সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
পঞ্চম অধ্যায়
এশিয় ব্যবসায়ী এবং ইওরোপিয় কোম্পানি
কাশিমবাজারের ব্যবসায়ীদের দাদনি অগ্রিম দেওয়ার জন্যে কোম্পানি তাদের থেকে নির্দিষ্ট পরিমান জামানত জমা রাখার শর্ত ব্যবসায়ীরা মানতে অস্বীকার করে। ১৭৪২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একটি চিঠিতে আমরা একজোট কাশিমবাজার ব্যবসায়ীদের অভূতপূর্ব স্বাধীনচেতনার ইঙ্গিত পাই, ব্যবসায়ীদের থেকে যে জামানত দাবি করার শর্ত তারা মানতে চাইছে না কারন এদের অনেকেই আমাদের সঙ্গে যে পরিমান অঙ্কের ব্যবসা করে, তার থেকে অনেক বড় অঙ্কের ব্যবসা করে গুজরাটি, মুলতানি, আর্মেনিয় এবং অন্যান্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে; অথচ তাদের থেকে জামানত চাওয়া হয় না, তাছাড়া তাদের সামাজিক সম্মান এবং ব্যবসায়ী সম্মানের তুলনা হয় না, সংক্ষেপে বললে তারা কেউই জামানত জমা দিয়ে আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করতে উতসুক নয় … as to giving security as demanded of them [the merchants] is what they would not do on any account that some of them did business for Guzzeraters, Multaners, Armenians and other merchants and for greater amounts than with us and yet no such thing was ever demanded of them … besides there were none among them but what were esteemed men of credit and many of them substantial men … In short that none of them would submit to the reproaches/as they call it/of giving security … (Ibid., vol. 6, 26 Feb. 1742)। শেষ পর্যন্ত কাউন্সিল বুঝতে পারল ব্যবসায়ীদের জামানত দিতে বাধ্য করা সম্ভব নয় (finding no hope of gaining their point of getting them to give security), বরং তার চেয়ে কোরা রেশম জোগাড় করার জন্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের অগ্রিম দাদনি দেওয়া দরকার (Ibid)।
লন্ডনের বড় কর্তাদের (কোর্ট অব ডিরেক্টর্স) ব্যবসায়ীদের জোট ভাঙার নানান নির্দেশ পাঠানো সত্ত্বেও কাশিমবাজার কাউন্সিল প্রায়শই ব্যবসায়ী জোটের বাধার সামনে অসহায় পড়ত। কোম্পানির আমলারা অধিকাংশ সময়েই ব্যবসায়ীদের জোটবদ্ধতা রুখতে পারত না (DB, vol. 108, f. 623, para. 45, 4 Feb. 1743)। ১৭৪৩-এর ২৩ এপ্রিল কোম্পানির কনসাল্টেশন সূত্রে জানতে পারছি আগের বছরে খরচ না হওয়া কিছু অর্থ ফেরত চাইলে, কাউন্সিলকে আট জন প্রধান ব্যবসায়ী জানাল তারা নিজেদের মধ্যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে, that they had entered into a Contract not to depart from their demands on the Company … and that whoever of them makes up his account with the Company shall forfeit 10,000 Rupees and pay the others Ballances and this contract they have lodged in the hands of Sau too Cotma (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 6, 23 April 1743)। কোম্পানি বড় ব্যবসায়ীদের চুক্তি ভাঙতে পারল না। ফলে অনমনীয় ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে কলকাতা কাউন্সিল কাশিমবাজার কুঠিকে অন্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করতে নির্দেশ দিল।
ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করার আবশ্যিক শর্ত হিসেবে, জামানত জমা রাখার ইস্যুটি দাদনি ব্যবসায়ীদের কাছে স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে ওঠে। আমরা আগেই দেখেছি জামানত জমা রাখার নির্দেশের সরাসরি বিরোধিতা করছিল কাশিমবাজারের দাদনি বণিকেরা। কোম্পানির সঙ্গে দাদনি বণিকদের এই বিরোধ বহুকাল ধরে ধিকিধিকি জ্বলেছে। কোম্পানির কর্তারা, কলকাতার দাদনি বণিকদের জামানত জমা রাখার শর্তে বহুকাল পর্যন্ত রাজি করাতে পারে নি। ১৭৪৪ সালের ২৭ জানুয়ারি কাশিমবাজার কাউন্সিল লিখছে, ব্যবসায়ীদের অভিযোগ তারা ভারতজুড়ে নানান এলাকায়, নানান ব্যবসায়ীর সঙ্গে বহুকাল ব্যবসাকর্ম করে চলেছে, কিন্তু এই ব্যবসায়ীদের কোথাও কোনও দিন জামানত রেখে ব্যবসা করার শর্ত আরোপ করা হয় নি। জামানত জমা রাখার শর্ত মানলে তাদের সামাজিক ব্যবসায়িক সম্মান নষ্ট হবে, বিভিন্ন অঞ্চলে চালু ব্যবসা মার খাবে having it known they had given security would destroy all such trade because those other merchants they did business with would look on it that they were not responsible without it।
ব্যবসায়ীরা জামিন না দেওয়ার সিদ্ধান্তে স্থিরপ্রতিজ্ঞ থেকে কাউন্সিলকে বলল তারা কোম্পানির এই শর্তে ব্যবসা করতে রাজি নয়, এতে তাদের বিদেশের ব্যবসায় সুনাম ধ্বংস হবে (they would not do business on such terms for even a report that security was demanded of them would hurt their credit abroad (Ibid., vol. 6, 27 Jan., 1744)। শেষ পর্যন্ত কাশিমবাজার কাউন্সিল তিন চারজন রেশম ব্যবসায়ীকে দাদনি নেওয়ার প্রেক্ষিতে জামানত জমা দেওয়ার কাজে রাজি করাতে পারল (However the Kasimbazar Council finally succeeded in bringing the silk merchants to be joined in security, three or four of them together for the Dadney they advance them (BPC, vol. 17, f. 27vo, 25 Feb. 17 44)।
কিন্তু দাদনি অগ্রিম দেওয়ার প্রেক্ষিতে জামানত জমা রাখার কাজে অধিকাংশ দাদনি ব্যবসায়ীকে রাজি করাতে পারে নি কোম্পানির কর্তারা। কোম্পানির লাভের অন্যতম উৎস সিল্ক-পিস গুডস ব্যবসায়ীরা জামানত জমা দেন নি। কোম্পানি জামানত রাখা নিয়ে জোরাজুরি শুরু করলে কোম্পানির সঙ্গে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ভাবনাও ভাবতে শুরু করে দাদনি বণিকেরা। ১৭৪৪ সালে কলকাতা কাউন্সিল লিখল, নির্দিষ্ট গুণমানের বরাত দেওয়ার সিল্ক-পিস গুডস মুকসিদাবাদ আর সৈদাবাদ এবং অন্যান্য অঞ্চলের বেশ কয়েকজন সম্পদশালী এবং সামাজিক সম্মানের ব্যবসায়ীদের যুক্ত না করলে পাওয়া অসম্ভব… কিন্তু তারা জামানত রাখতে ইচ্ছুক নয় বিশেষ করে রাম সিং, গোঁসাইরাম, রামনাথ ইছেনাত, এদের সাহায্য ছাড়া কাশিমবাজার কাউন্সিলের আশংকা, এই পণ্য পাওয়া মুশকিল হবে। এরা মূলত তাফেতা আর সিল্ক-পিস গুডসএর ব্যবসা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে, আমাদের বাছাই কাপড় দেয়, অন্য ব্যবসায়ীদের এদের মত কাজ করার ক্ষমতা যোগ্যতা নেই কারন তাদের থেকে তাঁতিরা বহু টাকা পায়, তাঁতিদের কাছে যাওয়ার মুখই নেই… তো আমরা যে দাদনি বণিকদের কথা বলছি, তারা বিপুল সামাজিক সম্মানের জন্যে জামানত রাখতে রাজি না, কাশিমবাজার মনে করে তাদের যে কোনো পরিমান অর্থ দাদন দেওয়ায় সমস্যা নেই… কারন তারা যে কোনও পরিমান অর্থের নিরাপত্তা দিতে সক্ষম… আর আমরা যদি তাদের দালালির পদ থেকে বের করে দিই, দাদনি না দিই, তাহলে ফরাসি আর ডাচেরা তাদের লুফে নেবে …it is impossible to get the quantity of silk piece-goods ordered, without employing many other merchants residing at Muxidabad and Sidabad and o’ther places some of whom being wealthy in good credit will not be persuaded to give any security, particuarly Ram Singh, Gosseram and Ramnaut Echenaut, without whose assistance they [Kasimbazar Council] fear they shall fall very short in the article of Taffaties which the above-mentioned chiefly deal in and provide the very best and which the other merchants do not care to meddle with as they are liable to occasion bad debts among the weavers .. they absolutely refused to give [security] as they are very substarltial people, and they apprehend no risque of any money entrusted with them, and in case they throw them out of Dadney, the Dutch and the French will gladly employ them …. (Ibid., f. 66, 23 April 1744; Fact. Records, Kasimbazar, vol. 6, 19 April 1744)। বলাই বাহুল্য যে দাদনি অগ্রিমের প্রেক্ষিতে জামিন দিতে রাজি না হওয়া সত্ত্বেও, কলকাতা কাউন্সিল কাশিমবাজারকে সেই সব প্রখ্যাত ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করতে অনুমতি দেয়।
কাশিমবাজারের থেকে নজর ফিরিয়ে কলকাতার ব্যবসা পরিমণ্ডলে আসা যাক। ১৭৪১ সালে দালাল পদটি অবলুপ্ত হয়। এর পরেও দাদনি অগ্রিমের প্রেক্ষিতে কোম্পানির পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের থেকে উপযুক্ত জামানত জমা করার দাবি করা হয়। ব্যবসায়ীরা কোম্পানির শর্তে খুশি ছিল না। ১৭৪৪ সালের এক যৌথ আবেদনপত্রে তারা কাউন্সিলকে জানায় পরের বছরে বিনিয়োগ চুক্তি করার সময় এই শর্ত চুক্তিতে থাকলে, তারা কোম্পানির সঙ্গে কাজ করবে না (cannot agree to this method again when we contract for next year’s investment (Ibid., vol. 17, f.119, Annex. to Consult., 28 May 1744)। আবেদনের উত্তরে ৮ মার্চ ১৭৪৫ সালে কাউন্সিল জানায় তারা শর্ত তুলে নিচ্ছে না। ১৪ মার্চে কাউন্সিল ব্যবসায়ীদের তিনটে গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে কোম্পানির সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তির ব্যবস্থা করর, ব্যবসায়ীরা রাজি হয় না, বরং তারা জানায় কোম্পানির দাদনি সুরক্ষার জন্যে তাদের সাত-আটটা গোষ্ঠীতে ভাগ করে টাকা দেওয়াই বাস্তবসম্মত – শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কোম্পানি মেনে নিতে বাধ্য হয় (Ibid., f.482vo, 8 March 1745i f. 488vo, i4 March 1745; C&B Abstr. vol.5, f. 57, para. 4 & 5, 11 Aug. 1745.)। (চলবে)