সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
চতুর্থ অধ্যায়
দামি ধাতু বিক্রি
ব্রিটিশ কোম্পানির কোর্ট অব ডিরেক্টর্স বাংলার পুঁজির বাজারের সমস্যা সম্বন্ধে খুব কিছু না জেনেই ফতেহচাঁদের বজ্রমুষ্ঠি থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। ১৭৪৫ সালে লন্ডন কলকাতা কাউন্সিলকে লিখল, চেষ্টা কর আমাদের কোম্পানির সঙ্গে কাজ করা ব্যবসায়ীদের দাদনি যদি রূপোর মাধ্যমে শোধ করা যায় তাহলে শেঠ পরিবারের রমরমা কিছুটা কমাতে পারি — By delivering our silver to the merchants at the current value as part of their dadney, it may prevent Fatehchund’s lowering it according to his will and pleasure, on his shuffling in such an unheard of manner. Some of the other great shroffs should have been tryed, whereas offers being made to him only, flung the Power wholly into his hands off getting it at his own price (DB., vol. 108, f. 288, para. 15, 7 Feb. 1745)। কিন্তু আমরা আগেই দেখেছি দাদনি বণিকেরা দামি ধাতুতে বিদায় চাইত না এবং স্রফদের গদিও কোম্পানি থেকে দামি ধাতুতে ধার শোধে উৎসাহিত ছিল না।
১৭৪৪ সালে ফতেহচাঁদের মৃত্যু হল। লন্ডন কোর্টের আশা জাগল বাংলায় কোম্পানির দুর্বিসহ আর্থিক অবস্থা শেষ হয়ে, পরিস্থিতি তাদের পক্ষে যাবে। তারা নতুন কমটিকে বলল বাংলা কাউন্সিলের যুবা কাউন্সিলাররা যদি ব্রিটিশ কোম্পানির স্বার্থ নবাবকে বোঝাতে যথাবিহিত দরবারি দৌত্যে গিয়ে কাজ হাসিল করতে পারে তাহলে ব্রিটিশদের বাংলায় আমদানি করা রূপো বেশি দামে মুর্শিদাবাদের টাঁকশালকে কিনতে হবে (Ibid., vol. 109, f. 463, para. 19, 7 May, 6 & 12 June 1746)। কিন্তু আমরা একটু পরেই দেখব ডিরেক্টরদের এই আশা নিরাশায় পরিণত হবে। ফতেহচাঁদের প্রয়াণের পরে, তাঁর উত্তরাধিকারী জগতশেঠ মহতাব রাই এবং মহারাজা স্বরূপচাঁদ চেষ্টা করলেন তাদের পিতামহ যে বিনিময় হার তৈরি করে দিয়ে গ্যাছেন সেই অঙ্কটা কমাতে। ১৭৪৫ সালের জুন মাসে কোম্পানি, শেঠ পরিবারকে আমদানি করা দামি ধাতু নিতে অনুরোধ করে, এবং শেঠেরা agreed to take at the prices paid for the last provided we will send it up there [Kasimbazar] for they will receive it nowhere else। কাশিমবাজার কাউন্সিল শেঠ পরিবারের দুই উত্তরাধিকারীকে বলল, ফতেহচাঁদ কোম্পানির রূপোর যে দাম দিত, তার থেকে বেশি দিতে to raise the price to what Futtichund formerly paid, কিন্তু শেঠের গদি দাম বাড়াতে অস্বীকার করে বলল, রূপোর দাম বাড়ানোর অধিকার তাদের এক্তিয়ারে নেই, দাম ঠিক করবে সরকার বাহাদুর (BPC., vol. 17, f. 604, 13 June 1745)। ১৭৪৬ সালে ব্রিটিশেরা রূপো বিক্রি করতে চাইলে স্বরূপচাঁদ জানাল, তারা আগের দাম ২৪০এর সিক্কা ওজনের বিনিময়ে তারা কেবল ২০৩ সিক্কা ওজনই দেবে; এর বাইরে তারা নতুন দাম তৈরি করতে পারবে না, last price given namely 203 sicca rupees for 240 sicca weight(Ibid., vol. 18, ff. 265vo-266, 30 June l 746)। সেই বছরের অক্টোবর মাসে শেঠেরা ব্রিটিশ রূপো নিতে রাজি হলেও, তারা জানাল আগের বছরের থেকে বেশি দাম তারা দেবে না।
কলকাতা কাউন্সিল অবস্থা বুঝেই কাশিমবাজারকে লিখল, এক্ষুণি ফতেহচাঁদের কুঠির সঙ্গে দাম নিয়ে ঝগড়া কোরো না, গত বছরের দামেই রূপো বিক্রি কর [We cannot pretend to dispute the price of bullion with Futtichund’s house at this time and that we agree to let them have it at the price of last year(Ibid., vol. 18, ff. 394, 398, 14 & 15 Oct. 1746)]।
জগতশেঠেরা ব্রিটিশদের আমদানি করা রূপো বিক্রি নিয়ে আরও একটা নতুন ফ্যাকড়া তুলল। ১৭৪৬ সালের নভেম্বরে কাশিমবাজার কুঠি কলকাতাকে জানাল, শেঠ মহতাব রাই কাশিমবাজারের দেওয়া ২৪০ সিক্কায় ২০৩ সিক্কা বিনিময়ের রূপোর দাম নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন, কারণ তিনি যে দামে রূপো কলকাতায় পাচ্ছেন, তার বেশি দাম তারপক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। কোম্পানি যদি কাশিমবাজারের দাম চায় তাহলে রূপো তাদেরকে কাশিমবাজারেই হাত বদল করতে হবে (Ibid., vol. 18, f. 431, 8 Nov. 1746)। কলকাতা কাউন্সিল কাশিমবাজারকে বলল, তারা যেন শেঠকে জানায় এর আগে শেঠের গোমস্তা কলকাতা থেকে রূপো কাশিমবাজারে বয়ে আনার খরচ চেয়েছিল, কিন্তু পরে সেই দাবি থেকে সরে আসে। একইসঙ্গে কাশিমবাজার কুঠিকে কলকাতা আরও জানাল, শেঠেরা যদি তাদের দাবিতে অনড় থাকে তাহলে রূপো নিয়ে খুব বেশি দরদাম না করে তাদের মতে সম্মতি জানাতে হবে (Ibid., vol. 18, f. 43lvo, 8 Nov. 1746)।
পরের বছর শেঠেরা ২৪০-এর বদলে ২০১ সিক্কার বেশি দিতে অস্বীকার করে, alleging by way of excuse to the imposition that the profit thereon is not near so great as formerly occasioned by Rupees being made of finer silver than usual (Ibid., vol. 19, f. 292vo, 23 June 1747; Beng. Letters Recd., vol. 21, f. 285, 10 Jan. 1748; FWIHC, vol. 1, p. 233)। চরম হতাশ হয়ে কলকাতা কাউন্সিল লিখল, শেঠেদের ক্ষমতার বিরোধিতা করার মত শক্তি আমাদের নেই, অন্য খরিদ্দার না থাকায় তাদের একচেটিয়া কারবারের দাম মেনে নিতে হবে we must submit thereto as we had it not in our power to resist their imposition, there being no other purchasers (Beng. Letters Recd., vol. 21, ff. 289-90, para. 195, 10 Jan. 1748; BPC, vol. 20, f. 187vo, 9 Oct. 1747; FWIHC, vol. l, p. 236)। শেঠেরা যেহেতু কলকাতা থেকে রূপো কাশিমবাজারে সুরক্ষা দিয়ে বয়ে এনেছে, সুরক্ষা আর পরিবহন খরচ হেতু শেঠেরা বিনিময় মূল্যের ওপরে আরও ১% উপরি দাবি করল। কলকাতা কাউন্সিল কাশিমবাজারকে জানাল শেঠের দাবি না মানতে (BPC, vol. 21, ff. 198vo-200vo, 22 Sept. 1748)। কিন্তু শেষ অবদি কোম্পানির কলকাতা কাউন্সিল এবারেও শেঠেদের তৈরি করা চাপ সহ্য করতে পারল না বেশি দিন, ১৭৫০ সালের অক্টোবরে তারা to deduct half percent in consideration of the risqué and charges upএর শেঠেদের দাবি মানতে বাধ্য হয় (Ibid., vol. 23, f. 356vo, 20 Oct. 1750; C&B. Abstr., vol. 5, f. 278, paras. 126, 127, 4 Feb. 1751; FWIHC, vol 1, pp. 482-83)।
ব্রিটিশদের তুলনায় ডাচেদের অবস্থা যে বেশি কিছু ভাল ছিল এমন না। নীতিগতভাবে বাংলার মুঘল টাঁকশাল যে কোনও প্রজা, রাষ্ট্র নির্দিষ্ট বাটা দিয়ে, টাঁকশালে রূপো নিয়ে গিয়ে, বাজার দরে মুদ্রা তৈরি করিয়ে নেওয়ার জন্য খোলা থাকার কথা। প্রকৃতপক্ষে, টাঁকশালগুলির একচেটিয়া দখল ছিল জগতশেঠ পরিবারের হাতে। যেহেতু জগতশেঠেরা মুর্শিদাবাদ দরবারে বিপুল প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল, তাই প্রত্যেক বছর টাঁকশাল চালাবার দায়িত্ব তারা সহজেই পেত। ব্রিটিশদের মত ডাচেরা এই টাঁকশালেই বাটা দিয়ে প্রত্যেক বছর মুদ্রা ছাপাত। মাঝে মধ্যে তাদেরও এই কাজে প্রচুর ঝামেলা পোয়াতে হয়েছে। তারা এই খুচরো ঝুটঝামেলার মধ্যে না গিয়ে ব্রিটিশদের মতই আমদানি করা দামি ধাতু জগতশেঠেদের গদিতে মুদ্রা তৈরি করে দেওয়ার জন্যে হাত বদল করত। বিদেশি কোম্পানিদের ঝামেলায় ফেলার আরও একটা সহজ উপায় ছিল — শেঠেরা মাঝে মাঝেই তেঠিয়া খদ্দেরকে সিধে কজরা জন্যে টাঁকশালের মুল কারিগরকে ধীরে কাজ করতে নির্দেশ দিত। মুদ্রা তৈরিতে প্রয়োজনের তুলনায় দেরি করিয়ে দেওয়া উদ্দেশ্য। যে সময় কোম্পানিগুলোর বিপুল পরিমান নগদ মুদ্রা প্রয়োজন, যখন পরিবহনের সমস্যা ছিল ব্যাপক, সেই সময়েই যদি টাঁকশাল কর্তা মুদ্রা তৈরি করতে দু-তিন হপ্তা দেরি করিয়ে দেন তাহলে কোম্পানিগুলির মাথাব্যথা বাড়ে বৈ কমে না, কারণ দাদনি বণিকদের দেয় বকেয়া টাকা, সে বছরের দাদন দেওয়া ইত্যাদির কাজ যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি সেরে ফেলা দরকার, অথচ হাতে নগদ মুদ্রার অভাব। ডাচ কর্তা সিকটারম্যান (Sichtermann) ১৭৪৪ সালে তার Memorie’তে লিখছেন মুদ্রা ছাপানোতে প্রচুর দেরি হওয়ায় তারা খোলা বাজারে রূপো বেচে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই বছরে খোলা বাজারে রূপোর দাম বেশ ভালই ছিল (Sichtermann’s ‘Memorie’, VOe, 2629, ff. 920, 926-28, 14 March 1744)। পলাশীর কাছাকাছির সময়ে ১৭৫৫ সালে Taillefert মেমোয়ারে লিখছেন জগতশেঠের পরিবারে আভ্যন্তরীণ কলহের জন্যে টাঁকশালে মুদ্রা তৈরি করতে অভূতপূর্ব দেরি হচ্ছে unheard of delays (Taillefert’s ‘Memorie’, Voe, 2849, ff. 214-15, 27 Oct. 1755)। ফলে আগেই বলেছি ডাচেরাও জগতশেঠের গদিতে রূপো বিক্রি করতে বাধ্য হয়, এমন কি ১৭৫৫ সালে ডাচেরা জগতশেঠের গোমস্তা বৈজনাথকে হুগলিতে রূপো বিক্রি করতে বাধ্য হয় (voe, 2862, ff. 855-56, HB, 14 March 1755)।
মাদ্রাজ আর আর্কটা মুদ্রা
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আরও কয়েকটা অতিরিক্ত সমস্যা ছিল, তার একটা আলোচনা করছি। ব্রিটিশেরা দক্ষিণ ভারতের টাঁকশালে যে মাদ্রাজ এবং আর্কট মুদ্রা ছাপাত, সে সব বাংলায় চালাতে গেলে অতিরিক্ত বাটা দিতে হত। এক অঞ্চলের মুদ্রা এনে অন্য অঞ্চলে চালানোর বিষয়টি নিয়ে জগতশেঠেরা ব্রিটিশ কোম্পানিকে অতিরিক্ত হয়রানিতে ফেলত। এই সব কারনে কোম্পানি বাংলায় যে কোন মূল্যে টাঁকশালে সিক্কা টাকা ছাপানোর অধিকার পেতে চাইছিল কারণ অধিকাংশ আড়ংএ মাদ্রাজ টাকা বাংলায় সে বছরের মূল্যে বিক্রি হত না। তাকে সিক্কা টাকায় রূপান্তর করার জন্যে ৩, ৪, ৫ শতাংশ বেশি বাটা দিতে হত, ফোর্ট উইলিয়ামের দাদনি বণিকেরা সেই বাটাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ১০ শতাংশে (C&B. Abstr., vol. 2, f. 175, para. 61, 6 Dec. 1718)। কাশিমবাজার কুঠির অভিযোগ ১৭৩১ সালে ফতেহচাঁদের উসকানিতে নবাবের কাছে একটি দৌত্য গিয়ে না কি অভিযোগ করেছে (যদিও এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য) ব্রিটিশ কোম্পানি সে বছর/মরশুমে শুধুই মাদ্রাজ আর আর্কট মুদ্রা বাংলায় নিয়ে এসেছে বাণিজ্য করার জন্যে, দামি ধাতু আনে নি, তাই নবাব যেন বাংলায় সে বছর দক্ষিণের মুদ্রা নিষিদ্ধ করে শুধুই দামি ধাতু গ্রহণ করার ফরমান জারি করেন। নবাবের ফরমান বেরোনো মাত্রই সেই নির্দেশ রূপায়িত করতে ফতেহচাঁদ, অবিলম্বে যে টাঁকশালে ৫০ হাজার টাকা গলিয়ে বর্তমান মুদ্রায় রূপান্তরিত করে। অন্যান্য স্রফেরা বিপাকে পড়ল, কারন তার very clamorous upon the occasion, as they are likely to be great sufferers by it (BPC, vol. 8, ff. ’45lvo-452, lo Sept. 1731; C&B. Abstr., vol. 3, f. 172, para. 2, 5 Jan. 1732)। (চলবে)