বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর জেলা ‘বাহের দ্যাশ’ নামে পরিচিত। এই এই অঞ্চল ‘বাহের দ্যাশ’ নামে পরিচিত হবার একটি কারণ আছে।, রংপুর অঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যে কাউকে সম্মোধনের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে ‘বাহে’ শব্দটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। আমাদের দেশে পূত্র বা পূত্রস্থানীয় কাউকে সম্মোধনের ক্ষেত্রে ‘বাবা হে’ কিংবা ‘বাপু হে’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। এ ধরণের সম্মোধন পদই রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় — বাবা-হে বা বাপু-হে থেকে ‘বাহে’ শব্দে রূপান্তর লাভ করেছে এবং কেবলমাত্র পূত্র বা পূত্রস্থানীয়দেরকেই নয় রংপুরের লোকসমাজে যে কাউকে সম্মোধনের ক্ষেত্রে এই ‘বাহে’ শব্দটির বহুল ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে। আর এই ‘বাহে’ সম্মোধনের ব্যাপক প্রয়োগ সূত্রেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের কাছে রংপুর অঞ্চলের পরিচিতি হয়ে উঠেছে ‘বাহের দ্যাশ’ নামে।
এই ‘বাহের দ্যাশ’ নামে পরিচিত রংপুর অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। তাদের দেশের লোকসংস্কৃতি বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গেলে তাদের জীবনযাপন আচার অনুষ্ঠান, সংগীত, ও শিল্প-সংস্কৃতির উপর আলোচনা করতে হয়।।
বাহের দ্যাশ’ নামে পরিচিত রংপুর অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির উৎসঃ
রংপুর অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি ও লোকসংগীতের মূল প্রবাহ রাজবংশী সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত হওয়ায় রাজবংশী ও তাদের সংস্কৃতির সম্বন্ধে জানতে হলে রাজবংশীদের পরিচয় জানতে হবে।
জানা যায়, মঙ্গোলীয় নৃ-গোষ্ঠী কোচ জাতির অংশ। ষোল শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কোচ রাজা হাজোরের বংশধরদের নেতা বিশুসিংহ তার গোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে আদিধর্ম ত্যাগ করে হিন্দু ধর্মগ্রহণ করেন। আর কোচ রাজবংশের সন্তান হিসেবে এরাই পরবতীর্তে রাজবংশী হিসেবে পরিচিতি পান।
অন্যদিকে রাজবংশীদের একটি অংশ ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে “কেওট রাজবংশী” নামে পরিচিতি পান। তবে রাজবংশীরা প্রধানত শিবভক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী। রাজবংশী জাতি পাহাড়, নদী, বন ও মাটিকেও উপাসনা করেন। এদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলো হলো : পাঁচকন্যা পূজা, বিষহরি পূজা, বেষমা পূজা, খরা-অনাবৃষ্টি কাটাতে হুদুমা পূজা, ব্যাঙ্গের বিয়ে প্রভৃতি। হিন্দু ধর্মাবলম্বী রাজবংশীরা নিজেদেরকে হিন্দু পৌরণিক কাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে নিজেদের অভিজাত শ্রেণির অন্তর্ভূক্ত করার চেষ্টা করে।
এই জাতিগোষ্ঠীর শিববংশী, পলিয়া, দেশী, জলপাইগুড়ি রাজবংশী, পাহাড়ি রাজবংশী, তোঙ্গিয়া রাজবংশী, খোপ্রিয়া ও গোব্রিয়া নামের পরিচয় পাওয়া যায়।
রাজবংশীরা দেখতে খর্বকায়, লম্বা, চ্যাপ্টা ও তীক্ষ্ণ নাক, উচু চোয়াল বিশিষ্ট এক মিশ্র জনগোষ্ঠী। বাঙালিদের ন্যায় রাজবংশীদের সংকর জাতি বললে অত্যুক্তি হবে না। এদের প্রধান পেশা কৃষি। এদের মধ্যে মৎসজীবীও রয়েছে। ইসলাম ও হিন্দু র্ধমগ্রহণের পূর্বে রাজবংশীদের সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক, বর্তমানে তা পিতৃতান্ত্রিক প্রথা অনুসরণ করছে।

আদি রাজবংশী (পাহাড়ি) পুরুষরা কোমরে নেংটি এবং নারীরা কোমরে লম্বা ঝুলের কাপড় ব্যবহার করতো কাঁচুলি নামে বক্ষ বন্ধনী ব্যবহার করতো। এই জাতিগোষ্ঠী সমতলে নেমে আসার পর থেকে বাঙালিদের প্রভাবে ধুতি ও শাড়ি পড়া শুরু করেন। তবে এক সময় এই রাজবংশী নারীরা হাতে বোনা মোটা ধরনের চার হাত দৈঘ্য ও আড়াই হাত প্রস্থের ’ফতা’ নামের বিশেষ পোশাক পরিধানে করতো। এই ’ফতা’ নামের পোশাক বহু বর্ণ রঞ্জিত থাকতো। এই রাজবংশী মেয়েরা কাঠ ও মাটির গহনা ব্যবহার করতো। বাঙালিদের সান্নিধ্যে আসার পর রাজবংশী মেয়েরা ধাতব গহনা ব্যবহার শুরু করেন।.
এই রাজবংশী জাতিগোষ্ঠী আনন্দ প্রিয়। রাজবংশীরা পূজা পার্বনে বিভিন্ন ধরনের নৃত্য ও সংগীত পরিবেশন করেন। তাদের এই নৃত্য ও সংগীত পরিবেশন আদিবাসীসুলভ। সমতলে আসার আগে রাজবংশীরা তাদের গানে ধামামা ও বাঁশী বেশি ব্যবহার করতো। তবে বর্তমানে তাদের নৃত্য ও সংগীতে দোতারা ও সারিন্দা ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।
রাজবংশী সম্প্রদায়ের গীত ভাওয়াইয়া গানের নায়ক মাহুত, মৈষাল বন্ধু, বাউদিয়া, চেংড়া বন্ধু, সাধু (স্বামী বা বন্ধু) বৈদ্য, রাখাল প্রমুখ। অধিকাংশ ভাওয়াইয়ায় নারীর অভিব্যক্তিতে এসব নায়কদের সম্বোধন পাওয়া যায়। তবে পুরুষের অভিব্যক্তি যে নেই তা নয়। যেমন—
ও মোর সোনার কইন্যারে
ও মোর গুণের কইন্যারে
আজি আশা দিয়া ভাসালু মোক
অকূল সাগরে।
আগেই বলা হয়েছে, রংপুর জেলার লোকসংস্কৃতির মূল প্রবাহ রাজবংশী সংস্কৃতি। এই জনপদের বিপুল জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক জীবনে আছে বর্ণময় ও বৈচিত্র্যময় রুপ। রংপুর জেলার লোকনাটক, লোকসঙ্গীত, লোকছড়া, লোকপ্রবাদ-প্রবচন, লোকধাঁধা, লোকাচার, লোকদেবতা, লোকপোষাক, লোকখাদ্য, লোকপুরাণ, লোকধর্ম, লোকনৃত্যসহ লোকসাহিত্যের বিভিন্ন উপাদানে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় স্থান পেয়েছে এই অঞ্চলের মানুষের যুগযুগান্তরের ভাবনা ও আবেগ। রংপুর জেলার লোকসাহিত্যের এইসব বৈচিত্রময় উপাদপান যথাযথভাবে সংগ্রহ করতে পারলে উঠে আসবে এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ও লোকসংস্কৃতির বর্ণময় রুপ। লোকসাহিত্য লোকায়ত জীবন ও মানসেরই প্রতিচ্ছবি। যে কোন ভাষার প্রবহমান প্রাণশক্তিকে ধারণ করতে পারে কেবল সিলেবলিক ছন্দ, সুর, তাল, লয় সমৃদ্ধ লোকসঙ্গীতগুলো। কেননা সাধারণের প্রয়োজনে স্বতস্ফূর্ত এক ছন্দে রচিত হয়েছিল এ লোকসঙ্গীত গুলো। ছন্দের এই স্বতস্ফূর্ততাই লোকসঙ্গীতগুলোকে করেছে যুগোত্তীর্ণ। তাছাড়া গভীর কোন ভাবার্থ নয়, লোকসঙ্গীতের বিষয় হচ্ছে জীবনের আনন্দ। জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে এ আনন্দ পরিবেশিত হয়। আনন্দের এই সার্বজনীনতা রংপুরের লোকসঙ্গীতকে ছড়িয়ে দিয়েছে সর্বত্র এবং এর মধ্যে প্রবেশ করেছে বর্ণিল বৈচিত্র্য্য। লোকসঙ্গীত একটা স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে লোকসাহিত্যে। এ অঞ্চলের সিংহভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে কৃষিক্ষেত্রে লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া আর কিষাণি গানে প্রভাব পড়েছে বেশি। এ অঞ্চলের অনেক মানুষের একদিকে নদনদী জীবিকার উৎস হলেও অপরদিকে নদী তীরবর্তী সিংহভাগ মানুষের জীবনে তা মূর্তিমান অভিশাপ। লোকসঙ্গীতে নদনদীর এই অভিশাপের প্রভাব লক্ষণীয়। এ ছাড়া এ অঞ্চলের ঐতিহ্য লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া প্রধান আকর্ষণ ও আনন্দ হলেও এর পিছনে উঠে এসেছে স্বপ্ন ভঙ্গ ও বেদনার কথা। সেই বেদনা অন্তরের গভীরে গোপন রেখে এই অঞ্চলের মানুষ লোকসঙ্গীত, ভাওয়াইয়া, রাখালী আর কিষাণি গান গায় অবলীলায়। খেতে খামারে কৃষি কাজে এবং অবসরে উঠানে বসে লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া, রাখালী আর কিষাণি গানের আসর জমিয়ে তোলে গায়কেরা। এ অঞ্চলে ভাওয়াইয়া গান ছাড়াও পালা গান, কেচ্ছা বন্দি গান, রাজা মানিক চাঁদ, গুপিচাঁদ. রাজমাতা ময়নামতির স্মৃতিমাখা গানেও তারা জমিয়ে তোলে খেত খামার কিংবা উঠানের আসর। বর্ষাকালে নদনদীতে পানি ভরে উঠলে নৌকা বাইচে সারি গান আর জারি গান তাদের মহাবিষ্ট করে। এমনো এক সময় ছিল সারা রাত জেগে শুনতো জাগের গান, পালাগান, যোগীর গান, মোনাই যাত্রা, ভাসান যাত্রা, কৃষ্ণলীলা, বেহুলা ও বালা লক্ষ্মীন্দরের গান, মলিশী, ও ছোকরা নাচের গান। এ অঞ্চলের সেই সব সংস্কৃতি আজ কালের বিবর্তনে বিলুপ্ত প্রায়।

রংপুর জেলাকে বৃহত্তর বঙ্গপ্লাবন ভূমির অংশ মনে করা হয়। কিন্তু ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর গঠন দেশের অন্যান্য জেলা থেকে আলাদা। এ জেলার ভূগঠন অতীতে উত্তরাঞ্চল প্রবাহমান কয়েকটি নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং ভূকম্পনজনিত ভুমি উত্তোলনের সাথে জড়িত। তিস্তা নদীর আদি গতিপথ পরিবর্তন ছিল রংপুর জেলার ভূমি গঠনের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা নদী ১৭৮৭ সালের পূর্বে গঙ্গানদীর একটি উপনদী ছিল। তিস্তা সিকিম বা হিমালয়ে পরিচিত রাংগু ১৭৮৭ সাল পর্যন্ত দিনাজপুর জেলার নিকট আত্রাই এর সাথে মিলিত হয় নিম্ন গঙ্গা নদীতে পতিত হতো। ১৮শ শতকে তিস্তা, আত্রাই নদীর পথ ধরে গঙ্গা ও বিছিন্ন কিছু খাল বিলের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র, উভয়কিছু নদীর সাথে ঋতু ভিত্তিক সংযোগ করত। অপর নদী ধরলা তিস্তা থেকে নিম্ন হিমালয় অঞ্চল বৃহত্তর রংপুর জেলার পূর্ব দিক দিয়ে (বর্তমান কুড়িগ্রাম) ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে। ঘাঘট এ জেলার অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ নদ। ঘাঘট তিস্তার গর্ভ থেকে উৎপন্ন হয় রংপুর জেলার মধ্য দিয়ে দক্ষিণে গাইবান্ধা জেলা অতিক্রম করে করতোয়া নদীতে পতিত হয়। আত্রাই নদী এ সময় করতোয়া ও গঙ্গার মধ্যে সংযোগ রক্ষা করত।
রংপুরের লোকসাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতে হয়।
‘লোক’ কোন ব্যাক্তি মানুষ নয়, গোষ্ঠী মানুষ। পল্লীর সহজ, সরল, সাধারণ মানুষের সাহিত্যই লোকসাহিত্য। লোকসাহিত্য মৌখিক সাহিত্য। রংপুরের পল্লীর সহজ, সরল, সাধারণ মানুষের মতোই লোকসাহিত্য সহজ, সরল, অনাড়ম্বর ও আধুনিক হেঁয়ালি বর্জিত। রংপুরের বিপুল জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক জীবনে আছে বর্ণময় ও বৈচিত্র্যময় রুপ। রংপুর জেলার লোকনাটক, লোকসঙ্গীত, লোকলোকসঙ্গীত, লোকপ্রবাদ-প্রবচন, লোকধাঁধা, লোকাচার, লোকদেবতা, লোকপোষাক, লোকখাদ্য, লোকপুরাণ, লোকধর্ম, লোকনৃত্যসহ লোকসাহিত্যের বিভিন্ন উপাদানে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় স্থান পেয়েছে এই অঞ্চলের মানুষের যুগযুগান্তরের ভাবনা ও আবেগ। রংপুর জেলার লোকসাহিত্যের এইসব বৈচিত্রময় উপাদপান যথাযথভাবে সংগ্রহ করতে পারলে উঠে আসবে এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ও লোকসংস্কৃতির বর্ণময় রূপ। লোকসাহিত্য লোকায়ত জীবন ও মানসেরই প্রতিচ্ছবি।
ভাওইয়া গান উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষের হৃদয়ের অনুপম মাধুর্যে ঋদ্ধ ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতধারার নাম ভাওয়াইয়া। লোকসাহিত্যের অপরাপর শাখার মতো লোকগীতি ভাওয়াইয়াও মৌখিক সাহিত্য এবং সংহত সমাজের সামগ্রিক সৃষ্টি। পল্লীবাসীর মুখেমুখেই এর রচনা, মুখেই প্রচার এবং লোকায়ত মানুষের স্মৃতিই এর কালানুক্রমিক বাহক। ভাওয়াইয়া গানে উত্তর জনপদের অন্তর্জীবনে নিহিত প্রেম-প্রীতি, আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্ন-সাধের বিচিত্র ভাবাবেগ ও মর্মানুভূতি স্পন্দিত হয়।
এই ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতধারার মধ্যে উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষের চিরায়ত মিলন-পিপাসা ও বিরহময়তার অনিবার্য সুরও ধ্বনিত হয় নান্দনিক ভঙ্গিতে। যাপিত জীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা ও মৃত্তিকালগ্ন মানুষের বিচিত্র জীবন-ভাবনার স্পর্শে ভাওয়াইয়া গান হয়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গের জীবনচর্যার অনবদ্য বাহন।
বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, পশ্চিম দিনাজপুর ও কোচবিহার ভাওয়াইয়া গানের লালনভূমি। ভাওয়াইয়া গানে মূলত প্রেমস্পর্শ-কাতর নারীমনের প্রচ্ছন্ন বেদনার ভাবই অভিব্যক্ত হয়। ‘বিরহই প্রেমের সর্বোত্তম অংশ, বিধায় ভাওয়াইয়া গানের মধ্যে বিরহ ও অতৃপ্তির যে মর্মভেদী দীর্ঘ নিঃশ্বাস শুনতে পাওয়া যায়, তা-ই এই সঙ্গীতকে এক অনবদ্য বেদনা-মধুর রসরূপ দিয়েছে।’

‘ভাব’ থেকে ‘ভাওয়াইয়া’ শব্দের উৎপত্তি বলে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়।
ভাওয়াইয়া গানের অপূর্ব ভাষা ছন্দ ও সুরের মেলবন্ধন বুঝতে হলে এখানে দুই একটা অতি জনপ্রিয় ভাওয়াইয়া গান তুলে ধরা যেতে পারে।
পতিধন মোর দূর দ্যাশে
মৈলাম পৈল কালা চিকন ক্যাশে রে’
আবার গরুর গাড়িতে করে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি যাওয়ার পথে:
‘ওকি গাড়িয়াল ভাই
কত কান্দিম মুই নিধুয়া পাথারে’,
দীর্ঘ সুরের ভাওইয়ায় অনুরাগ, প্রেমপ্রীতি ও ভালোবাসার কথা ব্যক্ত হয়। ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘কোন দ্যাশে যান মইশাল বন্দুরে’, ‘নউতোন পিরিতির বড় জ্বালা’ অধিক সমাদৃত।
বাবার বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়ি যাওয়ার পথে আপন-জনদের ছেড়ে যাওয়ার ব্যাকুলতায় ব্যাকুলিনী বধুর মুখে উচ্চারিত:
‘আস্তে বোলাও গাড়ি রে গাড়িয়াল
ধিরে বোলাও গাড়ি
আরেক নজর দ্যাখিয়া নেও মুই
দয়াল বাবার বাড়ি —’
প্রোষিতভর্তৃকার বিচ্ছেদের বেদনা এই অতি জনপ্রিয় এই গানটিতে ব্যক্ত হয়েছে। জীবনসঙ্গীকে জীবিকার সন্ধানে দূরদেশে যেতে হয়। তার প্রত্যাগমনকালের অনিশ্চয়তায় নারীর হৃদয় ভারক্রান্ত হয়ে ওঠে।
ওকি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে।
ওকি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে।
***
যেদিন গাড়িয়াল উজান যায়
নারীর মন মর ছুইরা রয় রে …
***
যেদিন গাড়িয়াল উজান যায়
নারীর মন মর ছুইরা রয় রে ..
ওকি গাড়িয়াল ভাই…
হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারির বন্দরে রে
***
আর…কি কব দুস্কের ও জ্বালা…
গাড়িয়াল ভাই
গাঁথিয়াছি কনমালা রে…
আর…কি কব দুস্কের ও জ্বালা…
গাড়িয়াল ভাই
গাঁথিয়াছি কনমালা রে…
***
ওকি গাড়িয়াল ভাই…
কত কাঁদি মুই নিথুয়া পা’থারে রে …
***
ওকি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে
ওকি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে
আরেকটি অতি জনপ্রিয় ভাওয়াইয়া গান এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। এই গানটিতে নারীর মনের বেদনা কিভাবে বিবৃত হয়েছে আপনারা অনুধাবন করবেন।

জীবনসঙ্গীকে জীবিকার সন্ধানে দূরদেশে যেতে হয়। তার প্রত্যাগমনকালের অনিশ্চয়তায় নারীর হৃদয় ভারক্রান্ত হয়ে ওঠে। তখন জীবনসঙ্গীর কাঁধের সামান্য গামছাখানি তার কাছে মহামূল্য স্মৃতিচিহ্নের রূপ নেয় :
ওকি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে,
কোন্ দিন আসিবেন বন্ধু
কয়া যাও কয়া যাও রে।
যদি বন্ধু যাবার চাও
ঘাড়ের গামছা থুয়্যা যাওরে।
বট বৃক্ষের ছায়া যেমন রে,
মোর বন্ধুর মায়া তেমন রে।
সংস্কৃতি জগতের এক কিংবদন্তীর নাম আব্বাস উদ্দীন। যার সুনাম ভাওয়াইয়া জনক হিসেবে। তিনি উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গানকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন। তিনি নিজেও ভাওয়াইয়া গান রচনা করেছেন এবং এবং তাঁর শিষ্যদেরকে ভাওয়াইয়া গান শিখিয়ে বিশেষ অবদান রেখেছেন।
লোকসংস্কৃতির একটি বিশিষ্ট ও সবচেয়ে সমৃদ্ধ ধারা হচ্ছে লোকসাহিত্য। আমাদের লোকসাহিত্য তথা সামগ্রিকভাবে লোক-ঐতিহ্যের ভান্ডার অত্যন্ত ঋদ্ধ। লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ফুটে ওঠে জাতির সামগ্রিক আত্মপরিচয়। জাতীয় জীবনের ইচ্ছা ও প্রত্যাশাকে প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি। জাতির সমগ্র মানসন্ডপ্রবণতা, জীবনধারা, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবনের জন্যে তাই লোকসাহিত্যের চর্চা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রংপুরের লোকসাহিত্যে শিল্পসৌন্দর্য, রস ও আনন্দবোধের ঘাটতি নেইা। লোকসাহিত্য লোকসংস্কৃতির একটি জীবন্তধারা, এর মধ্য দিয়ে জাতির হৃদয়ন্ডস্পন্দন শোনা যায়। অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের প্রেরণা বাঙালি লোকসাহিত্যের মর্মদর্শন থেকে পেয়েছে। রংপুরের লোকসাহিত্য কোনো ব্যক্তিবিশেষের সৃষ্টি নয়, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মিলিত সাধনা ও কর্মপ্রয়াসের সোনালি ফসল। রংপুরের অতুল বৈভবমন্ডিত লোকসাহিত্যের দিকে তাকালে মুগ্ধ ও বিস্মিত হতে হয়। লোকসঙ্গীত, লোকলোকসঙ্গীত, গীতিকা, লোকাহিনী, লোকনাট্য, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধাঁ প্রভৃতি শাখায় বিভক্ত রংপুরের লোকসাহিত্য।
এই অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির কথা বলতে গিয়ে খেলাধুলার কথা বলতে হয়। এই অঞ্চলের খেলাধুলা স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল।
এই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সাথে জড়িয়ে আছে যে খেলাগুলোর তার মধ্যে অন্যতম হল — হাডুডু, কাবাডি, লাঠি খেলা, দাঁড়িয়া বান্ধা, গোল্লাছুট, এক্কা-দোক্কা, বউ-ছুট, লুকোচুরি, চেংকুডারা বা চেংগু-পেন্টি, তরবারি খেলা, পাতা খেলা, গুড্ডি বা ঘুড়ি উড়ানো খেলা, কেরাম খেলা, নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড়, ফুটবল, আটকোটা, উরূণ-গাইন, লুডু, পিংপং, পিন্টু-পিন্টু, লুকোচুরি প্রভৃতি। নিজস্ব ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই খেলাগুলো এ অঞ্চলের মানুষের একদা শরীর চর্চা ও আনন্দ বিনোদনের মাধ্যম ছিল।
তথ্যসূত্র : ১) উইকিপিডিয়া ২) বাহের দ্যাশের লোকসংস্কৃতি পরিচিত আনওয়ারুল ইসলাম রাজু, ৩) লোকসংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশ ড. আনোয়ারুল করীম, ৪) রংপুরের ভাওইয়া গান : ইউটিউব এবং পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত, ৫) বৃহত্তর রংপুরের লোকসঙ্গীত” — মিটন আলম, ৬) উত্তরবঙ্গের ‘ভাওয়াইয়া’ : মাখন চন্দ্র রায়, ৭) আব্বাস উদ্দিন রচিত ও গাওয়া ভাওয়াইয়া গানের কথা: পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত
মনোজিৎকুমার দাস, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।