হিন্দু শব্দের সঙ্গে হিন্দোলক শব্দের বেশ মিল আছে।হিন্দোলক মানে পাহাড়ের ডুলি বা দোলা। উত্তরাখণ্ডের একটি গ্রামের নাম ‘হিন্দোলককাল’।
সংস্কৃত ভাষায় ‘আর্য’ শব্দের অর্থ হল ‘সদ্বংশজাত ব্যক্তি’। পণ্ডিতদের মত অনুযায়ী ‘আর্য’ একটি ভাষাগোষ্ঠীর নাম। অর্থাৎ যাঁরা আর্য ভাষায় কথা বলেন তাঁরাই আর্য জাতির অন্তর্ভুক্ত। ফিলিপ্পো স্যাসেটি নামক ফ্লোরেন্সের এক বণিক গোয়াতে পাঁচবছর অবস্থান করার পর (১৭৮৩-১৭৮৮ খ্রিঃ) প্রথম সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে ইউরোপের প্রধান বেশ কয়েকটি ভাষার সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করেন।
১৭৮৬ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে দেওয়া তাঁর বক্তৃতায় তিনি বলেন যে, একই উৎস থেকে উৎপত্তির কারণে এই সাদৃশ্য। তিনি মনে করেন, সংস্কৃত, গ্রিক, ল্যাটিন, পারসিক, কেল্টিক, গথিক, জার্মান ইত্যাদি একই উৎস থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এই ভাষাগুলো পন্ডিতদের কাছে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা বা ইন্দো-জার্মান ভাষা রূপে পরিচিত। এই ভাষাগত সাদৃশ্যের কারণে কঠিন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে যে, যে জাতিগোষ্ঠী এই আর্য ভাষা ব্যবহার করতেন তাঁদের আদি বাসভূমি বা আদি নিবাস কোথায় ছিল? তাঁরা কোথা থেকে ভারতে আগমন করেছেন? এ সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। একদল মনে করেন যে, ভারতবর্ষই আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল। পরবর্তীকালে তাঁরা ভারতের বাইরে পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। অন্য পণ্ডিতদের মতে, আর্যরা বাইরে থেকে এসে ভারতবর্ষে বসতি স্থাপন করে। যাঁরা মনে করেন যে ভারতবর্ষ আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল, তাঁরা নিম্নলিখিত যুক্তি পেশ করেছেন।
(১) আর্যদের প্রাচীনতম গ্রন্থ হল ‘বেদ’। এই বেদ রচিত হয়েছিল ভারতের মাটিতেই। বেদের মধ্যে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে। বৈদিক সাহিত্যে যে সকল গাছ ও পশু-পাখির উল্লেখ রয়েছে সেগুলি ভারতের এই অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায।
(২) পারগিটারের মতে, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আর্যদের ভারত আগমনের কোন নির্দিষ্ট প্রমাণ ভারতের ইতিহাসে নেই, বরং উত্তর-পশ্চিম দিক হতে আর্যদের ভারতের বাইরে চলে যাওয়াটা সম্ভব। ঋগ্বেদের মধ্যে নদী স্তোত্রে যে নদীগুলোর নাম উল্লেখ হয়েছে তা গঙ্গা দিয়ে শুরু হয়ে উত্তর-পশ্চিম হয়ে সরস্বতী নদীতে দিয়ে শেষ হয়েছে। এই নদী স্তোত্র থেকে স্পষ্ট ধারণা করা যায় যে আর্যরা পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিমে গিয়েছিলেন।
(৩) আর্যদের মধ্যে যাঁরা দেশ ত্যাগ করে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস স্থাপন করেন তাঁরা তাঁদের আদি বাসভূমি অর্থাৎ ভারতের কথা স্মরণ করে থাকেন। কিন্তু বৈদিক সাহিত্যে ‘সপ্তসিন্ধু’ ছাড়া অন্য কোন দেশের উল্লেখ পাওয়া যায় না।
(৪) আর্যরা যদি বহিরাগত হয় তাহলে তাঁদের আদি বাসভূমিতে বেদের মত কোন গ্রন্থ রচিত হওয়ার কথা ছিল? এসব যুক্তির অবতারণা করে কিছু পণ্ডিত দাবী করেন যে, আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল ভারতবর্ষ।
কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক এই যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করেছেন। তাঁদের যুক্তিগুলো নিচে বর্ণিত হল-
(১) বেদে যেসব গাছপালা ও পশুপাখির নাম উল্লেখ করা হয়েছে তা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলই ছিল আর্যদের আদি বাসস্থান বা আদি বাসভূমি। ভারতে যখন তাঁরা প্রবেশ প্রবেশ করেন প্রথমে তাঁরা ঐ অঞ্চলে বসতি স্থাপন শুরু করেন ফলে ঐ এলাকার গাছপালা ও পশুপাখির সঙ্গে তাদের প্রথম পরিচয় ঘটে। এ কারণেই উক্ত গাছপালা ও পশুপাখির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ঐ এলাকাতেই বেদও রচনা করা হয়েছিল।
(২) নদী স্তোত্র দিয়ে আর্য জাতির উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে বাইরে চলে যাওয়া প্রমাণ করা যায় না। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে ৩৯টি নদীর নাম উল্লিখিত রয়েছে। তার মধ্যে ঋগ্বেদের মধ্যেই ২৫টি নদীর নাম পাওয়া যায়, কিন্তু গঙ্গা নদীর নাম শুধুমাত্র একবার উল্লেখ করা হয়েছে। আর্যরা ভারতের মূল নিবাসী বা আদিবাসী হলে এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে গেলে গঙ্গা নদীর সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ক থাকার কথা ছিল এবং সে ক্ষেত্রে গঙ্গা নদীর নাম বারবার উল্লেখিত হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু তা হয়নি।
(৩) ঋগ্বেদের মত উন্নত কোন গ্রন্থ অন্য কোন দেশে রচনা করা হয়নি বলেই একথা বলা যায় না যে ভারতই ছিল আর্য জাতির আদি নিবাস বা আদি বাসভূমি। এটাও হতে পারে যে ভারতে আগমনের আগে বেদের মত উন্নত গ্রন্থ রচনা করার মত প্রজ্ঞা ও সামাজিক উন্নয়ন তাঁদের ঘটেনি। তাছাড়া এও বলা যায় যে ভারতবর্ষ আর্যদের আদি বাসভূমি বা আদি নিবাসী হলে তাঁরা ভারত ছাড়ার আগেই গোটা ভারতবর্ষে আর্য বসতি ও সংস্কৃতি বিস্তার করে ফেলতেন। কিন্তু উত্তর ভারতের বহু এলাকা এবং দক্ষিণ ভারত ছিল আর্য সংস্কৃতির ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
(৪) এটাও হতে পারে যে সুদীর্ঘকাল ধরে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে বসবাস করার ফলে আর্য জাতি তাঁদের আদি বাসভূমির সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলেন বলেই বেদে তার কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না।
(৫) সংস্কৃত ভাষার মধ্যে তালব্য বর্ণের (ন, ং, ৎ) প্রাধান্য দেখা যায় যা ইউরোপীয় অন্য কোন ইন্দো ইউরোপীয় ভাষার মধ্যে নেই। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন যে, ইউরোপ থেকে ভারতে আগমনের পর দ্রাবিড় ভাষার প্রভাবে এমনটা হয়েছে। বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে বন্য পশুদের মধ্যে সিংহের উল্লেখ করা থাকলেও বাঘ ও হাতির কোন উল্লেখ নেই। আর্যরা ভারতের আদিবাসী বা মূল নিবাসী হলে ভারতের এই দুটি প্রাণীর নামের উল্লেখ বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে অবশ্যই থাকা উচিৎ ছিল। কিন্তু নেই।
এসব যুক্তি দ্বারা ঐতিহাসিকেরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে আর্য জাতির আদি বাসভূমি ছিল ভারতের বাইরে। তাঁরা ভারত আক্রমণ করে ভারতবর্ষ দখল করেছিলেন।
বহু নামী ঐতিহাসিক আছেন যাঁরা মনে করেন যে, আর্যরা ইউরোপ থেকে ভারতে আগমন করেছিলেন। তাঁদের যুক্তিগুলো নিচে পেশ করা হল —
(১) বৈদিক সাহিত্যে ওক, উইলো, বার্চ প্রভৃতি গাছ এবং ঘোড়া, গাভী, ষাঁড়, শুয়োর প্রভৃতি জন্তুর উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচ্য দেশের জীবজন্তু যেমন হাতি, বাঘ, উট ইত্যাদির জন্তুগুলির কোনো বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে নাম বা উল্লেখ নেই।
(২) আর্য ভাষাগোষ্ঠীর সাতটি ভাষা রয়েছে, তাদের মধ্যে পাঁচটি ভাষা এখনও ইউরোপের ভাষা, শুধুমাত্র সংস্কৃত ভাষা ও পারসিক ভাষা ইউরোপের বাইরের ভাষা। ইউরোপে গ্রিক, জার্মান ল্যাটিন, প্রভৃতি আর্য ভাষাগুলোর যেরকম ঘন সন্নিবেশ লক্ষ্য করা যায় ভারতে তা লক্ষ্য করা যায় না। ইউরোপে আর্য গোষ্ঠীভুক্ত ভাষার অধিক লক্ষ্য করা যায়, সেজন্য একদল ঐতিহাসিক মনে করেন যে, প্রাচীন যুগে আর্য জাতি ইউরোপের মধ্যেই বসবাস করতেন।
(৩) অধ্যাপক গাইলস মনে করেন, আর্য জাতির আদি নিবাস বা বাসভূমি ছিল দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপ। আদি ইন্দো ইউরোপীয় ভাষাযর মধ্যে সমুদ্রের কোন উল্লেখ না থাকায় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে আর্য জাতির যদি বাসভূমি কোন দ্বীপে বা সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে ছিলনা। আর্যরা যেসব গাছপালা ও পশুপাখির নাম উল্লেখ করেছেন সেগুলো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের আর্যরা তখন স্থায়ীভাবে বসবাস এবং কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন। আর্যদের গৃহপালিত পশুর মধ্যে গরু, ঘোড়া ও ভেড়ার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রযয়োজন ছিল। সুতরাং ধরে নিতে হবে যে আর্যদের আদি বাসস্থান এমন একটি অঞ্চলে ছিল যেখানে কৃষিকাজ ও চারণযোগ্য প্রাকৃতিক পরিবেশ কোনটিরই অভাব ছিলনা। সেখানে কৃষিকাজের জন্য কৃষিযোগ্য জমি, ঘোড়া চারণের জন্য বিস্তীর্ণ স্তেপ এবং ভেড়া চরানোর জন্য উঁচু জমি- সবকিছুই ছিল। এসব অনুকুল পরিবেশের দিকে লক্ষ রেখে অধ্যাপক ডঃ গাইলস বর্তমান অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি অঞ্চলকেই আর্য জাতির আদি বাসভূমি বা আদি নিবাস হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
‘হিন্দু’ শব্দটি আর্যরাই প্রথম সৃষ্টি করেছিলেন, বলে অনেকের বিশ্বাস। তারা ইউরোপের উরাল পর্বতের কাছে স্টেপস অঞ্চল থেকে আসার সময় ঘোড়া, রথ, গাভী, মেষদের এনেছিল সঙ্গে। অশ্বারোহী আর্যরা হিন্দুকুশ পর্বত পার হয়ে ভারতে প্রবেশের সময় এখানকার পাহাড়ি রাস্তায় দোলা বা ডুলির প্রাচুর্য দেখে অবাক হয়েছিল। অপারগ মানুষের ভরসার জায়গা ছিল এই মনুষ্যবাহিত ডুলি বা দোলা।তীর্থযাত্রায় মনুষ্যবাহিত ডোলা বা ডুলি যে পঙ্গুকে গিরি লঙ্ঘন করতে সাহায্য করে, তা দেখে আর্যরা তাজ্জব হয়ে গেল। এগুলি ‘হিন্দোলক’ বলে পরিচিত ছিল প্রাচীন সাহিত্যে। হিন্দোলক বা ডুলি তথা পালকির কথা বেদ-পুরাণেও আছে। স্কন্দপুরাণে পাই — ‘কামহারৈশ্চ বংশৈশ্চ বদ্ধো হিন্দোলকঃ কৃতঃ । আরূঢাশ্চ মহাকন্যা গাযন্তে সুস্বরং তদা ॥’ হিন্দোলক থেকেই ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হয়ে শব্দটি দাঁড়াল হিন্দু বা হিন্দ-এ। অর্থাৎ হিন্দোলক ব্যবহারকারী জাতিই আর্যদের দৌলতে হিন্দু বলে পরিচিত হল।