সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
চতুর্থ অধ্যায়
স্থানীয় ধারের বাজার
ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর ধার করার কর্মপদ্ধতি ছিল কেন্দ্রিভূত। কোম্পানি বাংলা/ভারতবর্ষের বিভিন্ন ব্যবসায়ীক/গঞ্জ/বাজার অঞ্চলে জগতশেঠের শাখা কুঠি থেকেও ধার করত। ব্যবসার জন্যে অধীনস্থ কুঠির অর্থের প্রয়োজন হলে মুল কুঠি — হয় কলকাতা বা কাশিমবাজার টাকা ধার করত। মহাজন, আমলা, ব্যবসায়ী বা স্রফদের থেকে জোগাড় করা ধার অধীনস্থ কুঠিগুলোয় নগদে বা হুন্ডির মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হত (বিশদ আলোচনার জন্যে জন্যে পঞ্চম অধ্যায় দেখুন)। বাংলা/দেশ/এশিয়া জোড়া বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোয় ছড়ানো ছিল জগতশেঠের হাজারো কুঠি (সুশীলবাবু ইংরেজি করছেন Agency house, subordinate office)। বাংলা বাজারে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর সব থেকে বড় উত্তমর্ণ ছিল স্বয়ং জগতশেঠের গদি। তবে আগেও বলেছি, জগতশেঠের গদি থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা ধার করলেও ব্রিটিশ কোম্পানি অন্য স্রফ আর ব্যবসায়ীর গদি থেকেও ধার করা বন্ধ করে নি। আরেকটা কৌতুহলদ্দীপক ঘটনা হল কোম্পানির কলকাতা কুঠি তাদের সঙ্গে কাজ করা দাদনি বণিকদের থেকে টাকা ধার করত। এটাও আমরা দালালদের কাজকর্ম পর্বে আলোচনা করেছি।
সওদাগর, মহাজন এবং স্রফেরাই শুধু ইওরোপিয় কোম্পানিগুলিকে ধার দিত না, বহু সময় শাসক পরিবারের লোকজনও এই সব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করত, অন্য অর্থে ধারও দিত। কোম্পানির নথিপত্রে এরকম বেশ কয়েকজন আমলার নাম পাচ্ছি। শেঠ/স্রফ/দালালদের ধার শৃঙ্খলের বাইরে দরবারি আমলা/কর্মচারীদের থেকে ধার নেওয়া পাত্রের একটা উদাহরণ দেব এখানে — তিনি হলেন হাকিম বেগের দেওয়ান, পাচোত্রা দারোগা (চুঙ্গি করের দারোগা। বাংলার ডাচ প্রধান জাঁ কার্সেবুম ১৭৫৫ সালে হাকিম বেগ সম্বন্ধে লিখছেন, কাস্টম হাউস বা টোলপ্লাজার দারোগা, নবাবের প্রিয়তম পাত্রদের মধ্যে অন্যতম Daroga van de Pansjoutra of tholplaatsen (Daroga of Pachotra or Tollplaces [custom houses]), and ‘een grote favoriet van den Nawab’ (a great favourite of the Nawab), VOC, 2892, ff., 125vo, 127vo) কিশনদেব পোদ্দার। কিশনদেব ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দের পাঁচের দশকজুড়ে বাংলা সুবা প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ সদস্য (১৭৫০ সালে আলিবর্দি, আমলা কিশনদেব পোদ্দারকে ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে প্রশাসনের মধ্যস্থর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিইয়েছিলেন। এর পরেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে কিশনদেবের গুরুত্ব খুবই বেড়ে যায় BPC, vol. 23, f … 306vo, 25 Aμg. 1750)। শোনা যায় নবাব এবং হাকিম বেগের ওপরে কিশনদেবের খুবই জোরালো পকড় ছিল person of very great interest and authority in the government (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 10, 10 Oct. 1751; vol. 11, 2 Dec. 1751)। কিশনদেব ২ জানুয়ারি ১৭৫০ থেকে ১৬ আগস্ট ১৭৫৩ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কাশিমবাজার কুঠিকে মোট ৩,৩৫,০০০ টাকা ধার দিয়েছিলেন (Computed from Fact. Records, Kasimbazar, vols. 9, 10, 12)। আমরা আন্দাজ করতে পারি, যে বিপুল টাকা কিশনদেব পোদ্দার ব্রিটিশ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছেন, তার উৎস ছিলেন তিনি নন নিশ্চই হাকিম বেগ, তার নিয়োগকর্তা। এই জন্যেই হয়ত কিশনদেব পোদ্দারের মৃত্যুর পর হাকিম বেগ কাশিমবাজার কুঠিকে তার কর্মচারীর থেকে নেওয়া ১ লক্ষ টাকার (মূল) বকেয়ার হিসেবের ওপর সুদের হাতচিটা (interest note) শোধ করতে নির্দেশ দেন। কাশিমবাজার কাউন্সিল হাকিম বেগকে ১৭৫৪ সালের ৩১ মে সেই অর্থ শোধ করে (Fact. Records, Kasimbazar, vol. -12, Consults. 4 May 17 53; 31 May 1754)।
ধারের সমস্যা
ওপরের আলোচনায় একটা তথ্য পরিষ্কার হয়ে যায়, বাংলায় অষ্টাদশ শতাব্দের প্রথমার্ধে, দেশিয় পুঁজির বাজারের ওপর নির্ভর করে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি, তাদের নগদ পুঁজির অভাবের সমস্যা অনেকটাই মিটিয়েছে। কিন্তু তার মানে নয় যে, কোম্পানিগুলোর ধার নেওয়ার প্রক্রিয়ার সামনে কোন বাধা বা সমস্যা ছিল না। স্থানীয় বাজার থেকে ধার করার কি কি সমস্যার মুখোমুখি তাদের পড়তে হত, সেগুলি আমরা এবারে আলোচনা করব।
ছোট সময়ের ধার
আমরা যে সময়ের কথা আলোচনা করছি, অষ্টাদশ শতাব্দের প্রথম পর্বজুড়ে বাংলার ধার বাজারের চরিত্রই ছিল কম সময়ের জন্যে টাকা ধার দেওয়া হত। টাকা দেওয়া হত মাত্র কয়েক মাসের কড়ারে। দীর্ঘ সময়ের ধারের পরম্পরা বাংলা ব্যবসা জগতে গড়ে ওঠে নি। কলকাতা বন্দরে ইওরোপ থেকে সম্পদ নিয়ে আসা জাহাজ [কোম্পানি আমলাদের লব্জে ট্রেজার শিপ — অনুবাদক] নোঙর করার মুহূর্তে বাংলার স্রফ, সওদাগর এবং অন্যান্য ব্যাঙ্কিং গদি থেকে নিরন্তর ধার শোধ করার তাগাদা আসত কুঠিগুলোয়। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর পক্ষে এক লহমায় এতগুলো উত্তমর্ণকে বিপুল পরিমান ধার শোধ করা অসম্ভব কাজ ছিল। ঠিক সময়ে ধার শোধ না হলে মূলত জগতশেঠের গদি থেকে নিরন্তর চাপ আসত। আসত সরাসরি ব্যবসা/ধার বন্ধ করার হুমকি। ১৭৪৮এর নভেম্বরে ঢাকার ব্রিটিশ কুঠি লিখছে শেঠ মহতাব রাইএর গোমস্তা আমাদের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করছে। ওর বক্তব্য যদি ঠিক সময়ে তার কর্তার গদির ধার শোধ না করি তাহলে বিপদে পড়তে হতে পারে; ঠিক সময় ধার শোধ না হলে তাদের কর্তা আমাদের বাংলা ব্যবসা বন্ধ করারও হুমকি দিয়েছে [absolutely insisted on the payment of the sum due to his master threatening in rough terms that in case of non-payment he would immediately put a stop to our Business (Fact. Records, Dacca, vol. 3, 9 Nov. 1749; BPC, vol. 22, f. 420, 15 Nov. 1749)]। ১৭৪৯-এর কাশিমবাজারে আর্মেনীয় জাহাজ নিয়ে ব্রিটিশেরা তাদের তৈরি হঠকারী ঝামেলা মেটাতে গিয়ে শেঠেদের থেকে ১,২০,০০০ টাকা ধার করে নবাবের দরবারে জমা দিতে হয়েছিল (তিন ও পাঁচ অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। কাশিমবাজার কাউন্সিল কলকাতার কাউন্সিলকে লিখছে, শেঠের গোমস্তা রুইদাস আমাদের কুঠিতে এসে ঝগড়া করে গেছে বিপুল পরিমান সম্পদভর্তি জাহাজ বন্দরে এসে নোঙর করা সত্ত্বেও আমরা তাদের কেন এই মরশুমের মধ্যে টাকা শোধ করছি না (complained heavily of our not having paid them anything this season of the large debt the Company owed them at that factory notwithstanding so much treasure had been imported by several ships lately arrived (BPC, vol. 22; ff. 338-338vo, 20 Oct. 1749))। শেঠেরা বহুসময় নাছোড়বান্দা মনোভাবে তাদের পুঁজি উদ্ধারে লেগে থাকত। বন্দরের ঘাটে ইওরোপিয় জাহাজ নোঙর করার পরেই যেন তারা ধার শুধে দেওয়ার উদ্যম নেওয়ার দাবি জানাত, যে দাবি কোম্পানিগুলোর পক্ষে মানা খুবই সমস্যার ছিল।
২৫ আগস্ট ১৭৫০ সালে কাশিমবাজারের চিঠিতে এই বিষয়টা বিশদে উল্লিখিত হয়েছে, … the Seats on the arival of the treasure sent to demand it and gave them to understand and they expected the whole of their debt at that factory should be paid off out of the money which might arrive by this year’s shipping and instead of being able to raise a further credit with them it was with the utmost difficulty they could obtain their consent to apply any part of what was lately serit them to the use of the investment ….( Ibid., vol. 23, f .. 303vo, 25 Aug. 1750)।
নগদ সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে কোম্পানির আমলাদের প্রায়শই ঝামেলায় পড়তে হত। এরকম সমস্যার উদাহরণ পাচ্ছি ঢাকা কুঠির এক চিঠি থেকে। ১৭৫১ সালে ঢাকার কুঠিয়াল লিখছেন, কিভাবে মহতাব রাই শেঠের গোমস্তা কুঠিতে চড়াও হয়ে পুরো বকেয়া টাকা এক্ষুণি শোধ করে দিতে [whole of the Debt to be immediately paid him (Beng. Letters Recd., vol. 22, f. 117; NAI, Home Misc., vol. 16, p. 189, para. 83, Letters to Court, Feb. 1751; C & B. Abstr., vol. 5, f. 275)]। ঢাকার কুঠিয়াল কাশিমবাজার কুঠিয়ালকে অনুরোধ করছে তারা যেন মহতাব রাই শেঠকে প্রভাবিত করে নিবৃত্ত করেন। তারা কথা দিচ্ছেন টাকা হাতে এলেই সেই টাকা শোধ করে দেবেন; হাতে যা নগদ টাকা আছে, সেটা দিয়ে ধার শোধ করতে গেলে তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে (as it would stop their business and render it unpracticable for them to purchase any Ready money goods)। সে সময়ের কোম্পানির কাগজপত্র সূত্রে আমরা জানয়ে পারছি, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ধার দেওয়া হত মাত্র কয়েক মাসের জন্যে। প্রতিমাসে সুদ হিসেব করা হত। ধার সাধারণত একবছরের বেশি হত না। এক বছরে নেওয়া ধার, সে বছরেই শোধ করে দিতে হত, অন্য বছরে গড়িয়ে যেত না।
বাজারে নগদের অপ্রতুলতা
মাঝে মাঝে বাংলার ধারের বাজারে টাকার অভাব ঘটত নানান কারণে। হঠাতই ধারের বাজারে নগদ টাকার অভাব দেখা দিলে কোম্পানিগুলো চরম অসুবিধেয় পড়ত। বাজারে নগদের অভাব ঘটার কারণগুলির মধ্যে একটা ছিল সরকারের দাবিদাওয়ার ভয়ে স্রফ বা ব্যাঙ্কারদের নগদ টাকা বাজার থেকে তুলে নিয়ে লুকিয়ে ফেলা। আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি সেই অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে মাঝেমধ্যেই বাংলার ধারের বাজারে নগদ টাকার অভাব দেখা দিয়েছে, কোম্পানিগুলোকে অসুবিধেও ফেলেছে। কিন্তু এই অভাব চরমে ওঠে মারাঠা হ্যাঙ্গামের সময় ১৭৪০-এর শুরু থেকে ১৭৫০-এর দশকের প্রথমপাদ পর্যন্ত। এমন কি জগতশেঠেদের মত বিশাল মহাজনী গদি দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে ছড়িয়ে যাওয়া ভয়ের পরিবেশ থেকে মুক্ত ছিল না। তবে মনে রাখা দরকার নবাব আলিবর্দি খান মারাঠাদের আক্রমনে বিপর্য্যস্ত হলে তিনি বহিঃশত্রুর আক্রমণ রুখতে বড় বাহিনী তৈরি করার উদ্যম নেন। বাহিনী তৈরি করতে, পরিচালনা করতে বিপুল নগদ অর্থের যোগান প্রয়োজন ছিল। মারাঠা বর্গিদের হামলা মোকাবিলা করতে বাংলার নবাব আলিবর্দি খানের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মানুষ হয়েও নবাবের অর্থ সাহায্যের দাবির ভয়ে শেঠেরা কাঁটা হয়ে থাকত। ১৭৪৬ সালের কাশিমবাজার কুঠির এক চিঠি থেকে শেঠেদের ভয়ের মনোভাব স্পষ্ট হয় … they have not a prospect of borrowing more … for the scarcity of money is so great that it has been with some difficulty Futtidiand’s house has been able to pay for the bullion sold them …. (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 7, Consult. 22 June 1746; BPC, vol. 18, f. 265vo, 30 June 1746)। কাশিমবাজার কুঠির কুঠিয়াল লিখল, আমাদের স্থির ধারণা শেঠেদের তহবিলে নগদদের অভাব নেই, কিন্তু সরকারের চাপে পড়ার ভয়ে সেসব প্রকাশ্যে আনছে করছে না (it appears to us, that if they [the Seths] have money, they don’t care to produce it for fear of the Government)। কাশিমবাজারের পুঁজি জোগাড়ের কাজে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, নবাবের সব থেকে বিশ্বস্ত অর্থসূত্র শেঠেদেরই যদি বর্গির আক্রমনে এই অবস্থা হয়, তাহলে অন্যান্য স্রফ আর শেঠেদের কি অবস্থা হয়েছিল তা আন্দাজ করাই যায়। (চলবে)