সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
পঞ্চম অধ্যায়
এশিয় ব্যবসায়ী এবং ইওরোপিয় কোম্পানি
কলকাতার ব্যবসা জগতে শেঠ আর বসাক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী পরিবার; এদের দেওয়া বিপুল অঙ্কের ধার কোম্পানির বাংলা ব্যবসায় পুঁজির ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করেছে। যে সময় ঘিরে আমাদের আলোচনা নিবদ্ধ করেছি, সেই অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে কলকাতা কুঠির দালাল পদটি বংশ পরম্পরায় দখল রাখত শেঠ পরিবারের সদস্যরা। কোম্পানির কাগজপত্র থেকে জানা যাচ্ছে কলকাতার ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে এবং ব্রিটিশ কোম্পানিতে শেঠ পরিবারের প্রভাবের দরুন কোম্পানির অন্যান্য বণিকেরা closed Corporation পরিণত হয়েছিল। এমন কি লন্ডনের কর্তারাও শেঠ পরিবারের প্রভাব এবং গুরুত্ব আর কোম্পানিকে দেওয়া তাদের সেবাটিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করত (Ibid., vol. 19, f 147vo, 16 March 1747)। কিন্তু শেঠেরা ছিল চতুর বানিয়া; তারা কোম্পানির মিষ্টি কথায় ভোলে নি, বরং সময় এলে তারা কোম্পানির দেওতা শর্তের বিরুদ্ধে কঠিন দরকষাকষি করেছে। শেঠ পরিবার কলকাতা ব্যবসা পরিমন্ডলের ব্যবসায়ীদের নেতৃস্থানীয় ছিল এবং ১৭৪৭ সালে কোম্পানিতে পুঁজি বিনিয়োগ, দাদনি বণিকদের কোম্পানিতে অগ্রিম জামানত দেওয়ার প্রেক্ষিতে কোম্পানির সঙ্গে দীর্ঘ বিতর্ক আর টানাপোড়েনে অবতীর্ণ হয়। বাংলার উপদ্রুত রাজনৈতিক অবস্থা এবং মারাঠা হ্যাঙ্গামএর প্রেক্ষিতে লন্ডনের কর্তারা ১৭৪৬-এ ব্যবসায়ীদের দেয় দাদনি অগ্রিমের পরিমান কমানোর সিদ্ধান্ত কলকাতা কাউন্সিলকে জানিয়ে নির্দেশ দিল সম্ভব হলে ব্যবসায়ীদের দাদন না দিয়ে নগদে পণ্য কিনতে বাধ্য করাতে (DB, vol. 109, f. 465, para. 33-39, 6-12 June 1746)। ১৯ মার্চ কলকাতা কাউন্সিল, লন্ডনের কর্তাদের প্রস্তাব বণিকদের জানালে সক্কলে সর্বসম্মতিক্রমে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং বিকল্প প্রস্তাব জমা দিয়ে যুক্তি দিয়ে বোঝায় কেন দাদনি ব্যবস্থা জরুরি(ব্যবসায়ীদের দেওয়া যুক্তিগুলি দেখতে দেখুন BPC, vob 19, ff.15lvo-152;C& B. Abstr., vol. 5, para. 32, f. 108; Beng. Letters Recd., vol. 21, ff. 213- 14, para. 32; FWIHC, vol. 1, pp. 190-91)।
কাশিমবাজারের ব্যবসায়ীরাও কোম্পানির দেওয়া নতুন শর্তে পণ্য সরবরাহের জন্যে চুক্তি স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করে। কাশিমবাজার কাউন্সিল কলকাতাকে লিখল, এই বিষয়ে ব্যবসায়ীদের আমাদের পক্ষে নিয়ে আসা কঠিন … to both of which propositions they are extremely averse that they think it impossible for them ever to bring them to agree thereto(BPC, vol. 19, ff. 209vo, 210, 22 April 1747)।
কলকাতাতেও কোম্পানি আর ব্যবসায়ীদের মধ্যে চুক্তির শর্ত নিয়ে দড়ি টানাটানি চলতে থাকে। শেঠেদের নেতৃত্বে কলকাতার কোম্পানির ব্যবসায়ীরা কলকাতা কাউন্সিলকে ১৭৪৭ সালের ২৫ মে জানাল তারা তাদের দেঈয়া শর্ত ছাড়া কোম্পানির দেওয়া যে কোনও শর্তে তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে অনিচ্ছুক, বরং তারা contract ‘on no other terms’ than the following: that they would provide one-fourth of the investments for ready money and the remaining three-fourths on dadni of which 85 per cent to be advanced as last year। ব্যবসায়ীদের একগুঁয়েমিতে বিরক্ত কোম্পানি ঠিক করল তারা সে বছর ইচ্ছুক ব্যবসায়ী ছাড়া অন্য বিতর্কে নামা কোনও ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করবে না; এইভাবেই তারা অনিচ্ছুক ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ তৈরি করতে পারবে (Ibid., f. 255-55vo, 25 May 1747; f. 257, 28 May 1747; Beng. Letters Recd., vol. 21, ff. 216, 218; FWIHC, pp. 92-93)। কোম্পানি সে বছর ১৬ জন ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করে। এদের মধ্যে সাতজন নতুন ব্যবসায়ী ছিল (এদের মধ্যে দুজন ডাচ কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করা ব্যবসায়ী ছিল একজন Otteram অতিরাম আর অন্যজন Gosseram Occoor গোঁসাইরাম অক্রুর)। এদের সঙ্গে কোম্পানির মোট বিনিয়োগের এক তৃতীয়াংশ, ৮ লক্ষ টাকার চুক্তি হল (BPC, vol. 19, f. 280, 13 June 1747; C&B. Abstr.., vol. 5, f. l09, para. 39, 13 June 1747; Beng. Letters Recd., vol. 21, ff. 220-21; FWIHC, vol. l, p. 194)। শেঠ এবং অন্য ব্যবসায়ীরা জানাল তারা বাকি দুই-তৃতীয়াংশ বিনিয়োগের দায়িত্ব নিতে পারে একটি শর্তে যে আগস্টের মধ্যে ৫০% দাদনি হস্তান্তর করতে হবে এবং বাকি ৩৫% পণ্য সরবরাহের পরে, কিন্তু দাদনি প্রক্রিয়ায় নতুন ব্যবসায়ী ঢুকলে তারা ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যাবে but if there are new men introduced into the Dadney they will do no business at all (Ibid., vol. 19, f. 286, 16 June 1747)। কলকাতা কাউন্সিল হতাশ হয়ে কর্তাদের জানাল, শর্ত পূরণ না হলে, শেঠ এবং অন্য সদস্যরা আমাদের সঙ্গে অসহযোগিতা করে চুক্তিবদ্ধ হতে অস্বীকার করছে এবং শর্তে রাজি অন্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমাদের চুক্তিতেও তারা বাধআ দিচ্ছে As the Seths [Setts] and other merchants obstinately refuse to-contract with us unless upon their own terms and impertinently refuse to let us employ any other merchants agreed that we look out for such as will contract(Ibid., vol. 19, f. 289vo, 18 June 1747)।
কলকাতার ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলের ব্যবস্থাপনা ছিল মূলত জাতি ভিত্তিক। ১৭৪৮ সালে চুক্তির সময় এলে শেঠেরা তাদের পুরোনো শর্তেই অটল। তাদের প্রতিক্রিয়ায় হতাশ কলকাতা কাউন্সিল জানাল, শেঠেরা সকলে [বৈঠকে] ছিল… তারা তিলকচাঁদ, গোঁসাই অক্রুর আর অতিরামকে নিয়োগকে বিরোধিতা করে, কারন এরা অন্য জাতের; ফলে তাদের সঙ্গে মিলে ব্যবসা করা এই ব্যবসায়ীদের পক্ষে সম্ভব হবে না; শর্তে রাজি না হলে দাদনি নিতে অস্বীকার করছে (The Seats being all present … inform us that last year they dissented to the employing of Tillickchund, Gosseram Occoor and Otteram they being of a different cast[e] and consequently they could not do any business with them upon which account they refused the Dadney and the same objection to make they propose taking, their shares of the Dadney if we should think proper to consent thereto(Ibid., vol. 21, f. 69, 18 May 1748; C&B. Abstr., vol. 5, para: 33, pp. 134-35; FWIHC, vol. I, p. 298)। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্য শেঠেদের শর্তেই চুক্তি সম্পাদনের পক্ষে ছিল।
কোম্পানির নতুন বিনিয়োগের সময় চলে এলেও সব কিছু পরিকল্পনামত ঠিকমত এগোচ্ছিল না। কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক দিনের পর দিন এতই বিষিয়ে যাচ্ছিল যে ব্যবসায়ীদের কোম্পানির সঙ্গে নতুন শর্তে কাজ করা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার ইচ্ছেটাই চলে যাচ্ছিল। দুপক্ষই নিজেদের শর্ত অপরপক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ায় অনড়। চুক্তি তৈরি প্রক্রিয়ায় থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে মারাঠা হ্যাঙ্গাম এবং সেই আক্রমন সামাল দিতে নবাব অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহে মরিয়া হয়ে উঠছিলেন। বর্গিদের আক্রমন যদিও সাময়িক এবং আঞ্চলিক দুর্ঘটনা, কিন্তু এই দস্যুবৃত্তি সাময়িকভাবে বাংলার অর্থনীতিকে আঞ্চলিকভাবে ধাক্কা দিলেও আমাদের ঘটনা পরম্পরা থেকে মনে হয়, ব্যবসায়ীরা ঠিকই করে নিয়েছিল, যতক্ষণ না তাদের কোম্পানির সঙ্গে চলতে থাকা বস্ত্র ব্যবসায় দ্রুত কমতে থাকা লাভের পরিমান বাড়ানো না যাচ্ছে এবং ব্যবসায় বাড়তে থাকা ঝামেলা ঝক্কি সামলানো না যাচ্ছে, ততদিন তারা কোম্পানির সঙ্গে নতুন চুক্তি সম্পাদন করতে অস্বীকার করে। দু’পক্ষের মধ্যে প্রথম অনতিক্রম্য ফাটল দেখা যায় ১৭৫১ সালে কাউন্সিলের তৈরি হিসেব ব্যবসায়ীরা মেনে নিতে অস্বীকার করার পর থেকেই। ব্যবসায়ীদের পণ্য সরবরাহে দেরি করার অজুহাতে কোম্পানি জরিমানা ধার্য করে (ব্যবসায়ীদের জরিমানা না দেওয়ার যুক্তি বুঝতে দেখুন C&B. Abstr., vol. 5, f. 303, para. 123, 20 Aug. 1751; FWIHC, vol. 1, p. 523)। শেঠ পরিবার ব্যবসায়ীদের গোষ্ঠীর নেতা হিসেবে নতুন জরিমানা দেওয়ার কড়ারে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করলেও, এই বিশেষ সময়ে উদ্ভুত ঘটনায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কলকাতার বসাকেরা।
বসাক গোষ্ঠীর মাথাদের অন্যতম শোভারাম বসাক জানান কোম্পানি জরিমানা যে হিসেব মেনে তৈরি করেছে, সেই প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে অস্বীকার করলেন এবং কলকাতা কাউন্সিলকে বলেন এর ফলে কোম্পানি ব্যবসায়িদের সঙ্গে অতীতে স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে। তিনি এই জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ মেনে নিচ্ছেন না। কোম্পানির হাতে একটিই অস্ত্র মজুদ ছিল। তারা সেটা সে প্রয়োগ করল এবং কর্তাদের লিখে জানাল, শোভারাম বসাক আমাদের শর্ত না মানার যুক্তিতে অনড়, এই ঘটনা এবং পুরোনো বেশ কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করে আমাদের মনে হয়েছে, ব্যবসায়ীদের আমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে বাধা দিচ্ছেন এই ব্যক্তি… তাকে দাদনি প্রক্রিয়া থেকে বার করে দিলাম এবং এর পরে তাঁর কুঠিতে আসা নিষদ্ধ হল … Sooberam bysaack persisting in obstinate refusal and it appearing to us most probably from this and some other circumstances that he had been greatly instrumental in working up several of the other merchants to the same refusal… dismissed him from Dadney and forbid him coming to the factory(BPC, vol. 24, ff. 133, 134 VO, 17 & 20 May 1751; C&B. Aostr., vol. 5, ff. 303-304, para. 126, 20 Aug: 1751; FWIHC, vol. 1, pp. 523-24)। একইভাবে শেঠ পরিবারের মাথা রামকৃষ্ণ শেঠও এই জরিমানার হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করলে কোম্পানি তাকেও দাদনি চুক্তি থেকে বার করে দেয় এবং কুঠিতে ঢোকা নিষিদ্ধ করে। পরে ভাইপো লক্ষ্মী চন্দ্র শেঠের অনুরোধে রামকৃষ্ণ শেঠ এবং শোভারাম বসাক(BPC, vol. 24, ff. 136, 137 vo, 23 & 27 May 1751; C&B. Abstr., vol. 5, f. 304, para. 130, 128, 20 Aug. 1751; FWIHC, vol. 1, p. 524) কোম্পানিতে প্রবেশ করেন। (চলবে)