১৩৩৩-এর বার্ষিক বসুমতীতে প্রকাশিত হয়, আরও তিনটি কবিতা– ‘তার সাড়া’ [ক্ষণে ক্ষণে কাজের মাঝে…], ‘পারের তরী’ [পারের তরী এসেছে তার ছায়ারি পাল তুলে…], ‘প্রাণের দান’ [নিতে যারা জানে তারাই জানে…]।
১৩৩৪-এর বার্ষিক বসুমতীতে আরও একটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল — ‘তোমার প্রীতি করুণ স্মৃতি’। পরপর তিন বছরে বার্ষিক বসুমতীতে প্রকাশিত কবিতাগুলির কয়েকটি ঈষৎ সম্পাদিত হয়ে ‘পূরবী’ কাব্যে স্থান পায়।
‘প্রহাসিনী’র ‘কালান্তর’ কবিতাটি [তোমার ঘরের সিঁড়ি বেয়ে…] ১৩৪৭ বঙ্গাব্দে শারদীয় ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। লঘু সুরে হালকা ছন্দে স্মৃতি বেদনার মালা গাঁথা এ-কবিতা।
‘ছড়া’ কাব্যের [ছেঁড়া মেঘের আলো পড়ে…] ৫-সংখ্যক কবিতাটি ‘চলচ্চিত্র’ শিরোনামে ১৩৪৭ বঙ্গাব্দের শারদীয় ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় (পৃ. ১৬৩) প্রকাশিত হয়। কবিতাটির রচনাকাল ২১ শে আগস্ট, ১৯৪০ [৫ ভাদ্র, ১৩৪৭], স্থান উদীচী, শান্তিনিকেতন। অবশ্য কবিতা রচনার সূচনাকাল আরও আগে ২৭ মার্চ, ১৯৪০। উক্ত চিত্র-কোলাজ-ধর্মী কবিতাটির পূর্বপাঠ সেটি।
গ্রন্থাকারে প্রকাশের পূর্বে ‘শোধবোধ’ ও ‘পরিত্রাণ’ নাটক দুটি শারদীয় ‘বসুমতী’ (বার্ষিক) পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল যথাক্রমে ১৩৩২ ও ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে। ‘কর্মফল’ গল্পের নাট্যরূপ ‘শোধবোধ’ এবং পূর্বপ্রকাশিত ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নাটকের সম্পাদিত পরিবর্তিত রূপ ‘পরিত্রাণ’।
আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে কবির যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকেই। পরে ক্রমশ গভীরতর হয় সে সম্পর্ক। বলা যেতে পারে, ‘প্রবাসী’ ও ‘মডার্ন রিভিয়্যু’ ছাড়া, ‘দেশ’ সহ, আনন্দবাজারই একমাত্র পত্রিকাগোষ্ঠী, যেখানে শ্রদ্ধার সঙ্গে কবি-সম্পর্কিত সবরকম সংবাদ পরিবেশিত হয়ে এসেছে। কবির জীবদ্দশায় তাঁর অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ভাষণগুলি বিস্তৃত আকারে প্রকাশ করবার অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল এই পত্রিকা, তেমনি সেই ট্র্যাডিশনের সূত্র ধরে আজ পর্যন্ত কবির শত শত অপ্রকাশিত চিঠিপত্রের প্রকাশনায় ‘দেশ’ ও ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ অনন্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। রবীন্দ্রনাথও শেষ বয়সের কয়েকটি আধুনিকতম ছোটগল্প সেদিনের সেই তরুণ বয়সী আনন্দবাজারে প্রকাশের অনুমতি দিয়ে পত্রিকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটাকে আরও বেশি সুদৃঢ় করেছিলেন। আনন্দবাজার যে অত্যন্ত সম্ভ্রমের সঙ্গে যথোচিত মর্যাদায় তাঁর লেখা প্রকাশে উদ্যোগী হ’ত, তার স্বীকৃতি আছে কবির উক্তিতেই। তৎকালীন রবিবাসরীয় বিভাগের সম্পাদক মন্মথ সান্যাল কবির লেখার প্রুফ দেখাতে জোড়াসাঁকোয় গেলে কবি জানিয়েছিলেন — “তোমরা বড়ো ভালো করে আমার লেখাটা সাজাও, দেখলেই সুখ পাই, বেশ ভালো লাগে।”
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উল্লেখ্য, বর্তমানে পুজোসংখ্যায় লেখার জন্য, অনেক বড়ো পত্রিকার তরফেই লেখকদের সম্মান দক্ষিণা দেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথের সময়, অন্যান্য পত্রিকার তরফে এমন ব্যবস্থা খুব একটা না-থাকলেও শেষের দিকে ‘রবিবার’ ও ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পের জন্য আনন্দবাজার কর্তৃপক্ষ তাঁকে কিছু সম্মান-দক্ষিণাও দিয়েছিলেন।
নোবেলজয়ী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও কোনো কোনো সাময়িকপত্রের প্রকাশক প্রাপ্য সম্মান দক্ষিণা থেকে কীভাবে বঞ্চিত করতেন, সচিব অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা নিম্নোক্ত চিঠিই তার প্রমাণ…
“কবিতার জন্য বিচিত্রা তাড়া দিচ্চে। কিন্তু ওরা ফাঁকি দিয়ে পেতে চায় — অতএব চুপ করে থেকো। বসুমতী যা পায় তার দাম দেয়।”
‘চুপ করে থেকো’ অর্থাৎ প্রকাশের জন্য বিচিত্রা পত্রিকা কবিতা চাইলে, কোনো উত্তর দিতে নিষেধ করেছেন ব্যক্তিগত সচিব কে! কেন? কারণ, ‘ফাঁকি দিয়ে’, ‘বিচিত্রা’ কবিতা না পেলেও, ‘দাম দিয়ে’ ‘বসুমতী’ অনেকগুলি রবীন্দ্র-রচনা প্রকাশ করেছিল! ‘বসুমতী’র ইতিহাসে তার সাক্ষ্য আছে।
২৬ চৈত্র, ১৩৩৪ [৮ এপ্রিল, ১৯২৮] কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনে প্রেরিত তৎকালীন সচিব অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা, কবির চিঠি। দ্র. চিঠিপত্র — ১১, পত্র সংখ্যা ৪৯।
উদ্ধৃত অংশটি ‘চিঠিপত্র-১১’ -এর বিশ্বভারতীর সম্পাদকমণ্ডলী অনুক্ত রেখেছিলেন। কিন্তু ‘রবীন্দ্র প্রসঙ্গ : মাসিক বসুমতী’ [সম্পাদনা : প্রণতি মুখোপাধ্যায় অভীককুমার দে, সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত] গ্রন্থে অসম্পাদিত মুদ্রিত হয়েছে।
পাঠভবন-বিশ্বভারতী পরিচালনার জন্য যে অর্থাভাবের মধ্যে তাঁকে পড়তে হয়, তার জন্য এই সম্মান দক্ষিণা গ্রহণ তাঁকে উপকৃত করেছিল। কবির জীবদ্দশায় দুটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয় শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায় এবং একটি তাঁর প্রয়াণের অব্যবহিত পরে। এগুলি হল — ‘তিনসঙ্গী’র, ‘রবিবার’ ও ‘ল্যাবরেটরি’ এবং গল্পগুচ্ছের ‘প্রগতিসংহার’। উল্লেখ্য, ‘তিনসঙ্গী’র গল্প তিনটিতে অস্তগামী রবির রক্তিম রশ্মিচ্ছটা সেদিন বাঙালি পাঠককে একদিকে যেমন বিস্ময়াভিভূত করেছিল, তেমনি রক্ষণশীল একশ্রেণীর পাঠককে বিরুদ্ধ সমালোচনায় মুখর করে তুলেছিল। কেউ কেউ আক্ষেপ করেছিলেন এই বলে যে, আধুনিকতার ছোঁয়াচ শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথও এড়াতে পারলেন না! কেউ কেউ আবার একে বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথের ভীমরতি বলে উপহাস করতেও দ্বিধা করেন নি! ১৩৪৬ বঙ্গাব্দের ২৫ আশ্বিন [১২ অক্টোবর ১৯৩৯] শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘রবিবার’ গল্পটি প্রকাশিত হয়।
গল্পটি ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় প্রকাশের প্রয়াস ছিল বুদ্ধদেব বসু ও হুমায়ুন কবিরের। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশের পূর্বে তাঁরা উভয়ে কবিকে অনুরোধ করেন ‘চতুরঙ্গ’-এর আশ্বিন সংখ্যায় গল্পটি দেওয়ার জন্য। ৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ [১৭ই ভাদ্র, ১৩৪৬] তাঁরা কবিকে অনুরোধ করে একটি পত্রে লেখেন, — “আমরা শুনলাম যে আপনি সম্প্রতি একটি ছোটোগল্প লিখেছেন এবং শান্তিনিকেতনে সেটি পড়ে শুনিয়েছেন। গেলো বছর আপনার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে আমরা আপনার একটি গল্প প্রার্থনা করেছিলুম, তা ছাড়া আপনি কালিম্পং যাবার সময় ট্রেনে এ-বিষয়ে আপনার সঙ্গে কথা হয়েছিল, সে কথা বোধহয় আপনার মনে আছে। তখন আপনার কোনো গল্প লেখা ছিল না, কিন্তু পরে লিখলে আমাদের দেবেন এ রকম আশা দিয়েছিলেন। এবারে এ গল্পটি আমাদের আশ্বিন সংখ্যা ‘চতুরঙ্গ’-এর জন্য কি পেতে পারি না? গল্পটি আকারে বড়ো হলেও আমরা একই সংখ্যায় ছাপতে পারবো। আশা করি এবার আমাদের অনুরোধ আপনি রাখবেন।”
প্রত্যুত্তরে, পত্রপ্রাপ্তিমাত্র ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ [২০ ভাদ্র ১৩৪৬] স্পষ্টবক্তা রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেবকে লেখেন — “অর্থের প্রয়োজনে গল্প লিখতে হয়েছে। অর্থ উপার্জনের অন্য কোনও সহজ পথ জানিনে — বিপদে পড়লে সরস্বতীকে পাণ্ডা করে লক্ষ্মীর দরজায় যেতে হয়। সে লেখাটা বিক্রি করেছি। ভবিষ্যতে আবার গল্প লিখতে হবে কিন্তু একই কারণে। ব্যবসাটা অর্থকরী নয় কিন্তু ভিক্ষার চেয়ে অন্তত ভদ্র।”
ভিক্ষা কেন? বিশ্বভারতীর জন্য! অনুমান করা যায়, চতুরঙ্গের হুমায়ুন বা বুদ্ধদেব সম্ভবত কবির উপযুক্ত সম্মান দক্ষিণা দিতে অপারগ ছিলেন! আর কবিও বিশ্বভারতীর স্বার্থে ‘ভিক্ষার চেয়ে ভদ্র’-ভাবে অর্থ সংগ্রহ করতে নিজের ‘লেখা বিক্রি’ করতে বাধ্য হয়েছেন!
অর্থের প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথ আনন্দবাজার পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশের জন্য দিয়েছিলেন। কিন্তু কত টাকার বিনিময়ে, তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মৈত্রেয়ী দেবী তাঁর ‘স্বর্গের কাছাকাছি’ গ্রন্থের এক জায়গায় (পৃ.২৫২) লিখেছেন — “মনে আছে একবার রথী’দা মংপু পৌঁছলেন।…আর ঠিক সেই সময়ই রবীন্দ্রনাথ ঝুঁকে পড়ে সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকারে একটি ছোট গল্প শেষ করছেন। বলে বলেও তাঁকে ওঠানো যাচ্ছে না। বলছেন সময়মত পাঠাতে হবে শারদীয়ার জন্য। আনন্দবাজার আমাকে একশ’ টাকা দেবে বলেছে।” গল্পটি কি ‘রবিবার’? কেননা, এ সময় ১২-সেপ্টেম্বর থেকে ৯-নভেম্বর (১৯৩৯) পর্যন্ত প্রায় দু’মাস কবি কালিম্পঙে ছিলেন। পরের বছর আনন্দবাজার পত্রিকা, শারদসংখ্যা ১৩৪৭-এ প্রকাশিত হয় ‘ল্যাবরেটরি’। ১৯৪০-এর আগস্টের শেষদিকে কবি গল্পটি লিখতে শুরু করেন। গল্পটি লেখার জন্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়া হয়ে গিয়েছিল। তবে পরিমাণ কত এক্ষেত্রে তা জানা যায় না। এই বার্ধক্যে গল্প লেখা যে কত কষ্টসাধ্য, তা জানাচ্ছেন ২২ আগস্ট, ১৯৪০ [৬ ভাদ্র, ১৩৪৭] শান্তিনিকেতন থেকে পুরীতে সচিব-কবি অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা এক পত্রে —
“আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে বিশ্বভারতী মারফৎ আমার ঘাড়ে একটা গল্প লেখার ফরমাস চাপিয়েছে। সেই ঘাড়ের উপর যে মাথাটা টলটল করচে সেটা প্রায় গজভুক্ত কপিত্থবৎ — লিখতে হয় কষ্টে মন্থর গতিতে। অন্যান্য সকল কাজকে সে মুড়িয়ে খেতে খেতে চলেছে।” (আগামীকাল সমাপ্য)
খুবই ভাল লাগল, অজানাকে জানতে পেরে।দাদা ধন্যবাদ।
????????
শান্তিনিকেতনের স্বার্থে কবির লেখা বিক্রির তথ্য জেনে উপকৃত হলাম……ভালো লেখা
যেমন তথ্য পরিবেশন তেমনি লেখার সহজ চলন লেখকের জ্ঞান এবং স্বকীয়তার পরিচায়ক। ঋদ্ধ হলুম। শুভেচ্ছা রইলো।
দারুণ লেখা। সমৃদ্ধ হলুম। সহজ লেখা যায় না লেখা সহজে…!