সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
চতুর্থ অধ্যায়
আন্তঃএশিয় এবং পণ্য পরিবহন ব্যবসা
সমুদ্রপথে আন্তঃএশিয় ব্যবসার শুল্ক বাণিজ্যেও অসুবিধেয় পড়েছে ব্রিটিশেরা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে অন্য ইওরোপিয় প্রতিযোগী আর মুসলমান জাহাজ মালিকদের প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছে। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে ব্রিটিশ কোময়ানি ছাড়া ডাচ আর ফরাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আন্তঃএশিয় ব্যবসা করত। ১৭২৭ সালের কলকাতা কাউন্সিল লিখছে, সুরাট থেকে মুসলমান মালিকের দুটো জাহাজ পৌঁছেছে, সুপারকার্গো (বা দেশিয় ভাষায় নাখুদা — সমুদ্র যাত্রায় জাহাজের পণ্যদ্রব্য বিক্রয়ের তত্বাবধাযক) মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ীদের জানিয়েছে তাদের জাহাজ ইওরোপিয়দের জাহাজের তুলনায় অনেক শক্তপোক্ত। সে সময় ব্রিটিশেরা মহারাষ্ট্রে [কনৌজী] আংরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। ১৭১৭ কলকাতা কাউন্সিলব্যবসায়ীদের চালু হারের অর্ধেক দামে পণ্য পরিবহন এবং একই সঙ্গে জাহাজ ভাড়া না নেওয়ারও প্রস্তাব দেয়। ব্রিটিশদের এই প্রস্তাবে বহু ব্যবসায়ীই আকর্ষিত হয়। শুল্ক ছাড় প্রকল্পে ব্রিটিশ কোম্পানি সেই সময়ে বিপুল পরিমানে পণ্য পরিবহন করে (C&B. Abstr., vol. 2, ff. 524-25, para. 15, 28 Jan. 1727)। পরের বছর কাউন্সিল লিখল, মন প্রতি ৪ থেকে ৪.৫ টাকা শুল্কে পণ্য পরিবহন করছি… কিন্তু আর পরেই ব্রিটিশেরা ভাড়া ৪টার নিচে নামালে মুসলমান মালিকেরা শুল্ক ১ টাকায় নামিয়ে আনে [have run away with the major parts of the freights at Rs 4 and 41\2 per maund… were the English to lower theirs to 4 Rupees per maund the Moors would still sink under even to 1 Rupee, per maund because [they] can afford to take less (Ibid., vol. 2, ff. 583, para. 18, 28 Jan. 1728)]। সেই বছরেই জুলাই মাসে কম্পটন জাহাজ সুরাটে পণ্য পরিবহনে তৈরি হয়ে আছে কিন্তু চাহিদা মত পণ্য পাচ্ছে না কারন ফরাসি আর মুসলমান মালিকদের জাহাজ অর্ধেক শুল্কে প্রতিগাঁট পরিবহনের প্রস্তাব দিচ্ছে [cannot expect many freight Bales becaμse the French and Moors take in Bales at 1/2 freight (Ibid., vol. 3, f. 26, para. 18, 31 July 1728)]। ১৭২৯ সালে এক ফরাসী জাহাজের ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে বিশাল একটা মুসলমান মালিকানার জাহাজ ফরাসী পাস নিয়ে বাংলায় আসে এবং কম ভাড়ায় বিপুল পরিমান পণ্য সুরাটে নিয়ে যায় [has got the major part of the freight by agreeing for it at Surat at an under rate (Ibid., vol. 3, f. 30, para. 16, 2 Feb. 1729)]। কোর্ট অব ডিরেক্টর্সও পণ্য পরিবহনে, বিশেষ করে সুরাটের দিকে যাওয়া জাহাজগুলোয় রোজগার কমার কথা স্বীকার করে নিচ্ছে, কারণ, ব্যবসার মাহোল ভাল না, পরিবহন শুল্ক কমছে, এবং মুসলমান ব্যবসায়ীদের হাতে প্রচুর জাহাজ থাকায় তারা অনেক কম ভাড়ায় অনেক বেশি পণ্য নিয়ে যেতে পারছে [badness of Trade, and the low freights which the Moors ships carrying goods for who sailing at-much less charge than our shipping can afford to do (DB, vol. 104, ff. 420-21, para. 6, 21 Feb. 1729]। ইওরোপিয়দের থেকে ধার ব্রিটিশ কোম্পানির পুঁজি জোগাড়ের আরেকটা রাস্তা ছিল বাংলায় প্রবাসী ইওরোপিয়দের থেকে ধার করা। এদের মধ্যে ছিল কোম্পানিগুলোর আমলা, ব্যক্তিগত ইওরোপিয় ব্যবসায়ী, এবং জাহাজের ক্যাপ্টেন। কম সময়ের এই ধারগুলো নির্দিষ্ট মরশুমে কোম্পানির ঘাটতি পড়া বিনিয়োগের কিছুটা সমস্যা মেটাত। অষ্টাদশ শতকের প্রথম দশকগুলিতে, কোর্ট অব ডায়রেক্টদের নামে কাটা লন্ডনে বিনিময়যোগ্য বিল অব এক্সচেঞ্জ, হুণ্ডিতে কোম্পানির আমলারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে অর্থ বিনিয়োগ করেছে। কলকাতা কুঠির হিসাব পরীক্ষক আব্রাহাম এডামস ১৭১৬ সালে অবসৃত হয়ে লন্ডনে চলে যাওয়ার আগে কোর্ট অব ডিরেক্টরদের নামে কলকাতায় ২৭,৭২৮ টাকার বিল অব এক্সচেঞ্জ নিয়ে যায় (BPC, vol. 3, f. 117)। এমন কী ফোর্ট উইলিয়ম কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট এই পদ্ধতিতে লন্ডনে টাকা পাঠিয়েছে। হুণ্ডি পদ্ধতিতে বিল কেটে বাংলার প্রেসিডেন্ট রবার্ট হেজেস ৪০,০৪৫ টাকা লন্ডনে পাঠায় ১৭১৭ সালে (Ibid., vol.4, f. 1vo)। ঐ বছরেই রপ্তানি পণ্য গুদামের কর্মচারী হেনরি ফ্রাঙ্কল্যান্ড কলকাতার কোম্পানির তহবিলে ৮৮,০০০ টাকা বিনিয়োগ করে। এর বিনিময়ে সে লন্ডনে কোর্ট অব ডিরেক্টরদের নামে কাটা বিল অব এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ১১,০০০ পাউন্ড (Ibid., vol. 4, f. 3) পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পায় বাস্তবিক, আমরা যে সময়জুড়ে আলোচনাকে সীমাবদ্ধ রেখেছি সেই অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে কোম্পানি, বাংলায় কাজ করা ব্যক্তি ইওরোপিয়দের থেকে নিয়মিত টাকা ধার করেছে। যদিও এদের থেকে মোট ধার বছরে কত করত সে অঙ্ক আজ আর বের করা মুশকিল, তবে কয়েক বছরের মোট ধারের পরিমান পাওয়া যায়। জুন ১৭৪৬ থেকে মে ১৭৪৭ এই এক বছরে ব্রিটিশ কোম্পানি ইওরপিয়দের থেকে ধার করেছিল ৪,৭৫,৬৪০ টাকা। পরের বছরে অর্থাৎ জুন ১৭৪৭ থেকে মে ১৭৪৮ সময়ে কোম্পানি ধার করেছিল ৫,১০,৯৬৭ টাকা (Computed from relevant volumes of BPC)।
সামগ্রিকভাবে আমরা বলতে পারি, প্রচুর সমস্যার মধ্যে দিয়ে হেঁটেও ইওরোপিয় কোম্পানিগুলো বাংলায় পণ্য কেনার জন্যে ভাল পরিমান বিনিয়োগের অঙ্ক জোগাড় করতে পেরেছিল। এই সময়ে ইওরোপিয় বাণিজ্যের বৃদ্ধির হার আমাদের এই তত্ত্বকে প্রমান করে। কোম্পানিগুলির মুল সমস্যা ছিল হাতে নগদ অর্থের ঘাটতি। সেই সমস্যাকে সে সামাল দিয়েছিল স্থানীয় পুঁজির বাজার থেকে ধার করে, যে বাজারটা ছিল দারুণ সংগঠিত এবং অসম্ভব দক্ষ। তাদের মুল সম্পদ সংগ্রহের সূত্র ছিল স্থানীয় পুঁজির বাজার। তারা স্থানীয় ব্যক্তি ইওরোপিয় অর্থাত তাদের আমলা, কোম্পানি নিরপেক্ষ ব্যক্তি ব্যবসায়ীদের থেকেও ধার করেছে। এছাড়াও তারা আন্তঃএশিয় ব্যবসা এবং জাহাজে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমেও পুঁজির ঘাটতি মিটিয়েছে। স্থানীয় পুঁজির বাজার থেকে টাকা ধার করার সমস্যা ছিল যে, ধারের চরিত্র ছিল খুব কম সময়ে – কিছু মাসের জন্যে মাত্র আর সুদের হার ছিল খুব বেশি। গ্রহীতাকে ধার করা অর্থ দ্রুত শোধ করতে হত। ফলে একটা বিষয় পরিষ্কার, কোম্পানিগুলো কোনওভাবেই স্থানীয় পরম্পরা নির্ভর ধারের বাজার ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে সেই ধারকে দীর্ঘমেয়াদি চরিত্রে রূপান্তরিত করতে পারে নি। তবে সুদের হার কমাতে পেরেছিল। সুদের হার কমানোর জন্যে জগতশেঠদের বদান্যতা স্বীকার না করলে ভুল হবে। ব্রিটিশদের ধারের অঙ্কে ৩% সুদ কমানোর যে প্রক্রিয়া আমরা দেখেছি, তা ইওরোপিয়দের ব্যবসা ব্যবস্থাপনার প্রভাবে ঘটে নি — বরং আবেদন নিবেদনের মাধ্যমে এই সমস্যার সুরাহা হয়। তারা যে দামি ধাতু বাংলায় নিয়ে আসত সেটি বাংলায় মুদ্রায় রূপান্তরিত করা খুব কঠিন ছিল কারণ, বাংলায় ব্রিটিশেরা টাঁকশাল নিয়ন্ত্রণ করত না। তারা সেই দামি ধাতু সাধারণত খোলা বাজারে বিক্রি করতে পারত না বা দাদনি বণিক বা স্রফেরা সেগুলি নিত না। ইওরোপিয় কোময়ানিগুলো জগতশেঠ-এর হাতের পুতুল ছিল। আমরা দেখলাম, কোম্পানিগুলির আর্থিক শক্তি এমন কিছুই ছিল না যা দিয়ে তারা বাংলার পরম্পরার ব্যবসায়িক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার এক্কেবারে ছোট ছোট চলকগুলিকেও নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারে। এই ব্যবস্থায় যে কয়েকটি নতুন ব্যবস্থাপনার ভাবনা প্রবেশ করতে পেরেছিল সেগুলি ছিল মধ্যস্থ/দালাল বা chief merchant। যদিও পরম্পরার ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনায় দালাল বা মধ্যস্থ এক্কেবারেই নতুন ধারনা ছিল না, কিন্তু ব্রিটিশ কোম্পানি দালালদের যে পদ্ধতিতে কাজে লাগিয়েছিল, পরম্পরার ব্যবসা ক্ষেত্রে সেটি নতুন ছিল। দেশিয় ব্যবস্থাপনায় দালাল পেশাটিকে, ইওরোপিয় কোম্পানিরা নতুনভাবে কাজে লাগাল নিজেদের স্বার্থ পূরণে। আরেকটি নতুন ধারণা হল ব্যবসা এবং কোম্পানি ব্যবস্থাপনা। দেশে এই প্রথম কোম্পানি, সোরা ব্যবসায়ীদের জয়েন্ট স্টক কোম্পানি তৈরি করিয়ে দেয় (নবম অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। তাছাড়া চুক্তির সময় পণ্যের দাম নির্ধারণও নতুন ধারনা ছিল — এটাও আগে হত না। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি টানব। প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক, আমরা কেন এত বিশদে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করছি। যদিও তথ্য খুবই অপ্রতুল, তবুল বলা যাক, ইওরোপিয় কোম্পানির ব্যবসা ইত্যাদি কাজকর্ম বিষয়ে আলোচনা আমাদের উপনিবেশপূর্ব সময়ের দেশিয় ব্যবসা কাঠামোর জটিল চলন, ধার দেওয়ার আর পুঁজির ব্যবস্থাপনা, এবং সওদাগর শ্রেণী সম্বন্ধে জ্ঞান আহরন করতে সাহায্য করে (It is also interesting to note that a study of the European, investments gives us an insight, however inadequate, into the working of the complex structure of traditional commercial organization, credit machinery and capital market, and the mercantile class in the pre-colonial period.) (চলবে)