সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
পঞ্চম অধ্যায়
এশিয় ব্যবসায়ী এবং ইওরোপিয় কোম্পানি
এই প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা অবিশ্যি আমাদের মনে রাখা দরকার — আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই অষ্টাদশ শতকের চারের দশক ছিল বাংলা ভূমিতে নিরন্তর বর্গি লুঠেরাদের হ্যাঙ্গামের যুগ। বর্গিদের অত্যাচার, লুঠের চেহারা দেখে ভয় পেয়ে বাংলার অধিকাংশ মহাজন, ব্যবসায়ী, ব্যাঙ্কারেরা সম্পদ লুকিয়েফেলছিল। শুধু বর্গির লুঠ নয় সরকারও বর্গি আক্রমন রুখতে সেনাবাহিনীর আকার বাড়াতে হাত পাতছিল ধনীদের কাছে। ফলে গদির মালিক থেকে অযুত ধনী প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত সম্পদ লুকিয়েফেলতে চেয়েছে। এই দুরবস্থার সময়কে ঘোমটা হিসেবে ব্যবহার করে সরকারকে বোঝাতে চেষ্টা করছে, বাংলার ব্যবসায়ী আর উতপাদকেরা বর্গি আক্রমনে প্রবল সমস্যায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। এই বিষোয়টা বুঝতে আমরা বাংলার সব থেকে প্রভাবশালী, সব থেকে ধনী ব্যাঙ্কার জগতশেঠের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করব এবং সেই আলোচনা থেকে আমাদের প্রতিপাদ্য প্রমান করব। ১৭৪৬ সালের ব্রিটিশ কোম্পানির কাশিমবাজারের কাউন্সিলের নথিপত্র থেকে জানছি যে, কোম্পানি মনে করছে শেঠেদের বিপুল সম্পদ গচ্ছিত থাকা সত্ত্বেও সরকারের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে টাকা বের করছে না to produce cash for fear of government … even though they have money (Fact. Records, Kasimbazar,.vol. 7, 22 June 1746; BPC, vol. 18, f.265vo, 30 June 1746)। কোম্পানির খাতায় বাংলার কয়েকজন ব্যবসায়ীর দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার খবর পাচ্ছি। কিন্তু কয়েকজন হাতেগোনা ব্যক্তি ব্যবসায়ীর পতনকে সাধারণভাবে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার ব্যবসা মহাজনী এবং ব্যাঙ্কিং জগতের সামগ্রিক পতনের ইঙ্গিত হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত কাজ হবে না।
১৭৩২-এ ডাচ ডিরেক্টর Sadelijn এর মেমোয়ার সূত্রে বাংলার চার ব্যবসায়ীর দেউলিয়া হওয়ার সংবাদ পাচ্ছি। একই সঙ্গে তিনি লিখছেন, ব্যবসায়ীদের এই শূণ্যস্থান দখল করতে দ্রুত উঠে আসছে অন্য সব ব্যবসায়ী। মাথায় রাখতে হবে ডাচ কুঠিয়াল নির্দিষ্টভাবে জীবন চৌধুরী, গোকুল মুকুন্দ [খান?], জঙ্গিমল[?] খান এবং রাধাকৃষ্ণ চৌধুরী — এই চার দেউলিয়া বস্ত্র ব্যবসায়ী কথা লিখছেন। চার জনের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সংবাদকে তাবড় তাবড় গবেষক দুমড়ে মুচড়ে সে সময়ের বাংলার বস্ত্র ব্যবসার পতনের সঙ্গে জুড়েছেন এবং ব্যবসায়ীদের এই পতন কাণ্ডে স্বাভাবিকভাবে পলাশীর ঘটনার ইঙ্গিতও পেয়েছেন। কিন্তু ঘটনাটা যে অন্যভাবে ভাবাযায়, সেটা স্পষ্টভাবে বলা দরকার। তৎকালীন নথিপত্র সূত্রে আমরা দেখছি, কুঠিয়াল Sadelijn যে চারজন দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীর নাম নিচ্ছেন, তারা প্রত্যেকেই চুঁচুড়ার ডাচ কুঠিতে পণ্য সরবরাহের কাজে চুক্তিবদ্ধ না হয়ে চন্দননগরের ফরাসী কোম্পানিকে পণ্য সরবরাহ করার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হন (Memorie’ of Sadelijn, voe, 2196, ff. 422-23, 15 Jan. 1732. The four merchants were Jiban Chaudhury, Gokul Mukund [Khan?], Jangemaat [?] Khan and Radhakrishna Chiudhury)। এক কর্পোরেট কোম্পানির আঞ্চলিক মাথাকে হতচ্ছেদ্দা করে যখন বাংলার চার সম্পন্ন বণিক অন্য ইওরোপিয় প্রতিযোগী কোম্পানির কবলে চলে যায়, তাদের আটকাতে না পেরে প্রতিযোগী কর্পোরেট হোমরাচমরারা ব্যর্থতা ঢাকতে ব্যবসায়ীদের নামে স্বাভাবিক ভাবেই কুৎসা রটানোর চেষ্টা করবেন — এ তথ্য বলাই বাহুল্য। তাই এই যুক্তিটাও বুঝতে হবে, ডাচ কর্তার নথি নির্ভর করে চার শান্তিপুরী ব্যবসায়ীর দেউলে হয়ে যাওয়ার ‘প্রমান’কে তৎকালীন কাপড় ব্যবসার পতনের প্রমান হিসেবে ব্যবহার করা যায় কী না, সেই তথ্যটা আদৌ ঠিক তথ্য কীনা সেটাও আমাদের তদন্ত করে দেখতে হবে সমালোচকের দৃষ্টিতে। তাছাড়া চার ব্যবসায়ীর দেউলে হয়ে যাওয়া এবং যখন বলা হচ্ছে তাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে অন্য ব্যবসায়ী উঠে আসছেন, এই ঘটনাকে আদৌ বাংলার বস্ত্র শিল্পের পতনের ইঙ্গিত হিসেবে ধরা যায় কী না, সেই সঙ্গত প্রশ্ন উঠে আসুক। নথিপত্রের তথ্য আমাদের যাচাই করে নেওয়া দরকার।
গোমস্তা ব্যবস্থায় ব্যবসা ঢেলে সাজতে গিয়ে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সারাক্ষণের জন্য কোম্পানির ব্যবসা দেখার যোগ্য বাঙালি চাকুরে গোমস্তা খুঁজে পেল না। ফলে উপযুক্ত পরিমানে এবং দীর্ঘদিনধরে একই গুণমানে পণ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে অনতিক্রম্য অসুবিধে দেখা দিচ্ছিল কুঠিগুলোতে। ১৭৪৭ থেকে ১৭৪৯ সাল পর্যন্ত ডাচ কোম্পানি চুক্তিবদ্ধ দালালের বদলে মাইনে নির্ভর চাকুরীজীবি গোমস্তা রেখে পণ্য জোগাড়ের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। অথচ কোম্পানির স্বার্থে অচলাবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। এই ক’বছরের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ডাচেরা ১৭৫০ সালে পরম্পরাগত দালাল পদ্ধতিতে ফিরে বাংলার ধনী আর অস্বচ্ছল উভয় ধরণের ব্যবসায়ীর দক্ষতার ওপর ভরসা পেশ করল। কোম্পানি ব্যবসায়িদের দক্ষতা অনুযায়ী পাঁচ দলে ভাগ করে করে মিহি বস্ত্র সরবরাহকরার চুক্তি করে (Kerseboom’s ‘Memorie’, Voe, 2849, f. 95vo, 14 Feb. 1755)। এই ঘটনার সঙ্গে কারসেবুমের উল্লিখিত চার ব্যবসায়ীর দেউলে হয়ে যাওয়ার তথ্যের সঙ্গে বাংলার বস্ত্র ব্যবসার পরিবেশ পতনের সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত চিন্তা করা দরকার। মনে রাখা দরকার, চারের দশকের শেষের আর পাঁচের দশকের প্রথমের দিকে বাংলার ব্যবসায়ীরা মারাঠা আক্রমনের প্রেক্ষিতে দুরাবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, যদিও এই সঙ্গীন অবস্থা সাময়িক ছিল। সে সময়ের বাংলার আর্থিক তথ্য থেকে একথা পরিষ্কার মারাঠারা বাংলার অর্থনীতিতে কিছুটা আঁচড় কাটতে পারলেও পুঁজির বাজার এবং এশিয় এবং ইওরোপিয় ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করার পরিবেশকে বিষিয়ে দিতে পারে নি।
ম্যানিঙ্গহ্যাম আর ফ্রাঙ্কল্যান্ডের সমীক্ষা বিষয়ে কিছু কথা বলা দরকার। এই সমীক্ষার সরল সাধারন পাঠ এবং সমীক্ষার সমস্ত তথ্য নিঃসংশয়ে মেনে নেওয়া — আমাদের ভুল দিকে নিয়ে যাবে। প্রাথমিক আলগোছ পাঠে অবশ্যই মনে হতে পারে ব্রিটিশ কোম্পানি দাদনি ব্যবস্থা থেকে গোমস্তা ব্যবস্থায় চলে যাওয়ার কারণ হল দাদনি বণিকদের কোম্পানির দেওয়া চুক্তি পালন করার অক্ষমতা এবং তাদের ব্যবসা করার স্বচ্ছলতার যোগ্যতাতেও ঘাটতি দেখা দেওয়া। সমীক্ষা খুঁটিয়ে এবং পারিপার্শ্বিক তথ্যাবলীর সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে অন্য আরও গুঢ় তথ্য উঠে আসতে থাকে যা এই প্রচলিত বয়ানকে খান খান করে দেয়। এই রিপোর্ট থেকে পরিষ্কার কোম্পানির বাংলা কর্তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে কোম্পানির ব্যবসার আঙ্গিক দালালি থেকে গোমস্তা ব্যবস্থায় ঢেলে সাজা জরুরি ছিল। আমরা আগেই দেখেছি বাংলা নির্ভর ব্যবসায়ীরা নিজের শর্ত ছাড়া কোম্পানির শর্তে কাজ করতে ইচ্ছুক ছিল না — এদের জোটও ভাঙা যাচ্ছিল না। ফলে কোম্পানির ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় গোমস্তা পদ্ধতি আত্মীকরণ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না। আমরা যেন মাথায় রাখি বাংলার ব্যবসা পরিবেশের পতনের কারণে কিন্তু তারা দালালি ব্যবস্থা থেকে গোমস্তা ব্যবস্থায় উল্লম্ফন ঘটায় নি। বরং বাংলার ব্যবসায়ীরা স্বাধীনচেতা স্বভাবে, এগুঁয়ে মনোভাবে, কোম্পানির শর্ত মেনে না নেওয়ার একরোখা সিদ্ধান্তে বিদেশি কোম্পানির শর্তে চুক্তি না করতে অনড় হয়ে ছিলেন। সেই মনোভাবের চাপেই ইওরোপিয় কোম্পানি বাধ্য হয়েছিল দাদনি প্রথা ছেড়ে গোমস্তা ব্যবস্থা আপন করে নিতে।
সমীক্ষায় লেখা হচ্ছে, আমাদের গোমস্তা প্রথা আপন করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না; কারন ব্যবসায়ীদের আরোপিত শর্ত আমাদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণস্বার্থ রক্ষার পরিপন্থী। সম্মানিত চাকুরেদাতারা তাদের দেওয়া শর্ত মেনে নেন নি; ব্যবসায়ীদের মনে হয়েছিল আমরা তাদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হব, কারন তাদের ছাড়া বিনিয়োগ জোগাড় করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব তাই আমরা ব্যবসায়ীদের ক্রীড়ানক [We are by necessity obliged to have recourse to the present method [gomasta system], as the only one left; for whilst our merchants’ proposals are so very contrary to the Interests and Commands of our. Hon’ble Employers they render it impossible for us to consent thereto … by their proposals they seem to think we are absolutely in their hands and must submit to their demands however extravagant, on a supposition that it is not in our power to procure an investment without them (BPC, vol. 26, f.165vo, Annex to Consult., 7 June 1753)]। এই সমীক্ষা পড়লে মনে হতেই পারে, সমীক্ষা লেখকেরা যতদূর সম্ভব দাদনি প্রথা বজায় রেখে, দাদনি ব্যবসায়ীদের কোম্পানির সঙ্গে জুড়ে রেখে পুঁজির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে থমকে যাওয়া ব্যবসা চালু করে আড়ঙে কোম্পানির ঝুঁকি কমানো আর নির্দিষ্ট সময়ে মালপত্র সরবরাহ নিশ্চিত করা চেষ্টা করেছে (the original intent and design of conducting the Investments by means of Dadney merchants)। সমীক্ষায় নির্দিষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, চুক্তিবদ্ধ বহু ব্যবসায়ীই কোম্পানির থেকে অগ্রিম দাদন নিয়ে পণ্য সরবরাহে অক্ষম হলে, জামিনে প্রতিশ্রুত অর্থ জরিমানা হিসেবে দিতে পারার অবস্থায় নাকি ছিলেন না। এটা ঠিক যে পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে কোম্পানিতে নিয়মিত পণ্য সরবরাহে কিছুটা ব্যর্থ হচ্ছিলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এই ব্যর্থতার সঙ্গে তাদের আর্থিক দেউলিয়াপনার কোন যোগসূত্র ছিল না। পঞ্চাশের দশকের শুরুর সময়টিতে বাংলার ব্যবসা জগত যে ব্যাপক রাজনৈতিক দুর্যোগের মধ্যে দিয়ে চলছিল এই পণ্য সরবরাহের ব্যর্থতা সেই সাময়িক দুর্যোগের কারণেই ঘটছিল।
সমীক্ষার দুই লেখককে মাঝেমধ্যেই খুবই বিভ্রান্ত মনে হয় এবং তারা অতিউতসাহে দাদনি ব্যবস্থা থেকে গোমস্তা ব্যবস্থায় যাওয়ার যুক্তি দেখাতে গিয়ে বারে বারেই পরস্পর বিরোধী মন্তব্য করে বসেন, যা দেখে মনে হয় তারা এই সমীক্ষাটি উদ্দেশয়পূর্ণভাবে কোম্পানি আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বাড়ানোর বিষয়টি আরও বেশি মদত করার জন্যে তৈরি করেছিলেন। সমীক্ষায় বলা হয়েছে দাদনি বণিকেরা যেভাবে নিজেদের শর্তে অনড় হয়েছিলেন, তার ফলে কোম্পানিকে বাধ্য হতে হয়েছিল গোমস্তা ব্যবস্থা আত্মীকরণ করতে। কিন্তু তারা একই সঙ্গে লিখলেন নতুন ধরণের ব্যবসায়ী নিয়োগ করার ক্ষমতা তাদের নেই। এই মন্তব্য তারা কেন করলেন? কারণটা কি শেঠ এবং বসাকদের নেতৃত্বে এবং শর্তে দাদনি বণিকেরা চলছিলেন বলেই তাদের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছিল? আর যদি ধরেই নি যে কলকাতার দাদনি বণিকেরা আর্থিকভাবে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ছিলেন তাহলে দুই সমীক্ষার লেখক নতুন এক দল ব্যবসায়ী চাইবেনই বা কেন? তাহলে কি ধরে নিতে হবে কোম্পানির আমলারা দাদনি বণিকদের কোম্পানির ব্যবসা জগত থেকে উতখাত করতে চাইছিলেন, কারণ দাদনি বণিকেরা এতই শক্তিশালী যে তারা কোম্পানি ব্যবসা ছাড়া আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসায় মদত দেবেন না? (চলবে)