| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ফ্রম প্রস্পারিটি টু ডিক্লাইন — এইটিনথ সেঞ্চুরি বেঙ্গল : সুশীল চৌধুরী, (২য় কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৪০৯ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৩

সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা

ভূমিকা

যেহেতু মুঘল সুবা বাংলা, সর্ব প্রথম বিদেশি ব্রিটিশ উপনিবেশের অধিকারে গেল, উপনিবেশপূর্ব সময়ের এই অঞ্চলের ইতিহাস, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, অর্থনীতি বিষয়ে জ্ঞান এবং তথ্য নিয়ে আলোচনা জরুরি। এই সব তথ্য ব্যবহার করে ১৭৫৭-র পলাশী যুদ্ধের আগের সময়ের বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থা কী ছিল এবং পলাশীর পরে উপনিবেশিক আমলে কী কী পরিবর্তন এসেছে সে সব বিষয় আমরা বুঝতে পারব। উপনিবেশিক শাসন কিভাবে বাংলার পরম্পরার অর্থনীতির ওপর ঘা মেরেছিল, সেই গবেষণা ইতিমধ্যে বহু গবেষক সম্পাদন করেছেন (এ বিষয়ে কিছু কাজের জন্যে এই বইগুলি পড়তে পারেন — N.K.Sinha, Economic History of Bengal, 3 vols.; D.B.Mitra, Cotton Weavers of Bengal; Hameeda Hossain, Company, Weavers of Bengal; T. Raychaudhuri, ‘The mid-Eighteenth Century Background’ and S. Bhttacharya ‘Regional Economy (1757-1857): Eastern India’ in Cambridge Economic History of India, vol. II.)। কিন্তু উপনিবেশপূর্ব সময়ের ঠিক আগের সময়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে বংলার অর্থনীতির অবস্থা নিয়ে খুব বেশি গবেষণার কাজ হয় নি। এই বইতে আমি বাংলার পলাশীপূর্ব সময়ের অর্থনীতির সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরেছি। আমি বলেছি ব্রিটিশপূর্ব সময়ে বাংলায় আর্থিক সমৃদ্ধি (পাতার দ্বিতীয় টিকায় সুশীলবাবু ‘prosperity’ এবং ‘decline’এর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, ‘এই বইতে প্রস্পারিটি শব্দ ব্যবহার করেছি অর্থনীতির উন্নতিশীলতা বোঝাতে, বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্প ক্ষেত্রে; উন্নতির বিপরীতে অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয় পাদে অর্থনীতির পতনের সময় শুরু হয়; সেই ঢালপথে অর্থনীতির গড়িয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ হবে ঊনবিংশ শতকের শুরুর সময়ে — The word ‘prosperity’ is used here in the sense indicating a thriving state of affairs, especially in trade and industry, in contradistinction to the decline which was clearly manifest in the second half of the eighteenth century and culminated in the early nineteenth) যে ঘটেছিল, সে তথ্যে আজ আর প্রশ্ন ওঠা উচিত নয়। পলাশী পরবর্তী সময়ে, অষ্টাদশ শতাব্দের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার পরম্পরার ব্যবসা এবং উতপাদন ব্যবস্থার পতনের পথ প্রশস্ত হয়। প্রথম বিষয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বিষয়ে খুব কম গবেষকই আলোচনা করেছেন। তাই প্রথমে আমরা ১৭৫৭ পর্যন্ত প্রায় ৫ দশক ব্যপ্ত বাংলা ভূখণ্ডের সমৃদ্ধ অর্থনীতির বিশদ কর্মকাণ্ড আলোচনা করব। তার সঙ্গে পলাশীর পরের সময়ে উপনিবেশকালে অর্থনীতির সূচকগুলি পতনের যে ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছিল তাকেও সূত্রায়িত করব। কিভাবে একটি সমৃদ্ধশালী ভূখণ্ড বৈদেশিক শাসনের প্রভাবে নিশ্চিতভাবে পতনের দিকে ঢলে যাচ্ছে, সে তথ্য এবং প্রক্রিয়া বুঝতে অষ্টাদশ শতকের বাংলা আমাদের কাছে একটি আশ্চর্য নিদর্শন হিসেবে উপস্থিত রয়েছে। আমরা যেন মাথায় রাখি মুঘল বাংলা সুবার ব্যপ্তি ছিল আজকের পশ্চিমবাংলা, বিহার, ওডিসা এবং আধুনিক কালের বাংলাদেশজুড়ে।

উপনিবেশ শুরু আগের প্রায় দুই শতাব্দ ধরে বাংলা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম সমৃদ্ধিশীল সুবা। মধ্য সপ্তদশ শতকে, হয়ত তারও বহু আগে বাংলা ভূখণ্ড আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচক্রের হৃদিঅক্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে ওঠে। এর উর্বর ভূমিতে বিভিন্ন ধরণের ফসল চাষ হয়েছে। উর্বর চাষ ক্ষেত্রের সঙ্গে জুড়েছিল বিপুল দক্ষ কারিগর, তাঁতিরা, চরম বিকশিত আর্থিক ক্ষেত্র। সুগম্য যোগাযোগ ব্যবস্থা তাকে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম গন্তব্যস্থলে পরিণত করেছে। অষ্টাদশ শতকের প্রথমপাদ পর্যন্ত বিপুল রাজস্ব — সে বিল অব এক্সচেঞ্জেই [হুণ্ডি] হোক বা নগদ সম্পদেই হোক, পৌনপুনিকভাবে দিল্লির দরবারে পাঠিয়েছে বাংলা সুবার কর্তৃপক্ষ। বছরের পর বছর বাংলায় বিপুল উদ্বৃত্ত তৈরি এবং এই উদ্বৃত্তকে খুব সহজে নগদী অর্থে পরিণত করার ক্ষমতা দূর লক্ষ করছিল ইওরোপ থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় আসা সনদী কোম্পানিগুলো। যে জন্যে বাংলা ভূখণ্ডকে অধিকাংশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেবে সে তথ্য আজ আর খুব একটা আশ্চর্য জাগায় না। বাংলা সুবা, সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে প্রায় সব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এশিয় ব্যবসার কেন্দ্র হয়ে উঠেবে। বাংলার শক্তিশালী অর্থনীতির দিকে নজর রেখে, প্রত্যেকটি ইওরোপিয় শক্তি বাংলাকে তাদের সম্ভাব্য উপনিবেশ হিসেবে দেখতে চাইছিল। সোনা/দামি ধাতু/অর্থ দিয়ে বাংলার পণ্য কিনে, বিপুল রপ্তানি উদ্বৃত্ত তৈরি করত সওদাগরেরা। বাংলার বদনাম ছিল বাড়তে থাকা বিপুল অর্থনীতি নিয়ে সে এশিয়ায় আসা সমস্ত সোনার খাদক হয়ে উঠছে। তার বাণিজ্য উদ্বৃত্তের জন্যে এক কণা দামি ধাতুও বাংলার অর্থনীতি থেকে বেরোনোর সুযোগ ছিল না (Alexander Dow, Hindostan, vol. III, p. lxii)। একই সঙ্গে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের মনে রাখা দরকার শুধু ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোই বাংলার পণ্য কিনতে সোনা বয়ে নিয়ে আসত না, বাংলা নির্ভর এশিয় ব্যবসায়ীদেরও নগদ অর্থ আর দামি ধাতু দিয়ে বাংলায় ব্যবসা করতে হত। অবিসংবাদীভাবে এশিয় বাণিজ্যে বাংলা ছিল স্বনির্ভরতম অর্থনীতি। বাংলার অর্থনীতিতে রূপো (এবং সোনা — অনুবাদক) ছাড়া বিদেশি পণ্য আমদানির খুব একটা সুযোগ ছিল না। দামি ধাতু ছাড়া বাংলায় আসত বিপুল পরিমানে তুলো, অন্যান্য অদামি ধাতু [তামা, টিন, নানান সঙ্কর ধাতু — অনুবাদক] এবং ধনীদের জীবনুযাত্রা নির্বাহকরার জন্যে নানান ভোগ্যপণ্য। বাংলার পণ্য রপ্তানির মূল্যমানের তুলনায় আমদানি পণ্যের মোট মূল্য খুবই তুচ্ছ পরিমান ছিল।

মধ্য-অষ্টাদশ শতকেই বাংলায় ব্যবসা করতে করতে ইওরোপিয় কোম্পানিরা বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠে নিভৃতে কোম্পানির পরিচালন সমিতির বৈঠকে বাংলা জয় করার পরিকল্পনার মন্ত্র সাকার করার দিকে এগোতে থাকে। ইওরোপিয়রা, বিশেষ করে ব্রিটিশেরা ১৭৫০-এর কয়েক দশক আগেই বাংলা দখলের পরিকল্পনার জালসাজিস তৈরি করেফেলেছিল (Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, pp.35-37)। ব্রিটিশ কোম্পানির পলাশী বিজয় পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা ঘটনা নয় অথবা পলাশীর চক্রান্ত হঠাতই ঘটে যায় নি। পলাশী ভারতবর্ষে পরিকল্পিতভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পত্তনের সূচনাবিন্দু। উদ্বৃত্ত অর্থনীতির বাংলায় প্রথমে উপনিবেশ তৈরি হওয়ায় এই অঞ্চলের সম্পদ ব্যবহার করে ইওরোপিয়দের অন্যান্য অঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হল। পলাশীর পরের লুঠ [লুঠ শব্দটা সুশীলবাবু লেখেন নি; অনুবাদকের সংযুক্তি] উদ্বৃত্তে ব্রিটিশেরা তাদের সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করে ভারতবর্ষজুড়ে ভূমিখণ্ড দখল করতে শুরু করে। অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে সমৃদ্ধশালী ভৌগোলিক বাংলা অঞ্চল, পলাশীর পর ব্রিটিশদের শাসন ব্যবস্থায় গরীব উপনিবেশে পরিণত হল। ঔপনিবেশিক শাসনে বাংলা বিশ্বের উতকৃষ্টতম কারিগরি শিল্পকেন্দ্র থেকে শুধু মাত্র কাঁচামাল রপ্তানির কেন্দ্র [এবং ইওরোপিয় কারখানার উতপন্ন পণ্যের বাজার — অনুবাদক] হিসেবে ব্যবহৃত হল। তাই বাংলার অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার সময়ের বাস্তবতা থেকে শুরু করে অর্থনীতর ধ্বংসক্রিয়ার মাত্রা বুঝতে আমাদের প্রথমে উপনিবেশপুর্ব সময়ের ব্যবসা, শিল্প, বাজার, সওদাগরদের অবস্থা, উতপাদন কাঠামো বোঝা জরুরি; সব শেষে পতনের বাখান। এই বইএর উদ্দেশ্যও পলাশীপূর্বের সময়ের অর্থনীতির পরিচয় সন্ধান। উপনিবেশের সময়ে পরম্পরার শিল্প বিশেষ করে তাঁত এবং রেশম, উনবিংশ শতকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে এই দুটি শিল্প অষ্টাদশ শতকের প্রথমপাদ পর্যন্ত বিপুল বিশ্ববাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মিটিয়েছে। আমরা এই শিল্প ক’টার কাঠামো এবং সংগঠন বিশদে বুঝব ৬, ৮, ৯ অধ্যায়ে। এই আলোচনা সূত্রে অমরা আন্দাজ করতে পারব কিভাবে বাংলার শিল্প এশিয় এবং ইওরপিয় বাজারের প্রায় অসীম চাহিদা পূরণ করত উতপাদনের প্রযুক্তি [এবং কাঠামো আর ব্যবস্থা] না পাল্টিয়ে।

বইটিতে এই সময়ের এবং এই অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর বিভিন্ন বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। ভারতবর্ষ নিয়ে অধিকাংশ অর্থনৈতিক ইতিহাসের কাজে বিশেষ করে বাংলার অর্থনীতি গবেষণায় বাংলা-ইওরোপ ব্যবসা গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে [S. Bhattacharya, East India Company (1954); S. Chaudhuri, Trade and Commercial Organizataion (1975); K.N. Chaudhuri, Trading World (1978); Om Prakash, Dutch Company (1985); S. Arasaratnam, Merchants, Companies and Commerce (1986)]। সমস্যা হল এ প্রত্যেকটি গবেষণায় বাংলা নির্ভর এশিয় বণিকদের বাণিজ্য উদ্যমের বিষয়টি আলোচনাই হয় নি। ঢাকা পড়েছে। অস্বীকার করা যায় না আলোচ্য সময়ে ইওরপিয় কোম্পানিগুলোর ক্রমাগত বাড়তে থাকা বাণিজ্য সূত্রে বাংলায় বিপুল পরিমান দামি ধাতু আমদানি ঘটেছে। একই সঙ্গে বলা দরকার মধ্য অষ্টাদশ শতকে বাংলা থেকে বাংলা নির্ভর এশিয় বণিকদের রপ্তানি করা দুটো দামিতম পণ্য, সুতি আর রেশম বস্ত্রের রপ্তানির পরিমান ইওরপিয়দের রপ্তানির পরিমান ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই সূত্রে আরও একটা বিষয় প্রমান করা যায়, বাংলা থেকে পশ্চিম এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ায় পণ্য রপ্তানি কাঠামোয় রাজপথ নির্ভর ক্যারাভান বাণিজ্য মুঘল, সাফাভি এবং অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরেও ধ্বংস হয়ে যায় নি। ১৭৭০-এর দশকে, যখন এশিয় বণিকেরা ইওরোপিয় বণিকদের চাপে বিপর্যস্ত, তখনও বেশ কিছু পরিমানে রেশম রপ্তানি হচ্ছে লাহোর এবং মূলতানে। আমরা জানি, সেই কোন কাল থেকে লাহোর এবং মূলতান দেশিয় রপ্তনির পণ্য যাযাবরদের ক্যারাভান নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার পথে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র (নোডাল পয়েন্ট) ছিল। ইওরোপিয় এবং এশিয় মহাফেজখানা জুড়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজে অষ্টাদশ শতাব্দের প্রথম পাদের রাজপথীয় বাণিজ্যের বিপুল তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব।

প্রখ্যাত ডাচ ঐতিহাসিক J.C.van Leur এশিয় বাণিজ্যকে চরিত্রায়িত করেছেন খুচরো পথবাণিজ্য (peddling trade) বা হকার বাণিজ্য এবং ধনীদের জন্যে বিক্রি করা পণ্যের রপ্তানি বাণিজ্যের মিলিত রূপ হিসেবে (J.C van Leur, Indonesian Trade and Society, pp. 132-33, 197-201, 219-20.)। এশিয় বাণিজ্যে পথ ব্যবসায় নির্ভরতার তত্ত্বটি সাম্প্রতিক গবেষণায় তার মত করে জোরদারভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আরেক প্রখ্যাত গবেষক। তিনি দাবি করেছেন সুরাটের প্রখ্যাত সওদাগর মুল্লা আবদুল গফফর নাকি ছিলেন পথব্যবসায়ী বা হকার (Niels Steensgaard; Asian Trade Revolution, pp. 22-59; Ashin Das Gupta, Indian Merchants, pp. 11-13)। এ বিষয়ে আমি একমত নই। তবে নীলসের কাজ অন্য দিকে গুরুত্বপূর্ণ। বহু ইওরোপিয় ঐতিহাসিকের দাবি এশিয় রপ্তানি বাণিজ্য ছিল মূলত বিলাসদ্রব্য নির্ভর। কিন্তু নীলস গবেষণাসূত্রে প্রমান করেছেন এশিয় বাণিজ্য মূলত অবিলাসপণ্য নির্ভর উদ্যম(Ashin Das Gupta, ‘The Maritime Merchant, 1500-1800’, Proceedings of the Indian History Congress, Presidential Address, 35th Session, pp. 99-111)। বাংলা অর্থনীতি ক্ষেত্রেও দেখানো যায় বাংলা থেকে এশিয়া ইওরোপ জুড়ে দামিতম মসলিন বা মিহি ক্যালিকোর তুলনায় অনেক বেশি পরিমানে রপ্তানি হচ্ছে সাধারণ মানের শস্তা মোটা ক্যালিকো (সপ্তম অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। এ ধরণের ইওরোপিয় গবেষকেরা এশিয় রপ্তানি বাণিজ্যকে যেভাবে পথ ব্যবসায়ী বা হকারদের ব্যবসা হিসেবে দেখিয়েছেন সেটা মনে হয় ঠিক নয়। বইএর পঞ্চম অধ্যায়ে দেখিয়েছি, বাংলার প্রধান সওদাগর-ব্যাঙ্কার জগৎশেঠ, কলকাতার উমিচাঁদ এবং আরমেনিয় খাজা ওয়াজিদ সাধারণ রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো হকার বণিক নন। উল্টে তাদের কাজের বিস্তৃতি, তাদের বাণিজ্য সাম্রাজ্য সূত্র তাদের মেদিচি, ফুগার্স বা ট্রিপসের সঙ্গে তুলনা করিতে পারি।

বাংলার সওদাগরদের চরিত্র বিষয়ে ভ্যান লেউর যা বলেছেন, আমাদের গবেষণাও তাই পেয়েছি, এরা মূলত শাসক অভিজাত নির্ভর ব্যবসায়ী ছিল (j.C. van Leur, Indonesian Trade and Society, p. 204)। অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদ পর্যন্ত বাংলার সওদাগর সম্রাটদের ক্ষমতার শীর্ষে আরোহন এবং মহত্ব অর্জনের একটা বড় কারণ হল, এই ব্যবসায়ীদের বাংলার নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতা। পঞ্চম অধ্যায়ের আলোচনায় দেখাব কিভাবে দরবারকে ভিত্তি করে এই সওদাগর সম্রাটদের উত্থান এবং বাড়বাড়ন্ত ঘটেছে। পলাশীর পরে পুরোনো পৃষ্ঠপোষকেরা সরে গেলে, তাদের ব্যবসা জগত হেঁটমুণ্ডঊর্ধ্বপদ হয়ে ধ্বসে পড়ল তাসের ঘরের মত। আশ্চর্যের হল সম্প্রতি গুজরাট এবং সুরাটে দুই ব্যবসায়ীর ওপর গবেষণার কাজ হয়েছে, সেখানে দেখা গিয়েছে তারা প্রশাসন নিরপেক্ষ হয়ে ব্যবসা বাড়িয়েছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন ব্যবসায়ীরা সরকারের পৃষ্ঠপোষণা ছাড়াই নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারছেন (M.N. Pearson, Merchants and Rulers; Ashin Das Gupta, Indian Merchants)। ঠিক এই ধরণের উদাহরণের বিপরীতে আমরা দেখাতে পাচ্ছি, কিভাবে হাতে হাত ধরে শাসক অভিজাত আর ব্যবসায়ীরা এক যোগে কাজ করেছে পলাশীপূ্র্ব সময়ে।

এই বইতে আরেকটি গুরুত্বপুর্ণ বিষয়, ব্রিটিশদের বাংলা বিজয় নিয়ে আলোচনা। অধিকাংশ ঐতিহাসিকই পলাশীর চক্রান্তের চরিত্র এবং পলাশী বিজয়ে ব্রিটিশদের সক্রিয় ভূমিকাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেন নি। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও বলা হয়েছে বাংলার আভ্যন্তরীণ আর্থিক এবং রাজনৈতিক দুর্যোগের জন্যই ব্রিটিশেরা বাংলায় এসেছিল। ঐতিহাসিকেরা বার বার বলেছেন ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে পলাশী চক্রান্ত ঘটানোর মত রণনৈতিক পরিকল্পনা তৈরি ছিল না। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবকে পরাজিত করতে পলাশীর চক্রান্তের সলতে পাকাতে এবং পলাশী ঘটাতে ব্রিটিশ বণিকেরা বড় ভূমিকা পালন করে নি। তাদের তত্ত্ব হল ইওরোপিয়রা ব্যবসার জন্যে বিপুল অঙ্কের দামি ধাতু বাংলায় আনত। সেই আমদানি করা দামি ধাতুর অর্থনীতির সঙ্গে বাংলার সামরিক দরবারি অভিজাত, সওদাগর-ব্যাঙ্কার গোষ্ঠী এবং জমিদারদের স্বার্থ সরাসরি জড়িয়েছিল। ১৭৫৬-য় কলকাতা থেকে ব্রিটিশদের তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে মুর্শিদাবাদের শাসক অভিজাতরা মেনে নিতে পারে নি, তার ফলে পলাশীর চক্রান্ত ঘটিয়ে ব্রিটিশ-স্বার্থসম্বন্ধীয়রা ব্রিটিশকে দিয়ে প্রশাসন দখল করিয়ে বাংলায় উপনিবেশ তৈরি করায় (P.J. Marshall, Bengal, 56, 63, 65, 67, 77, 91; C.A, Bayly, Indian Society, 49-50; Rajat Kanta Ray, ‘Colonial Penetration and Initial Resistance, IHR, vol. XII, nos. 1-2, 1986, pp. 4, 6, 7, 14.)। একই সঙ্গে বাংলার রাজনৈতিক সঙ্কটের তত্ত্বও ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে এটা দেখাতে, অষ্টাদশ শতকের প্রথম থেকেই অভিজাতদের সঙ্গে নবাবদের দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং তার ফলে মুর্শিদাবাদের দরবারে নতুন শ্রেণীবিন্যাস ঘটে যায়। একই সঙ্গে বলা হল, ব্রিটিশ দখলদারির আগে নবাবি দরবারকে আর্থিক দুর্গতির ঘণঘটা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছিল (P.J. Marshall, Bengal, p. 91)। বেশ কয়েকজন ঐতিহাসিকের প্রতিপাদ্য ছিল ১৭৪০ এবং ১৭৫০ দশকজুড়ে বাংলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাহ্যত এবং দীর্ঘকালীন মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছিল (Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 33; K.N. Chaudhuri, Trading World, pp. 99-108’, 159, 311-12; P.J. Marshall, EastlndianFortunes, p. 35; Bengal, pp. 72- 73, 91, 142-43, 163-64, 170)।

এই প্রবণতার বাইরে বেরিয়ে বইতে দেখানোর চেষ্টা করেছি ব্রিটিশদের বাংলা বিজয় অনিচ্ছাকৃত বা হঠাত ঘটে যাওয়া ঘটনা ছিল না। একাদশ অধ্যায়ে আমি দেখিয়েছি, কোম্পানির আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা স্বার্থেই পলাশীর চক্রান্তের জাল বোনা চলেছে; তার ফলে বাংলার ক্ষমতায় ইওরোপিয় দখলদারি ঘটেছে। ফরাসী কোম্পানির আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার বাড়বৃদ্ধির জন্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা মার খাচ্ছিল। তাই ফরাসীদের ব্যবসা বৃদ্ধি রুখতেই তাদের ধ্বংস করা হয় (পলাশী ঘটানোর আগে চন্দননগর শহর গুঁড়িয়ে দেওয়া)। এর ফলে ব্রিটিশ বিরোধী বঙ্গ-ফরাসী জোট তৈরি হওয়ার প্রচেষ্টা বন্ধ হয়েগেল। শুধু ফরাসিদের ওপর অত্যাচার নামিয়ে এনেও ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য সিদ্ধি হচ্ছিল না। বাংলার নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করার দরকার হয়ে পড়ছিল। কারণ নতুন নবাব উদ্ধতভাবে ব্রিটিশ কোম্পানি আর আমলাদের বেআইনি ব্যক্তিগত ব্যবসা আর দস্তকের দুর্ণীতিগ্রস্ত যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলছিলেন। এর ফলে কোম্পানি আমলাদের বাংলায় উপউপনিবেশিকতা তৈরির পরিকল্পনা বাধা পাচ্ছিল। বাংলার অভিজাতদের সঙ্গে ইওরোপিয়দের নতুন করে শ্রেণী সমঝোতা গড়ে ওঠা তত্ত্ব অনেকে দিয়েছেন। এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে একটাই মন্তব্য করা যায়, যে সওদাগর সম্রাট পলাশীর বিপ্লবে অন্যতম প্রধান কুশীলব ছিলেন, তাদের মুল রোজগার কিন্তু ইওরোপ কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা সঞ্জাত উদ্বৃত্ত ছিল না। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রাজনৈতিক কাঠামো আলোচনা করতে গিয়ে দেখাবার চেষ্টা করেছি, সে সময়ে যে নতুন শ্রেণী-সমঝোতা তৈরি হল, তার ভিত্তি হল ব্যক্তিগত স্বার্থসাধন, কোনও সাংগঠনিক ভিত্তি নয়। এই জন্যে জোট সমঝোতা ক্ষণস্থায়ী হল। আমরা দশম অধ্যায়ে দেখাব, যে সময়ের আলোচনা আমরা করছি সে সময়ে যে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির তত্ত্ব দেওয়া হয়েছে সেই মূল্য বৃদ্ধিকে কোনো ভাবেই উল্লেখাযোগ্য এবং দীর্ঘসময়ের প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev