়ে যায়। কিন্তু চাঁপাডাঙ্গার পরবর্তী এলাকায় এই নদী অপেক্ষাকৃত ক্ষীণতর থাকায় বটল নেক এর আকার ধারণ করে। ফলে জলের প্রচন্ড চাপে এইসব এলাকায় দামোদরের পশ্চিমপাড় ভেঙে বন্যা প্লাবিত হওয়ার ঘটনা অনেক বেড়ে যায়। এই বিপুল জলরাশির চাপ সামলানোর ক্ষমতা দামোদরের পশ্চিমপাড়ের ছিল না। কারণ, ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানে একটি অদ্ভুত নিয়ম চালু আছে। নদীর পূর্বপাড় উঁচু করে বোল্ডার দিয়ে বাঁধানো অথচ পশ্চিম পাড়ের সেই ভাগ্য নয়। এই দিকটিকে বলা হয় ‘ স্পিল ওভার জোন’। যদি বন্যার প্রচন্ড চাপ আসে তাহলে পূর্বদিক যেন কিছুতেই না ভেঙে যায়, কারণ এদিকে রেলপথ, শিল্পাঞ্চল, শহর ইত্যাদি আছে। তাই পশ্চিম দিকটিকে সেফটি ভাল্ভ হিসেবে ধরা হয়। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। কুরচি, লেবুতলা, হরাল দাসপুর, থেকে শুরু করে খানাকুল এক নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির অরুন্ডা গ্রাম পঞ্চায়েত, ধারা শিমুল বন্দাইপুর, চব্বিশপুর শোলা আস্তা যুগিকুন্ডু, সুদামচক ইত্যাদি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দামোদর থেকে আসা এই বিপুল জলরাশি বেরোবার রাস্তা পাচ্ছে না কেননা দামোদরের সমান্তরাল ভাবে পশ্চিমেই আছে মুন্ডেশ্বরী। তার পূর্ব পাড়ে বাধা পাচ্ছে সমস্ত জল। এইবারের বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে এই সমস্ত বিষয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠবে আমাদের কাছে।

কৃত্রিমভাবে মুণ্ডেশ্বরীর গতিরোধ করা ছাড়াও আরো একটি বিষয় এই নদীর নাব্যতা কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। তা হল বোরো বাঁধ। গ্রীষ্মের বোরো ধান চাষ করার জন্য মুণ্ডেশ্বরী নদীর অনেকগুলি জায়গায় আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়া হয় জল ধরে রাখার উদ্দেশ্যে। বর্ষা এলে এই বাঁধের মাটি নদী থেকে তুলে নেওয়া হয় না। ফলে প্রতিবার অস্থায়ী মাটি এবং অন্যান্য উপকরণে নদী গর্ভ ভরে ওঠে। এই নদীতে অসংখ্য খেয়া পারাপারের ঘাট আছে ।যেগুলি নৌকো পারাপার হিসাবে সরকারি অনুমতি দিলেও বাস্তবে নৌকা চালানোর পরিবর্তে প্রচুর অস্থায়ী সাঁকো তৈরি হয়। ঘন ঘন বাঁশের বা সাল বল্লার খুঁটিতে নদীর স্রোত অনেকটা বাধাপ্রাপ্ত হয়। গাছের ডাল পালা, শ্যাওলা বা আবর্জনা জমে নদীর গতিপথ রুদ্ধ হয়। এভাবে জলস্রোত বাধা পেয়ে নদীর পাড় ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনা বহু ঘটেছে।

দামোদর মুণ্ডেশ্বরী ছাড়াও আরামবাগের মধ্য দিয়ে আর যে একটি নদী তার নাম দ্বারকেশ্বর। এই দ্বারকেশ্বর ঘাঁটালের কাছে শিলাবতী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে রূপনারায়ণ নাম নিয়ে হুগলির একেবারে দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পরে মুণ্ডেশ্বরী নদী ও এই রূপনারায়ণের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। হুগলিতে রূপনারায়ণের পথ খুব সামান্য। কিন্তু তাকে নিয়ে সমস্যা অসামান্য। এই রূপনারায়ণ ই মূলত খানাকুল তথার নিম্ন দামোদরের নিকাশি পথ। এই নদী খালি থাকলে বা এর জল ধারণের ক্ষমতা বেশি থাকলে খানাকুলের জল নিকাশ খুব সহজেই হয়ে যায়। কিন্তু বিপদের সময় দেখা যায় এই পথটিই আগে বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমত, নিম্নচাপ বা এরকম কোন কারণে দ্বারকেশ্বরের উৎসমুখের অঞ্চলে যদি প্রবল বৃষ্টি হয় তবে এই নদীতে কোনো বাঁধ বা জলাধার না থাকায় তার অনিয়ন্ত্রিত জল যে হারে দামোদর শিলাবতি প্রভৃতি নদী বাহিত হয়ে রূপনারায়ণে পড়ে তা বহন করার ক্ষমতা তার থাকে না। এই জলের কোন হিসাব পত্রও থাকে না প্রশাসনের কাছে। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় হড়পা বান।

প্রসঙ্গত, দ্বারকেশ্বর নদীর অতিরিক্ত জলোচ্ছ্বাসে বারবার সর্বনাশ হয়েছে আরামবাগ খানাকুলের বিভিন্ন এলাকার। এক্ষেত্রে এক শেণীর সংবাদ মাধ্যম বারবার ডিভিসির প্রসঙ্গ এনেছেন। মনে রাখতে হবে দ্বারকেশ্বরের সঙ্গে ডিভিসির কিন্তু কোন রকম সম্পর্ক নাই। আরেকটি বিষয় হলো বন্যার সময় যদি জোয়ার আসে তবে জোয়ারের প্রভাবে রূপনারায়ণের জল গরেরঘাট পর্যন্ত ফুলে ওঠে। ফলে বিভিন্ন নদী নালা প্রবাহিত খানাকুলের জল নেওয়ার কোন ক্ষমতা তার থাকে না বরং সেখান থেকে জল উল্টোদিকে ঠেলা দেয়। তখন কোন পরিকল্পনা দিয়েই এই জলকে ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় থাকে না। এমনিতেই আমাদের দুর্ভাগ্য, রূপনারায়ণ এই এলাকার একমাত্র পূর্ব বাহিনী নদী। ফলে এই নদীর স্রোতের টান খুব কম। মাঝে মাঝেই পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে এর অনেক অংশ। খানাকুল উদয়নারায়নপুর এলাকার বন্যা পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠার একমাত্র কারণ কিন্তু এই রূপনারায়ণ।

এবারে আসি অসম্পূর্ণ দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের প্রসঙ্গে। একে নিম্ন দামোদর উপত্যকার দুঃখের কারণ বলা যেতে পারে। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল তিনটি। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থার প্রসার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন। ১৯৪৩ সালে ভয়াবহ বন্যার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর সরকার একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির প্রস্তাবেই আমেরিকার টেনিসি প্রকল্পের অনুকরণে সেখানকার এক প্রবীণ ইঞ্জিনিয়ার ভুরডুইনের পরিকল্পনা অনুযায়ী দামোদর পরিকল্পনা গৃহীত হয়। ঠিক হয় দামোদরের অববাহিকায় ৮ টি বাঁধ দিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সেই হিসাব অনুযায়ী ১০০০০০০ কিউসেক জল নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এই বাঁধগুলি। কিন্তু সেই প্রকল্পের সম্পূর্ণ রূপায়ণ হয়নি। প্রথম পর্যায়ে তিলাইয়া, কোনার, মাইথন, পাঞ্চেত এই চারটি বাঁধ এবং দুর্গাপুর ব্যারেজ তৈরি হয়। পরে বিহার সরকার তেনুঘাট বাঁধ তৈরি করে। মাইথন পাঞ্চেত পরিকল্পনা অনুযায়ী জায়গা না পাওয়ায় আকারে ছোট করতে হয় তার উপর সব জলাধারগুলিতেই দীর্ঘকাল পলি পড়ে পড়ে বর্তমানে তাদের অবস্থা সঙ্গিন। অসম্পূর্ণতা এবং সংস্কারের অভাবে বর্তমানে পুরো প্রকল্পটি পরিত্যক্ত হওয়ার মতো অবস্থায় এসে গেছে।

ধান চাষের সেপ্টেম্বর মাসের সেচের জন্য জমিতে জলের চাহিদা মেটাতে জুলাই আগস্ট মাসে ডিভিসির জলাধারে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত জল ধরে রাখা হয়। সাধারণত এরপর এই এলাকায় তেমন বৃষ্টি হয় না। যেহেতু ডিভিসির জল ধারণের ক্ষমতা কমে গেছে তাই তার সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত জল ধরে না রাখলে পরবর্তী শুখার সময় চাহিদা মেটানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু প্রকৃতি যদি অন্যরকম হয়, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে নিম্নচাপের প্রভাবে উৎস এলাকায় প্রচুর বৃষ্টি হয় তবে সেই বৃষ্টি ধরে রাখার ক্ষমতা ডিভিসির থাকে না। বাধ্য হয়েই তাকে জল ছাড়তে হয়। এই সময় যদি আবার দ্বারকেশ্বরের অববাহিকা তেও বৃষ্টি হয় তাহলে সেই অনিয়ন্ত্রিত জলের সঙ্গে ডিসিসির ছাড়া জলযুক্ত হয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যেমনটি হয়েছিল ১৯৭৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০০০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, পিলিন এর সময় ৭ অক্টোবর এরকম বহু উদাহরণ আছে।

প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই প্রাকৃতিকভাবেই বেসিনের মত আকৃতির এই নিম্ন দামোদর এলাকা বিশেষ করে চতুর্দিকে নদীর বাঁধ দিয়ে যাকে আমরা আষ্টেপিষ্টে বেঁধে ফেলেছি সেখান থেকে বন্যাকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তবে একে নিয়ন্ত্রণ করতে কিছু ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করা উচিত।

প্রথমত, রূপনারায়ণের জল ধারণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে। নিচের দিক থেকে এর ড্রেজিং এর প্রয়োজন। বন্যা নেমে গেলে যাতে মাঠ বা সমতলের জল দ্রুত নদীতে পড়ে সেই উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে কিছু স্লুইজগেটের প্রয়োজন। কৃষি জমিতে জল ঢুকলে তা ক্ষতিকারক নয়, যদি তা দ্রুত নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই এলাকায় একবার জল ঢুকলে তা আর কিছুতেই বেরোতে চায় না। দ্বিতীয়তঃ ডিভিসির জলাধারের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে হবে। জল ধরে রাখা এবং ছাড়ার নির্দৃষ্ট রুপরেখার পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। ভুরডুইনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিভিসি যাতে বিপদসীমায় না গিয়েও দশ লক্ষ কিউসেক জল ধরে রাখতে পারে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। জলাধার গুলিকে পলি মুক্ত করতে হবে। শুধুমাত্র নদীর বাঁধ উঁচু এবং মজবুত করলেই বন্যা সমস্যার কোন সমাধান হবে না। বন্যার সময় এলাকার অভিজ্ঞ মানুষদের সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনের লোকজনদের খতিয়ে দেখতে হবে কোথায় কোথায় বন্যার কী পরিস্থিতি হচ্ছে। বিশেষ করে সড়ক পথগুলি যেখানে জল আটকে থাকছে বা বারবার ভাঙ্গার প্রবণতা সেখানে প্রয়োজনীয় কালভার্ট নির্মাণ করতে হবে।

স্লুইজগেট, কালভার্ট, ডুবোপোল ইত্যাদির মাধ্যমে জমা জল যাতে বেরিয়ে যায় তার ব্যবস্থা রাখতে হবে, অর্থাৎ পরিকল্পনামাফিক নদীকে কিছুটা মুক্তি দিতে হবে। নদী ভরাট করে যেখানে নদীকে সংকীর্ণ করা হয়েছে বিশেষত ইটভাটা ইত্যাদি জায়গায় নদীকে তার সীমানা ফিরিয়ে দিতে হবে। আঞ্চলিক কোন মাস্টারপ্ল্যান এর উপর নির্ভর না করে একটা সামগ্রিক পরিকল্পনার প্রয়োজন। বন্যা পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সক্রিয়তার প্রয়োজন আছে। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরী, বন্যা নিয়ন্ত্রণের নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস। জাতীয় স্তরে এই উদ্যোগ নিতে হবে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিকেও যুক্ত করে। তাহলেই নিম্ন দামোদর এলাকার ইতিহাস আবার নতুন করে লেখা হবে। সেই ইতিহাসে বন্যার সঙ্গে মিশবে না কোনো হতভাগ্যের চোখের জল বরং বন্যার পলি মাটিতেই গড়া হবে এই এলাকার মানুষের সৌভাগ্য।

আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “নিম্ন দামোদর অববাহিকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কিছু বাস্তব সমস্যা : দেবাশিস শেঠ”

  1. বেবী কারফরমা says:

    প্রতিবেদনটি পড়ে যেমন অনেক কিছু জানলাম তেমনি মর্মহত হলাম

  2. Navendu Samanta says:

    খুব সুন্দর। অনেক তথ্য পেলাম

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev