বেশি ফলন ?
অনেক কৃষকই গর্ব করে বলেন বিঘায় (৩৩ শতক) ২২ মন ধান উৎপাদন হয়েছে। তখন কিন্ত বলা হয়না কত টাকার রাসায়নিক সার, বিষ, সেচ প্রয়োগ করা হয়েছে। খরচ অনুপাতে আয় কত? প্রতি কেজি সার পিছু কত কেজি ফলন হয়? এর জন্য প্রকৃতির ক্ষতি কতটা হয়? কে এই ক্ষতির দায় নেবে? কিভাবে প্রকৃতির ভারসাম্য ফিরবে?
মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে শুধু বেশী ফলনের কথা। বৈজ্ঞানিক কৃষির নামে ফসলের পুষ্টিগুন, বিরুপ পরিবেশে মানিয়ে চলার ক্ষমতা, মেয়াদ, চাষের খরচ, ছিটিয়ে বোনা ধানের সুবিধা, খড়ের পরিমান, ধান ও মাছ চাষের সুবিধা ইত্যাদি ভুলিয়ে দেওয়া হল। শুধু জলের হিসাব ধরলে দেখা যায় ১ কেজি ধান/ মাংস উৎপাদন করতে (মেয়াদ অনুযায়ী) ৩০০০-৪০০০ লিটার জল লাগে। যেখানে ডালশস্য ও গমে ধানের ৫ ভাগের ১ ভাগ জল লাগে। রাসায়নিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রকৃতির সুরক্ষার কথা ভাবা হয়না। উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক নিয়মকানুন স্বাভাবিকভাবে প্রযোজ্য; উচ্চফলনশীল বীজ, কৃষি রাসায়নিক, সেচ ইত্যাদি প্রয়োগ একই করা হলেও উৎপাদন বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন হয়। ভারতে ধানে জাত প্রায় ৮২০০০ আার গমে জাত প্রায় ৩৮০০০। সব জাতের ফলন কম হতে পারে? অতি সরলীকরন করে বলে দেওয়া হল দেশী মানেই কম ফলন। এর স্বপক্ষে নিয়ামকদের কাছে যুক্তিগ্রাহ্য কোন তথ্য নেই। মানে সব ভারতীয়র গায়ের রং কালো কিংবা ফর্সা! তা না হলে আধুনিক জাতের তথা কথিত উচ্চ ফলনশীল বীজ চালানো যাবে না।
এক কথায় দেশের ধান ও গম সম্পদের উৎপাদনশীলতার তথ্য লুকিয়ে ফেলার নামই সবুজ বিপ্লব। উদ্দেশ্য ছিল দেশজ ফসলের উৎপাদনশীলতা ও বৈচিত্রের কথা সাধারণ মানুষ যেন না জানতে পারেন। কৃষক যেন সনাতনী চাষের সব কৃৎকৌশল ভুলে যায় এবং এর সম্বন্ধে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। ১৭৬২ সাল থেকে ১৭৬৬ সাল পর্যন্ত একজন ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার থমাস বার্নাড এখনকার তামিলনাড়ু জেলার সেলম এবং থাঞ্জাভুর জেলায় ধান নিয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে ১৩০ টা গ্রামের দেশি ধানের গড় ফলন ছিল প্রতি হেক্টরে ১০ টনের বেশী (Pingle, 2017)। অবশ্য সেই ধান এখন আর চাষ হয় না, বীজ হারিয়ে গিয়েছে। আইনি আকবরীতেও প্রতি হেক্টরে ছ থেকে সাত টন ধানের কথা বলা আছে। অন্যদিকে ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত ভারত সরকার বিভিন্ন ফসলে বেশি উৎপাদনের জন্য কৃষি পণ্ডিত পুরষ্কার ঘোষণা করত। সে সময়ও কিছু ধানের ফলন ছিল ১২ টন/হেক্টর। এখন পর্যন্ত কোন আধুনিক জাতের ধানের ফলন রাসায়নিক সার দিয়েও ওই উৎপাদন দিতে পারেনি। বেশি ধান উৎপাদন করার জন্য ১৯৫২ সালে কর্নাটকের এক কৃষককে কৃষি পন্ডিত পুরস্কার প্রদান করেন। ধানের ফলন ছিল প্রতি হেক্টরে ৯ টন। সবুজ বিল্পবের প্রাক্কালে এই উৎপাদনশীলতার কথা বেমালুম চেপে যাওয়া হল। ১৯৬৮-র আই আর ৮ ধানের হেক্টরে ৬ টন ফলন দেখে জনৈক বিজ্ঞানী চমকে উঠেছিলেন, ওটাই ছিল “উচ্চ ফলনশীল ধান”। অথচ ১৯৫২-এ হেক্টরে ৯ টনের ধানের উৎপাদনের কথা চেপে গেলেন কোন বাধ্যবাধকতায়? (পাল ২২)।
আই আর ৮ ধান চাষে কিন্তু রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দিতে হবে এবং বীজ কিনতে হবে প্রায় প্রতিবছর । তা না হলে কিন্তু বেশি ফলন দিতে পারবে না। অথচ ওই দেশি ধান গুলোতে কোন রাসায়নিক সারের প্রশ্নও ছিল না এবং বীজ বছরের পর বছর কৃষকরা ব্যবহার করতে পারবেন। সুতরাং ওই চাষে পরিবেশ, মাটি ও কৃষকের লাভ তাই ওই সব বীজকে উৎসাহিত করা হবে না। আর পর পর কয়েক বছর চাষ না হলেই কৃষককের কাছ থেকে বীজ হারিয়ে যাবে। হয়েছেও তাই। জানার পরেও আলাদা করে সংরক্ষনের ব্যবস্থাও করা হল না। যেন ওটা হারিয়ে গেলেই ভালো। তবে এখনো কিছু দেশী ধান আছে যার ফলন ৫ থেকে ৬ টন, সার ও বিষ ছাড়াই সম্ভব।

রাজ্যের অনেক কৃষক দেশী ধান চাষে ব্রতী হয়েছেন। কেন কোন ব্লকে কেরালা সুন্দরী, বহুরুপীর মত বেশী ফলনের দেশী ধানের চাষ ২০ হেক্টর থেকে ২০০ হেক্টর হয়েছে। উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি মহকুমায় ভালোই প্রসার লাভ করেছে। এতে খরচ কম, ভালো ফলন এবং বীজ কিনতে হয় না বারবার। রাজ্য সরকার এই চাষে উৎসাহিত করছেন কিছু প্রকল্পের মাধ্যমে। আনন্দের কথা এই রাজ্যে অন্য রাজ্যের অনেক বেশী দেশী ধান উৎপাদন করে। কালভাত নামক সবথেকে বেশী পুষ্টিকর কালো চালের উৎপাদন এই রাজ্যে সর্বাধিক।
বিজ্ঞান কাদের কব্জায়
জনকল্যাণে স্বাধীন বিজ্ঞান গবেষণা আর হয় না বললেই চলে। এখন সবটাই কর্পোরেট পুঁজি ও ব্যবসা নির্ভর। সুতরাং যাঁরা পুঁজি বিনিয়োগ করছেন তাঁদের ব্যবসায়িক স্বার্থটাই বড়। প্রশ্ন চলে না। কর্তারা বিজ্ঞান গবেষণায় প্রশ্নহীন আনুগত্য চান। এর জন্য নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা ও বাস্তব সত্যকে উপেক্ষা করতে হবে। তথাকথিত বিজ্ঞানের মোড়কে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারজাতকরণ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছত্রাক নাশক, আগাছানাশক বিষ, রাসায়নিক সার গ্রহণকারী ও রোগপোকাপ্রবণ সংকর জাতের বীজ, প্রসাধন সামগ্রী, প্যাকেটজাত খাবার, স্বাস্থ্যবর্ধক পানীয়, ঠান্ডা পানীয় ইত্যাদি এখন আর বির্তকের ঊর্ধ্বে নয়। রয়েছে অনেক প্রশ্ন। এমনভাবে লোহার রড ও সিমেন্টের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, যাতে মনে হয় বাড়ি ওই সব দ্রব্য ছাড়া তৈরি সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে চুন, সুরকি বা সিমেন্ট বালি, মাটি ব্যবহার করে লোহার রড ছাড়া বাড়ি তৈরি করা সম্ভব। বাড়ি অর্থে মাটির বাড়িও আছে। রাসায়নিক সার ও বিষের কুপ্রভাব নিয়ে গবেষণায় উৎসাহ দেওয়া হয় না বললেই চলে পাছে লোকজানাজানি হয়, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যতটুকু হয়েছে সেটাও প্রকাশিত হয় না বা করতে দেওয়া হয় না। বরং যা চলছে তাই চলুক। বহু প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের ‘বিশেষ বাধ্যবাধকতার’ জন্য ‘বিজ্ঞানের মোড়কে তত্ত্ব তৈরি হয় এবং সেই অনুযায়ী এর বাজারীকরণের সুপারিশ’ করা হয়। কর্মরত প্রাতিষ্ঠানিক কর্মী ও বিজ্ঞানীদের প্রাধান্য দিতেই হয় প্রতিষ্ঠানকে। নৈতিকতা, পরিবেশ রক্ষা ও কৃষক কল্যাণ ইত্যাদি গৌণ হয়ে যায়। আরো এক শয়তানি হল জিন শস্য। বিজ্ঞানের নামে এই শস্য চাষের জন্য খুব চেষ্টা চলছে। পেটেন্ট করা, কোম্পানীর দামী বীজ। বলা হচ্ছে ফলন বাড়বে, আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াবে। সেটা অপপ্রচার ছাড়া কিছুই নয়। জিনশস্য গুলো শংকর জাতের, তাই ফলন বেশী হবে এতে রাসায়নিক সার ও বিষ ও সেচ লাগবে। শংকর জাতের সঙ্গে জিন কারিকুরির প্রত্যক্ষ যোগ নেই। সংকরায়ন একটি পুরোনো প্রযুক্তি। আমাদের দেশে এখন যা ফসল বৈচিত্র্য আছে সেটা দিয়েই ভালোই ফসল উৎপাদন সম্ভব, অনেক জাত বিরুপ আবহাওয়া সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে ও প্রান্তিক জমিতে চাষ করা যাবে, চাষের খরচও কম হবে। [ক্রমশ]
লেখক প্রাক্তন কৃষি অধিকারিক, জৈবকৃষি ও দেশজ ফসলের গবেষক ও লেখক