| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

রাজভিখারীর খাওয়া দাওয়া : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী

Reporter
মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী / ৬৮৯ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ৩ মার্চ, ২০২৪

“যে রান্নাটা ভালো করতে পারে না, সে কখনও পাকা সাধু হতে পারে না।”

সন্ন্যাসীদের সম্পর্কে সকলের মাত্রাতিরিক্ত প্রত্যাশা থাকে। আমাদের সকলেরই থাকে। যেমন সন্ন্যাসী হবেন সর্বত্যাগী, তাঁদের খিদে, তেষ্টা থাকবে না। থাকলেও অনায়াসে দমন করতে পারবেন… ইত্যাদি ইত্যাদি। এই প্রত্যাশা সম্বন্ধে স্বামীজী হরিপদ মিত্রকে বলেছিলেন,

“তোমরা মনে কর, কেউ সন্ন্যাসী হলেই, তার ঈশ্বরের মতো ত্রিগুণাতীত হওয়া চাই। সে পেট ভরে খেলে দোষ, বিছানায় শুলে দোষ, এমনকী জুতো বা ছাতি পর্যন্ত তার ব্যবহার করার জো নেই। কেন তারাও তো মানুষ, তোমাদের মতে পূর্ণ পরমহংস না হলে তার আর গেরুয়া বস্ত্র পরবার অধিকার নেই — এও ভুল। ”

স্বামীজী খেতে, খাওয়াতে এবং রাঁধতে ভালবাসতেন।রান্না নিয়ে নানা এক্সপেরিমেন্ট করতেও ভালবাসতেন। অবশ্য সবসময় সেই এক্সপেরিমেন্ট যে সফল হতোই এমনটা নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাল রান্নাই তিনি করতেন। তবে অসম্ভব ঝাল খেতেন, তাই বিদেশে থাকাকালীন রান্না করতে গেলে তাঁর বিদেশী শিষ্যবর্গ একটু ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতেন। কারণ ঝাল খাবার অভ্যাস বিদেশীদের তৈরি হয়নি। এত লঙ্কা খাবার প্রসংগে তিনি উত্তর দিতেন এই যে – পরিব্রাজক ব্রত নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় অর্ধেক দিন খেতে পান নি, অথবা শুধু বুড়ো আঙুল টাকনা দিয়ে ভাত খেতে হয়েছে। তাই ঐ লঙ্কা টাকনা দিয়ে খাওয়া তাঁর অভ্যাস হয়ে গেছিল। আসল কথা তিনি ঝাল পছন্দও করতেন। হালকা রান্না তাঁর কোনদিনই পছন্দের ছিল না। বড় বাড়ির আদরের সন্তান তিনি। ঠাকুর, চাকর, বাবুর্চি সবই ছিল একসময়। পিতা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন পাকা রাঁধুনি। সুতরাং তিনি যে আঝালা মশলাহীন খাবার পছন্দ করবেন না, এটাই তো স্বাভাবিক। কালের নিয়মে বা নিয়তির পরিহাসে তাঁদের আর্থিক অবস্থা নিদারুণ খারাপ হয়ে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে যেদিন বুঝতে পারতেন ঘরে পর্যাপ্ত খাবার নেই, সেদিন মাকে মিথ্যা কথা বলে বেরিয়ে যেতেন যে তাঁর নেমতন্ন আছে। তারপর রাস্তায় রাস্তায় ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়ানো, রাস্তার কলের জলে পেট ভরানো।

তাঁর কষ্টের প্রসঙ্গ বরং থাক। তিনি যে আনন্দ নিয়ে খাওয়া দাওয়া করতেন সেই প্রসঙ্গে আসা যাক। স্বামীজী ফল ভালবাসতেন। স্বামী ধীরানন্দের লেখা পড়ে জানা যায় নেয়াপাতি ডাবের ভেতরে চিনি দিয়ে সেই ডাবের খোলে বরফ ঢুকিয়ে দিয়ে খেতে ভালবাসতেন স্বামীজী। এমন কি বাচ্চা ছেলের মত ধীরানন্দের কাছ থেকে এঁটো ডাব ‘আমায় একটু দে না’ বলে চাইছেন। আসলে তাঁকে আমরা ভগবান বানিয়ে ফেলে এত উচ্চাসনে বসিয়ে রেখেছি যে সবকিছু স্বাভাবিক ব্যাপার থেকে তাঁকে আলাদা করে আমাদের দেখা চাইই চাই। আরে বাপু! তিনি এ জগত ত্যাগ করেছেন মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সে। যে বয়সে এখন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা বিয়ের পিঁড়িতে বসছে। কিন্তু তিনিও তো আর পাঁচটা মানুষের মতোই ছিলেন। বয়েসটা নেহাতই অল্প ছিল, জ্ঞানের কথা বলছি না। কিন্তু ওই যে অন্য সন্ন্যাসীদের কাছে এঁটো চেয়ে খাওয়া, এটা কি খুব আশ্চর্যের?

গ্রীষ্মকালীন ফলের মধ্যে পছন্দ করতেন তরমুজ। জাগুলিয়ায় ভগ্নী মৃণালিনী বসুর বাড়িতে ছিলেন কিছুদিন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে। ফিরে আসার সময় বোন এক ঝুড়ি কালো জাম দিলেন। মঠে এসে স্বামীজী বললেন, “আগে সব জামগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে রস করে ফেল।” তারপর কতগুলো বোতল সাফ করে রস অনেকগুলোতে ভরা হল। ছিপি এঁটে বেশ মজবুত করে দড়ি দিয়ে মুখগুলো বাঁধতে বললেন। পাঁচ – সাতদিন রোদ্দুর খাওয়ানো হল। তারপর সিঁড়ির নীচে কুঠুরিতে রেখে আসা হল। তারপর একদিন তিনি চায়ের টেবিলে বসে আছেন। হঠাৎ দুম করে একটা আওয়াজ সকলের কানে এল। স্বামীজী বললেন, “দ্যাখ, দ্যাখ – বোতল ফাটলো বুঝি” — বাস্তবিক তাই। ফারমেন্ট হয়ে রস তেজী হওয়ার দরুণ একটা বোতল ওইরূপ ফেটেছিল। স্বামীজী বললেন, “এই শিরকা। ভারী হজমি।”

স্বামীজী, তাঁর গুরু এবং গুরু পত্নী সকলেই ছিলেন পেটরোগা। স্বামীজী প্রথমদিকে খুবই সবল ছিলেন ঠিক কথা, কিন্তু পরিব্রাজক জীবন শুরু হওয়ার পর তিনিও ডিসপেপসিয়ায় ভুগতে শুরু করেন। একদিনে বিশ বাইশবার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হত তাঁকে। এ নিয়ে বিব্রত হতেন তিনি। জাহাজে যাবার সময় এই অসুখ থেকে কিছুটা নিরাময় হয়েছিল তাঁর চিঠিতে জানা যায়। যিনি প্রথম জীবনে সবকিছু খেতে ভালবাসতেন, পরের দিকে রাস্তার চপ, সিঙারা, তেলেভাজা একেবারে ত্যাগ করেছিলেন। বাঙালির জিভের কন্ট্রোল নেই বলেই ওইসব খাবার খেয়ে বাঙালি রোগে আক্রান্ত হয় একথাও বলেছেন। অথচ নরেনের বাল্যবন্ধু রাখাল, যিনি পরবর্তী কালের স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজ, তিনি ছেলে বয়সে কুস্তির আখড়া থেকে সোজা নরেন্দ্রর বাড়িতে চলে আসতেন। মহেন্দ্র নাথ দত্তের লেখা পড়ে জানা যায় যে — ‘সন্ধ্যার সময় রাখাল এসে এক ঠোঙা কচুরি, সিঙারা, আলুছেঁচকি ও দু’ একটা মিষ্টান্ন খেতো। একে জোয়ান ছেলে, তার উপর আবার কুস্তি লড়ে আসতো, এইজন্যে সে আধসের খাবার খেত। তখন খাবারের দর ছিল ছ’আনা সের।’ খাবার খাওয়ার ক্ষমতা ও খাবারের মূল্য অনেকটা বিস্ময় জাগায় এই যুগে দাঁড়িয়ে। এখন মানুষের খাবার পরিমাণ কমেছে আর খাবারের মূল্য হয়েছে আকাশ ছোঁয়া।

সেই সময়ের সিমলেপাড়ার বাজারে একটি লোক ধোঁকা বিক্রি করত। সে নাকি এমন তার স্বাদ যে কেউ ওরকম ধোঁকা তৈরি করতে পারত না। দত্ত পরিবারের ছোট ছেলেদের ভীষণ প্রিয় ছিল এই ধোঁকা। অবশ্যই এই বালকদের দলে বিশ্বজয়ী বিবেকানন্দও থাকতেন। তখন তিনি শুধুই ‘বিলে’। এই ধোঁকার স্মৃতি এতই মধুর ছিল যে বহু বছর পরে যখন সকলে সন্ন্যাসী হয়েছেন সব ত্যাগ করে, তখনও ওই ধোঁকার কথা, তার স্বাদের কথা আলোচনার মধ্যে স্থান করে নিয়েছে।

অসুস্থ ঠাকুরকে কালীমায়ের প্রসাদী মাংসের স্যুপ পথ্য হিসেবে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। স্যুপ খেয়ে তাঁর যে দুর্বলভাব একটু কেটেছে সেকথা তিনি নিজেই বলেছেন। তবে দিনে ভাতের গলা মণ্ড ও ঝোল, আর রাতে সুজির পায়েস বা ভার্মিসেলি সিদ্ধ বা দুধ, এই ছিল তাঁর খাদ্য। তাও বেশির ভাগ দিন সেটুকুও খেতে পারতেন না ঠাকুর। নরেন ওই সময় তাঁর গুরুকে খাইয়ে দিতেন।

মাংস খেতে ভয়ানক ভালবাসতেন নরেন। হোটেলে গিয়ে তখনকার দিনে নিষিদ্ধ মুরগির মাংসও তিনি খেয়েছেন। লোকে ঠাকুরের কান ভারি করার চেষ্টা করেছে নরেনের নামে এই বলে যে — ও অখাদ্য কুখাদ্য খায়, অস্থানে কুস্থানে যায়। ঠাকুরের মন এসব কথায় টলেনি। বরং যারা এসব বলেছে তাদের তিনি তাড়িয়ে দিয়েছেন এই বলে যে — নরেন যাই খাক সে শুদ্ধই থাকবে, আর তোরা যদি রোজ হব্বিষ্যিও করিস তোদের উন্নতি হবে না। ঠাকুর নরেনকে জ্বলন্ত আগুনের সঙ্গে তুলনা করতেন। আগুনে যেমন যাই পড়ুক সব শুদ্ধ হয়ে যায়, তেমনি নরেন্দ্র যে খাদ্যই গ্রহণ করুক না কেন তাতে কোন দোষ নেই।

স্বামীজীর দুটি নেশাও ছিল সাংঘাতিক। এক চায়ের নেশা, দুই তামাকের নেশা। কাশীপুরে হুটকো গোপাল বড় কেটলিতে করে চা আনলেন আর শশীমহারাজ বিখ্যাত ফাগুর দোকানের গুটকে কচুরি, লুচি আর আলু চচ্চড়ি আনালেন। সবাই মিলে আনন্দ করে খেলেন। তবে চায়ের নেশা অন্য গুরুভাইদেরও হয়েছিল। ঠাকুরের তিরোধানের পর ওই বিষাদের রাতে সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি কারো। কিন্তু দরমা জ্বালিয়ে চা তৈরি করে সব গুরুভাইদের ঢকঢক করে খাওয়া হল। তাই অনেক পরে শরৎ মহারাজ বলেছিলেন শিবরাত্রির দিন চা খাওয়া কেন চলবে না, যেখানে অমন শোকের দিনেও চা খেয়েছিলাম।সংসারের সব বন্ধন ছিন্ন হলেও স্বামীজীর চায়ের বন্ধন এতটুকু শিথিল হয়নি। বরানগর মঠে যুবক সন্ন্যাসীদের পেটে দানাপানি নেই কিন্তু শুধু জলে চা পাতা ফেলে ঢকঢক করে পান চলত। দুধ চিনি জুটত না। তামাকের কমতি ছিল না।

প্রিয় পুত্র সন্ন্যাসী হবার পর তাঁর মায়ের সংসারে কেমন রান্নাবান্না হচ্ছে দেখে নেওয়া যাক একটু কালের দরজায় উঁকি দিয়ে। মহেন্দ্রনাথের বর্ণনা অনুযায়ী — সময় সকাল এগারোটা। বাবুরাম মহারাজ উপস্থিত ভুবনেশ্বরীর বাপের বাড়ি ৭ নং রামকান্ত বসু লেন। ‘ভুবনেশ্বরী দেবী দোতলায় দরমার বেড়া দেওয়া একটা খোলার ঘরে বসে রাঁধছিলেন। তিনি বাবুরামকে বললেন ‘এসো বাবা, বসো — এই রাঁধছি, পেটে তো দুটো দিতে হবে।’ বাবুরামের উত্তর — ‘তা মা আমিও এখানে দুটো খাবো।’ নরেনের মা বললেন, ‘ভাত, ডাল আর চচ্চড়ি — আর কি রাঁধবো বলো?… তোমার মা এত বড় মানুষ, তাদের পঞ্চব্যঞ্জন ভাত। তা না খেয়ে তুমি এই শুকনো আলোচালের ভাত, একটু চচ্চড়ি খেতে চাচ্ছ কেন গা? ‘বাবুরাম উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপনার হাতের রান্না বড় পবিত্র, তাই আপনার কাছে আসি।’ আসলে গুরুভ্রাতার মাকে দেখতে আসাও একটা প্রধান কারণ।

বরানগরে অনাহারে, ভিক্ষার অন্নে নরেন্দ্রনাথের কঠিন পেটের অসুখ হল। বলরাম বসু তাঁকে নিজের বাড়িতে এনে সাগু, বার্লির ব্যবস্থা করলেন। দু-একদিন পর ভাত মাছের পাতলা ঝোল। কিন্তু রোগীর পথ্য নরেন্দ্রর আদৌ পছন্দ হল না। তিনি ঐ বাড়িতে ভাবিনী নামক এক বিধবা মহিলার কাছে রুটি আর কুমড়োর ছক্কা খেতে চাইলেন। মহিলা নরেনের অসুখের কথা কিছুই জানতেন না, তাই দিলেন। নরেন্দ্রনাথ পেটভরে খেলেন। এই খবরে বলরাম বসু খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। কিন্তু ঠাকুরের কৃপায় নরেন্দ্রনাথ এবার সুস্থ হয়ে উঠলেন।ঠাকুরের সন্তানরা যেমন উপোসে থাকতে পারতেন তেমনই পাহাড় প্রমাণ খেতেও পারতেন। স্বামী সারদানন্দ একবার বাবুরাম মহারাজের মায়ের ডাকে আমন্ত্রিত ছিলেন। তিনজন সাধুর নিমন্ত্রণ ছিল, কোন কারণে অন্য দুজন অনুপস্থিত। বাবুরামের মা তিনজনের মত রুটি কুমড়োর ছক্কা করেছিলেন। সারদানন্দ একাই তিনজনের খাবার খেয়ে শেষ করেছিলেন।

মাংস তো প্রিয় ছিলই। মাছের মধ্যে সবাই ভাবেন ইলিশ বুঝি স্বামীজীর সবথেকে প্রিয় ছিল। কারণ দেহাবসানের দিন ইলিশ তিনি নিজে কিনেছিলেন। বেশ কটি খেয়েও ছিলেন। তারপরের কথা সবার জানা। তবে দেড়েটোনের আদি বাড়ি, সিমলেপাড়ার ছেলের প্রিয় ছিল গলদা চিংড়ি। ঘটি যে! একথা ভুললে চলবে কেন? যদিও ঝাল খেতেন বাঙালদের মত। তবু ইলিশ চিংড়ির এটুকু ঝগড়া নাহয় রয়েই যাক। আমাদের এই প্রিয় সন্ন্যাসীটি পোলাও, মাংস, রামপাখির প্রিপারেশান, ইলিশ, চিংড়ি, রসগোল্লা, জিলিপি, জিবে গজা সব ভালবাসতেন। আবার দিনের পর দিন না খেয়েও বেঁচে উঠেছেন শুধুমাত্র মনের জোরে। রান্নায় নানান ইনোভেটিভ আইডিয়া আনতেন তিনি। বেলুড়ে একবার সরুচাকলির মতন কিন্তু সরুচাকলির মত এরকম কিছু একটা করে সকলকে খাইয়ে ছিলেন।

রাজস্থানের রেল স্টেশনে স্বামীজীকে তিনদিন অনাহারে কাটাতে হয়েছিল। বহু মানুষ আসতেন ধর্মকথা শুনতে কিন্তু কেউ জিজ্ঞাসা করেনি সন্ন্যাসী অভুক্ত কিনা। তৃতীয় দিনে ভয়ে ভয়ে যিনি তাঁর কাছে খাবার কথা জিজ্ঞেস করলেন, তিনি জাতে চামার। সেই চামারের হাতের ডাল রুটি নরেন্দ্রনাথের জীবন বাঁচিয়েছিল। সে দৃশ্য দেখে কেউ কেউ নিন্দা রটালেন। স্বামীজী তোয়াক্কাই করেননি।

হাতি চলে বাজার কুত্তা ভোকে হাজার।

জীবনের অনেকখানি সময় বিদেশে কেটে গেছে তাঁর। সেখানেও রান্না শিখেছেন। সকলকে খাইয়ে আনন্দ পেয়েছেন। বিদেশে থেকেও দেশ থেকে কাঁচা মুগের ডাল, ছোলার ডাল পাঠিয়ে দেবার জন্য পত্র লিখেছেন। ভুল হলে বকাবকি করে পত্রও দিয়েছেন। বিবেকানন্দর জোব্বা থেকে বেদ বেদান্ত যেমন বের হত, তেমনি নানান গুঁড়ো মশলা, আচার, চাটনি, ফোড়নও বের হত।

বিদেশে সারদানন্দ মহারাজকে গরম সুপ্যের পাত্র কিভাবে ধরতে হয়, কোন হাতে কাঁটা চামচ ধরতে হয় সব, কিভাবে খাবার মুখে তুলতে হয় সব হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন স্বামীজী। সকলের অলক্ষে শরৎ মহারাজের পা চেপে দিয়ে বলতেন, “ওরে ডানহাতে ধরতে নেই, ডান হাতে ছুরি ধরতে হয়, আর বাঁহাতে কাঁটা দিয়ে মুখে তুলতে হয়। অত বড় গরাস করে না, ছোট ছোট গরাস করবি। খাবার সময় দাঁত জিভ বার করতে নেই, কখনও কাশবি না। খাওয়ার সময় বিষম খাওয়া বড় দূষনীয়, আর নাক ফোঁস ফোঁস কখনও করবে না। ‘লন্ডনের একঘেয়ে খাবার খেয়ে মুখ বদলাতে নিজে রান্নাঘরে ঢুকে ঝাল ঝাল আলুর দম করতেন। আবার সেই রান্না মুখে দিয়ে বলতেন ‘যেন ধড়ে প্রাণ এলো।’. অর্থাৎ বিদেশর মাটিতে দেশের রান্না মিস করেছেন আর পাঁচটা বাঙালির মতই।

মিস কেমরিন মজার ছলে ঝগড়া করতেন স্বামীজীদের সঙ্গে। শরৎ মহারাজকে বলতেন ‘You Cooky Swami, Devil Swami। বলতেন – কেবল খাবে আর খেয়ে খেয়ে মোটা হবে… ইত্যাদি। একবার ওনাদের রান্না করা কচুরি আর আলুর চচ্চড়ি মুখে দিয়ে মিস কেমরিন ভয়ানক চিৎকার করে বলেছিলেন, “ওঃ কি ভয়ংকর জিনিস, গোলমরিচকে লঙ্কা দিয়ে রেঁধেছে!” রসিক গুডউইন প্রায়ই শরৎ মহারাজকে বলতেন, “দুষ্ট স্বামী, তুমি ধ্যান করো না, শুধু চোখ দুটি বুজে খাবার কথা ভাব।” ভারত থেকে পাঠানো হিং দেওয়া বড়ি খেয়ে রেগে বলেছিলেন, “এমন বদ-গন্ধওয়ালা জিনিস ভারতের লোকেরা খায়!”

“ছুঁয়োনা ছুঁয়োনা” করে ছুৎমার্গীর দল দেশটাকে

ঝালাপালা করছে।… তোদের যত কিছু ধর্ম এখন দাঁড়িয়েছে গিয়ে ভাতের হাঁড়ির মধ্যে! অপর জাতির ছোঁয়া ভাতটা না খেলেই ভগবান লাভ হয়ে গেল! শাস্ত্রের মহান সত্যসকল ছেড়ে কেবল খোসা নিয়েই মারামারি চলছে।”

“গরিবরা খাবার জোটে না ব’লে অনাহারে মরে, ধনীরা অখাদ্য খেয়ে অনাহারে মরে।”

“খিদে পেলে কচুরি জিলিপি খানায় ফেলে দিয়ে এক পয়সার মুড়ি কিনে খাও — সস্তাও হবে, কিছু খাওয়াও হবে।”

“যাকে ধরে হাঁটাতে হয়, খাওয়াতে হয়, সেটা তো জীবন্ত রোগী, সেটা তো হতভাগা।”

“যে একদমে দশক্রোশ হাঁটতে পারে না সেটা মানুষ না কেঁচো?”

মায়াবতীতে স্বামী বিরজানন্দজীকে বলেছিলেন, “অত কষ্ট করে শরীরটাকে মাটি করিসনি। আমরা শরীরটাকে বেজায় কষ্ট দিয়েছি। তার ফল কি হয়েছে? না জীবনের যেটা সবচেয়ে ভাল সময়, সেখানটায় শরীর গেল ভেঙে, আর আজ পর্যন্ত তার ঠেলা সামলাচ্ছি।”

লেখাটা শেষ করি তাঁরই কথা দিয়ে

“যখন সন্ন্যাসী হই, তখন বুঝে সুঝেই এপথ বেছে নিয়েছিলাম। বুঝেছিলাম অনাহারে মরতে হবে। তাতে কি হয়েছে? আমি তো ভিখারি।”

আমরা মানুষ না কেঁচোয় পরিণত হয়েছি সেটা বোঝার বোধও আমাদের নেই, কারণ কেঁচোর মস্তিষ্ক থাকে না। আর যিনি আসলে রাজভিখারি, যাঁকে সর্বস্ব দিয়ে দিলে সেটাই স্বর্ণ হয়ে ফেরত আসবে সেটা বোঝার মত ক্ষমতাও আমাদের নেই। তাই আমরা কিপটে হয়ে একটি দুটি চালের দানা তাঁকে দিয়ে থাকি। দিনের শেষে ওই দু-একটি চালের দানার মধ্যে সোনা চিকচিক করতে দেখে লোভে মরি — কেন সবটুকু তাঁকে দিলুম না বলে। আসলে রাজভিখারিকে আমরা কোনদিনই চিনে উঠতে পারলাম না। ওই, কেঁচোর কি মস্তিষ্ক থাকে!

তথ্যঋণ : স্বামী গম্ভীরানন্দ, স্বামী সারদানন্দ, শ্রী শ্রী মায়ের কথা, শ্রী মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়

আপনার মতামত লিখুন :

4 responses to “রাজভিখারীর খাওয়া দাওয়া : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী”

  1. মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য says:

    মুগ্ধ হলাম।

  2. Sarbani Putatunda says:

    Really very interesting. To learn something about Swamiji you have to realize him in totality. Your write up has been an effort to unveil him as a person. ????????

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev