আবার ৩-সেপ্টেম্বর, ১৯৪০ [১৮-ভাদ্র, ১৩৪৭] কালিম্পঙে অবস্থানরত প্রতিমা দেবীকে লিখছেন — “গল্পটা শেষ হয়ে গেছে, এখন তাতে প্লাস্টার লাগাচ্চি।” এর পক্ষকাল পরে ১৯-সেপ্টেম্বর, ১৯৪০ [৩-আশ্বিন, ১৩৪৭] কালিম্পং যাত্রার পূর্বে কলকাতা থেকে পুরীতে অমিয় চক্রবর্তীকে কবি আবার লিখছেন — “কিছুদিন থেকে আমার শরীর ক্রমশই ভেঙে পড়ছে, দিনগুলো বহন করা যেন অসাধ্য বোধ হয়। তবু কাজ করতে হয়েছে তবু এত অরুচিবোধ সে বলতে পারিনে। ভারতবর্ষে এমন জায়গা নেই যেখানে পালিয়ে থাকা যায়। ভিতরের যন্ত্রণাগুলো কোথাও কোথাও বিকল হয়ে গেছে — বিধান রায় আশঙ্কা করেন হঠাৎ একটা অপঘাত ঘটতে পারে। সেইজন্যে কালিম্পঙে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু মন বিশ্রামের জন্য এত ব্যাকুল হয়েছে যে তাঁর নিষেধ মানা সম্ভব হলো না। চল্লুম আজ কালিম্পঙে। …দায়ে পড়ে একটা গল্প লিখতে বাধ্য হয়েছিলুম। বহু কষ্টে লিখে নিষ্কৃতি নিয়েছি। আনন্দবাজার পূজাসংখ্যায় যাবে — কি রকম হয়েছে কী জানি। লিখতে আর প্রবৃত্তি নেই।” ভগ্ন শরীর নিয়ে এত কষ্ট সত্ত্বেও গল্পটি লেখা শেষ হলে, কবির মানসিক অবস্থা কেমন হয়েছিল তার বর্ণনা পাওয়া যায় কালিম্পঙে পুত্রবধূ প্রতিমাদেবীকে লেখা কবিকন্যা মীরা দেবীর পত্রে। প্রতিমা দেবী এ সম্পর্কে লিখছেন — “আমি যখন কালিম্পঙে যাই তখন তিনি ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পটি লিখতে শুরু করেছেন। কিন্তু আজকাল গল্প লিখতে ভারি দ্বিধা, বলেন, ‘আগেকার মতো তাড়াতাড়ি লিখতে পারি না, অনেক সময় নেয়।’ তা-ছাড়া তাঁর নিজের লেখা সম্বন্ধে তিনি খুব কড়া বিচারক ছিলেন, নিখুঁত না হলে তাঁর কিছুতেই মন উঠত না, কতবার যে নিজের হাতে লেখা কপি করতেন, আর সেইসঙ্গে বদল করতেন তার ঠিক নেই, যদিও কপি করবার লোক আপিসে হাজির তবু তাকে দেবেন না। ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পটি লিখে পড়তে তাঁর কত সংকোচ। লোকে ঠিক বুঝবে কি না এই ছিল তাঁর সন্দেহ, সেইজন্যে শ্রোতা সম্বন্ধে তিনি ভারি খুঁতখুঁতে ছিলেন। যখন আজকাল তাঁকে নতুন লেখা পড়তে বলা হত তিনি ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়তেন এবং আশেপাশের লোকেরাও তাই সেই সঙ্গে তটস্থ হয়ে থাকত।” এই ঘটনার সাক্ষ্য প্রতিমাদেবীকে লেখা, মীরা দেবীর আর একটি চিঠিতে কিছুটা পাওয়া যাবে — “ভাই বৌঠান, …বাবা যে গল্পটা লিখছিলেন সেটা শেষ হয়েছে দু-তিন দিন আগে, জন-কয়েককে প’ড়ে শুনিয়েছেন। সেদিন সকাল থেকে সে কী এক্সাইটমেন্ট বাবার, সকালে সুধাকান্তর সঙ্গে এক দফা ঠিক হ’ল কাকে কাকে ডাকা হবে, সেই মতো মহাদেব (ভূত) পাড়ায় পাড়ায় চিঠি বিলি করে এল, তার পরমুহূর্তে সেই সুধাকান্ত নাইতে-খেতে বাড়ি গেছে আবার মহাদেব ছুটল সুধাকান্তকে ডাকতে। সুধাকান্ত আসতে আবার কী পরামর্শ হলো, আবার চিঠি নিয়ে লোক দৌড়ল। সেদিন মহাদেব অনবরত ছুটাছুটি করেছে আর সুধীর কর বেচারা লেখা কপি করা নিয়ে বকুনি খেয়েছেন তেমনি। বাবা এমন ইরিটেটেড মেজাজে ছিলেন, পড়া শেষ না-হওয়া পর্যন্ত যে-কটি আমরা উপস্থিত ছিলুম গল্প পড়ার সময় ভয়ে সব জুজু হয়ে বসে, কারোর মুখে হাসি নেই বা কথা নেই। উপরে গিয়ে চারদিক তাকিয়ে মনে হ’ল যেন আসামীরা কোর্টে হাজিরা দিতে এসেছে, এখন মনে করতে হাসি পাচ্ছে। যে বিষয় নিয়ে এত ভয় সঞ্চার হয়েছিল আসলে গল্পটা কিন্তু সেরকম ভয়াবহ নয়। গল্পটা আরো এন্জয় করা যেত যদি গল্প পড়ার ভূমিকাটা তদনুযায়ী হোত। … গল্পটি হচ্ছে বর্তমান যুগের মেয়েদের নিয়ে।”
চিকিৎসকদের নিষেধ সত্ত্বেও কবি ১৯-সেপ্টেম্বর, ১৯৪০ [৩-আশ্বিন, ১৩৪৭] কলকাতা থেকে কালিম্পঙ যাত্রা করেন। সেখানে ২৫-সেপ্টেম্বর থেকেই তাঁর শরীর খারাপ হতে থাকে। অসুস্থতার খবর পেয়ে মংপু থেকে মৈত্রেয়ীদেবী এলে কবি ‘ল্যাবরেটরি’-র পাণ্ডুলিপি তাঁর হাতে দিয়ে বলেন, ‘বড়োই ইচ্ছে ছিল গল্পটা তোমাদের পড়ে শোনাব, বউমাও শুনতে চেয়েছিলেন কিন্তু সে আর আমার দ্বারা হল না, পড়ে নিও।’ ১৩৪৭-এর শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার সময় তিনি রোগশয্যায়। অথচ রোগযন্ত্রণা তাঁর আনন্দ প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে নি। প্রতিমা দেবী লিখছেন — ‘জোড়াসাঁকোয় বাবামশায় দু-মাস রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করলেন, কী কষ্ট পেয়েছেন চোখে যাঁরা দেখেছেন তাঁরাই জানেন। তাঁর এই অসুস্থতার মধ্যে পুজোর ‘আনন্দবাজার’ বেরল, তাতে ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল, অসুখের মধ্যে সেদিন তিনি ভালো ছিলেন তাই কাগজখানি আসবামাত্র আমার স্বামী তা নিয়ে গিয়ে তাঁকে দেখিয়েছিলেন। কী আগ্রহ তাঁর গল্পটি দেখে, ডাক্তারদের বারণ সত্ত্বেও তিনি কাগজখানি হাতে নিয়ে আগাগোড়া চোখ বুলিয়ে গেলেন। সোহিনীকে নিয়ে যখন কেউ কেউ আলোচনা করতেন, তাঁদের প্রায়ই বলতেন, ‘সোহিনীকে সকলে হয়তো বুঝতে পারবে না, সে একেবারে এখনকার যুগের সাদায়-কালোয় মিশনো খাঁটি রিয়ালিজম্, অথচ তলায় তলায় অন্তঃসলিলার মতো আইডিয়ালিজম্ই হল সোহিনীর প্রকৃত স্বরূপ।’ বন্ধুবান্ধব এসে গল্পটির প্রশংসা করলে অসুখের মধ্যেও তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত।” গল্পটি পড়ে অমিয় চক্রবর্তী চমকে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন ৭ রাইসিনা রোড, নিউ দিল্লি থেকে ৬-নভেম্বর, ১৯৪০ কবিকে লেখা পত্রে — “পঞ্জাবের নানা জায়গায় ঘোরবার কালে ট্রেনে বসে ল্যাবরেটরি গল্প পড়লাম। মনেও করা যায় না এমন গল্প লেখা যেতে পারে। শুকনো ধুলির পৃথিবী সম্পূর্ণ মাধুরীতে ভ’রে গেল — ভুলেই গেলাম বাংলার বাহিরে আছি, চতুর্দিকে যুদ্ধ লেগেচে; বুঝতে পারলাম জীবনের সন্ধান কোনখানে। চমৎকৃত কল্পনায়, নিগূঢ় শিল্পে মননে চরিত্রচিত্রে মর্মান্তিক এমন গল্প লেখা হয়নি।” কয়েক মাস পরে বুদ্ধদেব বসু শান্তিনিকেতনে এসে অস্তাচলগামী কবির স্নেহ-সান্নিধ্য লাভ করেন। ‘সব পেয়েছির দেশে’ বইতে তাঁর সেই অদ্ভুত স্মৃতি লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। বুদ্ধদেব লিখছেন — “আমাদের দেশের মেয়েদের ভালোবাসায় যে অন্তিক কল্যাণ কামনা, তা একদিন থেকে যেমন লালন করে তেমনি অন্যদিক থেকে দুর্বলও করে। তাঁর মনকে নাড়া দেয় সেই ভালোবাসা যা প্রেমাস্পদকে ধরে রাখতে চায় না, প্রেমাস্পদকে বড়ো করতে চায়, আর তার জন্য ত্যাগ করে নির্ভয়ে, দুঃখ নেয় মাথা পেতে। সোহিনীতে সেই চরিত্রবতীকে তিনি এঁকেছেন যে একদিক থেকে বাস্তবিকই খারাপ মেয়ে, কিন্তু অন্যদিকে একটি মহৎ জীবনব্রতে যে উৎসর্গিত। সেখানেই তিনি অকুন্ঠিত অভিনন্দন জানিয়েছেন যেখানে দেখেছেন এমন কোনো লক্ষ্যের প্রতি নিষ্কম্প্র নিষ্ঠা, যা প্রচলিত ভালো-মন্দর বাইরে ও নিজের সুখদুঃখের উপরে।” ১৩৪৮ সালের শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘প্রগতি সংহার’। কবির প্রয়াণ বছরে। সম্ভবত ১১-২১ জুন, ১৯৪১ [২৮ জ্যৈষ্ঠ-৭ আষাঢ়, ১৩৪৮] সময়সীমায় গল্পটি রচিত। গল্পটির প্রথমে নাম ছিল ‘কাপুরুষ’। শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশিত হয় ৩ আশ্বিন, ১৩৪৮ [২০ সেপ্টেম্বর, ১৯৪১]। প্রকাশের পূর্বে ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৪১ [৩০ ভাদ্র, ১৩৪৮] আনন্দবাজার পত্রিকায় এ সম্পর্কে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল — “শারদীয়া / আনন্দবাজার পত্রিকা/ পরিকল্পনা, রূপসজ্জা ও পরিবেশন রীতিতে অভিনব/ মূল্যবান মসৃণ কাগজে, বহুবর্ণরঞ্জিত সুদৃশ্য প্রচ্ছদপটে / বিচিত্র চিত্রসম্ভারে, বিষয় বৈচিত্র্যে ও রচনা সৌষ্ঠবে/ সর্বাঙ্গসুন্দর হইয়া বাহির হইতেছে/ এই সংখ্যায় আছে/ বহুচিত্রশোভিত/ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের / শেষ গল্প / ‘প্রগতি সংহার’।”
‘রবিবার’ ও ‘ল্যাবরেটরি’র মতো ‘প্রগতিসংহার’ সম্ভবত শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকার জন্য প্রত্যক্ষত লিখতে হয় নি। কবির মহাপ্রয়াণের পর, পত্রিকা কর্তৃপক্ষই শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশের-ব্যাপারে প্রয়াসী হয়েছেন। ‘প্রগতিসংহার’-ও আধুনিক কলেজশিক্ষার প্রেক্ষাপটে প্রেম ও স্বার্থপরতার দ্বন্দ্বময় কাহিনি। এটিই ছোটোগল্প-স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের লেখা শেষতম গল্প। সম্ভবত কবির বিশেষ অনুগত কোনও বিদ্বান ও সাহিত্যিকমহলে সুপরিচিত বিদগ্ধ ব্যক্তি এবং সমকালীন জনৈকা প্রগতিশীল মহিলার ছায়াপাত ঘটেছে এ গল্পের প্রধান দুই চরিত্রে!
একালে, পুজোসংখ্যার সংখ্যাধিক্যের বাজারে, রবীন্দ্র-সমকালে ‘রবীন্দ্রনাথের পুজোর লেখা’ সম্পর্কে নতুন করে কৌতূহল জন্মাল। তাঁর মহাপ্রয়াণের বিরাশি বছর পরেও, বিশিষ্ট জনেদের লেখা কবির বেশ কিছু চিঠিপত্র বিভিন্ন পত্রপত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়ে চলেছে এখনো। এখনো তিনি কতভাবেই না আমাদের কাছে ‘অপ্রকাশিত’!
মধুর তোমার শেষ যে না পাই…
অনেক সাধুবাদ জানাই।
বড়ো অশান্ত সময়ে, বড়ো নিষ্ঠুর সময়ে সেই অমৃতময় পুরুষের ক্ষণিক প্রকাশে যার পর নাই আলোকিত পুলকিত হলুম।
ধন্যবাদ, ম্যাডাম। মনোযোগসহ আমার সামান্য লেখা পড়ার জন্য।
দাদা! মনটা সত্যিই খারাপ হলো,কারন আজ এই পর্ব
শেষ হলো তাই।আরো লেখা চাই।
যে বিষয়গুলি আপাত অনালোকিত, সেগুলি একত্রিত করে লেখার চেষ্টা করি মাত্র…
মনদিয়ে আমার অকিঞ্চিৎকর লেখা পড়ার জন্য ধন্যবাদ, ভাই।