| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ফ্রিল্যান্স, স্ট্রিংগার ফটোগ্রাফার হলো দলিত, স্টাফ ফটোগ্রাফার হলেন কুলীন ব্রাহ্মন : অশোক মজুমদার

Reporter
অশোক মজুমদার / ৩৫৭ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৯ জুন, ২০২৩

আমার ছবিওয়ালা জীবনের প্রতিষ্ঠার মূল কারিগর পোস্টের এই খাম। এই খামের সঙ্গেই চিত্র সাংবাদিক হিসাবে আমার যাত্রা শুরু হয়। সাদা বাড়ির কালো গ্রিল তথা আনন্দবাজার পত্রিকার ফিল্মরোল পাঠানোর এই খাম ৮৭ সাল থেকে তিনবার ডিজাইন চেঞ্জ হয়েছিল। আমার সংগ্রহে এটাই তার শেষ খাম। খুব যত্নে রাখা আছে।

৯০ এর দশকের আগে ছবি এবং খবর কিভাবে পাঠাতে হতো সাংবাদিক এবং চিত্র সাংবাদিকদের আজকের লাইভের যুগে তা ভাবলে কিরকম অবিশ্বাস্য মনে হয়। স্পট থেকে ছবি পাঠানোটাই একটা মস্ত ঝামেলার ব্যাপার ছিল। কারণ ওই খামে ফিল্মরোল ভরে ট্রেন, বাস, প্লেন কিংবা গাড়ি ভাড়া করে পাঠিয়ে দেওয়া হত কলকাতায়। স্টেশন, এয়ারপোর্ট, বাসস্ট্যান্ডে অফিস থেকে লোক এসে খাম সংগ্রহ করে নিয়ে যেত। এবং অবশ্যই এই ছবি পাঠানোর নানান কেলেঙ্কারি ঘটনা ঘটতো।

রিপোর্টারদের এরকম সমস্যা ছিলো না। কারণ স্পট কভার করে খবর টেলিপ্রিন্টার ফোনের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েই ওদের কাজে ইতি। কিন্তু ছবি না পৌঁছনোর ফলে সেই দিনের ছবি পরদিন কিংবা দু-দিন এমন কি তিনদিন পরেও প্রকাশিত হত।

আমরা কলকাতার বাইরে যে কোন ঘটনার ছবি তুলতে গেলে আগেই ভাবতে হতো ছবি কীভাবে পাঠাবো এবং সেটা ছিলো রীতিমত একটা পড়াশোনার বিষয়। বাস, ট্রেন, প্লেন কোথা থেকে ছাড়বে তার সময় কখন….একটা লিস্ট আমরা করে নিতাম। আমরা চিত্রসংবাদিকরা আশির দশকের আগে পরে যেভাবে ছবি পাঠাতাম সেটা প্রত্যেকের কাছেই এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়ে আছে। তবে বড় সংবাদপত্রগুলো একটা গাড়ি ভাড়া করেই কলকাতায় ছবি পাঠিয়ে দিতে পারতো।

রিপোর্টারদের যেহেতু এই সমস্যা নেই। ওরা ঘটনা দেখে বুঝে তথ্য নিয়ে চলে যেত টেলিফোন অফিসে। অবশ্য তাদেরও অনেক অনুনয় বিনয় করে বেশি রাত অবধি অফিস খোলা রাখতে অনুরোধ করা হতো। লাইন পরে যেত রীতিমত। ফোনের ঝামেলা হলেও রিপোর্টাররা টেলিপ্রিন্টারে ফোনের প্রতিদিনের খবরটুকু পৌঁছিয়ে দিতে পারতো। ফলে খবর প্রকাশ হয়ে যেত। কিন্তু ছবির জন্য আমাদের নির্ভর করতে হত সেই বাস, ট্রেন বা প্লেন। অনেকসময় আবার মাঝরাতে ফিল্ম পৌঁছে গেলে লাস্ট এডিশনে ছবি ছাপা হয়েছে। কিন্তু সেই ছবি কলকাতার ভিতরেই সীমাবদ্ধ থাকত।

আমি পুরানো ফটোগ্রাফি নিয়ে আমার বন্ধু বিশিষ্ট এবং উচ্চমানের এপির ফটো জার্নালিস্ট বিকাশ দাসের সঙ্গেও কথা বলেছি। বিকাশ আমাদের সময়ের অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার একজন ভালো সফল ফটো জার্নালিস্ট। দেশে বিদেশে ওর তোলা বহু ছবি পুরস্কার পেয়েছে। আজও পেয়ে থাকে। ওর হাতেখড়ি ইংলিশ স্টেটসম্যান কাগজে। যখন ইংলিশ শিখতে গেলেই প্রথমেই বাবা মা বলতেন স্টেটসম্যান কাগজ পড়তে। তখন থেকেই বিকাশ আমার পারিবারিক বন্ধু।

বিকাশের সাথে মোটামুটি আলোচনা করে যে তথ্য পেলাম তাতে পেজার বলে যে জিনিসটা এসেছিল ৯৫-৯৬ এর মাঝামাঝিতে। তাতে মেসেজ আসতো সেটা সাংবাদিক চিত্র সাংবাদিকদের খুব কাজে লাগতো। আমরা দ্রুত মুভমেন্ট করতে পারতাম একটা স্পট থেকে আর একটায়।

মোবাইল এলো ৯৬ এর শেষদিকে। মোটোরোলা কোম্পানির ফোন, অত্যন্ত দামি। যা আমাদের কাছে প্রায় দুঃসাধ্য। তবু অনেকে কিনেছিল।

BSNL… overseas communication service ৯৩-৯৪ এর মাঝামাঝিতে এটার মাধ্যমেও ছবি পাঠাতে পারতো। অবশ্য যেখানে যেখানে এদের অফিস থাকতো। এগুলো বিদেশি এজেন্সির ফটোগ্রাফাররা ব্যবহার করতেন। আর আমরা ট্রেন, বাস, গাড়ি, প্লেন যেখানে যেটা পেতাম এই খাম পাঠিয়ে দিতাম।

রেডিও ফোটোগ্রাফি এলো ৮০-৯০ এর ভেতরে। এখানেও এজেন্সির ফটোগ্রাফার প্রাধান্য পেতেন বিভিন্ন জেলা থেকে রেডিও ফটো পিটিআইকে পাঠানো হত। ওরা ওখান থেকে সাবস্ক্রাইব করা বিভিন্ন কাগজের অফিসে পাঠিয়ে দিতেন। এই সুযোগ একমাত্র এজেন্সির চিত্র সাংবাদিকদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল। ইউএনআই, এপি, রয়টার্স, এএফপি এরাই এই রেডিও ফটোগ্রাফি বাইরে গেলে ব্যবহার করতেন।

আমরা দৈনিক কাগজের চিত্র সাংবাদিকরা বুড়ো আঙ্গুল চুষে ওদের ছবি পাঠানো দেখতাম কারণ কলকাতার কোন কাগজই তখন এত ব্যয়বহুল মেশিন ব্যাবহার করতেন না। তার চেয়ে বছরে পিটিআইকে এককালীন টাকা দিলেই দেশ বিদেশের সব ছবি পাওয়া যেত।

এই আলোচনা যখন করছি মেশিন দূরের কথা ক্যামেরা, বিভিন্ন লেন্স, ফিল্ম যাতায়াত দিনান্তে খাবার সব আমাদের নিজেদের টাকায় করতে হত। কারণ কাগজ ছবি ছাপলে টাকা। আর এর ভিতর দিয়েই ফটোগ্রাফার তৈরি হওয়া। কোম্পানির ভালো লাগলে বা সিনিয়রদের পছন্দ হলে মাসিক একটা টাকা জুটতো। সেই টাকা সাবান তেল কিনতেই খরচ হয়ে যেত।

যেসব নামি দামী স্টাফ ফটোগ্রাফারদের পাশে আমরা কাজ করেছি তারা কখনোই আমাদের পাশে থাকতো না। এমনকি আমাদের মিসগাইড করে পুলিশকে বলে কার্ড না থাকার ফলে বহু জায়গা থেকে বার করে দিতেন।

অনেকটা এরকম বলা ভালো যে, ফ্রিল্যান্স স্ট্রিংগার ফটোগ্রাফার আমরা দলিত ওরা কুলীন ব্রাহ্মন। এর ভিতরেও অবশ্য কিছু ভালো স্টাফ ফটোগ্রাফাররা ছিল যারা লুকিয়ে হলেও আমাদের পাশে দাঁড়াতেন। খবর বলে দিতেন। কিন্তু তাদেরকেও দেখেছি কেমন যেন শেকি হয়ে থাকতে।

সেই সময়ে একজন চিত্র সাংবাদিককে শুধু ছবি তুললেই হতো না, সেই ছবি কাগজের অফিসে পৌঁছানোর জন্য যে কসরত করতে হতো সেরকমই কয়েকটির কথা আপনাদের বলবো। আমার ব্যক্তিগত ছবি পাঠানোর মধ্যে ছটি ঘটনা মনে করে উল্লেখ করলাম। তবে কত সাল ডেট এগুলো আগে পরে হতে পারে, তথ্যগত ভুলটুকু মার্জনা করবেন।

ঘটনা ১

রানীগঞ্জে কোলিয়ারী এক দুর্ঘটনায় ছবি ট্রেন ছাড়ার মুহূর্তে এক ভদ্রলোককে প্যাকেটটা দিয়ে বলেছিলাম, “দাদা আপনি হাওড়া ফিরছেন? এটা রাখুন। আমি আনন্দবাজার পত্রিকার ফটোগ্রাফার। এই প্যাকেটে ফিল্ম আছে। হাওড়া স্টেশনে আমাদের অফিসের কেউ আপনার থেকে প্যাকেটটা নিয়ে নেবে। আপনার বাড়ির ফোন নম্বর দিন।”

ভদ্রলোক ভীষণ শান্ত গলায় বললেন, “আমি নাকতলায় থাকি। এই নিন আমার ভিজিটিং কার্ড। আনন্দবাজার অফিস আমি চিনি। কাউকে পাঠাতে হবে না আমার গাড়ি নিতে আসবে। আমি রিসেপশনে ছবি দিয়ে বাড়ি চলে যাবো।”

আমি খুব আনন্দ পেলাম। ধন্যবাদ দিয়ে ট্রেন থেকে নেমে গেলাম। অফিসকে সব জানিয়ে দিলাম।

ট্রেন রাত ন’টায় হাওড়া স্টেশন পৌঁছানোর কথা কিন্তু এগারোটা অবধি অফিসে কোন ছবির প্যাকেট আসেনি দেখে আমি ভদ্রলোককে ফোন করলাম। উনি সেই রকমই ঠান্ডা গলায় আমাকে বললেন, “দাদা রাত দশটা হয়ে গেছিল তাই বাড়ি চলে এসেছি কাল সকালে অফিস যাওয়ার পথে ঠিক দিয়ে দেব।”

আমি বললাম, “করেছেন কি? আপনার বাড়িতে অফিস থেকে একজন যাচ্ছে আপনি তার হাতে প্যাকেট দিয়ে দেবেন।

আমাদের দিনের ছবি দিনেই দরকার হয়। উফফফফ আপনি অফিসের পাস দিয়ে প্যাকেট না দিয়ে বাড়ি চলে গেলেন!!”

উনি সব কথায় সরি সরি বলে গেলেন। ফোন কেটে অফিসকে সব জানালাম। রাত হলেও পরেরদিন কাগজে ছবি প্রকাশিত হয়।

ঘটনা ২

আবার এই রানীগঞ্জেই আমি এবং টেলিগ্রাফের চিত্র সাংবাদিক শৈবাল দাস কোলিয়ারির এক বড়ো দুর্ঘটনা কভার করতে গিয়েছিলাম। তখনও সেই ট্রেন ভরসা। ছবি তুলে স্টেশন এসে শুনলাম দুপুরের সেই ট্রেন একটু আগেই বেরিয়ে গেছে এর পর যে ট্রেন আছে সেটা রানীগঞ্জ থামবে না। সোজা বর্ধমান তারপর হাওড়া। মাথায় বজ্রাঘাত!! এতো ভালো ভালো ছবি….কি করে পাঠাবো!

দুজনেই স্টেশন মাস্টারের ঘরে ঢুকে খুব কাকুতি মিনতি করে ফিল্ম পাঠানোর কথা বলতেই তিনি জানালেন, “ট্রেন আছে কিন্তু রাণীগঞ্জে দাঁড়াবে না। আপনারা লোকাল ট্রেনে বর্ধমান চলে যান ওখান থেকে দেখুন।”

আমরা অনেক অনুরোধ করলাম প্রায় পায়ে পরে যাবার মতো করে বললাম, “সিগন্যাল এক মিনিটের মতো লাল করে দিন। আপনার হাতেই সব। এও বললাম যে এই ছবি না পাঠাতে পারলে আমাদের চাকরি থাকবে না।”….যেটা আমরা বলেই থাকি বিপদে আপদে।

স্টেশন মাস্টার বললেন, “আপনারা কি পাগল? আমি একটা থ্রু ট্রেন বিনা কারণে লাল সিগন্যাল করে থামাতে পারিনা। চাকরি তো আমারও চলে যাবে আপনাদের কথা শুনলে। প্লীজ আপনারা চলে যান।”

বেরিয়ে আমরা দুজনেই ভাবছি কি করবো? বাবার রেলের চাকরির সূত্রে রেল কলোনিতে থাকার সময় এখনও মনে পড়ে বাবা শর্টকাটে বাজার যাওয়ার সময় আমায় আপ লাইন ডাউন লাইন দেখিয়ে বলতেন কোন দিকে কোন সময় দেখতে হবে। একটা বাহার লাইন ছিলো সেটা শুধু কারশেড থেকে ইঞ্জিন ঢুকতো বেরোত।

সে অনেক কথা, যাইহোক আমি শৈবাল কে বললাম, “শোন আমি ওই দূরের সিগন্যালের কাছে যাচ্ছি। তুই স্টেশনের মাঝে থাক। ট্রেন থামলেই তুই প্যাকেট নিয়ে উঠে যাবি। আমরা যেভাবে প্যাকেট দিয়ে থাকি তুই তাই করবি। ফোন নম্বরটা অবশ্যই নিবি যাকে দিবি। কাজটা করতে গিয়ে ট্রেন যদি জোরে ছেড়ে দেয় নামবি না। বর্ধমান নেমে আবার লোকাল ট্রেন বা বাসে করে চলে আসবি। ফিল্ম যে করেই হোক অফিসে যাওয়া চাই। আমি একটা চেষ্টা করছি ট্রেন থামানোর।”

শৈবাল আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে….

ওকে বুঝিয়ে আমি স্টেশনের সামনে একটু দূরে সিগন্যালের দিকে চলে যাই। দূর থেকেই দেখেছিলাম ম্যানুয়াল সিগন্যাল আছে। অনেকে দেখে থাকবেন খুব লম্বা পোস্টের ওপর লাল হলুদ সবুজ তেরচা করে আগে একটা সিগন্যাল থাকতো। ওটা তারের সাথেই হাত দিয়ে অপারেট করতে হতো।

আমি ঐখানে গিয়ে দাড়ালাম। পোষ্টের গা দিয়ে সরু একটা সিঁড়িও থাকতো শেষ মাথা অবধি। আমি দূর থেকে ট্রেনের আওয়াজ পেয়েই তরতর করে সিগন্যাল এর ওপর উঠে লালটা টেনে দিয়ে দাড়িয়ে থাকি হাত নাড়াই আর চিৎকার করতে থাকি। দেখলাম ট্রেনটা প্লাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে একটু দূরে গিয়ে থেমে গেলো।

আমি নেমেই দৌড়ে গা ঢাকা দিলাম। দুর থেকে দেখলাম স্কুল কলেজ পড়ুয়া কিছু ছেলেমেয়ে লোকাল ট্রেনে উঠবে বলে হয়তো বসে ছিলো তারা দৌড়ে হাসতে হাসতে ট্রেনে উঠে পড়লো।

মিনিটখানেক পর ট্রেনটা ছেড়েও দিলো। শৈবালকে দেখতে পাচ্ছি না। স্টেশন মাস্টার দাড়িয়ে আছে। আমি গুটি গুটি পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। শৈবালও এলো।

স্টেশন মাস্টার আমাদেরকে বলল, “আপনারা কি করলেন এটা? এক্ষুনি আমি আরপিএফ ডাকবো।”

আমি বললাম,”স্যার আমরা কিছু করিনি তো।”

হাত ধরে বললাম, “অফিসে আসুন কথা বলছি। সব সত্যি বলবো।”

স্টেশন মাস্টারের অফিসে গিয়ে আমি সব বললাম। এও বললাম, “আপনার যা শাস্তি হয় দিন আমাদের ফিল্ম কিন্তু অফিসে পৌঁছে যাবে। আমরা কোথাও পালাবো না। এই দেখুন আমাদের গভর্মেন্ট অ্যাক্রিডেশন কার্ড।”

একটু ভয় তো পাচ্ছিলাম আমরা। স্টেশন মাস্টার বললেন, “ড্রাইভার আপনাকে দূরের ওই সিগন্যালে দেখে কিছু একটা ডাউট করেছিল। আমাদের মেইন সিগনাল কিন্ত গ্রীন করাই ছিলো। উফফফ আপনারা কি না পারেন।”

আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, “কিন্তু আমাকে রিটিন কৈফিয়ত তো দিতেই হবে। আপনাদের নাম কাগজ অ্যাড্রেস ফোন সব লিখে যান। আপনারা তো ডাকাত। যাক চা খেয়ে বিদায় নিন।”

তবে আমার আর শৈবালের যৌথ ভেঞ্চারে পরদিন আমাদের ছবি প্রকাশিত হয়।

ঘটনা ৩

মালদায, মুর্শিদাবাদ, রায়গঞ্জ বন্যা কভার করতে গেছি। সালটা ঠিক মনে নেই। কোনরকম ট্রেনে মালদা এলেও দুদিনের ভিতরে ট্রেন লাইন রাস্তা সব বন্ধ। ছবি তুলে যাচ্ছি পাঠাতে পাচ্ছি না। তিন চার দিন হয়ে গেছে। সব সাংবাদিকদের একই অবস্থা। সেই সময় আনন্দবাজারের মালদা জেলার রিপোর্টার ছিলেন সোমনাথ চক্রবর্তী। পরে সোমনাথ স্টার আনন্দেও কাজ করেন। খুবই দক্ষ একজন সাংবাদিক।

একদিন সাত সকালে আমি সোমনাথকে বলি, “শোন বাসস্ট্যান্ড চলতো। একটা বাস ভাড়া করেই আজ ফিল্মগুলো পাঠাবো।”

বাসস্ট্যান্ডে এলাম। খুঁজে কথা বলে একটা বাসকে রাজিও করালাম।

বাস ড্রাইভার বলল, “ছাড়তে তো পারি কিন্তু প্যাসেঞ্জার কোথায়। কোথাও জলে যদি আটকে যাই রিস্ক হয়ে যাবে।”

তখন বেলা এগারোটা মত হবে। আমি বললাম, “আপনার বাসে যত প্যাসেঞ্জার হয় সব ভাড়া ও এক্সট্রা কিছু টাকা দেব। যেমন করে হোক এই বাস ধর্মতলায় নিয়ে যান।”

বাস ড্রাইভার বলেছিল, “আটকে পড়লে কি করবো?”

আমি বলেছিলাম, “দেখুন না একটু চেষ্টা করে আটকে পড়লে আবার একটু চেষ্টা করবেন। তারপর আপনার কপালে যা থাকবে তাই হবে। প্লীজ আমাদের ছবির প্যাকেট যাবে। আপনি যদি যান….”

এখনো মনে আছে সেই সময় ভাড়া সহ ড্রাইভারকে প্রায় ১১ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। আমার পাশে সোমনাথ হাঁ করে দেখছিল। আমি ভাবলাম এই ছবি নাও পৌঁছতে পারে কিন্তু যদি পৌঁছোয় তাহলে আমি স্কোর করব। আজ না গেলেও কাল তো যাবে। দেখাই যাক।

বাসের নম্বর নিয়ে আমি অফিসে ফোন করে দিলাম। সাদা বাড়ির কালো গ্রিল (আনন্দবাজার পত্রিকা) রিপোর্ট ছবি পাঠানো নিয়ে কখনো টাকা পয়সা সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের ভাবতেই দেয়নি। সেই খালি বাস শুধুমাত্র ছবির রোল নিয়ে কলকাতায় পৌঁছেছিল প্রায় রাত একটায়। পরদিন একটা ছবি প্রকাশিত হলেও পর পর নিয়মিত অনেক ছবি ছাপা হয়।

ঘটনা ৪

পুরুলিয়ার আর্মস ড্রপ এর খবর। সেই ঘটনা পুলিশ থেকে মিডিয়া সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সারাদিন ছবি তুলে দুর্গাপুর বা ধানবাদ স্টেশন থেকে আমাদের বিকালের কোন এক্সপ্রেস ট্রেনে প্রতিদিন ফিল্ম রোল ধরানোটাও ভীষন ঝামেলার কাজ ছিল। একটু মিস হলেই ব্যাস। তাই ছবি তুলেই ঠিক সময় মতো আমাদের স্টেশন পৌঁছানো ছবি তোলার চেয়েও যেন কঠিন মনে হত।

ছবি তোলার জায়গা বুঝে আমরা স্টেশনটা বুঝে নিতাম। তবে ধানবাদটাই বেশি সুবিধা হত। গার্ড বা ড্রাইভার এর কাছে একসাথে ফিল্মের প্যাকেট ধরাতাম। রাতে হাওড়ায় ট্রেন ঢুকলে যে যার মতন অফিসের কেউ খামগুলো নিয়ে যেতেন। সাধারণত নাইট ডিউটিতে থাকা ফটোগ্রাফাররা এই কাজটা দায়িত্ব নিয়ে করতেন।

ছবি তোলার পর এক ঘন্টার বেশি জার্নি করে ধানবাদ স্টেশনে পৌঁছতে হতো। সেই সময় রাজীব দে, দেশকল্যাণ চৌধুরী, অমিত দত্ত, কে.কে রায় (পি টি আই এর এই বন্ধুটা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। খুব প্রাণবন্ত এই বন্ধুকে আমরা সবাই খুব মিস করি ) আমরা বিভিন্ন কাগজের হলেও একসাথেই কাজ করতাম।

একদিন খবর পাই পুলিশ গ্রামে ঢুকে খুব মারধর করেছে আর্মসগুলোর হদিস পাবার জন্য। আমরা সবাই হাজির একটা ভাড়া গাড়িতেই আমরা কাজ করতাম। মনের মতো ছবি বলে আমরা ছবি তুলতেই থাকি। কিন্তু হাতে বেশি সময় নেই। যা তুলেছি সেগুলো নিয়ে দৌড়ে গাড়ি করে স্টেশন না পৌঁছলে ট্রেন ছেড়ে যাবে। এই স্পট থেকে ধানবাদ প্রায় ৫৫ কিলোমিটারের বেশি। তাও গাড়ির কাছে পৌঁছতেই অবস্থা খারাপ কারণ অনেকটা হাঁটতেই হবে। সেটা বেশ কষ্টকর।

এদিকে সবাইকে বারবার বলছি, “ছবি তোলা শেষ কর এর পর ট্রেন মিস করবো।”

কিন্তু কে কার কথা শোনে। সবাই নানান অ্যাকশন ছবি তুলতেই ব্যাস্ত। প্রচণ্ড পেটাচ্ছে পুলিশ ছেলেমেয়ে এমন কি শিশুরাও বাদ যাচ্ছে না। একটার পর একটা ছবির আশ যেন মেটেই না।

কিন্তু থামতে তো হবেই। আমরা সবাই। জানি ছবি তোলার চেয়েও ছবি ঠিক সময় পৌঁছানো অনেক জরুরী।

আমি অনেকবার বলার পরও এই যাচ্ছি এই যাচ্ছি আর একটু দাঁড়াও, হাতে অনেক সময় আছে, তাড়াহুড়ো করছো কেন? এইসব বলছে…. আমি ঘড়ি দেখে দৌড়তে শুরু করলাম গাড়ির কাছে। আমি যখন গাড়িতে উঠছি দেখি বন্ধুরা মাঠ আল পেরিয়ে অশোকদা দাঁড়াও আসছি বলতে বলতে ছুটছে গাড়ি ধরবে বলে। সেটাও অনেক দূর।

না আমি তখন এক মিনিটও সময় নষ্ট করতে রাজি নই। ড্রাইভারকে বললাম, “ধানবাদ স্টেশন চলো। দাঁড়াতে হবে না।”

প্রায় এক ঘণ্টার ওপর গাড়ি ছুটিয়ে ধানবাদ স্টেশন পৌঁছে দেখি ব্ল্যাক ডায়মন্ড দাঁড়িয়ে আছে। সোজা গার্ডকে প্যাকেট ধরিয়ে বললাম, “আপনার কাছে আমাদের লোক স্টেশন থেকে এই প্যাকেটটা নিয়ে নেবেন।”

তখন উনি জানালেন, “ট্রেন একটু লেটে ছাড়বে। ইঞ্জিনের গন্ডগোল।”

আমি স্টেশনের পাশে জল চা খাচ্ছি। আর ভাবছি ট্রেন ছেড়ে দিলে আমার কিছু বলার থাকবে কিন্তু না ছাড়লে ওরা যে আমায় কি করবে কে জানে!

কিছুক্ষন পর দেখি ওরা পুলিশের গাড়ি বা কোনো ভাড়া গাড়িতে একসাথে নামলো। আমায় দেখে কোনো কথা না বলে ট্রেনে গিয়ে ওই গার্ডকেই প্যাকেট দিয়ে এলো।

কে.কে ছাড়া সবাই আমার জুনিয়র তাই প্রথমে কে.কে বেশ কিছু কথা শোনাল। তারপর এক এক করে সবাই। আমি বুঝি এটা আমার সাথে হলেও আমিও ছাড়তাম না। ট্রেন কিন্তু তখনও দাঁড়িয়ে।

আমি অনেকক্ষন পর বললাম, “ট্রেনটা লেট না করলে কি তোরা ফিল্ম ধরাতে পারতিস?”

যদিও এটা ওরা কিছুতেই মানতে নারাজ। আর সেটাই স্বাভাবিক। ট্রেন ছেড়ে যাবার পরও বেশ তর্ক বিতর্ক হলো। ওদের চা খেতে বললাম কেউ খেলো না। এমন কি ওরা ওদের গাড়ি করেই হোটেলে ফিরলো। আমি একাই ফিরলাম হোটেলে। দুদিন ওরা কেউ আমার সাথে কথাও বলতো না। তারপর কাজ আমাদের সব ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু এখনও আড্ডার ভিতরে এটা বলতেও ছাড়ে না যে, “অশোকদা এমন মানুষ যে সবাইকে ফেলে চলে আসতে পারে।”

হ্যাঁ পারি সত্যি পারি। যে যাই ভাবুক। এমন দৃষ্টান্ত আমার অনেক আছে। সেটা বন্ধুরা দুর্নাম করলেও আমি নিজের কাজে এই অটুট মনোভাব নিয়েই এতো দূর এসেছি। তবে এটাও বলবো যে ১৯৮০ থেকে এখনও অবধি আমার সব বন্ধুরাই আমায় ভালোবাসে আমার বিপদে ওদের সব সময় কাছে পাই।

ঘটনা ৫

১৯৯৪ সালে মুম্বাই হাওড়া মেলে লোটা পাহাড় আর চক্রধরপুরের মাঝে গভীর রাতে দুটো কামরায় আগুন ধরে যায়। সব পাসেঞ্জার তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কামরা বন্ধ অবস্থায় প্রায় ৩৪ জন প্যাসেঞ্জার পুড়ে মারা যায়, সঙ্গে বহু লোক হতাহত। তার মধ্যে অনেকেই ট্রেন থেকে নেমে নিজেদের প্রাণ বাঁচালেও বহু মানুষ আতঙ্কেই আহত হন।

কলেজ স্ট্রিট বসন্ত কেবিনে তখন আমি থাকি। কষ্ট করে এখানে থেকেছিলাম কারণ একটাই যে এখান থেকে হেঁটে হেঁটে আনন্দবাজারে পৌঁছে যেতে পারি। আমার রুমের পাশে ভাতৃপ্রতীম আজকালের বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার কুমার রায় থাকতেন। আর একজন রিপোর্টার আশীষ মৈত্র।

প্রতিদিন সকালে উঠে আনন্দবাজারে গিয়ে চারতলার রিপোর্টিং বিভাগে সারারাত ধরে টেলিপ্রিন্টারে যে খবর আসতো সেগুলো দেখতাম। কলকাতা ছাড়াও অনেক খবর পিটিআই, ইউএনআই টেলিপ্রিন্টারে সংক্ষেপে আসতো।

তখন আনন্দবাজারের মর্নিং ডিউটি ১১ টায় শুরু হত। নাইট ডিউটি ছিল রাত ৯.৩০ অবধি। কুলীন ব্রাহ্মণ স্টাফ ফটোগ্রাফাররা বাড়ি চলে গেলেও আমাদের মত দলিত ফ্রিল্যান্স ও স্ট্রিংগাররা একটু রাত বা সকালের দিকে ঘুরঘুর করতাম। যদি কিছু একটা পাওয়া যায়।

আমি তো সাত সকালেই হেঁটে আনন্দবাজারের চার তলায় পৌঁছে টেলিপ্রিন্টারের আসা কাগজগুলো দেখতাম। অনেক খবর আগেই অবশ্য জানতে পারতাম। তখন তো ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল কিছুই ছিল না। সবই ম্যানুয়ালি অপারেট করতে হত।

এমনই এক সকালে দেখি চক্রধরপুরে ট্রেনে আগুন লেগে বহু হতাহত হয়েছে। মুখ্য চিত্র সাংবাদিক বিশ্বরঞ্জন রক্ষিতকে ফোন করে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। উনি বললেন, “দাঁড়াও অফিস যাই তারপর দেখছি।”

বললাম, “বিশুদা অনেক দেরি হয়ে যাবে। আমি রওনা দিই পরে আপনি সিনিয়র কাউকে পাঠাবেন।”

বিশুদা বললেন, “গাড়ি ভাড়া থাকা খাওয়া এতো টাকা কোথায় পাবি?”

বললাম, “আমার কাছে ফটো এ্যাসোসিয়েশনের হাজার পাঁচেক টাকা ক্যাশ আছে। আমি ওই টাকা নিয়ে যাই। এসেই আবার দিয়ে দেবো।”

তখন আমি PPAI (প্রেস ফটোগ্রাফার এ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার ট্রেজারার ছিলাম)। বিশুদা কিছুটা অবাক হলেও আমায় আপত্তি করেন নি।

আমি কি করে ওখানে পৌঁছোই এবং কাজ করি সেও এক গল্প বটে। সেটা অন্য একদিন আপনাদের বলবো। জেনে রাখুন রাতের ওই ঘটনায় পরেরদিন দুপুরে একমাত্র সাংবাদিক আমি স্পটে পৌঁছতে পেরেছিলাম।

বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্সিকিউটিভ এডিটর সুমনদার মুখে আমি স্পটে আছি শুনে ওনাকেও ফোনে আমি দুবার সব জানিয়েছিলাম। আমি যে ওখানে পৌঁছেছিলাম সেটা সত্যি কি না বোঝাতে লোকাল বুথ কর্মীর সাথে আমাদের অফিসের সুমনদা, সঞ্জয় সিকদার, অনিন্দ্য জানার সাথে কথা বলিয়ে দিতে হয়েছিল।

এই ঘটনায় আনন্দবাজার পত্রিকার তিনজন রিপোর্টার রওনা দেয় কিন্তু কেউই সেদিন স্পটে পৌঁছতে পারেনি। কেউ খড়গপুর, কেউ টাটা, কেউ ঝাড়গ্রামে নাইট হল্ট করেন।

সব ছবি তুলে চক্রধরপুর স্টেশনের একটু দূরে একটা বেশ সাজানো গোছানো গাড়ি দেখতে পেয়ে ড্রাইভার এর কাছে জানতে পারি সেই সময় রেলমন্ত্রী জাফর শরীফ এসেছেন ঘটনাটি দেখতে।

আমি ড্রাইভার এর কাছে জানতে চাইলাম, “উনি এখন কোথায়?”

ড্রাইভার আমাকে বললেন, “বোধয় হাসপাতালে।”

তারপর বললাম, “এই ট্রেন কি কলকাতা ফিরবে?”

“নিশ্চয় আমরা রাত দশটার ভেতরে হাওড়া ঢুকবো।”

রাতেই নাকি রেলমন্ত্রী প্লেনে দিল্লি ফিরে যাবেন শুনে আমি মহানন্দে প্যাকেট দিয়ে বললাম, “স্যার এই প্যাকেটটা রাখুন ছবি তোলার ফিল্ম আছে। আমি অফিসকে জানিয়ে দেবো। অফিস থেকে লোক এসে প্যাকেটটি আপনার থেকে নিয়ে নেবে। ইতস্তত করেও অবশেষে ড্রাইভার প্যাকেটটি নিলেন।

আমি নিশ্চিন্তে অফিসে জানালাম ছবি পৌঁছে যাবে। পরে সুভদ্রা ঊর্মিলা মজুমদারের মুখে শুনেছিলাম সুমনদা চিৎকার করে বলে ছিলেন, “এই হচ্ছে অশোক মজুমদার। দেখ সালা ঠিক স্পটে পৌঁছে গেছে।”

অনিন্দ্য জানা ফোনে আমার থেকে রিপোর্ট নিয়েছিলেন। আর বারবার বলছিলেন এটা জেনে এসো ওটা জেনে এসো।

কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য সেই ট্রেন ঠিক সময় ছেড়েও রেলমন্ত্রীর নির্দেশে টাটাতে অনেক রাত অবধি দাঁড়িয়ে ছিল। ট্রেনের ভেতরে যে মহোৎসব হয়েছিল তা আর এখানে বলছি না।

আমার স্কোর করার মত ছবি পৌঁছে ছিল ভোরে। আমার দুঃখ হয়েছিল কিন্তু কিছু করার ছিল না কারণ আমরা এভাবেই ছবি পাঠাতাম। তা কখনো পৌঁছতো কখনো পৌঁছতো না। আবার অনেক সময় ফিল্মটাই পাওয়া যেত না। তবে গুণধর রেলমন্ত্রীর জন্য ফিল্ম না পৌঁছলেও আনন্দবাজারে আমার নাম দিয়ে খবর লিড হয়ে ছিল প্রথম পাতায়। হেডিং ছিলো….”ঠিক সময় ট্রেনের চেন কাজ করলে এত মানুষের মৃত্যুই হতো না।”

ঘটনা ৬

মাদার টেরেসার একটা অ্যাসাইনমেন্ট করে দুপুরে অফিসে ঢুকতেই টেলিগ্রাফের ভাতৃপ্রতীম চিত্র সাংবাদিক প্রদীপ সান্যাল বলল, “অশোকদা হায়দ্রাবাদ থেকে অনেকটা দূরে লাতুরে ভূমিকম্পে বহু মানুষ মারা গেছে। অফিস থেকে রিপোর্টার ফটোগ্রাফার পাঠাবে। বিরাট ঘটনা। তপনদা (মুখ্য চিত্র সাংবাদিক) উপরে গেছে এডিটর অভীক সরকারের সঙ্গে কথা বলতে।”

আমি সঙ্গে সঙ্গে চারতলায় হাজির হতেই দেখি তপনদা এক বান্ডিল টাকা নিয়ে করিডর দিয়ে এগিয়ে আসছে….”তপন দা শুনলাম কোথায় যেন ভূমিকম্প হয়েছে?”

তপনদা, “আর বলিস না, খুব বড় ঘটনা ডিটেলস পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু বহু মানুষ মারা গেছে। এখুনি হায়দ্রাবাদের ফ্লাইট ধরতে হবে। রিপোর্টার আশীষ ঘোষ যাবে। টেলিগ্রাফের মনে হয় শুভজিৎ পাল যাচ্ছে। অভীকবাবু বললেন এখুনি আমায় চলে যেতে…”

“তপনদা আমি যাই না। ঠিক পারবো তুমি অভিকবাবুকে বলে দাও।”

“তুই যাবি? কিন্তু… “বলে তপনদা কিছু বলতে যাচ্ছিল আমি তপনদার হাত থেকে টাকার বান্ডিলটা নিয়ে বললাম, “আমি যাই। কিচ্ছু চিন্তা কোরো না। তুমি এডিটরকে বলে দিও। রিপোর্টার আশীষের সাথে কথা বলে নিচ্ছি।”

তিনতলায় ফটো ডিপার্টমেন্টে নেমেই এয়ারপোর্ট রওনা হলাম। প্লেন ধরে হায়দ্রাবাদ নেমেই শুনলাম লাতুরে যেখানে ভূমিকম্প হয়েছে প্রায় ৪০০ কিলোমিটারের ওপর।

হোটেলে উঠেই গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম স্পটে। যাবার আগে লোকাল অনেক কাগজ কিনে সন্ধ্যের কলকাতার ফ্লাইটে পাঠিয়ে দিলাম। কারণ বুঝেই গেছিলাম ছবি পাঠাতে আমাদের কি অবস্থা হতে পারে।

আমি এবং আশীষ দুজনেই সেই রাতেই লাতুরে রওনা দিলাম। প্রায় কলকাতা বহরমপুর ডিসটেন্স। যখন পৌঁছলাম অন্ধকার। খাবার জলের বোতল নিয়ে সকালের কাজগুলো সেরে নিলাম। ভোরের আলো ফুটতেই দেখি একটা বিশাল এলাকা পাকা বাড়ি কাঁচা বাড়ি মাটির সাথে মিশে গেছে। গ্রামে ঢোকাই যাচ্ছে না। অসংখ্য মৃতদেহ প্রায় ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে যেতে হচ্ছে।

টেলিগ্রাফের শুভজিৎ পাল আমি এক সাথেই আছি। কোনরকম কিছু ছবি তুলে শুভজিৎকে বললাম, “তুই রওনা দে এখুনি ছবি ধরাতে হবে। তোর ক্যামেরা দিয়ে যা। যা আমি তুলবো তোর জন্যও তুলে রাখবো। আমাদের তো একই হাউস।”

আসলে স্পটে পৌঁছেই বুঝেছিলাম ছবি তোলা দূরের কথা ৪০০ কিলোমিটার দূরে হায়দ্রাবাদ গিয়ে ফিল্ম না ধরালে ছবি পৌছবে না। তাই আমাদের কাছে তখন ছবি তোলার চেয়ে ছবি পাঠানোটাই একটা চ্যালেঞ্জ।

প্রতিদিন স্পটে ভূমিকম্পের ছবি তুলে চারশো কিলোমিটার হায়দ্রাবাদ এসে ফ্লাইটে রোল ধরিয়ে পুনরায় ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কি রকম অবস্থা হতে পারে ভাবতে পারছেন?

আমি আর শুভজিৎ কাজটা ভাগ করে নিলাম। একদিন ও আমার রোল নিয়ে যাবে পরের দিন আমি ওর রোল নিয়ে যাব।

গাড়ির কাছে এসে টেলিগ্রাফের রিপোর্টার রাধাকৃষ্ণন এর সাথে দেখা হল। কলকাতার অফিস একবার আলাপ হয়েছিল। ও আগের দিন থেকে সারা রাত আছে। তখন সকাল আটটা বাজে। বললো, “হামলোক আভি নিকাল যায়েঙ্গে।”

শুনেই বললাম, “ভাইয়া পাঁচ মিনিট টাইম দিজিয়ে। হামলোগ কা এক ফিল্ম প্যাকেট আপ লে জায়েঙ্গে। আপকা মেহেরবানি হোগা। ইয়ে প্যাকেট আপ কলকাতা ফ্লাইট সে ভেজ দেনা।”

“কিউ নেহি, জরুর আপ প্যাকেট দিজিয়ে। নো প্রবলেম।”

আমাদের তো আর আনন্দ ধরে না। যাক বাবা সারাদিন মনের সুখে ছবি তুলবো। আজকের মতো তো কিছু একটা হলো।

এবিপি এবং টেলিগ্রাফ একটাই প্যাকেট করলাম। ভিতরে রোল আলাদা করা ছিল। ভোর থেকে যা তুলেছিলাম তাড়াহুড়োয় সব দিয়ে দিলাম।

এখনো মনে আছে সকাল ৯ টা নাগাদ রাধাকৃষ্ণন-সহ কিছু সাংবাদিক চলে গেল। আমি আর শুভজিৎ কিছু খেয়ে ছবি তুলতে ঢুকলাম। দুপুর অবধি অসংখ্য ছবি তুলেছি। এমন অবস্থা যে অন্ধের মতো যা ক্লিক করছি তাই সাবজেক্ট। ভাবার কিছু নেই।

ঠিক করলাম আজ দুজনেই হোটেলে ফিরবো। একটু ফ্রেস হয়ে আবার মাঝ রাতে বেরিয়ে পড়বো। এই সব ছবি অফিস পেলে তিন চার দিন নিশ্চিন্তে ব্যাবহার করতে পারবে।

তখন আমরা সবাই দূরে কোনো ঘটনা ঘটলে এই ভাবেই একবারে অনেক ছবি পাঠিয়ে দিতাম। অফিস সেই ছবি লেখার সাথে পরপর নানানভাবে ব্যবহার করতো। কারণ বহুবার ট্রেন প্লেন বাস ঠিক সময় মতো থাকতো না। ফলে ছবি পৌঁছোতো না। তাই অনেক ছবি একসাথে পাঠিয়ে দিতাম।

যাইহোক, সন্ধ্যের মুখে আমরা হায়দ্রাবাদের টেলিগ্রাফ অফিসে পৌঁছলাম। গিয়ে দেখি রাধাকৃষ্ণন টাইপ করছেন পাশে ফিল্মের প্যাকেটটা রাখা।

আমি বললাম, “আপ ইয়ে ফিল্ম প্যাকেট ভেজা নেহি?”

খুব ঠান্ডা মাথায় রাধাকৃষ্ণন বললেন, “আরে উও প্লেন ছুট গিয়া। কলকাতা কা প্লেন আউর নেহি হ্যায়। কাল সুবে ফ্লাইট মে বুক কর দেগা।”

আমার মাথায় তখন বজ্রাঘাত। মনে হচ্ছে মারি সালাকে। মুখ দিয়ে চিৎকার করে গান্ডু বলেই, শুভকে বললাম চল এয়ারপোর্ট কলকাতা না পেলে আমি দিল্লি চলে যাবো ওখান থেকে রাতের ফ্লাইটে কলকাতায় ছবি পাঠাবো।”

শুভ আমি গাড়ি নিয়ে ছুটলাম। গিয়ে শুনলাম কলকাতার ফ্লাইট বিকাল ৪.৩০ তে ছিলো। দিল্লীর ফ্লাইট এই কিছুক্ষণ আগে গেট বন্ধ করে দিয়েছে। চোখ ফেটে জল আসছে। এত ছবি ধরাতেই পারলাম না। শুভজিৎ চুপ।

চুপচাপ পরদিনের মর্নিংয়ের কলকাতা ফ্লাইটে প্যাকেট বুকড করে হোটেলে ফিরলাম। দেখলাম দিল্লী থেকে বিশিষ্ট সাংবাদিক দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য এসেছে।

আমার মুখে সব শুনে ওর খুব আফসোস হলো। অফিস ফোন করে চিফ ফোটোগ্রাফার তপন দাসকে সব বললাম।

শুনেই তপনদা রেগে আগুন। বললেন, “অভিকবাবু দুবার ছবির কথা জানতে চেয়েছিলেন।”

বললাম, “ওই কাগজগুলো থেকে ছবি কপি করে ম্যানেজ করো।”

তপনদা রেগে চিৎকার করে বলেছিলেন, “আমার চেয়ারটা চলে গেলে তুই বাঁচাবি? আমার তোকে পাঠানোটাই ভুল ডিসিশন।”

আমার কি বলার আছে দেবাশীষ, আশীষ দুজনেই তপনদার সাথে আমার হয়ে কথা বললেন। শুভজিৎ আমি অনেকক্ষণ কথা বলতে পারিনি। আসলে ছবি আটটার সময় তুলে দিয়ে ভরসা করেছিলাম ফিল্ম প্যাকেট পৌঁছে যাবে।

পরদিন আমার পাঠানো লোকাল কাগজ থেকে কপি করে কিছু প্রকাশিত হয়। কিন্তু আজও ভুলতে পারিনি, টেলিগ্রাফ এর রিপোর্টারের ভুলে সেদিন আমাদের ছবিগুলো যায়নি।

এরপরেও আমরা প্রায় ১৬ দিন ওখানে ছিলাম। অনেক ছবি তুলেছি সেগুলো প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রথমদিনের ছবি ধরাতে পারেনি বলে সেই আফসোস আজও রয়েছে। বুঝতেই পারছেন ভালো ভালো ছবি তুললেই হবে না। অফিসে পাঠানোটাও কিন্তু কঠিন ছিল সেই সময়।

আশেপাশে দেখেছিলাম বিবিসি, সিএনএন সব এজেন্সিরা মাঠে তাঁবু ফেলে কিভাবে মিনিটে মিনিটে ছবি এবং খবর পাঠাচ্ছে। এমন কি ওরা ওখানেই থাকছে। যাওয়া আসার সময় হাঁ করে ওদের সিস্টেমগুলো দেখতাম।

৯০ এর দশকের আগে আমরা এভাবেই কাজ করতাম। অনেক সময় মন্ত্রীদের দলবদ্ধভাবে কোন অনুষ্ঠান আগে করিয়ে নিতাম। সব ফটোগ্রাফাররা নিজেদের মধ্যে ঠিক করে একজন ট্রেনে বাসে বা প্লেনে ধরিয়ে দেওয়া হতো। বেশিরভাগ রোলের প্যাকেট স্টেটসম্যান এর অফিসে আসতো। ওখান থেকে সব সংবাদপত্র ফিল্ম সংগ্রহ করত। এমনকি আনন্দবাজারও।

আসলে আমরা প্রতিদিন একটা লড়াই করতাম। সেই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত যারা টিকে গেছেন তারাই সফল হতে পেরেছেন। আমি বাদে। সেই দিনগুলোর কথা বলে আপনাদের কতটা বোঝাতে পারলাম জানি না কিন্তু এভাবেই কাজ করতে হয়েছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে নতুন ফটোগ্রাফাররা হয়তো জানেনও না আমাদের কি সমস্যার ভিতরে ছবি পাঠাতে হতো। আসলে এটুকুই বলতে চাই যে, সেই সময়ে শুধু আমি না সব ফটোগ্রাফারদের কি রকম সংগ্রাম করতে হতো। যা এখন আমি নিজেই ভাবতে পারি না।

জানি, আজকে ছবিওয়ালার গল্প একটু বেশি বড় হয়ে গেল কিন্তু বুঝতেই পারছেন বিষয়টা ভীষনই গুরুত্বপূর্ন তৎকালীন সময়ের নিরিখে। এই খাম দেখে এখনও বহু গল্প মনে পরছে কিন্তু একটা সময় আমাদের প্রত্যেককেই থামতে হয় তাই আজ এখানেই থামলাম। লেখাটা বড়ো হয়ে গেলেও পড়বেন। খামটা আমি যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম, আপনাদের দেখালাম। এই খামে আর কোনোদিন কাগজের অফিসে ছবি পৌঁছাবে না। এটাও এখন একটা ইতিহাসের ধারা বহন করে চলেছে।

১৭.০৬.২০২৩

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev