হরিণের ইংরেজি deer, হরিণীর ইংরেজি hind, জার্মানিতে hinde, ওলন্দাজ ভাষাতেও hinde। হিমালয়ান মাস্ক ডিয়ার, যা আগে ছিল আলপাইন মাস্ক ডিয়ার গোত্রের অন্তর্গত, হাজার হাজার বছর ধরে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারতের কাশ্মীর, নেপাল প্রভৃতি অঞ্চলে বাস করে। কস্তুরী মৃগ-র নাম কেই বা শোনেনি। তাদের দেহে লুকানো কস্তুরীর গন্ধে হরিণীরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয় মিলনঋতুতে। বলা যায় হরিণের তূণের অস্ত্র এই কস্তুরী। আবার এই দুর্লভ কস্তুরীর লোভেই শিকারীরা তাদের বধ করে। কথায় আছে আপনা মাংসে হরিণা বৈরী।
আর্যরা ভারতে এসেছিল ইউরোপের জার্মান-রাশিয়া-অঞ্চলের উরাল পর্বতের স্টেপস তৃণভূমি থেকে। হিন্দুকুশ পর্বত পার হয়ে আফগানিস্তানের গিরিবর্ত্ম দিয়ে পাকিস্তান হয়ে কাশ্মীর ও পাঞ্জাবে প্রবেশ করে।একটি বই আমাদের আর্যগতিবিধির সন্ধান দেবে।বইটির নাম ইন্ডিকা। গ্রীক উচ্চারণে ইন্দিকা। মেগাস্থিনিসের নয়, তাঁর থেকে অনেক আগে, গ্রীক চিকিৎসক Ctesias এর লেখা। কিছুটা বাস্তব কিছুটা আজগুবি এই বই। আজগুবি ব্যাপারটার একটা তাৎপর্য আছে। আজগুবি ব্যাপারগুলো থেকে বোঝা যায় এটা পরের মুখে শোনা। হবারই কথা, কারণ এটা আলেকজান্ডারের অনেক আগের সময়। এটি মূলতঃ পারসিকদের কাছ থেকে গ্রীকরা ইন্ডিয়ার ব্যাপারে যা শুনেছিল তার ভিত্তিতে লেখা। হেরোডোটাসও একই ভাবে ইন্ডিয়ার কথা লিখেছেন। অতএব এই ইন্দোই, ইন্দোস, ইন্দিকা, ইন্দিয়া এই গ্রীক কথাগুলো পারসিকদের হাত ধরেই গ্রীসে পৌঁছেছে। সিন্ধু থেকে সোজা ইন্দ হয় না। স থেকে সোজা লুপ্তস্বর হয় না। স থেকে হ হয়, আর হ টা লুপ্তস্বর হয়। পুরোনো পারসিক ভাষায় স হ হয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে।কষ্ট করে স থেকে হ হওয়ার চেয়ে সহজ পন্থায় হ দিয়ে শুরু শব্দ থেকে হিন্দু আসা সম্ভব কিনা সেটাও ভেবে দেখা দরকার। সিন্ধু আর ইন্ডিয়া শব্দদুটোর মাঝখানে রয়েছে হিন্দ বা হিন্দু বা অনুরূপ কোনো শব্দ। ভারতীয় আর গ্রীকের মাঝে রয়েছে পারসিক। ভাষাগত ভাবে বোঝা গেল হিন্দ/হিন্দু জাতীয় শব্দ পঞ্চম পূর্বশতকে ছিল। পুরোনো পারসিক ভাষায়।
এবার দেখা যাক এই শব্দটার কোনো আর্কিওলোজিকাল এভিডেন্স আছে কিনা? আছে। একদম পাথরে খোদাই করা। ইরানের নকশ এ রোস্তম শিলালিপিতে। পঞ্চম পূর্বশতকেই। দারায়ুসের শিলালিপি। ওখানে আছে “হিদুস”। তবে পুরোনো পারসিক লিপিতে চন্দ্রবিন্দু ছিল না, মানে, কথার মধ্যে চন্দ্রবিন্দু থাকলেও সেটাকে লেখার উপায় ছিল না, অতএব হিদুস শব্দটাকে হিঁদুস বলেই মনে করা হয়। হিদুস শব্দটা মূলত উত্তর পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশকে বোঝাতে ব্যবহার হয়েছিল।
নকশ এ রোস্তমে এক জায়গায় তিরিশটি আলাদা আলাদা জাতির সৈনিকদের নাম ও মূর্তি সারিবদ্ধভাবে আছে। তিরিশটি জাতির মধ্যে বিভিন্ন ইরানীয় জাতির নামের পাশাপাশি রয়েছে অনেক বিদেশী জাতির নাম — আরব, যবন, ব্যাবিলোনীয় ইত্যাদির সাথে রয়েছে হিঁদুস জাতির বা অঞ্চলের নাম। হিদুস বা হিঁদুস বলতে যে একটা অঞ্চল, তার ভূপ্রকৃতি, পশুপক্ষী বা তার মানুষজনকে বোঝাতো দারায়ুসের যুগে, অর্থাৎ শুধুই একটা নদীকে বোঝাতো না — এতে সন্দেহ নেই।
পরে অবশ্য মেগাস্থিনিসের ও অন্যান্য গ্রীক লেখকদের পরিভাষায় ইন্ডিয়ার ব্যাপ্তি দেখা গেছে দক্ষিণ ভারত অবধি।
দেখা দরকার ফার্সী শব্দ হিন্দুস্তান বা হিন্দোস্তান শব্দটা কতটা পুরোনো। ঐ নকশ এ রোস্তমেরই আর একটা শিলালিপিতেই। রাজা শাপুরের শিলালিপি। তৃতীয় শতক। এখানে পাবেন হিন্দেস্তান। আল বিরুনির একাদশ শতকের বইয়ের নামেও আছে হিন্দ। হিন্দু শাহী রাজবংশের কথাও উনি বলেছেন। এটি অবশ্য ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের পরবর্তী যুগে।
তাহলে বোঝা গেল হিন্দু বা হিন্দ বা ইন্ডিয়া শব্দগুলো exonym বা বহিঃপ্রদত্ত নাম (জার্মান জাতি বা চীন দেশের মতই) যা প্রাচীন পারসিক ভাষা থেকে বিভিন্ন দেশে পৌঁছেছে। এর প্রাচীনত্ব নিয়ে সন্দেহ নেই।
আর্যরা ভারতে ঢোকার পূর্বে আলপিনীয়, দিনারীয়, আর্মানীয় নরগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের রক্তের মিশ্রণ হয়েছিল। আফগানিস্তান, পাকিস্তান প্রভৃতি অঞ্চলে কস্তুরী মৃগের গন্ধ তাদের আকৃষ্ট করেছিল। কস্তুরীমৃগের গন্ধে আকৃষ্ট হরিণীদের কামতাড়িত অবস্থা দেখে তারা Hind বা Hinde বলে ডাকে এই দেশটিকে। পরে এর অধিবাসীদেরও Hindu বা হিন্দু আখ্যা দেয়। রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি মনে পড়বেই —
পাগল হইয়া বনে বনে ফিরি
আপন গন্ধে মম
কস্তুরীমৃগসম।
ফাল্গুনরাতে দক্ষিণবায়ে
কোথা দিশা খুঁজে পাই না।
যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই,
যাহা পাই তাহা চাই না।
জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় হরিণশিকারের কাহিনী কাব্যিকভাষায় লেখা হয়েছে।
এখানে বনের কাছে ক্যাম্প আমি ফেলিয়াছি;
সারারাত দখিনা বাতাসে
আকাশের চাঁদের আলোয়
এক ঘাইহরিণীর ডাক শুনি—
কাহারে সে ডাকে!
***
কোথাও হরিণ আজ হতেছে শিকার;
বনের ভিতরে আজ শিকারীরা আসিয়াছে,
আমিও তাদের ঘ্রাণ পাই যেন,
এইখানে বিছানায় শুয়ে-শুয়ে
ঘুম আর আসেনাকো
বসন্তের রাতে।
***
চারিপাশে বনের বিস্ময়,
চৈত্রের বাতাস,
জ্যোৎস্নার শরীরের স্বাদ যেন;
ঘাইমৃগী সারারাত ডাকে;
কোথাও অনেক বনে—যেইখানে জ্যোৎস্না আর নাই
পুরুষহরিণ সব শুনিতেছে শব্দ তার;
তাহারা পেতেছে টের,
আসিতেছে তার দিকে।
আমাদের স্মৃতি, সত্তা, ভবিষ্যৎ- সব কিছুর সঙ্গেই যেন জড়িয়ে আছে হরিণীর আর্তনাদ। হিন্দু শব্দটির মূলে হরিণী তথা Hinde-এর ভূমিকা আছে কিনা তা তলিয়ে দেখা দরকার। পশুপাখির নাম থেকে অনেক স্থাননাম, জাতিনাম এসেছে। খোদ আমেরিকায় সাতটি জায়গার নাম এসেছে পশুপক্ষীর নাম থেকে। নিউ ইয়র্কের বাফেলো, আলাস্কার চিকেন-কে কে না চেনে! আমাদের মহিষবাথান, মহিষটিকরি সমানে পাল্লা দেবে। কলকাতার মুর্গিহাটাকেও মনে পড়বে। বঙ্গ, বগধ ও চেরপাদদের পাখি বলে দুয়ো দিত আর্যরা। তারা নিজেরা কি তবে প্রাণির নাম থেকে এদেশ ও জাতির নাম দিতে পারে? অসম্ভব কিছু নয়।