সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
চতুর্থ অধ্যায়
বাজারে নগদের অপ্রতুলতা
মাঝেমধ্যেই বাংলার পুঁজির বাজারে অর্থের অভাব দেখা দেওয়ার আরেকটা বড় কারণ ছিল আগরার পাইকারি পুঁজির বাজারে নগদ অর্থের চাহিদার ওঠা পড়া। আগরার বাজারের সুদের হার যদি বেশি হত, তাহলে বহু সময় বাংলায় নগদ অর্থের যোগান কমে যেত কারণ বাংলার স্রুফ আর অন্যান্য ব্যাঙ্কারেরা আগরায় বিপুল অর্থের টাকা বিনিয়োগ করত। সাধারণভাবে আগরায় সুদের হার ছিল ১২ শতাংশ, বাংলার থেকে ৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু নানা কারনে সুদের হার বেড়ে গেলে বাংলায় নগদের অভাব দেখা দিত। সপ্তদশ শতকের শেষে এবং অষ্টাদশ শতকের শুরুতে মাঝেমধ্যেই বাংলার ধারের বাজারজুড়ে এই ধরণের নগদ অর্থের অভাব দেখা দেওয়া স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। ১৭০০ সালের কাশিমবাজার কাউন্সিলের চিঠির এই উদ্ধৃতি আমাদের ভাবনার খোরাক যোগায়, বাজারি সুদেও আমরা বাজার থেকে নগদ অর্থ ধার পাচ্ছি না, কারন দেশের বাজারে এখন চরম টাকার অভাব চলছে, যেহেতু বাংলা থেকে দিল্লি বা আগরায় টাকার বিনিময় মূল্য স্রফেরা ৬% ধার্য করেছে, তাই তারা সব নগদ টাকা এখানকার বাজার থেকে তুলে সেই দুই বাজারে পাঠিয়ে দিয়েছে [We cannot get any money at interest here being very little ready money in the country and the exchange current from hence to Delhi and Agra is but 6 percent and the shroffs make use of what ready money they have that way (Fact. Records, Calcutta, vol. 10, pt. II, f.92)]। তবে তৃতীয় দশক থেকে বাংলা বাজার থেকে আগরায় পুঁজির বাজারে অর্থ বিনিয়োগের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে না। হয়ত এই সময় জগতশেঠেদের কুঠি উত্তরভারতীয় বাজারগুলিতে তাদের কাজকর্ম ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল, ফলে বাজারে স্থিতাবস্থা চলে আসে এবং সুদের হারের ওঠাপড়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
সুদের চড়া হার
১৭৪০ পর্যন্ত বাংলা বাজারে সুদের হার বেশ চড়া ছিল। চড়া সুদের হারের জন্যে বাংলা বাজার থেকে কোম্পানিগুলো অবাধে ইচ্ছে মত টাকা ধার করতে পারত না। লন্ডনের কর্তারা ১২ শতাংশ সুদে টাকা ধার করতে স্থানীয় আমলাদের নিষেধ করত কেননা তারা ১২% সুদের হারকে গলাকাটা(exorbitant) নাম দিয়েছিল। এই পরিমান সুদ যে তাদের ব্যবসা স্বার্থ হানি করছে তাও লন্ডন মনে করত। তারা বারবার বিভিন্ন কুঠিকে ধারে নাক ডুবিয়ে না ফেলার নির্দেশ পাঠিয়েছে। বাংলার গাঁটকাটা আর ইওরোপিয় সংবেদনশীলতায় আঘাত করা সুদে ব্যবসা করা নিয়ে বারবার কুঠিয়ালদের সতর্ক করেছে [the interest of which eats deep and insensibly (DB, vol. 95, f. 519, 18 Jan. 1705)] কিন্তু আমরা দেখেছি বাংলায় কোম্পানি কুঠিয়ালদের বাধ্যতামূলকভাবে বাজার থেকে বাংলা বাজারের নিয়ম মেনেই ধার করতে হয়েছে এবং বাংলা কুঠিগুলোর আমলারা এই হারকে necessary evil হিসেবেই দেখেছে।
জগতশেঠের গদির সুদ কমানের নিদর্শনে বাংলার শেঠ, স্রফেদের গদি ১৭৪০-এর পরে বাজারেরে সুদ ১২% থেকে কমিয়ে ৯% করলেও এই সুদেও ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর পক্ষে বাজার থেকে টাকা ধার করা কঠিন ছিল, বিশেষ করে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর ছোট ছোট কুঠির পক্ষে। তাদের অসহায় অবস্থা বুঝে ব্যবসায়ী আর স্রফেরা বাজারের তুলনায় বেশি সুদ নিত। ১৭৪৬ সালে ঢাকা কুঠি লিখছে, as we find it will be impossible for us to raise any more money here under the rate of 12 percent per annum Interest, they desired the Calcutta Council’s permission to borrow money at that rate of interest (Fact. Records, Dacca, vol. 2, Consult: 19 August 17 46)। এর উত্তরে কলকাতা কাউন্সিল লিখল positively ordered that on no account they give more than 9 percent for money at interest for it would be of utmost ill consequence to our Honble Masters should they give a higher premium to any one person and we doubt not that who have money to spare will let them have it at the same rate as we ger everywhere else (BPC, vol. 18, f. 354vo, 5 Sept. 1746)। ১৭৪৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা কুঠিয়াল লিখল, তারা ৯ শতাংশ হারে ঢাকায় টাকা ধার পাচ্ছে না, প্রত্যেক স্রফ ১২ শতাংশ সুদ হাঁকছে, তার তলায় কেউই নামতে চাইছে না liaving already tried all the shroffs in the place who insist on 12 percent(Fact. Records, Dacca, vol. 2, Consult. 16 Sept. 1746)। ১২ অক্টোবরেও তারা কলকাতাকে লিখল they are sorry to inform us that all their endeavours to obtain money from the shroffs of that place at the rate of 9 percent per annum have been fruitless (BPC, vol. 18, f. 39lvo, 12 Oct. 1746)।
কলকাতা কাউন্সিলের ধারণা ছিল ইওরোপ থেকে ট্রেজার শিপগুলো কলকাতা বন্দরে ঢুকলেই ঢাকা কুঠির সম্পদ সমস্যার স্থায়ী সমাধান ঘটবে (অর্থাৎ ঋণের বাজার উন্মুক্ত হয়ে যাবে)। অক্টোবরে তিনটে জাহাজ বন্দরে ঢুকলে কলকাতা কাউন্সিল ঢাকাকে লিখল, we hope the arrival of these ships will give them credit to Borrow money at the usual rate (Ibid., vol. 18, f. 408, 16 Oct. 1746)। কিন্তু নভেম্বরে প্রত্যুত্তরে ঢাকা কলকাতাকে লিখল, তবুও তারা ঢাকার বাজার থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছে না (Ibid., vol. 18, f. 434, 11 Nov. 1746)। এমন কি ১৭৪৭ সালে তারা জানাল ১২% সুদের নিচে তাদের ধার পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না (Ibid., vol. 20, f. 76vo, 31 July 1747) নভেম্বরেও ইওরোপ থেকে একটাও জাহাজ কলকাতা বন্দরে না ঢোকায় নগদের অবস্থা আরও ঘোরালো হয়ে পড়ে। ঢাকা কুঠি লিখল no one being willing to lend them a single rupee their credit being quite gone, none of the Company’s ships arriving with any treasure (Ibid., vol. 20, f. 235vo, 24 Nov. 1747)। পাল্টা চিঠিতে কলকাতা কাউন্সিল আশা প্রকাশ করে বলল ইওরোপ থেকে সম্পদ ভর্তি জাহাজ এলে নিশ্চই অবস্থার উন্নতি ঘটবে it will raise their credit to enable them to go on with the Investment (Ibid., vol. 20, f. 283vo, 28 Dec. 1747)। কিন্তু সেটাও ঘটল না। ১৭৪৮ সালে তারা লিখল, কলকাতা বা কাশিমবাজারের কুঠি থেকে আসা কোন আর্থিক সাহায্য ছাড়া বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ছে it will be impossible to send down any Goods this season as they could get no money there (NAI, Home Misc., vol. 13, f. 85, para. 70, Letter to Court, 10 Jan. 1748; Beng. Letters Recd., vol. 21, f. 237;’F.WIHC, vol. 1, PP: 203-4)।
মুদ্রা ছাপানো এবং দাবি ধাতু বিক্রির সমস্যা
(এই পর্ব শুরুর আগে যদিও অনধিকার চর্চা, তবুও নবাবি বাংলার আর্থ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করব আমার পলাশীপূর্ব বাংলার ৫০ বছর বই থেকে। আমার ধারণা এই পর্বটি পাঠ করলে, বর্তমান অধ্যায়ে সুশীলবাবু যে সব বিষয় সাঁটে আলোচনা করেছেন যে সব বিষয় প্রথমে আমার বুঝতে সমস্যা হয়েছিল, সে সব পাঠকদের বুঝতে সুবিধে হতে পারে। প্রসঙ্গত বলে রাখি মুর্শিদকুলি খাঁ যখন বাংলায় এলেন তখন দুটো টাঁকশাল — রাজমহল আর ঢাকায়। ১৭০৮-এ রাজমহলের টাঁকশাল মুর্শিদাবাদে তুলে আনলেন।
এবার মুদ্রা নিয়ে আলোচনা বাংলা বাজারে সোনার টাকা মোহর নামে পরিচিত। সোনার মোহরের সঙ্গে রূপোর টাকার বিনিময় মূল্য ছিল চৌদ্দ থেকে ষোল সিক্কা (ভুলও হতে পারি, সেই জন্যই হয়ত আমি বাল্যকালে কথ্য ভাষায় ষোল সিকি কথাটা শুনতাম)। সোনার টাকা ছিল মূলত রাজস্ব, উপঢৌকন, উপহার বা সঞ্চয়ের জন্য — দৈনিক ব্যবহারের জন্যে নয়। রূপোর টাকা (যেখান থেকে রূপিয়া শব্দটা এসেছে) ১০০ ভাগ খাঁটি রৌপ্য মুদ্রা। সিক্কা টাকা টাঁকশাল থেকে বেরিয়ে আসা সরকারের ছাপমারা মুদ্রা। তামার পয়সার নাম দাম। এক রূপোর টাকা সমান চল্লিশ দাম। শতাব্দের শুরুতে মুর্শিদকুলি খানের সময়েই তামার দামকে ব্যপ্তভাবে প্রতিস্থাপিত করল তৎকালীন খুচরো পয়সা কড়ি। বলা দরকার কড়ি নাজারে সব থেকে কম মূল্যের মুদ্রা হিসেবে কার্যকর ছিলই বহুকাল থেকেই, কিন্তু তামার মুদ্রাকে এই প্রথম বাজার থেকে হঠিয়ে দিল মালদ্বীপ থেকে বাংলা চালের বদলে আমদানি করা কড়ি। বাংলাকে যেহেতু তামা সরবরাহের জন্য ডাচেদের ওপর নির্ভর করতে হত, বাংলা সরকার ঠিক করল দামকে তারা হাড়িকাঠে তুলবে। এবার থেকে কড়ি হল বৈধ খুচরো মুদ্রা। এক টাকা সমান ৩২ পণ কড়ি (২০ গণ্ডায় এক পণ)।
বাংলায় ব্যাঙ্কিং-এ হরিশ চন্দ্র সিংহ লিখছেন, বাংলা বাজারে ভারতজোড়া বাজারগুলো থেকে বহুরকমের মুদ্রা আসত। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সারা ভারতে অনেকগুলো স্বাধীন রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের সার্বভৌম পরিচিতি হিসেবে মুদ্রা চালু করেছিল। সেই কয়েকশ ধরণের মুদ্রা ছিল নানান মাপের নানান দামের নানান ওজনের। মুঘলদের সময়কার কঠোরভাবে মুদ্রামান বজায় রাখা মুদ্রার আকৃতি আর ওজন নতুন সাকসেসর রাষ্ট্রগুলোয় অনেক ছোট আর হাল্কা হয়ে গেল — অর্থাৎ মুদ্রার মূল্যমান কমে গেল। বাংলায় না পারলেও দক্ষিণ আর পশ্চিম ভারতে ইংরেজ, ফরাসি, ওলান্দাজেরা সেই অঞ্চলের টাঁকশাল নিয়ন্ত্রণ করে নিজের নিজের টাকা ছাপিয়ে নিত। বাংলার বাজারে আর্কটের প্যাগোডা, ইংরেজ ফরাসি আর ওলান্দাজদের আর্কট, সুরাট, বোম্বাই, কাশী আর অযোধ্যার টাকাও আসত। বাংলা বাজারে সে সময় ভিন্ন আকৃতি, ভিন্ন ওজনের বত্রিশ রকমের মুদ্রা চালু ছিল। শুধু আন্তর্জাতিক ব্যবসাই নয় আন্তঃরাজ্য ব্যবসার লাভের গুড় বাংলার পক্ষেই থাকত — বাংলা ছিল সব থেকে বড় উদ্বৃত্ত অর্থনীতির অঞ্চল। এখানকার মত শস্তাতম দামে বিশাল বৈচিত্রের আর উচ্চগুণমানের পণ্য সব জায়গায় পাওয়া যেত না। জীবনধারণ খুব সহজে শস্তায় করা যেত। ফলে সক্কলে বাংলার সঙ্গে ব্যবসা করতে চাইত — তাই প্রচুর মুদ্রা বাংলার বাজারে নিয়মিতভাবে এসেছে। বাংলার কেন্দ্রিয় ব্যাঙ্কিং পরিবার জগতশেঠেরা এই মুদ্রাগুলোর বিনিময় হার ঠিক করত, এছাড়াও দেশ জোড়া মুঘল সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের টাঁকশালের মুদ্রার মান, ওজনও অভিন্ন ছিল না। ঢাকা, পাটনা, কটকের টাকা মুর্শিদাবাদের টাকার সমান বিনিময় হার ছিল। বাংলায় প্রচুর পোদ্দার, স্রফ মুদ্রা বিনিময় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। জগৎশেঠ পরিবারের সঙ্গে তাদের ব্যবসা ছিল। যারা তাদের বিরোধিতা করত বা সমান্তরাল আর্থিক লেনদেন চালাত তারা বাজার থেকেই বার হয়ে যেত। (চলবে)