| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলনের দিনগুলি : শিবনাথ চৌধুরী

Reporter
শিবনাথ চৌধুরী / ৪১৫০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৩ মার্চ, ২০২২

১৯৬২ সালের স্বাধীন ভারতে তৃতীয় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনেও তৃতীয় বারের জন্য কংগ্রেস দল দেশ শাসনের দায়িত্ব পায়। পশ্চিমবাংলায় ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। যদিও এই নির্বাচনে বিধানবাবু কলকাতার বহুবাজার কেন্দ্রে অবিভক্ত কমিউনিস্ট প্রার্থী মহ. ইসমাইল সাহেবকে মাত্র পাঁচ শত ভোটে পরাজিত করে জয়লাভ করেন।

এই নির্বাচনে কৃষ্ণনগর বিধানসভা কেন্দ্রে প্রজা সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে তরুণ আইনজীবী বিশিষ্ট বাগ্মী সাংসদ লক্ষ্মীকান্ত মৈত্রের পুত্র কাশীকান্ত মৈত্র জেলা কংগ্রেস সভাপতি স্বাধীনতা সংগ্রামী জগন্নাথ মজুমদারকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। কাশীকান্ত মৈত্র পিতার মতই বাগ্মী। বিরোধী নেতা হিসেবে রাজ্য বিধানসভায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

১৯৬২ সালের ১ জুলাই পশ্চিমবাংলার রূপকার মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায় পরলোক গমন করেন। খাদ্যমন্ত্রী ও প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রফুল্লচন্দ্র সেন পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। প্রফুল্লবাবু মুখ্যমন্ত্রিত্বের সঙ্গে খাদ্য দফতরও নিজের হাতেই রাখেন।

খাদ্য সমস্যা নিরসন হবার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না। বিধানসভায় বারবার বিতর্কে সরকার পক্ষ জেরবার হতে থাকল। সারা রাজ্যই তখন গমের হাহাকার। রেশনে মাথাপিছু সপ্তাহে আধ কেজি চাল ও এক কেজি গম বরাদ্দ। তাও সময়মতো মেলে না। তখন চালের বাজার দর ২ টাকা ৮০ পয়সা উঠেছে। মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। সরকারের খাদ্যনীতি ঘোষণা অনুসারে উদ্বৃত্ত এলাকা থেকে কৃষকরা নিজেদের খাদ্য মজুত রাখতে ব্যস্ত, তার উপর প্রয়োজন বীজধানের। তার পরিমাণও কম নয়। সুযোগ বুঝে মজুতদার ব্যবসায়ীরা খাদ্যসামগ্রী বাজার থেকে উধাও করতে শুরু করল। মানুষ এক দিশাহারা পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে পড়ল।

১৯৬৫ সালের ১১ মে বিধানসভার খাদ্য বিতর্কে অংশ নিয়ে কৃষ্ণনগর বিধানসভার বিরোধী সদস্য কাশীকান্ত মৈত্র এক নজরকাড়া জোরালো ভাষণ দেন।

মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি যে, অবিলম্বে উদ্বৃত্ত জেলা থেকে ঘাটতি জেলায় অবাধে চাল আসবার ব্যবস্থা করুন। কাউনিং ব্যবস্থা তুলে দিন। হাউস থেকে বিদায় নেবার আগে আমি এই গ্যারান্টি নিয়ে যেতে চাই। ঘাটতি জেলার মানুষকে বাঁচান। নদিয়া একটি ঘাটতি জেলা। সীমান্তবর্তী অঞ্চল। কিন্তু সেখানে দেখছি চাল নেই। বর্ধমানের চাল নদিয়ায় আসতে দিতে হবে, নচেৎ নদিয়ার মানুষ অনাহারে মরবে স্যার।  আমার আর্জি, সকলরকম বাধানিষেধ তুলে দিয়ে উদ্বৃত্ত জেলা থেকে ঘাটতি জেলায় চাল আসতে দিন। আপনি হাউসে ঘোষণা করেছিলেন—কালোবাজারি বন্ধ করতে রেশন ব্যবস্থা বরাদ্দ ১,২০০ গ্রাম থেকে বাড়াবেন। আমি জানতে চাই, সে চেষ্টা কবে করবেন? শেষ করবার আগে আবার বলছি অবস্থা ভয়াবহ। গ্রামবাংলার শান্তিপ্রিয় মানুষকে ইচ্ছে করে খেপিয়ে তুলবেন না।’

খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন ১৯৬৫ সালের ২৯ নভেম্বর ৬৬ সালের খাদ্যনীতি ঘোষণা করলেন। মাননীয় মুখ্যন্ত্রী বিধানসভায় খাদ্যনীতি ঘোষণা করে তাঁর বক্তব্যে বললেন—

‘কলকাতা-সহ শিল্প অঞ্চলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশির জন্য ৭০-৭২ লক্ষ মানুষের জন্য বিধিবদ্ধ রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। নিয়মানুসারে এই এলাকার মানুষের জন্য রেশন মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ করা হয়েছে। এই বিধানসভায় অনেক বন্ধু আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, এই ব্যবস্থা সফল হবে না, কিন্তু আমরা সফল হয়েছি। মনে রাখতে হবে, পাকিস্থান থেকে এখানে ৪০ লক্ষ মানুষ আশ্রয়প্রার্থী হয়ে এসেছেন। অন্য প্রদেশ থেকেও ৫৫ লক্ষ মানুষ এখানে বসবাস করেন। এই অতিরিক্ত মানুষের দায়িত্ব আমাদের নিতে হয়েছে। এই বিধিবদ্ধ রেশনিং ব্যবস্থা চালু রাখতে গিয়ে মানুষের ‘ফুড হ্যাবিট’ পরিবর্তনের প্রয়োজন। শুধুমাত্র চালের উপর নির্ভর করলে চলবে কি করে? মহালানবিশের রিপোর্ট অনুসারে মাথা পিছু মানুষের ১৮ আউন্স খাদ্য প্রয়োজন। কিন্তু আমার মতে ১৬ আউন্স হলেই চলে। আবার অনেকের মতে ‘যত পাই তত খাই’ (সরকার পক্ষের সদস্যবৃন্দের হাস্যরোল) বাইরে থেকে সাড়ে সাত লক্ষ টন খাদ্য আনা সম্ভব। আমাদের চাহিদা অনুসারে ৮০-৯০ ভাগ ধান সংগ্রহ করতে যদি পারা যায় তাহলে শহরাঞ্চলে মানুষকে কিছু কম খাইয়েও সমস্যা সমাধান করা যাবে। ১৯৬৬ সাল অত্যন্ত সংকটজনক হবে। খাদ্যের ঘাটতি হবে ২২ লক্ষ টন। সুতরাং কলকাতার মানুষকে ১২ আউন্সের বদলে ১০ আউন্স হিসাবে মাথা পিছু চাল দেওয়া হবে। আমি আগেই বলেছি বর্তমান সংকটকালে খাদ্য অভ্যাসের পরিবর্তনের প্রয়োজন। শুনলাম বর্ধমানে যে সব হাস্কিং মিল আছে তা থেকে ৪০-৪৫ হাজার টন চিড়ে উৎপাদন হয়। আমরা স্থির করেছি, চিড়ে সংগ্রহ করে রেশনের মাধ্যমে দেবার ব্যবস্থা করা হবে। যে কোন মূল্যে অপচয় বন্ধ করা হবে।

এই সভায় বিভিন্ন সময়ে স্যার চাষের খরচের হার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমি বলতে চাই যে, আমাদের রাজ্যে চাষের খরচের হার বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন রকম। ৫ টাকা থেকে ২১ টাকা খরচ হয় মন প্রতি উৎপাদনের জন্য। (বিরোধী সদস্যদের চিৎকার— আপনি কিছু জানেন না। একথা চাষিদের বললে ফুলের মালার বদলে অন্য মালা দেবে) (একটু থেমে)— মালার জন্য আপনারা লালায়িত, আমি নই। সুতরাং আমি হিসাব করে দেখেছি উৎপাদন খরচের হার ৯.৭০ পয়সা থেকে ১১.৮০ পয়সা। তাই আমি মনে করি সংগ্রহ মূল্য ১৫ টাকা ধার্য করা সঠিক। আমরা কৃষকদের উন্নতির জন্য ৮ কোটি ঋণ নিয়েছি। সমবায় সমিতির মাধ্যমে ১৪ টাকা ও ১৬ টাকা মন দরে ধান সংগ্রহ করা হবে। সমবায় বিভাগ দেড় লক্ষ টন ধান কিনবে। তা ছাড়া ডাইরেক্ট প্রোকিওরমেন্টও করা হবে। হোলসেলারদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। তারা সরাসরি ধান কিনতে পারবে না। ঘাটতি ও বাড়তি এলাকার সীমান্তে যে সমস্ত হাস্কিং মিল আছে সেগুলি বন্ধের আদেশ দেওয়া হয়েছে। কর্ডনিং জোরদার করা হবে। আমরা জেলার চাল কলকাতায় আসতে কিছুতেই দেব না। খাদ্যনীতি সফল করতে সবরকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। লেভি করা হয়েছে কৃষকদের স্বার্থেই। যাদের ধান বিক্রি করতে হয়, তাদের উপর লেভি বসালে সাংঘাতিক লোভী লোকদের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করা যাবে।

সংকটজনক অবস্থায় আমরা যদি পেট ভরে খাই তবে চাল পাব কোথায়? তাই বলছি খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। পেট ভরে খাবার জন্যই তো খাদ্যে এত ঘাটতি হচ্ছে। সুতরাং কাঁচকলা খেতে হবে বৈ কি? জার্মানি, আয়ারল্যাণ্ডেও তো বিকল্প খাদ্য ব্যবস্থা আছে। পশ্চিমবঙ্গে ২ লক্ষ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। প্রয়োজনে রেশনে আলু দেবার ব্যবস্থা করব।

১৯৬৬ সালের শুরু থেকেই জেলায় জেলায় খাদ্যসংকট তীব্র হতে থাকে। বিক্ষোভও দানা বাঁধতে শুরু করল। ফসলের অবস্থাও সংকটজনক হয়ে পড়ল। মুর্শিদাবাদের কান্দিতে খয়রাতি সাহায্য চেয়ে বিরাট মানুষের ভুখা মিছিল সংবাদের শিরোনামে এলো। বর্ধমান জেলায় কাটোয়ার জেলাশাসকের গাড়ি আটক করে ভুখা মানুষের বিক্ষোভ। রেশনে এক মাস চালের নামগন্ধ নেই। চাল কিনবার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলল জনগণ। একমুঠো ভাতের জন্য মানুষ তখন মরিয়া। গ্রামে গ্রামে ক্ষুধার্ত জনতার মিছিল, বিক্ষোভ আর সত্যাগ্রহ। পাঁচলায় ২২টি গরুর গাড়ি বোঝাই চাল আটক করল জনসাধারণ।

এদিকে বর্ধমানে ধান সংগ্রহ আশানুরূপ হলো না। খাদ্যাভাবের সাথে কেরোসিন তেল বাজার থেকে উধাও হলো। গ্রামে গ্রামে কেরোসিন তেলের হাহাকার। পরীক্ষার মরসুমে কেরোসিনের অভাবে ছাত্ররা দিশাহারা। বিক্ষুব্ধ অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যে সরকার বিভিন্ন শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করবার ব্যবস্থা করলেন। অনাহারের সাথে পুলিশি জুলুমের মাত্রা বেড়ে গেল। ঘাটতি জেলা নদিয়ায় খাদ্যাভাব প্রকটভাবে দেখা দিলো। ১৯৬৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিরোধী সংযুক্ত সোশ্যালিস্ট পার্টির ডাকে কাশীকান্ত মৈত্রের নেতৃত্বে এক বিরাট মিছিল নদিয়ার জেলাশাসক রমারঞ্জন ভট্টাচার্যের কাছে খাদ্য চেয়ে ডেপুটেশন দেয়। উত্তেজনার পারদ বাড়তেই থাকে।

১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজ্য বিধানসভার সভা চলাকালীন বিদ্যুৎবেগে সিপিআই সদস্য সোমনাথ লাহিড়ী সভায় প্রবেশ করে কম্পিত কণ্ঠে মেনশান করে বলতে শুরু করলেন, স্যার, এই মাত্র খবর পাওয়া গেল বসিরহাটের স্বরূপনগরের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র নুরুল ইসলামকে এই সরকারের পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। অপর একটি ছেলে মণীন্দ্র বিশ্বাসকেও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তাদের অপরাধ তারা তেঁতুলিয়া গ্রাম থেকে ধর্মঘট করে খাদ্য ও কেরোসিন তেলের জন্য স্বরূপনগর থানার সামনে আসা শোভাযাত্রায় অংশ নেয়, সেই শোভাযাত্রার উপর গুলি চালানো হয়। যে সরকার খেতে দিতে পারে না তারা গুলি করে হত্যা করতে পারে কী করে?

গুলি করে ছাত্রকে হত্যা করার বিরুদ্ধে বিধানসভা উত্তাল। সরকার পক্ষ নীরব। বিরোধী সদস্য কমল গুহ উঠে দাঁড়িয়ে হাউসে উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশে আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আসুন আমরা সবাই নুরুল ইসলামের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন করি।’ কমলবাবুর প্রস্তাব অনুসারে বিরোধী পক্ষ নীরবে দণ্ডায়মান হয়ে শ্রদ্ধা জানালেন। সরকার পক্ষের অধিকাংশ সদস্য বাইরে চলে গেলেন। কিন্তু কংগ্রেস দলের সদস্য অজয় মুখোপাধ্যায় এবং ডা. মৈত্রী বসু বিরোধী সদস্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলেন।

১৮ ফেব্রুয়ারি পুনরায় বিধানসভার অধিবেশন বসলে বিরোধী সদস্যরা ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। সভা মুলতবি করে এই বিষয়ে আলোচনা চাইলেন। সমগ্র বিষয়টি নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের জোরালো দাবি উঠল।  

১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে গ্রামে-গঞ্জে খাদ্য ও তেলের জন্য মিছিল-বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে। লেভি আইন সংশোধনের দাবি জোরালোভাবে উঠতে থাকে। ২৪ পরগনা জেলার হিঙ্গলগঞ্জে ও নদিয়ার শান্তিপুরে ছাত্রদের বিক্ষোভে শহর অচল হয়ে পড়ে। নদিয়ার রানাঘাট শহরে কিষান কংগ্রেসের ডাকে এক সমাবেশে সস্তা দরে খাদ্য দেবার দাবি ওঠে। আংশিক রেশন এলাকায় খাদ্য দেবার ব্যবস্থা শুধুমাত্র ছলনা। সরকার সংশোধিত রেশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও খাদ্য সমস্যা সমাধানের কোনও লক্ষণ দেখা দিলো না।

কৃষ্ণনগরের বাজার থেকে চাল উধাও হয়ে গেল। মজুতদাররা মাল মজুত করে রেখে জনসাধারণকে অনাহারের মুখে ঠেলে দিলো। এই অবস্থায় সংযুক্ত সোশ্যালিস্ট পার্টির বিধায়ক কাশীকান্ত মৈত্রের নেতৃত্বে মজুত উদ্ধার আন্দোলন শুরু করল। সঙ্গে জেল ভরো আন্দোলনও চলতে থাকল। মজুত উদ্ধার আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়ে কাশীকান্ত মৈত্র, জেলা সম্পাদক সত্যরঞ্জন দাশগুপ্ত, জেলার নেতা চিরসুহৃদ খাঁ, পরেশ বিশ্বাস, ভজেন বিশ্বাস, সুহাস মিত্র প্রমুখ নেতা কৃষ্ণনগরের দোকানে দোকানে হাজির হয়ে মজুত মাল উদ্ধার করে ন্যায্যমূল্যে জনসাধারণের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা করলেন। বিক্রয়মূল্য দোকানদারকে হিসেব করে দেওয়া হতো।

সাইকেল, রিকশা ভ্যানে করে উদ্বৃত্ত জেলা বর্ধমান থেকে চাল নদিয়ার আসত। তাতে কিছু সুবিধা নদিয়াবাসী পাচ্ছিলেন। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে মুখ্যমন্ত্রী জেলা সফরে এসে দেখে সাইকেলে চাল যাচ্ছে। দেখে ক্ষিপ্ত হলেন। ফুলিয়ার জনসভায় তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন, চাল আসা বন্ধ করতে হবে। এবং পুলিশকে নির্দেশ দিলেন, বর্ধমানের চাল আসা বন্ধ করতে হবে। এই নির্দেশ অমান্য করলে পুলিশ অফিসারদের ‘ডিমোশন’ করে দেবার হুমকিও তিনি দিলেন। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর কড়া হুকুমে পুলিশের জুলুম চরমে উঠল। চাল আসা একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। নদিয়ায় তখন দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া নেমে এলো।

খাদ্যের দাবিতে, কেরোসিনের দাবিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে সভাসমিতি, গণ অনশন, বিক্ষোভ, বিডিও অফিস অভিযান নিত্য দিনের ঘটনা হতে থাকল। ১ মার্চ এসএসপি-র মহিলা সংগঠনের ডাকে মহিলা নেত্রী বুলবুল ঘটকের (মেজদি) নেতৃত্বে ৪৪ জন মহিলা খাদ্যের দাবিতে আইন অমান্য করে কারাবরণ করেন।

৪ মার্চ পড়াশোনা করতে কেরোসিন তেলের দাবিতে এবং খাদ্যের দাবিতে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হলো কৃষ্ণনগরে। ছাত্র বিক্ষোভ প্রতিহত করতে শহরে কয়েক হাজার সশস্ত্র পুলিশ নামানো হলো। কৃষ্ণনগর শহরের প্রতিটি শিক্ষা আয়তনের ছাত্ররা খাদ্যের দাবিতে ক্লাস বর্জন করে জেলাশাসকের দফতরে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে এগিয়ে চলল। এমন বিক্ষোভ মিছিল মাঝে মাঝেই হচ্ছে শহরে। সুতরাং শহরের মানুষ নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। অফিস-আদালতে লোকে ভর্তি। বেলা ১১টা কৃষ্ণনগর এ ভি হাই স্কুলের দিক থেকে ছাত্রদের এক বিরাট মিছিল সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে দিতে পোস্ট অফিসের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। পোস্ট অফিসের সামনে তখন পুলিশের এক ভ্যান মোতায়েন। পুলিশের ভ্যান লক্ষ্য করে ছাত্ররা পুলিশবিরোধী স্লোগান দিতে দিতে নেতাজির মূর্তি প্রদক্ষিণ করে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ পুলিশ ভ্যান থেকে পুলিশ নেমে ছাত্রদের উপর বেধড়ক লাঠিচার্জ করতে শুরু করল। ছাত্ররা উত্তেজিত হয়ে ইট ছুড়তে থাকল। পুলিশ এক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছুড়েই অতর্কিত ছাত্রদের বুক লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে বসল। গুলির শব্দে ছাত্ররা বিচ্ছিন্নভাবে দৌড়োদৌড়ি শুরু করল। গুলি এসে বিদ্ধ হলো দেবনাথ হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র আনন্দ হাইতের বুকে। পরান কর্তার দোকানের সামনে আনন্দের দেহ লুটিয়ে পড়ল। পিচের রাস্তা আনন্দের বুকের রক্তে লাল হয়ে গেল। বিশ্বশান্তির প্রতীক বিশ্বকবির নামাঙ্কিত রাস্তার সংগমস্থলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল ছাত্র আনন্দ। পোস্ট অফিসে মোড়ে তখন তাণ্ডবনৃত্য চলছে। পুলিশ পোস্ট অফিসের মধ্যে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসে ঢুকে যাকে পাচ্ছে তাকেই লাঠি পেটা করছে। মারতে মারতে ভ্যানে তুলে নিচ্ছে। ছাত্রহত্যার ঘটনা তড়িদ্‌বেগে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল। ছাত্ররা তখন মরিয়া। চাল নেই, তেল নেই, কর্ডনিং-এর অত্যাচার, লেভির জুলুম বহুবিধ পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অভাব-অভিযোগে মানুষ ক্ষুব্ধ। তারপর পুলিশের গুলিতে নিহত হলো ১৭ বছরের তরতাজা ছাত্র আনন্দ। মানুষ ক্ষেপে উঠল। পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ শুরু হলো।

পুলিশ আবার গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে এ.ভি হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র জয়ন্ত পালের পায়ে বিদ্ধ গুলি জয়ন্তর পা ভেদ করে জর্জ কোর্টের প্রাচীর ভেদ করল। লালে লাল হয়ে গেল জজ কোর্টের আদালত চত্বর।

বিক্ষুব্ধ জনতা ফেটে পড়ল। পেট্রোল পাম্প থেকে পেট্রোল জোগাড় করে শুরু করল বহ্ন্যুৎসব। আগুন লাগাতে শুরু করল সরকারি ও আধা সরকারি অফিসে। সেই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ভষ্মীভূত হলো খাদ্য দফতর, হোলসেল কনজিউমার্স কোঅপারেটিভ, জেলা কৃষি দফতর, জেলা স্কুল বোর্ড অফিস, কাস্টমস অফিস, জেলা সমাজ কল্যাণ দফতর। আগুন আর আগুন। চারদিকে লালে লাল। ফায়ার ব্রিগেড আগুন নেভাতে পারছে না।

পরের দিন ৫ মার্চ ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে জনতা নেমে এলো কৃষ্ণনগরের রাজপথে। দাবি আনন্দ হাইতের মৃতদেহ চাই। সদর হাসপাতালের সামনে মানুষের ঢল। সেখানে উপস্থিত বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী শিবরাম গুপ্ত, ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা শিক্ষাবিদ অমিয়রঞ্জন দত্ত, আইনজীবী হরেন্দ্রপ্রসাদ ভট্টাচার্য, সাংবাদিক রমারঞ্জন মৈত্র প্রমুখ। আগের দিন ঘটনার পরই সংবাদপত্রের গাড়িতে করে কাকভোরে শহরে এসে উপস্থিত এমএলএ কাশীকান্ত মৈত্র। জেলাশাসক রমারঞ্জন ভট্টাচার্যের সাথে দফায় দফায় আলোচনা চলতে থাকলো। পুলিশ সুপার হরিবাবু জুহরীর পরামর্শে জেলাশাসক আনন্দের মৃতদেহ ফেরত দিতে রাজি হলেন না। মানুষের ক্ষোভের পারদ বৃদ্ধি পেতে থাকল। হাসপাতালের মোড়ে মহকুমাশাসক এ কে পাইনের গাড়ি জনতা দ্বারা অবরুদ্ধ হলো। জনতা মর্গের দরজায় আঘাত করতে থাকলো। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে হাসপাতালের সামনে অবস্থিত বয় চ্যাটার্জির বাড়ির সামনে থেকে পুলিশ গুলি ছোড়ে। মানুষ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। বুলেট এসে লাগে বৌবাজার নতুনপল্লির ২৭ বছরের যুবক হরি বিশ্বাসের বুকে। বুলেটবিদ্ধ হরি লুটিয়ে পড়ে ডি এল রায় রোডের উপর হাসপাতালের মোড়ে। কংগ্রেস সমর্থক প্রতুল বিশ্বাসের দ্বিতীয় সন্তান হরি বিশ্বাস। আদিবাড়ি পলাশিপাড়ায় কৃষ্ণনগর এ ভি হাই স্কুলে পড়াশোনা সমাপ্ত করে বিপিসি টেকনিক্যাল স্কুল থেকে পাশ করে মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসের অধীন এমইএস ব্যারাকপুরের স্টোরকিপার পদে চাকরি করত। প্রতি সপ্তাহেই বাড়ি আসত। ৫ মার্চ তার চাকরিস্থলে ফিরে যাবার কথা ছিল। কিন্তু আগের দিন পুলিশের গুলিতে নিহত আনন্দের মৃতদেহ নিয়ে মিছিল বার হবে, তাতে অংশ নিতে হরি হাসপাতালের কাছে উপস্থিত। পুলিশের গুলিতে হরির বুক বিদ্ধ হলো তখনই।

জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। জেলাশাসক মত পরিবর্তন করে নেতাদের সাথে আলোচনা করে ময়নাতদন্ত করে আনন্দের মৃতদেহ ছেড়ে দিতে রাজি হলেন। মৃতদেহ নিয়ে মিছিলের প্রস্তুতি চলছে। নেদের পাড়ার মুখে কোতয়ালি থানার এসআই যতীন দত্ত এবং কনস্টেবল সুদর্শন ঘোষের উপর জনতার রোষ গিয়ে পড়ল। রুদ্র ভৈরবের মতো প্রলয়নাচন শুরু হলো। রুষ্ঠ জনতার হাতে প্রাণ গেল দারোগা যতীন দত্ত আর কনস্টেবল সুদর্শন ঘোষের। পুলিশ আবার গুলি চালায়। গুলিতে আহত হলো প্রফুল্ল দত্ত, সুকুমার বিশ্বাস, অরুণ মজুমদার, তপন হালদার, গোপাল সরকার প্রমুখ। অগ্নিতে ঘৃতাহুতি। শুরু হলো রুদ্র ভৈরবের বহ্নি উৎসব। পেট্রোল পাম্প থেকে লিটার লিটার তেল সংগ্রহ করে, আগুন ধরালো ছাত্রের দল রয় চ্যাটার্জির মোটর গ্যারেজ, রাজ্যের পশুপালন ও দুগ্ধ দফতরের মন্ত্রী ফজলুর রহমান সাহেবের বাড়িতে, রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের কামরায়। পুলিশ বন্দুক উঁচিয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদলকে ছত্রভঙ্গ করতে এগিয়ে এলো, ছাত্ররা পিচের ড্রামের আড়ালে লুকিয়ে পুলিশের দিকে ইষ্টক বর্ষণ করতে করতে এগিয়ে চলল। আগুন ধরালো মনমোহন ঘোষ স্ট্রিটের খাদি ভাণ্ডারে, সেই আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করল সিটি কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক বিল্ডিং। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। আগুনের গ্রাস থেকে ব্যাঙ্কের জরুরি নথিপত্র, টাকা উদ্ধারে এগিয়ে এলেন শহরের তরুণ আইনজীবী লীলাময় মুখোপাধ্যায়। আগুনকে উপেক্ষা করে ব্যাঙ্কের সহ-সম্পাদক পরমানন্দ রায়, ডিরেক্টর অসীমানন্দ রায় ও বলাই ঘোষ ব্যাঙ্কে ঢুকে টাকার থলি নিয়ে বেরিয়ে এসে প্রভূত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেন ব্যাঙ্ককে। ঘূর্ণীর ছাত্রনেতা অসিত সাহার নেতৃত্বে ছাত্ররা বিক্ষোভে অংশ নিলো। ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে মুখর তারা। একদল তরুণ ছাত্র সরকার পরিচালিত সিরামিক ও টয় মেকিং সেন্টারে আগুন ধরালো। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ল সিরামিক সেন্টার। আগুন শুধু আগুন। কৃষ্ণনগর জ্বলছে। আগুনে পুড়ল রিলিফ অফিস, এস্টেট অ্যাকুইজেশন, তথ্য অফিস।

কৃষ্ণনগরে গুলিতে ছাত্রহত্যার বিরুদ্ধে সর্বত্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটল। শান্তিপুরে আগুন ধরানো হয় পৌরভবনে, পোস্ট অফিসে, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ। জিপ, ভ্যান, লরিও পুড়ল ১২টি।

অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে গেল। প্রশাসন ভেঙে পড়ল। অসহায়, উদ্বিগ্ন জেলাশাসক রাজ্যের চিফ সেক্রেটারি মৃগাঙ্কমৌলী বসুর কাছে এক জরুরি বার্তা পাঠিয়ে বললেন, ‘অবস্থা আয়ত্তের বাইরে। জনতা মর্গ ভেঙে ফেলেছে। কৃষ্ণনগর স্টেশন জ্বলছে। জনতার প্রহারে পুলিশ অফিসার নিহত। চারিদিকে ব্যাপক লুঠতরাজ। গুলি চালিয়েও অবস্থা আয়ত্তে আনা যাচ্ছে না। কী কর্তব্য জানান।’ বার্তা পেয়ে রাজ্য সরকার ব্যারাকপুর থেকে কয়েক ব্যাটেলিয়ান আর্মড ফোর্স কৃষ্ণনগরে পাঠাবার ব্যবস্থা করল।

বেলা একটায় আনন্দ হাইতের মৃতদেহ নিয়ে মিছিল বের হলো। কয়েকশো যুবক-ছাত্র মৃতদেহ নিয়ে শহর পরিক্রমা শুরু করল। মিছিলের অগ্রভাগে কাশীকান্ত মৈত্র। তখনও বন্দুক উঁচিয়ে এগিয়ে আসছে সশস্ত্র পুলিশবাহিনী। সবরকম ভয়ভীতি উপেক্ষা করে শহিদ আনন্দের মৃতদেহ শহর পরিক্রমা করে নবদ্বীপের পথ ধরল।

অশান্ত অবস্থা অব্যাহত রইল। দুপুর গড়াতেই আনন্দময়ীতলা পুলিশ ফাঁড়ি আক্রান্ত হলো। ফাঁড়িতে আগুন ধরানো হলো। পুলিশের দুটি রাইফেল ছিনতাই হলো। অনতিদূরে রথতলায় পাড়িয়াদের চালের গোডাউন ভেঙে বুভুক্ষু মানুষের দল চাল লুঠ করতে আরম্ভ করল। প্রতিটি রাস্তায় বড়ো কাঠ দিয়ে ব্যারিকেড। পুলিশ আসা-যাওয়ার পথ অবরুদ্ধ। রাজবাড়িতে অবস্থিত স্টেট ইলেকট্রিক অফিস আগুনে ভস্মীভূত হলো।

হাজার হাজার মেয়ে-পুরুষ যে যে রকম পারল চাল সংগ্রহ করতে থাকল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। ব্যারিকেড সরিয়ে পুলিশবাহিনী ছুটে এলো রথতলায়। গাড়ি থেকে নেমেই এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করল। কালীনগরের কানাই ঘোষের ছোটো ছেলে শক্তিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র অর্জুন ঘোষের দেহ লুটিয়ে পড়ল বেনেপুকুরের ধারে পুলিশের গুলিতে। অর্জুনের নিথর দেহ পড়ে রইল পুকুর ধারে রাত পর্যন্ত। গভীর রাতে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পুকুরের ধারে পড়ে থাকা অর্জুনের দেহ তুলে এনে কালীনগরের বাড়িতে রাখা হলো।

কালীনগরে শোকের ছায়া। পুলিশের গুলিতে নিহত অর্জুন ঘোষের মৃতদেহ বৃদ্ধ পিতা কানাই ঘোষ আগলিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছেন। কী হবে মৃতদেহের? শহরে কার্ফু জারি হয়েছে। রাস্তাঘাট জনমানবশূন্য। অর্জুনের শিক্ষক গৌরগোপাল দেব, সমাজসেবী সমীরণ পালকে নিয়ে আমি গোলাম কানাই ঘোষের বাড়ি। আমি তখন পুরসভার কমিশনার।

সন্ধে নামতেই কৃষ্ণনগরের অধিকাংশ পাড়া পুরুষশূন্য হয়ে গেল। সবাই বাড়িঘর ছেড়ে পাশের গ্রামে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো। কালীনগরের পাশের গ্রাম গোয়ালদহ মহিষনাংড়া গ্রামে তখন লোকে লোকারণ্য। গ্রামের দরিদ্র মানুষরা বিপদের দিনে শয়ে শয়ে মানুষদের পরম আন্তরিকতায় শুধু আশ্রয় দিয়ে নয় আহারের ব্যবস্থাও করে দিতে এতটুকু বিরক্ত বোধ করেননি।

সূর্য ডুবতেই পুলিশ দ্বিগুণ উৎসাহে শহরের মানুষদের ক্ষতিসাধনে মেতে ওঠে। আনন্দময়ীতলার সাইকেল ব্যবসায়ী প্রাক্তন কমিশনার কালীচরণের দোকান ভেঙে পুলিশ ক্যাশ বাক্স থেকে টাকা লুঠ করে। নতুন বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গৌরহরি সাহা ও ভোলানাথ সাহাকে চাল চুরির অপরাধে গ্রেফতার করে পুলিশ। বেনেপুকুর ধারের বাসিন্দা শ্রীশ্রী স্বামী নিগমানন্দের বংশধর প্রবীণ শিক্ষক নরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে হানা দিয়ে তছনছ করে তাঁর ব্যবহৃত দুটি হাতঘড়ি নিয়ে যায় পুলিশ। কালীনগরের কংগ্রেস কর্মী নিখিল সিংহ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নিত্যগোপাল পালকে বাড়ি থেকে পুলিশ বিনা কারণে গ্রেফতার করে। ফাঁড়ি পোড়ানোর ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বাঁকু দর্জি লেনের তরুণ প্রবীর পালকে ডিআইআর-এ পুলিশ গ্রেফতার করে। কৃষ্ণনগর শহর জুড়ে চলতে থাকল পুলিশের অত্যাচার। ৭ মার্চের দৈনিক বসুমতীর পাতায় প্রকাশিত হলো ‘কার্ফু কবলিত কৃষ্ণনগরে কোথাও জীবনের সাড়া নেই। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর যেন এক পরিত্যক্ত শহর জনশূন্য। রাজপথে কানে আসে শুধু পুলিশের বুটের আওয়াজ। আর পুলিশি হামলায় ঘরে ঘরে অসহায় বিক্ষোভ দমনে শুরু হইয়াছে পুলিশ ও মিলিটারির সন্ত্রাস, গৃহে গৃহে হানা ও নির্বিচারে ধরপাকড়।… পথে পথে বন্দুক ও বেয়নেটের স্পর্ধিত আস্ফালন— রক্তস্নাত কৃষ্ণকন্যার জন্য বেদনাহত নদিয়া। অবগুণ্ঠিত শৃঙ্খলিতা তবুও শৃঙ্খল ভাঙিবার দুর্জয় প্রেরণায় টলমল। ইহা যেন সূর্য হারা অরণ্যের নাগিনী কন্যার মত।’

৮ মার্চ সংযুক্ত সোশ্যালিস্ট পার্টির জেলা সম্পাদক আইনজীবী সত্যরঞ্জন দাশগুপ্তের বাড়ি থেকে কাশীকান্ত মৈত্র এবং সত্যরঞ্জন দাশগুপ্তকে মন্ত্রীর বাড়ি পোড়ানোর মামলায় অভিযুক্ত করে গ্রেফতার করল পুলিশ। স্থানীয় পাক্ষিক বিদ্যুৎ পত্রিকার সম্পাদক রামরঞ্জন মৈত্রকেও প্রায় একসঙ্গে গ্রেফতার করা হলো।

কৃষ্ণনগরের মতো শান্তিপুরে পুলিশের অত্যাচারে মানুষ দিশাহারা। বিক্ষোভের ফলে ডাকঘর ও স্টেট ব্যাঙ্ক আগুনে ভষ্মীভূত হয়। বিক্ষোভের ১০ দিন পরেও ডাকঘর, ব্যাঙ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম চালু করা যায়নি। পুলিশ বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে নিরীহ মানুষকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে।

দৈনিক বসুমতীর ৯ মার্চে সম্পাদকীয় স্তম্ভতে লেখা হলো—‘কিশোর আনন্দ হাইতের মা বসুমতীতে প্রকাশিত পুত্রের ফটো দেখিয়া আর্তনাদ করিয়া উঠিলেন—ওরে আনন্দ ফিরে আয়। হে শোকার্ত বঙ্গজননী, আনন্দ আর ফিরিবে না। পশ্চিমবাংলা হইতে আনন্দ বিদায় লইয়াছে, সেখানে গণতন্ত্রের কবর খোঁড়া হইয়াছে এবং সেই কবরের পাশে অন্ধকারে মিলিটারির ছায়ামূর্তি পদচারণা করিতেছে—আনন্দ-নুরুল-হরি-অর্জুন প্রভৃতি কিশোরেরা সেই গণতন্ত্রের কবরে শায়িত। আর শাসকেরা শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার গর্বে গৌরবান্বিত। না কোন বিচার নয়, তদন্ত নয়, পুলিশি হত্যাকাণ্ডের কোন প্রতিকার হয়। হে শোকার্ত জননী আনন্দ সত্যই বিদায় নিয়াছে। এই পশ্চিমবঙ্গে আনন্দ আর ফিরিবে না। সত্যই অবস্থা আজ ফার্স্ট ক্লাস, ফার্স্ট ক্লাস মুখ্যমন্ত্রী’।

সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৮ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলনের দিনগুলি : শিবনাথ চৌধুরী”

  1. রণজিৎ দাশ says:

    নদিয়ার সীমান্তবর্তী গ্রাম বানপুর ষ্টেশানের মাইল খানেক দূরে মাটিয়ারী গ্রামে বাড়ি ছিল। সে সময় চাষের জন্য বৃষ্টিই ছিলো একমাত্র ভরসা। তখন ১১/১২ বছর বয়স ছিলো আমার । আমন ধান সেবার ভালোই হয়েছিলো আমাদের। কাজেই খাদ্যাভাব বুঝিনি। গ্রামে আটা খাওয়া শুরু হলো সেবারই। গম, যব, ভুট্টা, মাইলো, বজরা ইত্যাদি নানা ধরনের অচেনা খাবার খেতে শুরু করলো মানুষ। চারিদিকে চাল-গম লুঠ হচ্ছে এইরকম খবর শোনা যাচ্ছিল। গোলাভর্তি ধান ছিলো। বাবা বলতো ধান লুঠ হয়ে যায় কিনা। ভয়ে ভয়ে দিন কাটতো। সেকথা এখনও মনে আছে।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev