সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
এক
তৃতীয় অধ্যায়ে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির বাংলার ব্যবসা এবং কাঠামো আলোচনা কালে দেখব, এমন কী ১৭৫০-এর দশকেও বাংলায় ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর রপ্তানির অঙ্ক খুব বেশি কিছু কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য ১৭৩০ এবং ১৭৪০-এর দশকের তুলনায় ১৯৫০ দশকের শুরুতে ব্রিটিশ কোম্পানির রপ্তানির ব্যবসা কিছুটা ঢালের দিকে গড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে ব্রিটিশ কোম্পানির ব্যবসার পতনের কারণ বর্গী হামলার পরের সময়ের বাংলায় ঘণীভূত হয়ে ওঠা তথাকথিত আর্থিক সঙ্কট নয়, এটা স্পষ্টভাবে বলা দরকার। বর্গী হামলা প্রসঙ্গে আমরা এই বইতেই দেখাব ঐতিহাসিকদের লেখায় মারাঠা আক্রমন এবং বাংলার অর্থনীতিতে ধ্বংসাত্মক প্রভাবের বিষয়টি অতিরঞ্জিত ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। মারাঠা আক্রমণে বাংলার অর্থনীতির পতনের তথ্য জমিনি বাস্তবতা ছিল না। কারন বর্গি আক্রমন হয়েছিল মূলত রাঢ় বাংলায়। বাংলাজুড়ে নয়। মারাঠা হ্যাঙ্গাম বাংলার অর্থনীতিতে প্রান্তিক প্রভাব ফেলেছিল। তাও খুব কম সময়ের জন্যে। তথ্য দিয়ে আমরা দেখাতে পারি, ১৭৪০ এবং ৫০-এর দশকগুলিতে ইওরোপিয় বা এশিয় বণিকদের বাংলা থেকে রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমান এবং মোট মূল্যমান, কোনওটারই পতন ঘটে নি। ১৭৫০ দশকের প্রথম দিকে বাংলায় ব্রিটিশ কোম্পানির বাণিজ্যের ঘাটতি দেখাদিলেও সেই ক্ষতি পুষিয়ে যায় ডাচ কোম্পানির রপ্তানি বাড়ায়।
ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির বাংলা কুঠি থেকে প্রচুর পরিমান কাপড় রপ্তানি করত। সেই বাস্তবতা বুঝতে আমরা সপ্তম অধ্যায়ে ব্রিটিশ এবং ডাচ বস্ত্র রপ্তানির বিশদ বিবরণ উপস্থাপন করব। এই গবেষণা আমাদের ইন্টারেস্টিং দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে সাহায্য করবে। কয়েজকন ঐতিহাসিক দাবি করেছেন ১৭৪০ এবং ৫০-এর বাংলায় দশকে সুতি বস্ত্রের দাম নাকী বিপুল বেড়েছিল (Brijen K. Gupta, Sirajuddaulfah, p. 33; l), N. Chaudhuri, Trading World, pp. ,99-108; P J Marshall, East IndianFortuns, p. 35; Bengal, pp. 73, 142-43, 163-64, 170)। সেই তথ্য যে সত্য নয় সেটাও আমরা দেখাতে পারব। একইভাবে অষ্টম অধ্যায়ে ডাচ এবং ব্রিটিশ কোম্পানির রেশম রপ্তানির বিশদ বিবরণ আলোচনা করব; আমরা দেখাব, মধ্য অষ্টাদশ শতকে এশিয় বণিকদের রেশম বস্ত্র রপ্তানি, সম্মিলিত ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির থেকে অনেক বেশি ছিল। ৫০-এর দশকের প্রথম দিকে এশিয় বাণিকদের রেশম ও সুতি বস্ত্রের রপ্তানির মোট মূল্য, দুটি ইওরোপিয় কোম্পানির মোট রপ্তানি মূল্যের সমান।
বেশ কয়েকজন ঐতিহাসিক (S. Bhattacharyya, East lndia Company, p. 17. Marshall Bengal, p. 80.) যুক্তি দিয়েছেন ১৭২০ এবং ১৭৪০-এর দশকে বাংলার অর্থনীতির একটা বড় অংশ ইওরোপিয়/ব্রিটিশ কোম্পানির দখলে চলে যায়। এই তথ্যতেও বিন্দুমাত্র সত্য লুকিয়ে নেই সে তথ্যও আমরা প্রমান করব। আমরা দেখাব, পলাশীপূর্ব সময়ে বাংলার অর্থনীতিতে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং সদর্থক হলেও অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে এশিয় বণিকেরা ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর তুলনায় অনেকগুণ বেশি শক্তিশালী ছিল। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি বাংলায় পণ্য কেনার জন্যে যে পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করত, যাকে তারা ইনভেস্টমেন্ট আখ্যা দিচ্ছে, সেই বিনিয়োগ জোগাড় করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছে। বিষয়টা আমরা চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। একই সঙ্গে আমরা দেখাব যে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষমতা খুব বেশি ছিল না বলেই তারা স্থানীয় ধারের বাজার থেকে বিপুল পরিমানে অর্থ জোগাড় করতে বাধ্য হচ্ছে। স্থানীয় অর্থনীতিতে তাদের নিয়ে আসা দামি ধাতু এবং মুদ্রাকে পণ্য কেনার উপযোগী স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় বাস্তবিক কী কী সমস্যা দেখা দিচ্ছিল, সে সব আমরা আলোচনা করব। সেই সীমিত পুঁজি নিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার যে তত্ত্ব বেশ কয়েকজন ঐতিহাসিক উপস্থিত করেছেন, সেই তত্ত্ব কত দূর সত্য, সেই বিষয়টাও আমরা বইতে বিশদে আলোচনা করব।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা অষ্টাদশ শতকের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করেছি। তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচনা করেছি ইওরোপিয় কোম্পানির কাজকর্ম। চতুর্থ এবং পঞ্চম অধ্যায়ে কোম্পানিগুলির বাণিজ্যকর্ম এবং সওদাগর সমাজ। ষষ্ঠ সপ্তম অষ্টম পর্বে সুতি ও রেশম বস্ত্র কাঠামো ও সংগঠন। নবম অধ্যায়ে ইওরোপিয় এশিয় বাণিজ্যে অন্যান্য পণ্যের প্রভাব। দশম অধ্যায় খুব গুরুত্বপূর্ণ, পলাশীপূর্ব সময়ে পণ্যের দামের ঝোঁক নিয়ে আলোচনা করব। একাদশ অধ্যায়ে বাংলায় ব্রিটিশ বিজয় এবং দ্বাদশ অধ্যায়ে আলোচিত হবে বিভিন্ন অধ্যায়ের আলোচনা থেকে উপনীত হওয়া সিদ্ধান্তের সংক্ষিপ্তসার।
এই বইতে আমরা কতগুলি বিষয় তুলে আনব। প্রথমত অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে মুঘল সাম্রাজ্যজুড়ে আইন শৃঙ্খলার সমস্যা দেখা দিলেও নবাবি নেতৃত্ব বাংলায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রদান করার ফলে বাংলায় অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে স্থায়ী এবং শক্তিশালী সরকার থাকার জন্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের বিকাশ ঘটছিল। এর পরে যে ব্রিটিশ দখলদারি এবং উপনিবেশ তৈরি হল, তার জন্যে বাংলাজাত অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সঙ্কট দায়ি নয়। দায়ি কোম্পানির আমলাদের উপউপনিবেশিক (sub-imperialism) উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং এশিয় এবং অন্যান্য ইওরোপিয় বণিকদের সঙ্গে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় লড়তে না পেরে ব্রিটিশ আমলাদের প্রায় ডুবতে বসা ব্যক্তিগত ব্যবসা বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা এবং একই সঙ্গে বাংলাকে দোহন করার জন্যে উপনিবেশ তৈরি করার উদ্যম।
দ্বিতীয়ত এই বইতে আমরা তর্ক তুলেছি, বাংলায় ভৌগোলিকভাবে অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে অর্থনৈতিক পতন ঘটে নি। মধ্যঅষ্টাদশ শতাব্দে বাংলায় আর্থিক সঙ্কটের চিহ্নমাত্র ছিল না, বরং বাণিজ্য ও শিল্পের বিকাশ ঘটছিল দ্রুতলয়ে। বাজারে লক্ষ্যণীয়ভাবে এবং দীর্ঘসময়ের দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি ঘটে নি। ১৭৩০-এর দশক বা ১৭৪০-এর দশকের প্রথম দিককার বিপুল রপ্তানির তুলনায় ১৭৫০-এর দশকে বাংলা থেকে ইওরোপিয় রপ্তানির মূল্যমানের ঘাটতি বা পতন দেখা দিচ্ছে না। এই সময়ে এশিয় বণিকেরা বাংলা থেকে বিপুল পরিমানে সুতি আর রেশম বস্ত্র রপ্তানি করছে। মনে রাখা দরকার পলাশীর আগের সময়ে বাংলায় সব থেকে বেশি পরিমান দামি ধাতু আমদানি করত বাংলা ভিত্তিক এশিয় ব্যবসায়ীরা, ইওরোপিয়রা নয়।
তৃতীয়ত, বই-এর শেষে আমরা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করব — চুম্বকে বাংলার অর্থনীতির পতন চরিত্র বর্ণনা। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার রাজনীতি, অর্থনীতিতে ব্রিটিশ পকড় সম্পূর্ণ হলে অর্থনীতির দ্রুতলয়ে পতন ঘটতে থাকে। বাংলা অর্থনীতির মেরুদণ্ড কারিগরদের দুর্দশার সময় শুরু হয়। যে সব তাঁতি, চরকা কাটনি, রেশম কারিগর এবং অন্যান্য পেশাজীবি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক চাপে এবং নিপীড়নের বাইরে দাঁড়িয়ে উতপাদনে জ্ঞান দক্ষতা শ্রম এবং মেধা বিনিয়োগ করে পণ্য তৈরি করতে পারতেন, তারা কোম্পানির শাসনে অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নিতান্তই দৈনিক মজুরির শ্রমিক — কার্যত দাস শ্রমিকে রূপান্তরিত হলেন। এশিয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা বাংলা নির্ভর এশিয় ব্যবসায়ীদের বিপুল বিশাল রপ্তানি বাণিজ্যকে উপনিবেশিক শাসন বাংলার অর্থনীতি থেকে মুছে দিল। ফলে বাংলার বাণিজ্য এবং শিল্প উভয়ের একসঙ্গে পতন ঘটল। অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে নবাবি শাসনে যে বাংলা সমৃদ্ধির চরম শিখরে উঠেছিল, পলাশীর পর অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে আর তার বেশি সময় লাগবে না। কোম্পানি এবং তার আমলারা শাসন ক্ষমতা দখল নেওয়ায়, বাংলার অর্থনৈতিক দুর্গতির সময় শুরু হল, বাংলার পরম্পরার ব্যবসা এবং শিল্পের ধ্বংস সাধন ঘটল। এই সব ঘটনা একসঙ্গে মিলে উনবিংশ শতকের শুরুতে বাংলায় ডেকে আনল অবর্ননীয় অন্তহীন দুর্দশার পরিবেশ। যে পরিবেশ থেকে বাংলার আর মুক্তি ঘটল না।
দুই
রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক বিন্যাস
অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে বিপুল বিশাল মুঘল সাম্রাজ্যের পতন না ঘটলেও তার সর্বভারতীয় প্রভাব নিশ্চিহ্ন হওয়ার দিকে দ্রুত এগোচ্ছিল। ১৭০৭য় ষষ্ঠ মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর বিদ্রোহী আর বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি সাম্রাজ্যের সুবাগুলোয় তাদের ধ্বংসাত্মক চরিত্র নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। যদিও মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের দেওয়াল লেখা, স্বপ্নভঙ্গের বেদনার ইঙ্গিত মিলছিল আওরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষ সময় থেকেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য জুড়ে অব্যবস্থাপনা অবাঞ্ছিত গতিতে উর্ধ্বমুখে বেড়ে চলে কেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণে সদুবাগুলির প্রশাসনে শৃঙ্খলা চাপানোর চেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে অরাজক অবস্থা এবং বিশৃঙ্খলার রমরমা দেখা দিল। আশ্চর্যের কথা ভারতবর্ষ জুড়ে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুর্গতির পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল, বাংলা সে পরিবেশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে এক্কেবারেই ব্যতিক্রম অটল সঙ্কল্প নিয়ে হয়ে দাঁড়িয়ে রইল আরও পাঁচ দশক। অষ্টাদশ শতকের সমগ্র প্রথমপাদ, বাংলার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশটি বজ্রমুষ্টিতে এবং চরমতম দক্ষতায় সম্পন্নভাবে চালিত হয়েছে। সার্বিকভাবে সর্বভারতীয় অঞ্চল থেকে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও বাংলা সুবার প্রশাসনিক ব্যবস্থা মজবুতই ছিল। এই সময়ের প্রশাসনের চরিত্র নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, সে যুগের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধি হিসেবে অভিজাত শাসক গোষ্ঠী একজোট হয়ে প্রশাসনিক দক্ষতার উচ্চ মান বজায় রেখেছিল an elite ruling group which was representative of the political realities of the day coalesced and maintained rather high standards of administrative efficiency (P.B. Calkins, ‘The Formation of a Regionally Oriented Ruling Group in Bengal, 1700-1740’, JAS, vol.XXIX, no.4, 197d, p.799.)।
দুই.এক. প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক কাঠামো
সপ্তদশ শতকে বাংলা সুবার প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল প্রমিত মুঘল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নির্ভর করে। ক্ষমতা কাঠামোর ওপরের অংশটি দখল করেছিল মনসদবদারেরা। তারা ছিলেন কেন্দ্রের মুঘল সরকারের মনোনীত প্রতিনিধি। তাদের এক সুবা থেকে অন্য সুবায় নিয়মিত বদলি করা হত, এই ভাবনায় যে কোন সুবাতেই যেন কোনও আমলাকে ঘিরে স্বার্থগোষ্ঠী গড়ে না ওঠে। কেন্দ্র সরকার সুবাগুলির ওপর কড়া পকড় বজায় রাখত উচ্চপদের আমলাদের নিয়মিত বদলি আর একে অপরের নজরদারির ভারসাম্য বজায় রাখার (checks and balances) ব্যবস্থাপনার নীতি অনুসরণ করত। সুবার প্রশাসন দুটো ভাগে বিভক্ত ছিল প্রশাসনিক বা ফৌজদারি এবং রাজস্ব বা দেওয়ানি — কোনও আমলার দপ্তরই কোনও আমলার দপ্তরের ওপরে নির্ভরশীল ছিল না — প্রত্যেকেই নিজের কাজে সম্রাটের কাছে সরাসরি কৈফিয়ত দেয়। প্রশাসনিক প্রধান পদের নাম ছিল নবাব-নাজিম অথবা সুবাদার। সুবাজুড়ে রাজস্ব আদায়ের স্বাধীন দায়িত্ব ছিল দেওয়ানের ওপর। [সুবাদারের কাজ ছিল প্রশাসন দেখা আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা আর দেওয়ানের কাজ ছিল সুবায় রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা আর আর্থিক প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ — অনুবাদক]। দুটি পদের আমলাই সাম্রাজ্যিক ফরমানে নিযুক্ত হতেন। প্রশাসনিক নির্দেশনামা চালিত হত সম্রাটের নির্দেশে তৈরি দস্তুরউলঅমল নামক নির্দেশনামা দ্বারা (Riyaz, p.248)।
কিন্তু সুবার দ্বৈত প্রশাসনে, পরস্পরের ওপর নজদারি আর ক্ষমতার ভারসাম্য রাখার দীর্ঘকালীন মুঘল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা অষ্টাদশ শতকে বাংলা সুবায় ভেঙ্গে পড়ল দুটো কারণে। প্রথমত ১৭০০-য় মুর্শিদকুলি খানকে দেওয়ান হিসেবে বাংলায় পাঠানোর হল। আওরঙ্গজেব জানতেন মুর্শিদকুলি যোগ্য প্রশাসক, তাঁর আশা ছিল মুর্শিদকুলি তাঁকে নিয়মিত এবং প্রয়োজনীয় রাজস্ব বাংলা থেকে পাঠাবেন। দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধে যুদ্ধে জেরবার আওরঙ্গজেবের যেহেতু অন্যান্য সুবার রাজস্ব আদায় সূত্র প্রায় শুকিয়ে গিয়েছিল, তিনি মুর্শিদকুলিকে নিযুক্ত করে নির্দিষ্ট পরিমান রাজস্ব দাবি করলেন। মুর্শিদকুলি নিয়োগকর্তাকে নিরাশ করেন নি। প্রথম বছরেই তিনি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সুবায় রাজস্ব গণনা এবং রাজস্ব আদায় করে ১ কোটি টাকা (পরের বছরগুলিতে আরও বাড়বে) রাজস্ব পাঠালেন কেন্দ্রিয় তোষাগারে। দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধে যুদ্ধে জর্জরিত বৃদ্ধ আওরঙ্গজেবের কাছে নিয়মিত যাওয়া এই অর্থ আশীর্বাদ স্বরূপ হয়ে দাঁড়াল। তিনি তার মনোনীত কর্মচারীকে বাংলায় মুঘল প্রশাসনিক রীতিনীতি উল্লঙ্ঘন করে, কেন্দ্রিয় মুঘল প্রশাসনের চোখ রাঙ্গানি উপেক্ষা করে, বাংলার মত দূর প্রদেশে স্বাধীনভাবে প্রশাসন চালাবার ছাড়পত্র দিলেন। মুর্শিদকুলি, বাংলা সুবায় তাঁর অবস্থান জোরদার করলেন ১৭০৪ সালে ঢাকা থেকে দেওয়ানি মুকসুদাবাদে (যা মুর্শিদাবাদ রূপে পরিচিত হবে আগামী দিনে) স্থানান্তরিত করে। এই কাজটা তিনি করলেন সুবাদার শাহজাদা আজিমউশ্বানকে উপেক্ষা (সূত্র রিয়াজ) করেই। সময়ক্রমে দেওয়ানের ক্ষমতায় আরোহন এবং তাঁর সম্মান আরও বাড়ল ১৭১৭-র ফরমানে তিনি সুবাদার নিযুক্ত হওয়ায়। মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে, কোনও মুঘল সুবায় এই প্রথম এই দুটি উচ্চতম আমলার পদ একজনকেই অর্পন করা হল। সপ্তদশ শতকে বাংলায় যে ধরণের প্রশাসনিক কাঠামো ছিল, সেটির বিপুলাকার পরিবর্তন ঘটেগেল অষ্টাদশ শতকের প্রথমপাদেই। এটাই মুঘল প্রশাসনিক প্রথার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান।
দ্বিতীয় ঘটনাটি হল, পরস্পরের ওপর নজরদারি করার মাধ্যমে ভারসাম্য রাখার জন্যে কেন্দ্র থেকে বাংলা সুবায় আমলাদল পাঠানো হত। সেই নিয়মতান্ত্রিক কাণ্ডটির ছেদ পড়বে ১৭১৩ থেকে (J.N. Sarkar (ed.), History of Bengal, vol.II, p. 410)। তাঁর আগের সময়ে দিল্লি থেকে সুবাদার এবং দেওয়ানের সঙ্গে, তাকে প্রশাসনে সাহায্য করার জন্যে, একদল আমলা প্রশাসনে আসত এবং তারা কেন্দ্রিয় সরকার আর সুবায় রাজ্য প্রশাসনের যোগসূত্রের দায়িত্ব পালন করত। দুটি পদেই যেহেতু একই মানুষ কাজ করছেন তাই কেন্দ্র থেকে আমলা পাঠানোর প্রথার ছেদ ঘটল। কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে বাংলার যে স্বাভাবিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল কয়েক শতকের প্রশাসনিক প্রথা বিকাশের ফলে, দিল্লির সঙ্গে সেই প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়ল। এরপর থেকে মুর্শিদকুলি বা তার উত্তরাধিকারীদের মাথায় আর কোন মুঘল হিন্দুস্তানের কেন্দ্র থেকে আসা আমলার জুড়ে বসার ঘটনা ঘটল না। সারা ভারত জুড়ে যে অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, বাংলায় তার বিপরীত কাণ্ড ঘটল, বাংলার প্রশাসন জোরদার হল, বাংলার নিজামত আরও শক্তিশালী হল, বাংলার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হল। বাংলার নবাব নিজের পছন্দ মতই আমলা নিয়োগ করতে শুরু করলেন মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্র নিরপেক্ষ হয়ে স্থানীয় স্তর এবং নিজেদের পারিপার্শ্বিক অঞ্চল থেকে। বাংলা শেষ পর্যন্ত আইনগতভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের সুবা হিসেবে কাজ করছিল ঠিকই, কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে ওপরের স্তরের প্রশাসনিক মাথাদের আর দিল্লির প্রতি আনুগত্য দেখানোর দরকার পড়ল না। আমলারা বাংলার নাজিমকে কাজ বুঝিয়ে দিত এবং তার নির্দেশেই কাজ করত। বছরের পর বছর ধরে এই কাণ্ড ঘটে চলায় নিজামের হাত শক্ত হল। বাংলায় নতুন নিজামতের পত্তন ঘটল স্থানীয় শক্তির ওপর নির্ভর করে।
বাংলার প্রশাসনিক ব্যবস্থা অন্যান্য এলাকার প্রশাসনিক ব্যবস্থা থেকে অনেকখানিই আলাদা ছিল। অধিকাংশ জমির দখল ছিল স্থানীয় ভিত্তিতে, দেশিয় জমিদারদের হাতে। বছরের পর বছর রাজস্ব আদায় বাড়তে থাকায়, নিজামতের অর্থনীতি আর প্রশাসনে স্থানীয় জমিদারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। জমিদারেরা স্থানীয় স্তরে রাজস্ব আদায় করতেন এবং শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন। গুরুত্বপুর্ণ বড় জমিদারদের নিয়ন্ত্রণ করে প্রাদেশিক প্রশাসন ছোট ছোট জমিদার সামন্ত এবং রায়ত/প্রজাদের পরোক্ষে নিয়ন্ত্রণ করত। জমিদার আর রায়ত/চাষীদের মধ্যে বহুস্তরীয় মধ্যস্থ তৈরি হল। অধিকাংশ সময়ে জমিদারদের সংগৃহীত রাজস্ব নবাবের কাছে পৌঁছত মধ্যস্থ মাধ্যমে। সপ্তদশ শতকে মনে হয় অধিকাংশ জমিদারই খুব ছোট আকারের ছিল (James Grant, ‘Finances of Bengal’ in W.K. Firminger (ed.), Fifth Report, vol. II, pp. 176-91) এবং মুঘল কেন্দ্রের পক্ষে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন ছিল না। কিন্তু অষ্টাদশ শতকের শুরুতে মুর্শিদকুলির রাজস্ব সংস্কারের ফলে এলাকায় এলাকায় বড় বড় জমিদারদের আবির্ভাব ঘটল। এদের উদ্ভবে সুবায় ক্ষমতার কাঠামোর কোন পরিবর্তনটা ঘটল সেটা আমরা খুব তাড়াতাড়ি দেখব।
দেওয়ান হিসেবে মুর্শিদকুলির নিযুক্তি বাংলার ইতিহাসে বড় বৈপ্লবিক ঘটনা। তিনি শুধু বাংলায় নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরিই করলেন না, তিনি সামগ্রিক রাজনৈতিক বোধেরও পরিবর্তন আনলেন। স্বয়ং আওরঙ্গজেবের অধীনে তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতা দক্ষিণে পরীক্ষিত হয়েছে। তাই তাকে সুচিন্তিতভাবে আওরঙ্গজেবের পক্ষ থেকে বাংলায় পাঠানো হয়েছিল একটি ছোট্ট নির্দেশ দিয়ে, বাংলার রাজস্ব বাড়াও। মুঘল প্রশাসন বহুকাল ধরেই মনে করত বাংলা থেকে কেন্দ্রিয় ভাণ্ডারে কম রাজস্ব যাচ্ছে এবং এই বাড়তি রাজস্ব লুটেপুটে খাচ্ছে মনসবদার আর জমিদারেরা (Risala, f.8b; কালকিনস উদ্ধৃতি দিয়েছেন Calkins, ‘Ruling Group’, p.801)। রাজস্ব আদায়ের এই পদ্ধতিতে বাংলার জমির দখলের পরিমানে এবং রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন ঘটিয়ে যেন তারা একটা নতুন প্রাদেশিক গোষ্ঠীবদ্ধ দল হিসেবে উঠে এল (formation of a new, regional group)। পরিবর্তনটিকে এইভাবে বলা যায় — নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ছোট ছোট জমিদারি লুপ্ত হয়ে নতুন বড় জমিদারি সৃষ্টি হয়; জমিদার, মুদ্রা ব্যবস্থাপক (স্রফ) এবং মহাজনদের (ব্যাঙ্কিং ক্লাস) গুরুত্ব অপরিসীম বৃদ্ধি পেল (emergence of big zamindaries with a consequent decline in the total number of zamindaries, the increasing importance of larger zamindaries in the political system of the province and the enhancement in the power of the moneylender and banking class) (ঐ)। (চলবে)