সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
পঞ্চম অধ্যায়
ব্যবসায়ী শাসক সম্বন্ধ
আমরা এর আগে বলেছি বাংলার সওদাগরী বিশ্বে ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ ব্যবসায়ীদের যেমন অস্তিত্ব ছিল তেমনই বিভিন্ন জাত, বিভিন্ন অঞ্চলের নানান শ্রেণীরও ব্যবসায়ীর অস্তিত্ব ছিল যাদের আন্তর্জাতিকস্তরে ছড়ানো ব্যবসা জাল ছাড়াও দেশিয় গঞ্জ এবং অন্য ব্যবসায়িক অঞ্চলগুলোয় ব্যবসা যোগাযোগ ছিল। ১৭৩০ সালে অস্টেন্ড কোম্পানিতে বিনিয়োগ এবং পণ্য সরবরাহ করা বাংলার ২৪ ব্যবসায়ী সমাজকে ডাচ কুঠিয়াল আলেকজান্ডার হিউম কয়েকটা ভাগে ভাগ করেন (আলেকজান্ডার হিউমের মেমোরি, Memorie’, Stadsarchief Antwerp, GIC 5769)। সমীক্ষায় তিনি উল্লেখ করেছেন ২১ জন হিন্দু, ৩ জন মুসলমান ১ জন আর্মেনিয় ব্যবসায়ীর কথা। হিন্দু ব্যবসায়ীরা নানান জাতিতে বিভক্ত ছিলেন। তাদের উপাধি উল্লেখ করেছেন সেন, দত্ত, মজুমদার, খান, নন্দী, মল্লিক। নন্দী আর মল্লিককে তিনি আলাদা করে তাঁতি সমাজ থেকে আসা ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ব্যবসায়ীদের মধ্যে আর্মেনিয় খাজা ‘Mahmet’ ফজল বা গুজরাটি মণিকচাঁদ খুবই বড় রকমের ব্যবসা করত। মহম্মদ বকর বা রামজীবন সেনের মত কয়েকজন ছোট মধ্যস্থ মূলত আড়ংএ নির্দিষ্ট বন্দোবস্তের বিনিময়ে কাজ করত, কোম্পানির থেকে দাদনের অগ্রিম নিয়ে বিভিন্ন আড়ংএ থাকা তাদের গোমস্তাদের কাজের বরাত দিত। হিউমের সমীক্ষা সূত্রে আন্দাজ করতে পারি মুর্শিদাবাদের বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নবাবের প্রশাসনের বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কথা। তিনি সোজাসাপটাভাবে লিখছেন মুসলমান সরকারের ওপর খাজা ফজলের প্রভাব ছিল লক্ষ্যণীয় great influence over the Moors government। বিভিন্ন ক্ষমতাধারীর পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদেরকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ আসত। যেমন বলরাম নন্দীকে হিউমের কাছে পাঠান ফতেহচাঁদের গোমস্তা বৈজনাথ।
হিউম আবার দরবারি আমলা বা দরবারের সঙ্গে জুড়ে থাকা ব্যক্তিদের সুপারিশের দালাল নিয়োগ করা থেকে সাবধান করেছেন কোম্পানি কর্মচারীদের। তাঁর যুক্তি তাদের রাজনৈতিক আনুগত্যের জন্যে, ব্যবসায়ীদের থেকে পড়ে থাকা বকেয়া আদায় করা মুশকিল হয়। সাধারণভাবে বাংলার ব্যবসা সমাজে যে কোন ধরণের সুপারিশ করার সাধারণ প্রথা ছিল, সুপারশকারীর কাছে দায়বদ্ধ থাকা (whoever recommends a man to any business is answerable for him)। তিনি বলছেন ব্যবসায়ীরা মূলত নিজেদের পুঁজি বিনিয়োগ করে ব্যবসা করত। যদিও ব্যবসায়ীদের অনেকেই পুঁজির বাজার থেকে আর কেউ শাসকদের কাছাকাছি থাকা মানুষদের থেকে টাকা ধার করে ব্যবসা চালিয়েছে। ব্যবসায়ীরা প্রায় সব ধরণের পণ্য নিয়েই ব্যবসা করত। তবে হিউমের সমীক্ষা বলছে, কিছু কিছু ব্যবসায়ী বিশেষ বিশেষ পণ্য নিয়ে ব্যবসার দক্ষতা অর্জন করেছে। যেমন মাণিকচাঁদের মত গুজরাটি ব্যবসায়ী সাধারণত মুদ্রা পরিবর্তন, গয়না, সোনা রূপো, আফিম এবং অন্যান্য পাটনাজাত পণ্য নিয়ে ব্যবসা করত কিন্তু পিস-গুড তাদের ব্যবসা আওতার এক্তিয়ারে ছিল না। তাঁর এই তথ্যের সঙ্গে পরবর্তীকালের আরেকটি তথ্য মিলে যাচ্ছে; যে সব ব্যবসায়ী সিল্ক-পিস পণ্যের ব্যবসায় বিশেষজ্ঞ হয়েছিল (উদাহরণস্বরূপ এর আগে আমরা দেখেছি, ১৭৪৪ সালে কাশিমবাজার ফ্যাক্টরেরা জানিয়েছিলেন যে মুর্শিদাবাদের মাত্র ৩ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী কোম্পানিকে শুধুই তাফেতা দেয় এবং the other merchants do not care to meddle in) তাদের মধ্যে কয়েকজন গুরা সরবরাহ করত; এমন কি রেশম ব্যবসাতে থেকেও মাত্র কয়েকজন রংপুর রেশম নিয়ে ব্যবসা করত, কিন্তু গুজরাট বা কুমারখালি রেশম নিয়ে প্রায় সব ব্যবসায়ীই ব্যবসা করত।
বাংলার ব্যবসায়ীদের সাধারণ প্রথা ছিল যে তারা নিজেদের নামে ব্যবসা করার পাশাপাশি আত্মীয়দের নামে, ছেলেমেয়েদের নামে, এমন কী নাবালকেদের নামেও ব্যবসা করতেন। নাম ভাঁড়ানোর কাজটা অনেক সময় মালিকের কাছে নিজেদের পরিচয় লুকোতে, এবং রাজনৈতিক বিপক্ষকে কিছুটা হলেও ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হত। ব্রিটিশ কোম্পানি আমলারা এক মধ্যস্থের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গিয়ে ১৭৩১ সালে দেখে বিষ্ণুদাস শেঠ এবং তার অংশিদার উমিচাঁদ কোম্পানির বরাত দেওয়া দাদনি পণ্য যেমন নিজেদের নামেও সরবরাহ করেছে তেমনি তাদের সন্তানদের নামে আর কিছু পরিমান অজানা সরবরাহকার নামেও সরবরাহ করেছে (BPC, vql. 8, ff. 424-424vo, 26 July 1731.)। এই ধরণের প্রথা যে খুব ব্যতিক্রমী ছিল বলা যাবে না। ১৭৬০ সালের প্রথমের দিকের একটি ডাচ সমীক্ষায় ব্যবসায়ীদের এই ধরণের রণনীতি অবলম্বন করার উল্লেখ পাচ্ছি স্পষ্ট। ডাচেদের ঢাকা কুঠি সন্তোষ রায় নামে এক বণিককে দাদন দেয়, যার আসল নাম ছিল রঘুনাথ মিত্র। তিনি ডাচেদের বস্ত্র সরবরাহ করতেন। ১৭৬২ সালে তিনি ডাচ কোম্পানির জন্যে বস্ত্র জোগাড় করেন তার পুত্র আনন্দময় মিত্রের নামে (Louis Taillefert’s ‘Memorie’, HR 246, ff. 93-95, 17 Nov. 1763)। এছাড়া যেসব ব্যবসায়ী সময়মত কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির নানান তফশিল পূর্ণ করতে পারছে না, তাদের পাশে অপর ব্যবসায়ীরা দাঁড়াতেন। ১৭৫০ সালে উমিচাঁদ নিজের বরাদ্দ বাদে কোম্পানিকে আরও ৩০ হাজার টাকার বস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী এই ৩০ হাজার টাকার কাপড় পিতাম্বর শেঠ, গঙ্গাবিষ্ণু মেন্দ্রু (?) এবং অন্য শেঠেদের সরবরাহ করার কথা ছিল (BPC, vol. 23, f. 185vo, l July 1750)।
আরেকটা বিতর্কিত বিষয় হল পলাশীপূর্ব সময়ে ব্যবসা পতন। এই বিষয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। ১৭৫০এর প্রথমের দিকে কোম্পানি যখন দাদনি থেকে গোমস্তা প্রথায় চলে গেল, সেই ব্যবসায়িক রণনীতির কারণ ব্যখ্যা করতে গিয়ে বহু গবেষক মন্তব্য করেছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলার ব্যবসা আর ব্যবসায়ীদের সার্বিক পতনের পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল বলেই ব্রিটিশ কোম্পানি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু আমরা স্পষ্ট আলোচনায় দেখিয়েছি, পলাশীপূর্ব বাংলায় ব্যবসা বা ব্যবসায়ীদের সার্বিক দুর্দশার পরিবেশ তৈরি হয় নি। কোম্পানির পুঁজি বিনিয়োগের ব্যবস্থা মাধ্যম বদলের কারণ ভিন্ন, তার সঙ্গে সাধারণ বাংলা বাজারের ব্যবসায়ীদের ব্যবসার পরিমানের সার্বিক পতনের যোগ নেই। কলকাতার প্রখ্যাত দুই ব্যবসায়ী পরিবার শেঠ আর বসাক বা মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজারের কাটমা পরিবার পঞ্চাশের দশকেও তাদের ব্যবসায় মাহির ছিলেন। বড় ব্যবসায়ী যেমন জগতশেঠ, উমিচাঁদ বা খাজা ওয়াজিদ এই সময়ে ব্যবসায়িক সম্ভাবনার শীর্ষে উঠেছিলেন। যতদিন এই বড় ব্যবসায়িরা সচল ছিল ততদিন বাংলার ধারের বা পুঁজির বাজার তেজি ছিল। বাংলা বাজারে পুঁজি পাওয়া সমস্যার ছিল না। এই তত্ত্ব সত্য ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও। কোম্পানির ব্যবস্থা বদলের আসল কারন হল ১৭৫৩ সালে দাদনি ব্যবসায়ীরা কোম্পানিকে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত দেয়। কোম্পানি সে সব শর্ত মানতে অস্বীকার করলে ব্যবসায়ীরা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি নবীকরণ করতে অস্বীকার করে। সেই টালমাটাল সময়ে ব্যবসায়ীরা নিজেদের বিনিয়োগ নিয়ে চিন্তিত ছিলই। কোম্পানির সিদ্ধান্ত ছিল তারা মোট চুক্তি অঙ্কের ৩০ শতাংশের বেশি দাদনি অগ্রিম দেবে না, যদিও আগে এই অগ্রিমের অঙ্ক ছিল ৮৫ শতাংশ। ব্যবসায়ীরা এই শর্ত মানতে রাজি হয় না। এছাড়াও ব্যবসায়ীদের পক্ষে যে কোন ধরণের পণ্য সরবরাহের ঘাটতির জন্যে ১০% জরিমানা ধার্য করার শর্তও চাপানো হয় (Ibid., vol. 26, f. 164, Annex. to Consult. 7 June t,753)। এই সব শর্ত ব্যবসায়ীদের কাছে অযৌক্তিক এবং অন্যায্য মনে হয়েছিল। এছাড়াও কোম্পানির আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা পঞ্চাশের দশক থেকে দ্রুতগতিতে কমছিল। কোম্পানির আমলাদের নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবসার রমরমা রক্ষার উদ্দেশ্যে তারা দাদনি থেকে গোমস্তা ব্যবস্থায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
আমরা যেন মাথায় রাখি বাংলার কোনও ব্যবসায়ীই ইওরোপিয় কোম্পানির মাইনে করা কর্মচারী ছিলেন না। অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে বাংলায় বাস করা এশিয় ব্যবসায়ীরা পা মাটিতে গেঁথে, তাদের ওপর ইওরোপি কোম্পানিগুলি এবং ব্যক্তি ইওরোপিয়র এক তরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা সফলভাবে প্রতিরোধ করেছিলেন (সপ্তদশ শতকের শেষে এবং অষ্টদশ শতকের শুরুর সময়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাঙ্গালি ব্যবসায়ীর বর্ণনা দেখুন S Chaudhuri, Trade and Commercial Organization, pp. 62-85; I. Ray, ‘The French Company and the Merchants·of Bengal’, IESHll, VIII (1971), PP. 46-48)। অংশিদারি এবং পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতা এশিয় ব্যবসায়ীদের ব্যবসার খুব গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক ছিল। পরের দিকে উপনিবেশের সময়েও এই আঙ্গিকেও ব্যবসা চালিয়েছেন। এ বিষয়ে ঐতিহাসিকেরা সর্বভারতীয়স্তরের উদাহরণ দিয়েছেন, কেস স্টাডি উপস্থাপন করেছেন Partnership or interdependence as distinct from a later period of subjugation was the keynote of the relationship between Asian merchants and European traders. This only confirms the views— held by historians from case studies of, different parts of India (P.J Marshall, East Indian Fortunes, pp. 44-48; S. Arasaratnam, ‘Trade and Political Dominion in South India, 1750-1790: Changing British Indian Relationships’, MAS, vot. 13, pt I, Feb. 1979, pp. 21-22; Holden Furber, Rival Empires, pp. 315-16)। অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদজুড়ে এশিয় ব্যবসায়ীরা তাদের পরম্পরার ব্যবসার ব্যবস্থাপনার কাঠামো বজায় রেখেছেন সফলভাবে, বাইরের সমস্ত চাপ প্রতিরোধ করেই। নতুন ব্যবসায়িক পরিবেশে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির বর্ধিত চাহিদার দিকে নজর রেখে এশিয় বণিকদের নতুন কোনও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হয়নি। বাংলা ভিত্তিক ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়িক খিদে কোনও ভাবেই ইওরোপিয় ব্যবসায়ীদের তুলনায় কম ছিল না।
এই ব্যবসায়ীদের ব্যবসাকর্ম এবং ব্যবসা পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে পাচ্ছি, ক্রেতা আর বিক্রেতারা একে অপরকে টপকে বাজারের এক্লুসিভ তথ্য পাওয়ার প্রতিযোগিতা চালিয়েছে [এখানে ক্রেতা অর্থে পাইকারি ক্রেতা অর্থাৎ ইওরোপিয় কোম্পানি আর বিক্রেতা অর্থে পাইকারি বিক্রেতা অর্থাৎ বাংলার দালাল আর সওদাগরেরা — অনুবাদক]। এর একটা বড় কারন ছিল দেশিয় ব্যবসায়ীদের ব্যবসা একচেটিয়াকরণের প্রবণতাকে ইয়োরোপীয় কোম্পানিরা ভাঙতে পারার ব্যর্থতা। বাংলা বাজারে এক নির্দিষ্ট ধরণের ইন্টারেস্টের ব্যবসায়ীরা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে ব্যবসা করত না, মূলত ব্যবসা হয়েছে ব্যক্তিগত স্তরেই। ব্যবসায়ীরা মূলত ব্যক্তিহিসেবে, পারিবারিক সদস্য হিসেবে খুব বেশি হলে ব্যবসার সাময়িক প্রয়োজনে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে ব্যবসা করেছে কিন্তু কোম্পানির সঙ্গে নৈর্ব্যক্তিক সহযোগিতা করে ব্যবসা চালিয়েছে। ইওরোপে যে ধরণের গোষ্ঠীবদ্ধতার ঢেউ উঠেছিল, সেটা বাংলায় আসে নি বললেই চলে। এমন কী ব্যক্তিস্তরে সহযোগও খুব সাধারণ ঘটনা/প্রক্রিয়া ছিল না। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে ব্যবসা চলত ব্যক্তির উদ্যমে বা খুব বেশি হলে কয়েকজন একজোট হয়ে (Men tended to act as individual merchants, as members of families, at most one in a group thrown together in the course of business impersonal cooperation in the institution of business, as had already been developed in Europe by this time, was relatively uncommon. Even cooperation at a personal level was not easy to come by. As in other parts of lndia, a commercial venture was mainly the risk of an individual merchant or a very small group of merchants taking part in it)। (চলবে)