সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
ষষ্ঠ অধ্যায়
বাংলার বস্ত্রশিল্পের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট
বাংলার বস্ত্র শিল্পের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমী চরিত্র ছিল তার স্থানিকতা (localization)। শুধু ওর্মেই নয় স্তাভার্নিয়ের মত বৈদেশিক মুসাফিররাও বলেছেন বিভিন্ন বিভিন্ন জেলায় আলাদা আলাদা ধরণের কাপড় উৎপাদনের কথা (Orme, Historical Fragments, p. 413; Stavorinus, Voyages, p. 474)। প্রত্যেক বস্ত্র উৎপাদন এলাকা তার অঞ্চলে তৈরি বস্ত্রে এলাকার অনন্য শৈল্পিক ছাপ এঁকে দিতেছিল এমনভাবে যে ১৭৫২ সালে কলকাতা কাউন্সিল বিভিন্ন আড়ং থেকে যে সব পিস-গুড জোগাড় করেছে, সে সব একটা কাপড় মিলিয়ে মিশিয়ে একটি গাঁটরিতে (বেল) বাঁধা ঠিক হবে না বলে কর্তাদের জানায়। তাদের যুক্তি প্রত্যেক আড়ংএর কাপড়ের গুণমান আলাদা আলাদা প্রকারের fabric of every aurung had its peculiar qualities তাই প্রত্যেক আড়ং-এর কাপড় আলাদা আলাদা গাঁটরিতে যাওয়া উচিত (BPC, vol. 25, f. 299, 17 Nov. 1752)। স্থানিকতা আর কারিগরদের নির্দিষ্ট এক অবচলে কন্সেন্ট্রেশনের অন্যতম কারন ছিল প্রয়োজনীয় উতপাদনের উপকরনের সেই এলাকায় পাওয়া যাওয়া এবং বংশ পরম্পরায় কারিগরদের অর্জিত দক্ষতার প্রয়োগ করা the cumulative effect created by a hereditary concentration of craft skills। মনে হয় যে এইসব উৎপাদন কেন্দ্রর অবস্থান পরিবহনের খরচ নিরপেক্ষ হওয়া অথবা অন্যান্য ব্যবসায়িক কারনে শুধুই মিহি কাপড়ের উতপাদন ক্ষেত্রগুলো স্থানিকতার চরিত্র অর্জন করে নি, এর সঙ্গে মোটা আর মাঝারিগুণমানের ক্যালিকো কাপড় উৎপাদন অঞ্চলও স্থানিক চরিত্র অর্জন করেছিল। এই জন্যে মসলিনের মূল উৎপাদন কেন্দ্র ছিল ঢাকা, রেশম সুতি আর কাপড় উৎপাদন হত মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজারে। বীরভূম ছিল গুরার মত সাধারণ কাপড় উৎপাদন কেন্দ্র, এটা বন্দরের কাছেও নয় দূরেও ছিল নয়; মালদা বন্দরের অনেক দূরে থেকেও মিহি এবং মোটা উভয় ধরণের বস্ত্র তৈরি করত। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রয়োজনীয় এবং কাঙ্ক্ষিত কাঁচামালের সহজলভ্যতার জন্যেই বাংলার বস্ত্র শিল্পের স্থানিকতার বিকাশ ঘটেছিল। প্রখ্যাততম, সব থেকে মিহি মসলিন তৈরি হত ঢাকায় কারণ সেখানে সব থেকে ভাল ফুটি তুলো চাষ হত। একইভাবে কাশিমবাজার এলাকায় রেশমের একচেটিয়া উৎপাদন হওয়ার কারণ এর আশেপাশের রেশম উৎপাদন হত।
বাংলার বস্ত্র শিল্পের সঙ্গে স্থানিকতা এবং একইসঙ্গে বিশেষীকরণ (spetialization) এতই লেপ্টেলুপ্টে গিয়েছিল যে, বাংলার প্রখ্যাততম আড়ংএর নাম তার নির্দিষ্ট এবং বিশেষ উৎপাদনের নামেই রাখা হত। সে সময়ের তথ্যভাণ্ডার থেকে দুটো উদাহরণ তুলে এনে আমরা আমাদের বক্তব্যের প্রমান দেব। মারাঠা হ্যঙ্গামের সময় ১৭৪১ সালে কাশিমবাজার কাউন্সিল লিখছে মারাঠা বর্গীরা চলে যাওয়ার আগে তাফাতি আড়ঙের সব পণ্য পুড়িয়ে দেয় (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 6, 26 May 1742)। বর্ধমান আর বীরভূমের গুরা উৎপাদন কেন্দ্রগুলি কোম্পানিগুলোর খাতায় গুরা আড়ং নামে পরিচিত ছিল। ১৭৪২ সালে কাশিমবাজারেরে ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা লিখছে তাদের পক্ষে গুরা জোগাড় করা সমস্যার হয়ে যাচ্ছে তার সে সব গুরা আড়ংএর সঙ্গে জুড়ে থাকা তাদের চার পাঁচজন ব্যবসায়ীর গোমস্তা ছিল না (Ibid.,. 3 April 1742)। এধরণের হাজারো উদাহরণ/সূত্র পাওয়া যাবে কোম্পানির খাতায়। সেই খাতা সূত্রে আমরা প্রমান করতে পারি আড়ংগুলির স্থানিকতার বিষোয়টি[এবং বিশেষীকরণটিও। স্থানীয় উতপাদন কেন্দ্র আড়ং নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে উৎপাদন এবং উৎপাদন কেন্দ্রের স্থানীয়তার অনুষঙ্গটি।
আরও কয়েকটা চলক কাপড় উৎপাদন ব্যবস্থার স্থানীয়তার বিকাশে সহায়ক হয়েছিল। ১৭৩২ সালে লন্ডনের কোর্ট অব ডিরেক্টরদের লিখে ফোর্ট উইলিয়ম কাউন্সিল জানাচ্ছে, শহুরে কুঠিতে গুরা তৈরি করা খুব কঠিন কাজ এবং সেটা যদি করতে হয়, তাহলে প্রত্যেকটার দাম দ্বিগুণ হবে, নির্দিষ্ট গুরা আড়ংএ এক ধরণের তুলো তৈরি হয় যা দিয়ে শস্তাতম গুরা তৈরি হয় every piece [of garras] would be double the price, it is at the particular aurungs where the cotton grows and rice much cheaper’ that garras were made (C&B. Abst., vol. 3, f. 180, 25 Feb. 1732)। তবে মনে করার কারন নেই বাংলার সব কটা সুতির কাপড় তৈরি করা আড়ং নিজেদের এলাকার সুতো থেকে কাপড় উৎপাদন করত। জন টেলর আমাদের জানাচ্ছেন, অধিকাংশ বিখ্যাত কাপড় তৈরি করা আড়ং এলাকায় খুব কম পরিমানে তুলো উরপাদন হত বা চাষই হত না, grew little or no cotton। সেই সব এলাকা বাইরের জেলা, প্রদেশ এমন কি দেশের বাইরে থেকে তুলো আনিয়ে কাপড় উৎপাদন করত (Home.,Misc., vol. 456F, f.117)। এই ধরণের আড়ংএর সব থেকে বড় উদাহরণ হল বর্ধমান আর বীরভূম। বীরভূমের আড়ংগুলোয় বছরে ১ লক্ষ মণ তুলো লাগত, কিন্তু সে বছরে মাত্র ৮০ মণের বেশি উৎপাদন করত না বর্ধমান প্রায় ৫০ হাজার মন তুলো তার উৎপাদন এলাকার বাইরে থেকে আমদানি করতে হত (N.K. Sinha, Economic History of Bengal, vol. 1, p. 104)। গুরা আর দোসুতির মত মোটা সুতোয় তৈরি কাপড় এই দুই জেলা উৎপাদন করত মূলত সুরাট তুলো দিয়ে। এবং সুরাট থেকে আমদানি করা সুতোর দামের হেরফের হলেই উতপাদিত বস্ত্রের দাম পরিবর্তিত হত (Beng. Letters Recd., vol. 23, ff. 51, 60; FWIHC, vol. I, pp. 917-18, 923)। ফলে আমরা স্থানিকতার যে দুটি বিষয় আলোচনা করলাম, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং বংশপরম্পরার দক্ষতা আর জ্ঞান এর সঙ্গে অবশ্যই জুড়তে হবে চাল, সুতো, রেশমের মত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলির চরমতম বৈচিত্রের স্থানিকতা — অর্থাৎ নির্দিষ্ট পণ্য নির্দিষ্ট এলাকায় পাওয়া যাওয়ার নিশ্চিন্ততা। যার ফলে বাংলাজোড়া বস্ত্র শিল্পে স্থানিকতার বিকাশ ঘটেছিল স্বচ্ছন্দে।
আমরা এই আলোচনায় যে সময়টি নিয়ে আলোচনা করছি, সেই অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদজুড়ে বাংলার বস্ত্র শিল্প ব্যাপক বৈচিত্রের বিশেষীকরণ করতে পেরেছিল শুধু আড়ংএর আলাদা আলাদা পণ্য চরিত্র তৈরি দক্ষতাতেই নয়, আড়ংএর কাপড়ের উৎপাদন বৈচিত্র্যেও। সাধারণভাবে প্রত্যেক আড়ং-এ যেমন বিশেষ চরিত্রের কাপড়ে উৎপাদন হত, তেমনি মাথায় রাখতে হবে শুধু আঞ্চলিক বৈচিত্রই নয়, যে সব আড়ং-এ একই কাপড় তৈরি করে তারাও আলাদা আলাদা বৈচিত্রের কাপড় তৈরি করত। একই নামের কাপড় তৈরি করা দুই আড়ংএর মধ্যে কাপড়ের গুণমানের মধ্যে যেমন পার্থক্য হত তেমনি সেগুলোর আকারেও আলাদা হত। প্রত্যেক আড়ং অন্য আড়ং-এর থেকে সচেতনভাবে একই কাপড় আলাদাভাবে তৈরি করত। এই আলাদাত্ব নির্ভর করত কাপড়ের সূক্ষ্মতা, এবং তাঁতি আর অন্যান্য কারিগরের দক্ষতার ওপর। বিভিন্ন জেলার আলাদা আলাদা আড়ং একই ধরণের বস্ত্র তৈরি করতে মাহির হয়, তাহলে সেই সব আড়ংকে শুধুই একটা কাপড়ের নাম দিয়ে চেনা যেত না, বরং তারা আরেকটাও নাম জুড়ত। তালিকা ৬.১-এ (১৫৪ পাতা) আমরা বক্তব্যের সমর্থনে উদাহরণ দিলাম। ১৭৪২ সালে ব্রিটিশদের কলকাতা কুঠির চাহিদা অনুযায়ী এই আড়ংএ দুই ধরণের প্রধান মসলিন খাসা আর মলমল উৎপাদন হত।

ঢাকা আড়ং বিশ্বখ্যাত ছিল বাংলার মিহিতম কাপড়, মসলিন উতপাদনের জন্যে, কিন্তু তার মধ্যে ভালতম মসলিন তৈরি হত জঙ্গলবাড়ি, বাজিতপুর এবং সোনারগাঁওতে। মিহি মসলিন কাপড়ের জমিতে সুতোর কাজ ছাড়া মসলিনের নাম মালবুস খাস (royal clothing) এই তিন আড়ংএ তৈরি হত মুঘল আমলজুড়ে। প্রত্যেক আড়ং তাদের কারিগরদের দক্ষতা প্রয়োগ করে কাপড়ে উতপাদনগুলোতে অনন্য বৈচিত্র এঁকে দিতে পারত — কাপড় দেখলেই তৈরি চোখ বুঝতে পারত সে কাপড়ের কোন আড়ংএ জন্ম। এই কাজ করতে কারিগরের চরমতম দক্ষতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল বছরের পর বছর বংশ পরম্পরায় কাজের জ্ঞান আর দক্ষতা অর্জনে। জঙ্গলবাড়ি আর বাজিতপুরের আড়ং-এর তাঁতিরা মসলিনের close texture তৈরি করতেন, সোনারগাঁওএর আড়ং-এর তাঁতিরা আবার দক্ষ ছিলেন thin and clear muslins তৈরিতে (Home Misc., 456 F, f.135)। শুধু তাঁতির বোনার দক্ষতাতেই এই বৈচিত্র তৈরি হয় না, এই বৈচিত্র তৈরি করতে হয় বিশদ পরিকল্পনা করে বোনার অনেক আগে সুতো কাটা, ধোয়া ইত্যাদি কাজ থেকেই। এই পরিকল্পনা নির্ভর বৈচিত্র্য তৈরি করার দক্ষতাতেই বিশ্ব জোড়া বিপুল বাজার তৈরি করতে পেরেছিল বাংলার বস্ত্র শিল্প। সব থেকে ভাল সুতো কাটা হত জঙ্গলবাড়ি আর বাজিতপুরে the fabrics of which arangs, from the great skill with which the thread is prepared, possess a peculiar softness (Ibid., f.129)। ড্যানিশ সমীক্ষা আমাদের জানাচ্ছে certain washermen in all weaving districts, whose washing can be imitated nowhere (Ole Feldbaeck, ‘Cloth Production in Bengal’, BPP, p. 132)। জন টেলর লিখছেন, জামদানি তৈরি করার একচেটিয়া দক্ষতা ছিল ঢাকার আড়ঙের তাঁতিদের। যে সব তাঁতি জামদানি তৈরি করত তাদের নাম ছিল জামদানি তাঁতি (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 12, 20 Dec. 1753; NAI, Home Misc., vol. 16, para. 61, ff. 183-84, Fort William Council to Court, 4 Feb 1751; f.250, para. 70, Fort William Council to Court, 28 August. 1751)। একইভাবে সিল্ক-পিস কাপড়, jamawars তৈরি করত বিশেষ এক দল তাঁতি তারা ঐ কাজেই দক্ষতা অর্জন করেছিল (K.N. Chaudhuri, Trading World, p.241)। (চলবে)