সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
পঞ্চম অধ্যায়
বড় ব্যবসায়ী (Merchant Princes) দের ভূমিকা
মুদ্রা ছাপানোর কাজে শেঠেরা প্রচুর রোজগার করত। একইসঙ্গে টাঁকশালের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্থব্যবস্থায় দখলদারি কায়েম করার অন্যতম হাতিয়ারও। জগতশেঠ এই একচ্ছত্র অধিকার যে কোন মূল্যে কায়েম রাখতে চাইত। অথচ ব্রিটিশেরা টাঁকশালের নিয়িন্ত্রণ পেতে নাছোড়বান্দা। কিন্তু কাশিমবাজার কুঠিয়াল জানতেন শেঠেদের। ১৭৪৩-তে কাশিমবাজার ফ্যাক্টরেরা জানাল, ফতেহচাঁদ যতদিন জীবিত আছেন আর মুর্শিদাবাদের সরকার ছায়ার মত তার পিছনে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দরবারের অভিজাতরা যতদিন তাঁকে সমর্থন করছেন, ততদিন এই [মুদ্রা ছাপাবার অধিকার] পাওয়ার ভাবনা মাথা থেকে বার করে দেওয়া দরকার (… but this [minting privilege] they can never hope while Futtichund subsists and has that weight with the government which his usefulness to them and great influence at Court naturally gives him (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 6, 16 March 1743)। ইওরোপিয় কোম্পানিরা বাংলা পণ্য কেনার উদ্দেশ্যে আনা দুটি সম্পদ, দামি ধাতু এবং মুদ্রা [মূলত দক্ষিণের], অন্য কোন বিকল্প উপায় না থাকায়, জগতশেঠের মহাজনী গদিতে তাদের তৈরি করা দামে বিক্রি করতে বাধ্য হত। বাংলার পুঁজির বাজারে জগতশেঠেদের বজ্র পকড়ের জন্যে তাদের তৈরি বিনিময় হারই ছিল মুদ্রা বাজারের বিনিময় হার। টাঁকশালের দখলদারি নিশ্চিত করতে দু’একটা ব্যতিক্রমী সময় বাদ দিলে, তারা নবাবকে চাওয়া মতই আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ফতেহচাঁদ নবাবকে প্রভাবিত করে তার মত করে বিনিময়ের হারের মূল্য জারি করাতেন নবাবের নিয়াবতের নামে। এ ধরণের বহু ঘটনা কোম্পানির খাতায় পাওয়া যায় (BPC, vol. ll, f.349, 8 Nov.1736; vol.12, f.17, 13Dec.1736; Beng. Letters Recd., vol. 21, f. 507, 13 Jan. 1750; BPC, vol. 25, f. 43, 3 Feb. 1752)। মুদ্রা ছাপানোর ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও মুদ্রা তৈরির জন্যে বাটা বা কমিশন জগতশেঠের গদির আরেক ধরণের বড় রোজগার ছিল। লুক স্ক্রাফটনের ১৭৫৭-র হিসেবে জগতশেঠ বছরে ৫০ লক্ষ টাকার মুদ্রা ছাপানোর বিনিময় বাটায় রোজগার করতেন ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা (Luke Scrafton to Clive, Orme Mss., India, XVIII, f. 5043, 17 Dec. 1757)।
বাংলার বাজারে আসা বিভিন্ন বিদেশি মুদ্রা এবং উপমহাদেশের নানান এলাকার নানান রকমের মুদ্রার (সেগুলোকে বাংলার মুদ্রায় পরিবর্তন করিয়ে দেওয়ার জন্য নেওয়া) বাটা থেকে বিপুল সম্পপদ উপার্জন করত জগতশেঠের মহাজনী গদি। এই কম্মটা শুধু বাংলায় নয়, উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তেও ঘটত। নবাবদের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলা সুবার আমিলেরা জমিদারদের বকেয়া রাজস্ব আর অন্যান্য শুল্ক সরকারি দাবি হিসেবে আদায় করতেন। সে বিপুল অর্থ নবাবের সিন্দুকে যাওয়ার আগে জমা হত মুর্শিদাবাদের জগতশেঠের গদিতে। তাছাড়া দেনাদারদের জামিন থাকতে শুরু করেন জগতশেঠেরা।
শেঠেরা ইওরোপিয় কোম্পানিগুলিকে যে ধার দিতেন সেগুলির বার্ষিক সুদ ছিল ১২%। ১৭৪০ সালের ১১ ডিসেম্বর কলকাতা কাউন্সিল কাশিমবাজার কাউন্সিলকে জানাল শেঠেরা কোম্পানির সনির্বন্ধ অনুরোধ মান্য করে বার্ষিক সুদের হার ১২ থেকে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে রাজি হয়েছেন (BPC, vol. 14, ff. 317-17vo, 11 Dec. 1740)। এরই প্রতিক্রিয়ায় সেই দিনই কলকাতা কাউন্সিল জগতশেঠ ফতেহচাঁদকে চিঠি লিখে সুদের হার কমানোর অনুরোধ জানাল। ১০ দিন পরে কাশিমবাজার কাউন্সিল নতুন ৯ শতাংশ হারে ৬০ হাজার টাকা জগতশেঠের মহাজনী গদি থেকে ধার করে (Ibid., vol. 14, f. 337, 26 Dec. 1740)। ১৭৪২ সালে এক দিনে কোম্পানি ধার করে ২ লক্ষ টাকা নতুন হারে কলকাতা গদি থেকে (Ibid., vol. 15, f. 84vo, 29 March I 742)। ডাচ আর ফরাসীরাও হাত খুলে জগতশেঠেদের থেকে ধার করেছে। জগতশেঠের একতরফা সুদের হার কমানোর দৃষ্টান্ত তাদের বাংলা পুঁজির বাজারের ওপর সামগ্রিক একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের ছবি তুলে ধরে।
অষ্টাদশ শতকের চারের দশক থেকে কার্যত বাংলার পুঁজির বাজারে একচেটিয়া ব্যবস্থা কায়েম করে জগতশেঠেদের গদি। বাংলার অন্য স্রফ, মহজন, ব্যাঙ্কার একাগ্র নজরে তাকিয়ে থাকত জগতশেঠেদের গদি পুঁজির বাজার নানান চলক বিষয়ে কী তৈরি করে সেই দিকে। ১৭৪২ সালের ৭ জুন মারাঠা আক্রমনের ধাক্কায় জগতশেঠ মুর্শিদাবাদ ছেড়ে চলে যাওয়ার খবরে মুর্শিদাবাদ কাউন্সিল লিখল, জগতশেঠ যতদিন না শহরে ফিরে থিতু হচ্ছেন, একজনও ব্যবসায়ী নিজেদের নিরাপদ ভাবছেন না no merchant or shroff of any consequence will think themselves safe in the city till Juggutseat comes to reside there। নবাব জগতশেঠকে শহরে ফিরে আসতে বললেন। কেননা তিনি জানেন শহরে শেঠ পরিবারের উপস্থিতি শুধু নবাবই নয় ব্যবসায়ীদের মনোবল বাড়ানোর জন্যে আবশ্যক ছিল; তার গদির কাজকর্ম অন্যদের জন্য পালনীয় গাইড হিসেবে গণ্য হত his presence being as necessary to the Nabob as to the merchants… his conduct being the general guide to all of them (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 6, 7 June 1742; BPC, vol. I 5, f. 188, 10 June 1742)। ১৪ জুনে জগতশেঠের পরিজনদের মুর্শিদাবাদে ফিরে আসার সংবাদ ছড়িয়ে যেতেই একে একে শহরের বাকি গুরুত্বপূর্ণ স্রফ, ব্যবসায়ী, ব্যাঙ্কার, মহাজনকেও বাসস্থানে দেখা সেতে শুরু করল (Ibid., ‘vol. 6, 14 June 1942; BPC, vol. 15, f. 194vo, 21 June 1742)। ১৭৪৩ সালে নতুন করে মারাঠা হ্যাঙ্গামে ফতেহচাঁদ মুর্শিদাবাদ ছাড়লে, ৬ জুন কাশিমবাজার ফ্যাক্টরেরা কলকাতাকে লিখল, ফতেহচাঁদ শহর ছাড়ায় আতঙ্ক এমন ছড়িয়ে গেছে যে শহরে এখন ধার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে It is wholly impracticable to raise money there for never was known so great a scarcity occasioned by the retreat of Futtichund(Ibid., vol. 6, 6 June 1743; BPC, vol. 16, f. 18lvo, IO June 1743)। ২ জুলাই তারা মন্তব্য করল Futtichund is returned and money is more plenty here (Ibid., vol. 6, 2 July 1743)।
অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে বাংলার নবাবি দরবারে জগতশেঠেরা গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জগতশেঠেদের গদি অষ্টাদশ শতকের শুরু থেকে প্রায় আধ শতক ধরে বাংলার নবাবি দরবারকে যেভাবে বিপুল প্রভাবে প্রভাবিত করেছে সেটা বাংলার আর্থিক প্রশাসনিক ইতিহাসে প্রায় অশ্রুতপুর্বই বলা যায়। মাণিকচাঁদের আমল থেকে শেঠেদের প্রভাব প্রতিটা রাজনৈতিক বিপ্লবে নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। দিল্লির দরবারে উজিরদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলতেন [was of chief importance in deciding the result of every dynastic revolution, and they were always in constant communication with the ministers of the Delhi Court (W.W. Hunter, A Statistical Account of Bengal, vol. IX, p. 254)]। দিল্লির মুঘল দরবারে শেঠেদের প্রভাবের একটা নিদর্শন পাই অসম্ভব দ্রুততায় বাংলা নবাবের জন্য নবাবী ফরমান বার করে দেওয়া থেকে। তিনি মুর্শিদুকুলির নাতি, সরফরাজের সিংহাসন দখল কাণ্ডে শাহী ফরমান আনানোর জন্য প্রভাব না খাটালেও, মুর্শিদকুলির স্থলাভিষিক্ত সুজাউদ্দিনের পক্ষে দাঁড়ান এবং দিল্লি থেকে দ্রুত রাজ্যাভিষেকের ফরমান আনিয়ে দেন। ফলে মুর্শিদকুলির তুলনায় সুজাউদ্দিন ফতেহচাঁদকে অনেক বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। ১৭৩০ সালে কাশিমবাজার কাউন্সিল দরবারে অন্য দুই গুরুত্বপূর্ণতম ব্যক্তিত্ব হাজি আহমেদ এবং আমলচাঁদএর মার্ফত প্রভাব খাটিয়ে ব্রিটিশদের (আর্কট) মুদ্রার মাধ্যমে বাংলায় ব্যবসা করা অনুমতি চাইলে দেখল নবাব ফতেহচাঁদের প্রতি অম্ভব শ্রদ্ধাশীল। ফতেহচাঁদের নাম নবাব এত শ্রদ্ধায় উচ্চারণ করছেন যে তাঁর সামনে শেঠেদের স্বার্থবিরোধী কথা বলা সুযোগই নেই, তিনি আমাদের বললেন, তাঁর সঙ্গে আলাপ করে আমাদের সমস্যাগুলো যতটা পারা যায় দ্রুত সমাধান করতে [answered the Nawab has such a regard for Futtichtmd, it was out of their power to serve us in opposition to him and continue to advise us to make up the affair with him as well as we can (BPC, vol. 8, f. 26,0 , 13 July 1730)]। হাজি আহমদ ১৭৩০ সালে কাশিমবাজার কুঠিয়ালদের জানিয়েছিলেন, শেঠেদের বাড়িই ছিল নবাবেরে তোষাখানা। নবাব শেঠকে খুশি দেখতে চাইতেন, Futtichund’s Estate was esteemed as the King’s treasure and the Nabob was resolved to see him satisfied (Ibid., vol. 8, f.234vo, 2 June 1730)। ১৭৪০-এর বিদ্রোহে আলিবর্দিকে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনায় ফতেহচাঁদ ছিলেন অন্যতম প্রধান চক্রী। সেদিন এবং আজও সক্কলে জানেন যে সিরাজউদ্দোউলার পতনের চক্রান্তে মুর্শিদাবাদের শেঠেদের বড় ভূমিকা কম ছিল না। কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল লিখছেন, তার পরিবার [জগতশেঠ] আলবর্দির সমস্ত কাজ করে দিত। তিনিই বাংলার সমস্ত বিপ্লবের উৎস (It is this family [Jagat Seth] who conducted all his [Alivardi’s] business and it may be said that it had long been the chief cause of all the revolutiohs in Bengal (S.C. Hill, Three Frenchmen in Bengal, p. 77))।

জগতশেঠেদের সম্পত্তির পরিমান নিয়ে মন্তব্য করা খুবই সমস্যার। সায়ের মুতক্ষরিণেরে লেখক গুলাম হুসেইন লিখছেন, তাদের সম্পদের কথা বলতে গেলে অতিরঞ্জিত করেই বলতে হত, যেন কল্প কাহিনী (Their wealth was such that there is no mentioning it without seeming to exaggerate and to deal in extravagant fables (Seir, vol. II, p. 458)। এক বাঙালি কবি লিখছেন, গঙ্গা সমুদ্রে যেমন বিপুল জলরাশি অর্পণ করে, ঠিক সেই মত করে শেঠেদের সিন্দুকে সম্পদ জমা হয় (Little, Jagatseth, p.3)। অষ্টাদশ শতকের ষাট দশকের প্রথমার্ধে উইলিয়াম বোল্ট হিসেব কষছেন, তাদের দেশের মানুষের ধারণা শেঠেদের পুঁজি হবে সাত কোটির মত (Bolts, Considertaions, p. 158)। নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহ মনে করেন, শেঠেদের সব থেকে উতকর্ষের দিনে সর্বোচ্চ পুঁজি ছিল ১৪ কোটি টাকা (Little, Jagatseth, p. XVII)। ৫.১ তালিকায় লুক স্ক্রাফটনের জগতশেঠেদের বাৎসরিক আয়ের একটা হিসেব দিয়েছি(Luke Scrafton to Col. Clive, 17 Dec … 1757, Orme Mss., India, XVlll, f. 5043; Eur. G23, BQx 37)। (চলবে)