আগষ্ট ২০১৭। ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স- ২০১৭ এর বর্হিদেশীয় শিক্ষাসফর চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কুয়েতের পর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য শ্রীলঙ্কা। আশ্চর্যজনকভাবে চোখ ধাঁধানো উন্নত দুটি দেশ সফরের পর দক্ষিন এশিয়ার এই দেশটিও আমাদের রীতিমত মুগ্ধ করেছিল। উপকূলে নারকেল গাছের সাঁজানো উদ্যানরাজি, সবুজাভ ঘাসের গালিচাময় প্রান্তর, সুনীল আকাশের রৌদ্রে পাখিদের ওড়াউড়ি। মাটি, বাতাস, আকাশ, বৃক্ষ সব যেন পরিচিত। আসলে যে কোন বাংলাদেশীর কাছে প্রথমে শ্রীলঙ্কাকে মনে হবে কত দিনের যেন চেনা।
বান্দরনায়েক বিমানবন্দর থেকে আমরা কলম্বোয় যাচ্ছি। প্রায় সমুদ্রের কাছে আমাদের হোটেল গালাদারি। শ্রীলঙ্কায় পা ফেলার সাথে সাথেই চোখে পড়ে দক্ষিন এশিয়ার অন্যদেশগুলোর তুলনায় দেশটির উন্নততর জীবন ধারার মান। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভদ্রতা, জীবন ধারার মান, শহরের যানবাহনের শৃংখলা, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা এবং সামাজিক সুচক ইত্যাদি বিচারে দেশটি দক্ষিন এশিয়ার সেরা। মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে সেই শ্রীলঙ্কা এখন দেউলিয়া। কিন্তু কেন এমন হলো? আমরা কি তখন দেশটির প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারিনি? ডিজিটাল অ্যালবামে শিক্ষাসফরের সেই সব রোমান্টিক ছবিগুলো দেখে এসব ভাবছিলাম…। শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশ তুলনীয় নয়। তবে শিক্ষনীয়।
২০০৯ এ গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ততোদিনে অনেকখানি গুছিয়ে নিয়েছে দেশটি। শ্রীলঙ্কা এখন লক্ষ লক্ষ বিদেশী পর্যটকের প্রিয় গন্তব্য। ৫-৬ দিনের শিক্ষা সফরে অন্তর্ভূক্ত হলো, সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলঙ্কা, সেনাবাহিনী সদরদপ্তর, নৌবাহিনী সদরদপ্তর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, লক্ষন কাদিরাগামার ইনষ্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশানস এন্ড ষ্ট্রাটেজিক ষ্টাডিজ ও গলের নৌ ঘাঁটি।
সামরিক বাহিনীর সদরদপ্তরগুলো সফরের সময় তামিল বিদ্রোহ বা ইন্সারজেন্সি দমন ও বর্তমান পরিস্থতি নিয়ে আলোচনা ও মত বিনিময় হয়। ভেলুপিল্লাই প্রভাকরনের নেতৃত্বাধীন তামিল টাইগার্স (লিবারেশন টাইগারস অব তামিল ইলম) ভিয়েতনামের পর সবচেয়ে শক্তিশালী ও দুর্ধষ গেরিলা হিসেবে বিবেচিত ছিল। এমন দুর্ধষ গেরিলা আন্দোলনকে পরাজিত করে শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনী অসাধারন সামরিক দক্ষতার পরিচয় দেয়।

উল্লেখ, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপক্ষে (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রি) ২০০৫ সালে ক্ষমতায় আসার পরই তামিল ইন্সারজেন্সি দমনে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহন করেন। এই সময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তার বড় ভাই গোটাবায়া রাজাপক্ষে অর্থাৎ বর্তমান প্রেসিডেন্ট। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপক্ষে শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনীর একজন লেঃ কর্ণেল ছিলেন (১৯৭১-১৯৯৮)। তাদের দুই ভাই এর বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে (২০০৯) পরিচালিত চুড়ান্ত অভিযানে বন্দী তামিল গেরিলাসহ কয়েক হাজার বেসামরিক তামিল নাগরিক হত্যার অভিযোগ উঠেছিল। পশ্চিমা বিশ্বের বিপরিতে, চীন সরকার তামিল বিদ্রোহ দমনে রাজাপক্ষে সরকারকে ব্যাপক সাহায্য করেছিল। একই সঙ্গে, সেই সময়ে চীন শ্রীলঙ্কাকে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে সাহায্য করে।
কলম্বোর অত্যন্ত ব্যাস্ত কিন্তু গোঁছানো এলাকা, বিজনেস ডিসট্রিকট এ অবস্থিত “সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলঙ্কায়” দেশের অর্থনীতির উপর আমাদের একটি প্রেজেন্টেশন দেয়া হয়েছিল। সেখানে দেশটির অর্থনীতির একটি গোলাপী চিত্রই আমরা পেয়েছিলাম। প্রবৃদ্ধি কম হলেও অর্থনীতি যথেষ্ট প্রানবন্ত ছিল। এই বছর শ্রীলঙ্কা সরকার তাদের ”ভিশন-২০২৫” ঘোষনা করেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল ২০২৫ এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা একটি ধনী দেশে পরিণত হবে।
তবে শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের মত ব্যাপক শিল্পায়ন চোখে পড়েনি। দেশটির কৃষিখাতও আমাদের মতো এতো বৈচিত্রময় ও শক্তিশালী নয়। অর্থনীতি মূলত পর্যটন, চা রপ্তানি ও বিদেশী রেমিটেন্স নির্ভর। শ্রীলঙ্কার মাথাপিছ আয় তখন ছিল প্রায় ৩৮০০ ডলার। “কলম্বো পোর্ট সিটি” নামে উচ্চাকাংখী ও বিশাল প্রকল্পের কিছু ছবি দেখানো হয়েছিল, যা আমাদের বিস্মিত করে।
কলম্বোর সবুজ বানিজ্যিক এলাকার উল্টোদিকে সাগরের বুকে বালি ফেলে যে বিশাল এলাকা জাগিয়ে তোলা হচ্ছে, সেখানে গড়ে তোলা হবে এক হাইটেক নগরী। গল ফেস গ্রীন এলাকার সমুদ্র পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চীনা কোম্পানীর এই কর্মযজ্ঞ দেখেছি। ব্রিফিংকালে, শ্রীলঙ্কার সপ্রতিভ কর্মকর্তা আরো বলেছিলেন- “সাগর ভরাট করে উদ্ধার করা এই জমি শ্রীলঙ্কার মানচিত্র বদলে দেবে। এমন এক বিশ্বমানের নগরী গড়ার সুযোগ দেবে যা কিনা দুবাই, হংকং কিংবা সিঙ্গাপুরের সাথে প্রতিযোগিতা করবে”।
শ্রীলঙ্কার ভৌগলিক অবস্থান এবং সমুদ্র বন্দরগুলো প্রাচীন সিল্ক রুটের সময় থেকে আধুনিক মেরিটাইম সিল্ক রুট পর্যন্ত একটি দুর্দান্ত কৌশগত গুরুত্ব দিয়েছে। শ্রীলঙ্কার গবেষনা প্রতিষ্ঠান “লক্ষন কাদিরাগামার ইনষ্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশানস এন্ড ষ্ট্রাটেজিক ষ্ট্যাডিজ” এ আমাদের সফরটি খুব ইন্টারেষ্টিং ছিল। উল্লেখ্য, এই সময় আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রি। এনডিসির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা সম্পর্কের উপর সংক্ষিপ্ত প্রেজেন্টেশন দেয়া হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার প্রতিমন্ত্রি বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা সম্পর্ককে অত্যন্ত বন্ধুত্বময় ও আন্তরিক বলে উল্লেখ করেছিলেন।
এই সময় শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট ছিলেন মৈত্রীপালা সিরিসেনা, যিনি ২০১৫ সালে মাহিন্দ রাজাপক্ষকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর সরকার ভারত ও চীনের সঙ্গে বেশ ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক রেখে চলছিল। থিংক ট্যাংকটির ব্রিফিং এ শ্রীলঙ্কার কৌশলগত অবস্থান নিয়ে মত বিনিময় হয়েছিল। তখন চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। চীনের “ডেব্ট-ট্র্যাপ ডিপলোমেসি” তত্ত্বটি তখনও সম্ভবত আলোর মুখ দেখিনি।
চোখ ধাঁধানো এক্সপ্রেস হাইওয়ে দিয়ে কলম্বো থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্র তীরবর্তী শহর গল এ যাওয়া ছিল চমৎকার অভিজ্ঞতা। সেখানকার নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে যেয়ে হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর ও মাত্তালা রাজাপক্ষে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সম্পর্কে জানা হলো। তখনও সমুদ্র বন্দরটি চীনকে ইজারা দেয়া হয়নি। তবে সে বন্দর থেকে কাঙ্খিত রিটার্ন আসছিল না। এদিকে প্রার্থিত ফ্লাইট না পেয়ে অরন্যের মাঝে তৈরী নতুন বিমান বন্দরের এয়ার কার্গো টার্মিনাল লিজ দিয়ে সেখানে ধান-চাল রাখা ও সেখানে হাতিসহ বন্যপ্রানী ও পাখিদের বিরুদ্ধে “সামরিক অভিযান” পরিচালনার মজার তথ্যও জানা গেল।
তখন শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন জনাব এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ। প্রতিশ্রুতিশীল ও দক্ষ এই কূটনীতিকের আমন্ত্রনে একদিন তার বাসভবনে (বাংলাদেশ ভবন) যাওয়া হলো। শ্রীলঙ্কায় “একখন্ড বাংলাদেশে” এসে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা সম্পর্ক ও দেশটি সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছিলাম।
বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার কূটনৈতিক সম্পর্ক ১৯৭২ সালে শুরু হলেও দুটি দেশ/অঞ্চল ঐতিহাসিক সম্পর্কে আবদ্ধ। শ্রীলঙ্কায় ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা্ হয় যে, প্রায় আড়াই হাজার পূর্বে বিজয় সিংহ প্রাচীন বাংলা-উড়িষ্যা অঞ্চল থেকে সমুদ্র পথে সিংহলে পৌঁছান। এমনি করে হয়তো গোড়া পত্তন হয়েছিল নতুন জাতির। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রনসিংহ প্রেমদাসা ঢাকায় সার্ক সম্মেলনে (১৯৯২) আনুষ্ঠানিক ভাষনে প্রাচীন বাংলার সন্তান বিজয় সিংহের সিংহল যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
শান্তি নিকেতনের বিশ্বভারতীতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় সিংহলী ছাত্র, আনন্দ সমরকুন এর লেখা একটি গান পরবর্তীতে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে (আপা শ্রীলঙ্কা, নম নম মাতা) স্বীকৃতি পায়। তবে একটা মত আছে যে, রবীন্দ্রনাথ তার প্রিয় ছাত্রকে তার দেশের জন্য বাংলায় একটি গান লিখে দেন ও সুর করেন। আনন্দ সমরকুন পরবতৃীতে এটি সিংহলি ভাষায় লিখেন। এ নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে, এটুকু বলা যায়, এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের কিছু অবদান ও প্রভাব হয়তো আছে।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির (১৯৪৮) পর থেকেই ব্যাপক ঝড় ঝাপটার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে শ্রীলঙ্কা। এবার পড়েছে চরম আর্থিক বিপর্যয়ে। বাংলাদেশ প্রায় প্রতিটি বিপদে সাধ্যমতো দেশটির পাশে থেকেছে। তামিল ইন্সারজেন্সি যখন মধ্য গগনে, তখন বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমীতে শ্রীলঙ্কান সেনা ক্যাডেটদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এছাড়াও, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রীলঙ্কা সশস্ত্র বাহিনীর অনেক সদস্য প্রশিক্ষন গ্রহন করেছেন ও করছেন।
২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর সংঘটিত সুনামীতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল শ্রীলঙ্কা। তখন সাহায্য সামগ্রী নিয়ে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জাহাজ “বিএনএস তুরাগ” সেই দেশে গিয়েছিল। বাংলাদেশের সাহায্য সংস্থা ব্রাক, এই দুর্যোগে শ্রীলঙ্কার ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৬ সালের বন্যা ও ভূমি ধ্বসে শ্রীলঙ্কা আবার ক্ষতিগ্রস্থ হলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ “বিএনএস বঙ্গবন্ধু” নিয়ে আমাদের নৌ সেনারা ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
এইবারও, ২০২১ সালের আগষ্টে অর্থাৎ সংকটের শুরুর দিকে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কাকে ২৫ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিলো। সাম্প্রতিককালে, বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয় দফায় আরো ২০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছিল শ্রীলঙ্কা। তবে এবার দেশটিকে ঋণ দেয়া সম্ভব হয়নি বাংলাদেশের। এই পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে ভারত। বন্ধুপ্রতীম শ্রীলঙ্কার জনগনের এই মহাবিপদে, বাংলাদেশ কিছুটা প্রতীকি হলেও আমাদের উদৃত্ত পন্য থেকে কিছুটা খাদ্য সামগ্রী, ঔষুধ ইত্যাদি পাঠানের কথা কি আমরা ভাবতে পারি?
শ্রীলঙ্কার বর্তমান দুরাবস্থা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি “ওয়েক আপ” কল। ষাট ও সত্তর দশকে লেবানন ছিল (ইসরাইল ছাড়া) মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান ও উদ্যোগী জনগনের দেশ। অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যটন শিল্প ও সার্ভিস সেকটরে শীর্ষে। সেই লেবানন চরম আর্থিক সংকটে পড়ে কয়েকদিন আগে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষনা করেছে। প্রাচীন সভ্যতা ও গনতন্ত্রের পাদপীঠ গ্রীস বহু আগেই দেউলিয়া হয়ে গেছে।
দক্ষিন এশিয়া ও আশে পাশের দেশগুলোতে চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা চলছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় এসেছে। শ্রীলংকা মুখ থুবড়ে পড়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার জেরে এই সপ্তাহেই পাকিস্তানে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। মালদ্বীপ ও নেপালেও সংকটে চলছে। পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত। এরই মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ নানা ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চমৎকারভাবে সামনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এখন ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে…।
করোনার অভিঘাত আরো কিছুদিন চলবে। সাংহাইতে এখন লক ডাউন চলছে। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে তীব্রতা কিছুটা কমলেও ইউক্রেনে পূর্বাঞ্চল ভিত্তিক যুদ্ধ হয়তো অনেকদিন চলবে। এর অর্থনৈতিক প্রভাব মারাত্বক হতে পারে। সব মিলিয়ে আমরা একটা কঠিন সময় পার করছি। করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে জিনিষপত্রের উর্ধ্বগতি মানুষকে কষ্টে ফেলেছে। জিনিষপত্রের দাম কিভাবে সহনীয় রাখা যায় সেখানেই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এই পটভূমিতে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি নির্মোহভাবে বিশ্লেষন করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ অবশ্যই শ্রীলঙ্কা নয়। আমাদের অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী। বিদেশী ঋণের বিবেচনায়ও এখন পর্যন্ত আমরা ঝুঁকিমুক্ত। তবুও শ্রীলংকার বর্তমান পরিস্থিতি থেকে আমরা শিখতে পারি। শ্রীলঙ্কার ব্যর্থতার নির্মোহ বিশ্লেষন আমাদের উন্নয়নকে বরং টেকসই করবে ও বেগবান করবে।
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আমাদের দেখা মুগ্ধতার শ্রীলঙ্কা যেভাবে চরম সংকটে পড়লো সেটি সত্যিই চিন্তার বিষয়। তাহলে শ্রীলঙ্কার সরকার কি জনগনকে দেশের প্রকৃত অর্থনীতি অবস্থা জানতে দেয়নি? শ্রীলঙ্কান কিছু অর্থনীতিবিদ দাবী করেছেন যে, বিভিন্ন সময় তারা সরকারকে সতর্ক করেছে ও পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু ভূল অর্থনৈতিক নীতি, গোষ্ঠিতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র ও দূর্নীতি একটি দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, তার প্রমান শ্রীলঙ্কা।
শ্রীলঙ্কা থেকে শিক্ষনীয় বিষয়গুলো এমন হতে পারে। এক- বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে অবশ্যই মেগা প্রকল্প প্রয়োজন। তবে সেগুলি যেন অতি প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়। বড় বড় প্রকল্পে সুশাসন, স্বচ্ছতা অপরিহার্য। দূর্ণীতি, অপচয় বন্ধ করা ও প্রকল্প সময়মতো সম্পন্ন করা জরুরী। দুই- বৈদেশিক ঋণ গ্রহনে প্রয়োজন সতর্কতা ও চুলচেরা বিশ্লেষন। সতর্ক থাকতে হবে ঋণ পরিশোধের দায় নিয়ে। ঋণ পরিশোধের রোড ম্যাপ করতে হবে। তিন- আমাদের অর্থনীতি এখন অনেকটা তৈরি পোশাক রপ্তানী ও রেমিটেন্স নির্ভর। এখানে আমাদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। রপ্তানী ক্ষেত্রে বহুমুখিতা অর্জন সময়ের দাবী। চার- জনতুষ্টিবাদী বা জন মোহিনী পদক্ষেপ গ্রহন না করা। পাঁচ- বৈদেশিক রিজার্ভ সংরক্ষনে গুরুত্ব দেয়া।
শ্রীলংকানরা লড়াকু জাতি। তাদের অর্ন্তনিহিত এক ধরনের শক্তি রয়েছে। তারা একদিন হয়তো আবার মাথা তুলো দাঁড়াবে। এ অবস্থায় আন্তজার্তিক সম্প্রদায়ের উচিত শ্রীলংকার পাশে দাঁড়ানো। আমাদেরও উচিত সাধ্যমত তাদের পাশে থাকা।
বাংলাদেশকে একটি বিমানের সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায় যে, হাজার বছর পর বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের সুনীল আকাশ উড়তে বা টেক অফ করতে যাচ্ছে। সুদক্ষ বৈমানিকগন বিমানের টেক অফ ও ল্যান্ডিং এর সময় সবচেয়ে সতর্ক থাকেন। সদা সতর্ক থেকে এগিয়ে যাক আমাদের ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। আবার মাথা তুলে দাঁড়াক আমাদের বন্ধুপ্রতীম শ্রীলঙ্কা।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, এনডিসি (অবঃ), গবেষক।