সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
চতুর্থ অধ্যায়
কাশিমবাজারের দালালেরা
অষ্টাদশ শতাব্দের দ্বিতীয় শতাব্দে কাশিমবাজারের ব্রিটিশ কুঠির খাতায় দালাল হিসেবে জনৈক ‘কান্ত’র (Kantu) নাম পাওয়া যাচ্ছে। কান্তর দাবি সে ব্রিটিশদের কাশিমবাজারের কুঠিতে সাতজন কুঠিয়ালের ব্যবসাপত্র দেখাশোনা করত। ১৭৩০ সাল নাগাদ কান্ত দেউলিয়া হয়। কান্তর দাবি, সে কাশিমবাজারের কর্তার বিপুল উতকোচের খাঁই আর কোম্পানির কাপড়ের গুদামঘরে বেআইনি কাজ করতে মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। বাজারে কান্তর নামে ঢি ঢি কপড়ে যায়। কান্ত, ফতেহচাঁদ শেঠের থেকে কোম্পানির ব্যবসা চালানোর জন্যে ২ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা ধার করেছিল। কোম্পানির কর্তারা কান্তর effects দখল নিতে গেলে বিরোধ বাধে। ফতেহচাঁদ দাবি করেন কান্তকে নতুন করে দালাল পদে চাকরি দিতে। সে সেই চাকরি করে ফতেহচাঁদের থেকে ধার নেওয়া ২ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা ফেরত দেবে। বেশকিছু কাল ধরে এই ঘটনা নিয়ে টালবাহানা চলতে থাকে। ইতোমধ্যে কোম্পানি ফতেহচাঁদকে কিছু বকেয়া মিটিয়ে দিলেও তারা কান্তকে শেষ পর্যন্ত বরখাস্ত করে (কান্তর কাজকর্ম বিষয়ে দলিল দস্তাবেজ BPC, vol. 8, ff. 203-3vo, 219, 226vo, 234-34vo, 236vo, 237, 248-48vo, 249-49vo, 256, 257-60 দেখুন)। ফতেহচাঁদ, কোম্পানির কাজকর্মে দালাল বা মধ্যস্থর ভূমিকা ও চরিত্র উত্তমরূপে জানতেন বলেই কান্তকে যে কোম্পানি দালাল (Dellol) হিসেবে চিহ্নিত করছে, তিনি তার বিরুদ্ধাচারন করেন (BPC, vol. 8, f. 257, I0 July 1730)। কাশিমবাজারের কাগজপত্রে কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার, কান্ত শুধু কোম্পানির মধ্যস্থই নয় ছিলেন না, তিনি নিজে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। বহু সময় ইওরোপিয় জাহাজে তার সরবরাহকরা পণ্য রপ্তানি হত। ১৭৩০ সালে তার সরবরাহ করা ৪০৫৩ টাকার দোসুতি ম্যানিলায় গিয়েছিল, যে টাকা কোম্পানি তাকে বরখাস্ত করে আত্মস্যাত করে নেয় (Ibid., vol. 8, f.249vo, 22 June 1730)। কলকাতার বাজারেও তার যোগাযোগ ছিল। কোম্পানির খাতায় দেখি বানারসী শেঠ ছিলেন তার bondsman (Ibid., vol. 8, f. 203, 28 April 1730)। কোম্পানির মধ্যস্থ হিসেবে তিনি যে বিনিয়োগের অর্থ নিয়ে এসেছিলেন, সেই অর্থ বাবদ তিনি ১.৯ শতাংশ হারে ১২০০০ টাকা দস্তুরি পান। কিন্তু কলকাতা কাউন্সিলের হিসেব ছিল, as he is to be esteem’d at the Durbar and the Country round as our Broker, he is obliged to live up to that character and the numerous family depending upon him will make that amount barely sufficient to defray his expenses(Ibid., vol. 8, f. 249, 49vo, 22 June 1730)।
এই গোলোযো চলতে চলতেই কাশিমবাজার কাউন্সিল কান্তকে ১৭৩০ সালের জুন মাসে বরখাস্ত করে আতান্তরে পড়ে যায়। কান্তর জায়গায় কাশিমবাজারের দুই গুরুত্বপূর্ণ বণিক, হয় বুড়ো দত্ত না হয় হাটু কাটমাকে নিয়োগের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু নতুন দালাল নিয়োগ সমস্যার সমাধান সহজে হল না। দুই ব্যবসায়ীই কোম্পানির দালাল পদের প্রস্তাব পত্রপাঠ ফিরিয়ে দেয়। তাদের প্রাথমিক যুক্তি ছিল অর্থনৈতিক — সে বছরে বিনিয়োগের মরশুম অনেকদূর পেরিয়ে গিয়েছে, নতুন বিনিয়োগের জন্যে তাদের দেওয়া সময় মোটেই প্রশস্ত নয়। পরে কোম্পানির পক্ষ থেকে চাপ দিতেই আসল কারন বেরিয়ে এল। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য বিনিয়োগের বিষয়টা হয়ত যা হোক করে, তাদের বুদ্ধি যোগাযোগ দিয়ে সমাধান করা যায়, কিন্তু তাদের সামনে অটল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ফতেহচাঁদ। তারা স্পষ্ট করে জানাল, ব্রিটিশ কোম্পানি যতক্ষণ না ফতেহচাঁদের সঙ্গে চলতি বকেয়া সমস্যা মিটিয়ে নিচ্ছে, ততক্ষণ তাদের পক্ষে কোম্পানির হয়ে কাজ করা সম্ভব নয় (Ibid., vol. 8, f. 248vo, 22 June 1730)। অক্টোবরে কোম্পানি একটু আগবাড়িয়েই বুড়ো দত্তের বাড়িতে প্রতিনিধি পাঠিয়ে তাকে দালাল হিসেবে নিয়োগ করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু কোম্পানিকে অবাক করে বুড়ো দত্ত সরাসরি কোম্পানির দালাল পদে যোফ দেওয়ার অপারগতা জানায়। সে এ বিষয়ে হুগলির ব্যবসায়ী ভায়ের সঙ্গে পরামর্শ করার জন্যে সময় চায় (Ibid., vol. 8, f. 298, 5 Oct. 1730)। শেষ পর্যন্ত কোম্পানি কাটমাদের অবিসংবাদী বাজারি সম্মান এবং দালাল পদে একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি আন্দাজ করে হাটু কাটমাকে দালাল হিসেবে নিয়োগ করে। কাশিমবাজার অঞ্চলে হাটুর যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল। সেই অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তার অগাধ ধনসম্পত্তিও ছিল। কোম্পানিকে হাটু পিতা নিধি কাটমা জানাকেন, তিনি পুত্রের হয়ে জামিন থাকতে রাজি (Ibid., vol. 8, 321, 7 Dec. 1730)। কোম্পানিতে বেশ কয়েক মাস দালাল পদে কাজ করার পরে ১৭৩৭এর প্রথম দিকে হাটু বরখাস্ত হয়। তার বিরুদ্ধে কলকাতা কাউন্সিলের অভিযোগ ছিল কাশিমবাজার কুঠির প্রধান বার্কারের হয়ে বণিকদের থেকে প্রতি সের রেশম সরবরাহ করার জন্যে চার আনা করে দস্তুরি তোলা। অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা কাউন্সিল তাকে বরখাস্ত করে নতুন দালাল নিয়োগ করার নির্দেশ দেয়। এবারে কোম্পানি বালি (বলাই/বলরাম) কাটমাকে দালাল পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। কোম্পানির সঙ্গে বালি বেশ কিছুকাল কাজ করেছেন। ব্রিটিশদের আভ্যন্তরীণ কাজকর্মে বালির অভিজ্ঞতা আর কাটমা পরিবারের বিপুল সম্পত্তি কোম্পানিকে বাধ্য করল তাকে দালাল পদে নিযুক্ত করতে। জামিনের পক্ষে দাঁরালেন কাটমা সমাজের অন্যতম নেতা বিনোদ কাটমা (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 5, Consult. 5 Feb; 21 Feb;, 19 March 1737; C & B. Abstr., vol. 4, f. 210, para. 4, 15 Feb. 1737; BPC, vol. 12, f. 162, 16 April 1737.)। ১৭৪১ পর্যন্ত বলাই দালালি করেন। সেই বছরে দালাল পদ তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
দালাল পদ উঠে যাওয়ার কাশিমবাজার কাউন্সিল আতান্তরে পড়ে কলকাতা কাউন্সিলকে লিখল, …consider how impracticable it is for us to come at the knowledege of the worth of any of the metchants here when there is no broker whose interest it is to tell us the truth and such an one has many ways to learn more exactly who are fit to be trusted than we can possibly so …. (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 6, Consult. 16 Sept. 1742)। দালাল পদ লুপ্ত হবার বহু পরে ১৭৪৮ সালেও তারা লন্ডনের কর্তাদের তাদের দুর্বিসহ অবস্থা জানিয়ে লিখল … the abolishing of the office of broker has been by experience found highly detrimental to your Honour’s affairs, especially in contract for the investment, the merchants being come to such a pitch as to fix what prices they pleased on their goods, which evil they conceived could be cured by no other method than by a ruler over them, of Wealth and Credit of their own cast[e] (Beng. Letters. Recd., vol. 21, ff. 283-84, 10 Jan. 1748; BPC, vol. 19, f. 239, 15 May 1747; FWIHC, vol. I, p. 232)।
ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির বাংলার (সুশীলবাবু লিখেছেন ভারতীয়/ইন্ডিয়ান — অনুবাদক) দালালেরা তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা আর ব্যবসা নিশ্চিত করতে এবং বাংলার বাণিজ্য ও অর্থনীতির বিকাশের কাজে অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে বিপুল ভূমিকা পালন করেছে, এই তথ্যে আজ আর কোন দ্বিমত থাকা উচিৎ নয়। তারাই দেশিয় ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির কেন্দ্রিভূত বিনিয়োগ সংগঠনের যোগসূত্র ছিল। অস্টেন্ডড কোম্পানির প্রধান হিউম ১৭৩০ সালে লিখলেন — The English and Dutch, who are the greatest Traders in this Country, do their business wholly by their Brokers who are their principal merchants. Notwithstanding they have numbers of Rich men Established in their bounds, who need no, Security but they find their business the best regulated by having their Merchants act in Concert, by means of their Broker, everyone taking upon him according to his force, they know one another better than they can be known by Europeans (Hume’s ‘Memorie’, Stadsarchief Antwerp, General lndische Compagnie, 5769)। (চলবে)