| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ফ্রম প্রস্পারিটি টু ডিক্লাইন — এইটিনথ সেঞ্চুরি বেঙ্গল : সুশীল চৌধুরী, (২০নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ২০৪ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা

চতুর্থ অধ্যায়

মুদ্রা ছাপানো এবং দাবি ধাতু বিক্রির সমস্যা

বাংলা বাজারে চালু ছিল চালানি টাকা। চালানি টাকা কাল্পনিক বা বিমূর্ত মুদ্রা নয়, সব ধরণের টাকার বিনিময় ঠিক হত এর মাধ্যমে — এই টাকার কোন ক্ষয় নেই, পরিবর্তন নেই। প্রচলিত মুদ্রা ব্যবস্থায় মুদ্রা পুরোনো হলে ক্ষয়ে যাওয়ার জন্যে বাজারে দাম কমে যেত। সে জন্য প্রতি তিন বছর অন্তর পুরোনো মুদ্রা নতুন করে টাঁকশালে এনে ছাপ দেওয়াবার (রিকয়েনিং) ব্যবস্থা করা হত। বাংলার মহাজন আর ব্যবসায়ীরা শতকরা দুটাকা হারে তাদের পুরোনো ‘সোনাত (সোনার মত) মুদ্রা ‘সিক্কা’টাকায় রূপান্তরিত করতেন। তিন বছর অন্তর টাকা নতুন করে টাঁকশালে ছাপিয়ে বেরোবার পর এক বছর সে টাকা বাজারে পূর্ণদ্যোমে চলত। দ্বিতীয় তৃতীয় বছরে ক্ষয়ের জন্য দাম কমতে থাকত তার। তখন এর নাম হত সোনাত বা সোনার মত। সিক্কা টাকা এক বছর পর তিন আর দু বছর পর পাঁচ শতাংশ দাম কমত। আরেকভাবে উদাহরণ দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করা যাক। সিক্কা টাকার সঙ্গে চালানি টাকার বিনিময়ের হার হল ১০০ সিক্কা টাকা সমান ১১২.৫ চালানি টাকা। এটা সরকারি হার, খোলা বাজারের দর ১১৮ চালানি টাকা। ক্ষয় হোক আর নাই হোক সিক্কা দ্বিতীয় তৃতীয় বছর সোনাত হলে সেই সোনাতের সঙ্গে চালানি টাকার বিনময় হল ১০০ সোনাত সমান চালানি টাকা।

সরকারিভাবে সিক্কা আর সোনাতের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি ছিল বাংলা বাজারের সুষ্ঠুভাবে মুদ্রা ব্যবস্থা চালু রাখার জন্যে। উদ্দেশ্য হল সিক্কার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা এবং তাকেই একমাত্র বৈধ বিনিময় মুদ্রা হিসেবে বাজারে তার মান বজায় রাখা। সেই জন্য নিয়ম ছিল তিন বছর অন্তর অন্তর সব সোনাতকেই সিক্কায় রূপান্তরিত করতে হবে। নাহলে সোনাতই বাজারের প্রধান মুদ্রা হত। দামে কম বলে বাংলার ব্যসায়ীরা তৃতীয় বছরে পোদ্দার আর স্রফেদের (যারা টাকার বিনিময় মূল্য ঠিক করত) কাছে সোনাত নিয়ে যাওয়া হত। স্রফেরা টাঁকশালে সোনাত জমা দিত সিক্কায় পরিণত করার জন্য। দুশতাংশ বাটা। তাতে টাঁকশালের আয়ও বাড়ত বিলক্ষণ। এইভাবে সোনাতের সঙ্গে সিক্কা বদল হত। কারণ তিন বছর পরে মুদ্রার আর বিনিময় মূল্য থাকত না, কারন মুদ্রার ধাতু মুল্যেই তার দাম ঠিক হত। চালানির সঙ্গে ইংরেজদের আর্কট মুদ্রার বিনিময় মূল্য ছিল ১০০ আর্কট সমান ১০৯ চালানি টাকা।

এবারে নবাবী আমলের শহুরে নবাবী আর্থব্যবস্থা বুঝতে জগৎশেঠেদের কাজকারবারে উঁকি দেওয়া জরুরি। কোন জগত শেঠ? যাদেরকে ইংরেজপন্থী বাঙালিরা বাঙলার রথসচাইল্ড নাম দিয়ে আজও কটুতম আত্মপ্রসাদ লাভ করে। ইওরোপিয়দের মনে হত জগতশেঠদের কাজকর্মই তখনকার রাজন্য বাঙলার অর্থনীতি। ফরাসিদের ধারণা ছিল জগতশেঠ ভাইরাই পলাশি চক্রান্তের মূল জন্মদাতা, তাদের ছাড়া ইংরেজরা পলাশির চক্রান্তেরমত হঠকারি-গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। পলাশি উত্তর সময়ে আমীরচাঁদকে ক্লাইভ জোর করে তীর্থে যেতে নির্দেশ দিয়ে মালদায় নদীতে বিসর্জন দিলেন, আমীরচাঁদ মারা গেলেন অমৃতসরে তীর্থ করার অপূর্ণ বাসনা নিয়ে।

যতদিন মুর্শিদকুলি খাঁ’র টাঁকশালের বিশ্বস্ত দারোগা রঘুনন্দন বেঁচেছিলেন ততদিন নবাবের খাজাঞ্চিখানার চাবি জগতশেঠ পদবিধারী ফতেহচাঁদের পরিবারের কব্জায় থাকলেও, টাঁকশালের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ শেঠ পরিবার পায় নি। রঘুনন্দন যখন মৃত্যুশয্যায়, সে সময় দিল্লি থেকে ফারুফশিয়রের ফরমান আনিয়ে ইংরেজরা বাঙলা সুবায় টাঁকশাল চালানোর অধিকারের জন্য লড়াই শুরু করে। ইংরেজদের দেওয়া ফারুখশিয়রের ১৭১৭-তে বাংলার টাঁকশাল ব্যবহারের অনুমতিপত্রে বলা ছিল ইংরেজদের মাদ্রাজ টাকার ওপর বাংলার টাঁকশাল কোন বাটা নিতে পারবে না। মুর্শিদকুলি, জগতশেঠ ফতেহচাঁদের সক্রিয় বিরোধিতায় এই ফরমান বাংলায় লাগু করা যায় নি। একইসঙ্গে ভেতরে ভেতরে জগতশেঠেরা সম্রাটের দরবারে নল চালিয়ে টাঁকশালের ফরমান নিজেদের নামে করে বানিয়ে নেয়। এরাই দেশের একচেটিয়া সোনা রূপোর ক্রেতা। বাটায় অভূতপূর্ব লাভ। সেজন্য বিদেশিদের টাঁকশালের অধিকার দেওয়া মুশকিল ছিল।

রঘুনন্দনের মৃত্যুতে টাঁকশালের আশায় থাকা ইংরেজরা দেখল, নবাবি কারসাজিতে ইংরেজদের বঞ্চিত করে ফতেহ্চাঁদের পরিবার সেই ফরমান বাগিয়ে নিয়েছে। আগেই বলেছি শতকরা মাত্র দু থেকে আড়াই টাকা হারে বাজার থেকে তারা পুরোনো সিক্কা কিনত। বাজার থেকে জনগণের কাছ থেকে পুরোনো মুদ্রা বা অন্য প্রদেশের মুদ্রা এনে টাঁকশালের ছাপ মেরে নতুন সিক্কা বানাত। ইংরেজরা তাদের দেশ থেকে আনা সমস্ত রূপো ফতেহচাঁদের পরিবারে বেচতে বাধ্য হত।

১৭৪০-এর পর থেকে হিন্দুকুশ থেকে সুরাট বন্দর হয়ে দেশি বণিকের হাতে সোনা-রূপো আসা বন্ধ হয়ে যায় সুরাট বন্দরের পতনের পরে। ফলে ইংরেজ আর বাংলায় বণিকদের আনা টন টন রূপো বাঙলায় টাঁকশালে জগতশেঠের প্রভুত্বের বলয়ে ঢুকে পড়ত। মুর্শিদাবাদের নবাবেরা পুরোনো বছরের মুদ্রায় খাজনা নিতেন না। অর্থাত বিগত বছরের ইংরেজদের মাদ্রাজের টাঁকশালের তৈরি আর্কট মুদ্রা বাজারের অন্যান্য সাধারণ পণ্য দ্রব্য হয়ে চড়া বা মন্দায় উঠত পড়ত। বাজারের অন্যান্য পণ্যেরমতই এই ভূতপূর্ব বছরের টাকা বা সনওয়ত ডিসকাউন্টে কেনা বেচা হত। এই বাটা ছিল জনতার ওপর অদৃশ্য কর। এইভাবেই আর্কটের দাম কমিয়ে দিয়ে, মুদ্রা বিনিময়ের হার নিয়ে ব্যবসা করার জন্য সরকার জগতশেঠদের ইজারা দিত টাঁকশালের। জগতশেঠেরা এর জন্য জনগণের কাছ থেকে তোলা ট্যাক্সের এক বড় অংশ নবাবকে দিত থোক টাকা হিসেবে। টাঁকশালের কর্তৃত্ব হাতে নিয়ে ফতেহচাঁদ পুরোনো মুদ্রা কিনে নিয়ে তা গলিয়ে ছাপ মেরে পুরো দামে বাজারে ছাড়ত। আর অন্যান্য সাধারণ ব্যবসায়ীরমতই বাটা দিয়ে আর্কট বা অন্য মুদ্রা ফতেহচাঁদদের কাছে বিক্রি করে প্রত্যেক বছর বাণিজ্যের জন্য সিক্কা সংগ্রহ করতে হত ইংরেজদের। ফতেহচাঁদ পরিবার মুদ্রার বিনিময় নিয়ন্ত্রণ করত বলে ইংরেজরা বছরের পর বছর তাদের টাকা তৈরি করতে খাজনা দিতে বাধ্য হত।

তবে জগতশেঠেরা শুধুই বাঙলার সরকারের সরাফ ছিল না, তারা দেশি বিদেশি সব বণিকদেরও মহাজন ছিল। ১৭৪০ পর্যন্ত ইংরেজরা তাদের কাছ থেকে ১২ শতাংশ হারে ধার করত। ১৭৪১ সাল থেকে সুদ কমে ৯ শতাংশ হয়। মধ্য এশিয়ার তুরানী বণিক, বসরা, জেদ্দা, মোখায় রপ্তানি করা আরমানী বণিক, ইংরেজ ওলান্দাজ, ফরাসিরা সকলেই তার দেওয়া ধারে আর হুন্ডিতে ব্যবসা করত। হুন্ডি চলত আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যেও। দেশ-বিদেশের বাণিজ্যে তাদের পরিবারের এই দবদবার কারণ ছিল দিল্লির দরবারে তার পকড়। পারিবারিক জগতশেঠ উপাধি স্বয়ং দিল্লির বাদশাহের দান, বাদশাহের পাশে বসা বাদশাহের প্রধান প্রতিনিধি, নবাব নাজিমের ঠিক পাশেই জগতশেঠ ফতেহচাঁদের স্থান ছিল। তার জীবতকালেই পুত্র আনন্দচাঁদ মারাগেলে দুই নাতি কুঠির কর্তৃত্ব পান। ১৭৪৩-এ কুঠি প্রধান হন জগতশেঠ মহতাব রায় আর তার খুড়তুতো ভাই সহযোগী মহারাজ স্বরূপচাঁদ। আহমদশাহ স্বয়ং মহাতব রায়ের জগতশেঠ উপাধি অনুমোদন করেন। দেশের যত ছোটবড় সরাফ যা বাটা নেন তা ঠিক হয় জগতশেঠ-এর কুঠিতে। যারা আলাদা হয়ে ব্যবসা করতেন বা তার কুঠির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না তাদের কুঠিতে লাল বাতি জ্বলত।

প্রবাদ রয়েছে মারাঠী দস্যুদের সঙ্গে মির হাবিব জগতশেঠদের কুঠি থেকে ২ কোটি টাকার আর্কট রূপাইয়া লুঠ করে নিয়ে যায়। সে সময়কার ঐতিহাসিকেরা বলছেন লুঠের পর এই দুই ভাইএর লোকসান হল যেন দুআঁটি খড় চুরির মত। দিল্লিতে চড়াও হয়ে যখন আহমদশাহ আবদালি লুঠপাঠ করছে, তখনও দেওয়ানই-আমের দরবারে কাবুলি নরপতির কাছে সম্মানিত লোক জগতশেঠের উকিল, কেননা আমীর ওমরাদের কাছ থেকে যে টাকা আদায় করা হচ্ছে তার জামিন হতে পারেন একমাত্র জগতশেঠ।

সিক্কার তুলনায় আর্কটএর (দক্ষিণ ভারতের টাকার নাম। সে এলাকায় টাকা ছাপা নিয়ন্ত্রণ করত ইংরেজরা। মাদ্রাজে সে সময় টাঁকশাল চালাচ্ছিল তারা) দাম বা নানান ভারতীয় মুদ্রার সঙ্গে বাঙলার টাকার দাম কত হবে তা নিয়ন্ত্রণ করত জগতশেঠদের কুঠি। ওলান্দাজ আর ফরাসি ব্যবসায়ীরা সকলেই জগত শেঠের গদির নিয়ন্ত্রণে ব্যবসা করত। বাঙলার বাণিজ্যে ইওরোপ থেকে আসা সব সোনা-রূপোই কিনত জগত শেঠ। টাঁকশালে টাকা বানিয়ে সুবিধামত বাজারে ছেড়ে তা দিয়ে মুদ্রার বিনিময় ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করত শেঠ ভাইরা। নবাবের দরবারে রেসিডেন্ট বসিয়েও জগত শেঠের সাম্রাজ্য সিরাজ হত্যার আগে ভাঙতে পারেনি ইংরেজরা। মির কাসেমকে মসনদে তুলে ইংরেজরা প্রথমেই যে পরোয়ানা জারি করে তা হল, জগতশেঠরা যেন কলকাতার সিক্কার ওপর বাটা না চায়।

জগতশেঠ পরিবারের বাতসরিক আয়ের পরিমানের একটা ধারণা হতে পারে, পলাশির চক্রান্তের পরে মুর্শিদাবাদ থেকে কর্নেল ক্লাইভকে জগতশেঠের ব্যবসার বাৎসরিক আয়এর একটা সমীক্ষা পেশ থেকে, —

On the revenue at 10% Rs. 10,60,000,

Interest from zamindars at 12% Rs. 13,50,000,

On reconing Rs. 50 lakhs at 7% Rs. 3,50,000,

Interest on Rs.40 lakhs at 37।5% Rs. 15,00,000,

Interest on batta on exchange Rs. 7,00,000,

Rate Rs. 7 to 8 lakhs;

Toal – Rs. 49,60,000

সবমিলিয়ে বাৎসরিক প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। ঐতিহাসিকেরা বলছেন, যাদের বছরের আয় আধ কোটি টাকা, তাদের মূলধন সে সময়ে পাঁচ বা ছ-কোটি বা তারও অনেক বেশি টাকা হওয়া অসম্ভব নয়। গোটা বাঙলার খাজনার দুই তৃতীয়াংশ জগতশেঠের কুঠিতে জমা পড়ত আর নবাব সরকার জগতশেঠের কুঠির ওপরই বরাত (ড্রাফট) দিতেন। কোম্পানির ইংরেজরা জগতশেঠদের অর্থনীতির এই ব্যবস্থাকে নাক উঁচু করে বলত একচেটিয়া ব্যবসা। যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেই বাঙলায় তার দেশের হয়ে একচেটিয়া ব্যবসা চালাচ্ছে, তারা ছুঁচ হয়ে চালুনির ছিদ্রের সমালোচনা করে!)

এবার ফিরি সুশীলবাবুর কাজে

ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোকে বাংলার বাজার থেকে বাংলার কারিগরদের উতপন্ন পণ্য কিনতে রূপোর মুদ্রা আমদানি করতে হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলো রূপোর সিন্ধুক ভর্তি ট্রেজার শিপ ইওরোপ থেকে বাংলার বন্দরগুলোয় পাঠাত। সেই সব সোনা রূপো আর মুদ্রা দিয়ে যদি ইওরোপিয়রা সহজেই বাংলা বাজারে চালু মুদ্রা বানিয়ে ফেলতে পারত, তাহলে তাদের আর্থিক সমস্যা এতটা একিউট হত না। কিন্তু আমরা যে সময়টা নিয়ে আলোচনা করছে, সেই অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদ জুড়ে ইওরোপিয় সওদাগর কোম্পানিগুলো, বহু চেষ্টা করেও তাদের আমদানি করা রূপো দিয়ে মুর্শিদাবাদের টাঁকশাল থেকে বাংলা বাজারের চালু মুদ্রা ছাপানোর অনুমতি পায় নি। কোম্পানিগুলো বহুকাল এই সুযোগ পাওয়ার জন্যে দিল্লির দরবারে লবি করেছে — কিন্তু কাএর কাজ কিছু হয় নি। তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল জগতশেঠের কুঠি। শেঠ পরিবার অষ্টাদশ শতকের তৃতীয় দশক থেকেই মুর্শিদাবাদের টাঁকশালের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। ১৭৩৩ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার কুঠিয়াল লিখছে তারা টাঁকশালের নিয়ন্ত্রণ চেয়ে দরবার করেছে, কিন্তু ‘ফতেহচাঁদ স্রফ চায় না আমরা টাঁকশাল নিয়ন্ত্রণ করি, ফলে টাঁকশালের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পাওয়া সমস্যা, নবাব টাঁকশাল থেকে প্রচুর রোজগার করে [Futtichund Shroff who it is said Trades for the Nabob hindered, fear it will never be granted, the Nabob gets so much by it (C &. B Abstr., vol. 2, f. 321, para. 77, 31 Jan. 1722)]। কলকাতার আমলাদের নিরাশার চিঠিকে পাত্তা না দিয়ে কোম্পানির কেন্দ্রিয় সংগঠন লন্ডনের কোর্ট অব ডিরেক্টর্স কলকাতা কাউন্সিলকে মুদ্রা ছাপাবার অধিকার চেয়ে সক্রিয়ভাবে দরবার করার জন্যে নির্দেশ দিয়ে চিঠি লেখে, আমরা আশা করি নতুন নির্বাচির প্রেসিডেন্ট এবং কাউন্সিল, আমাদের অন্যান্য কাজের মধ্যেই এই বিষয়ে [টাঁকশাল নিয়ন্ত্রণ করার ফরমান জোগাড় করার] উদ্যম নেবেন এবং কার্যকারিতার প্রমান দেবেন, আমরা বহুকাল ধরেই মুদ্রা ছাপাবার ব্যবস্থা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছি; আমরা তোমাদের বারবার বলছি, মাদ্রাজ টাকা আর রূপো দিয়ে টাকা তৈরি করার কাজে আমাদের বাটা দিতে হয়, এর ফলে আমাদের প্রভূত রোজগার কমেছে [(We hope our now constituted President and Council will give us a convincing specimen of their abiilty and zeal for our Service among other things in obtaining the grant of Coynage We have so often and with such earneestness prest you to endeavour and shew’d — you the loss we suffered and wherein in the sale of Silver and by the batta on our Madras rupees we can’t add thereto (DB, vol. 101, f. lff2, para. 56, 16 Feb. 1722)]। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev