| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ফ্রম প্রস্পারিটি টু ডিক্লাইন — এইটিনথ সেঞ্চুরি বেঙ্গল : সুশীল চৌধুরী, (৪র্থ কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ২৬২ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৩

সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা

দুই.এক. প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক কাঠামো

অষ্টাদশ শতকের শুরুতে সুবার প্রশাসনের ওপর দিল্লির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আস্তে আস্তে ঢিলে হতে শুরু করায় স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্ক-ব্যবস্থাপনা নতুন প্রশাসনিক কাঠামোয় নতুনভাবে গড়ে উঠোতে থাকে। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র যেমন কেন্দ্র থেকে সুবায় যেমন সরে আসছিল, তেমনি সুবাতেও ক্ষমতার সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটছিল (ঐ রিসালা)। আগের জামানায় যে সব মুঘল মনসবদার, কেন্দ্রিয় দরবার থেকে বাংলা প্রদেশে আসার সুবাদে খানজাদা ক্ষমতাধর অভিজাত হিসেবে প্রশাসনে গুরুত্ব পাচ্ছিলেন, ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে সব খানজাদা সুবায় ক্ষমতাহীন হয়ে পড়লেন। তারা স্থানীয় ক্ষমতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে চাইলেন। যে সব আর্থিক-সামাজিক গোষ্ঠী এতদিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মাথা নামিয়ে ছিল তারা নতুন অবস্থায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। এই ধরণের গোষ্ঠীদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল মুর্শিদকুলির নব্য প্রশাসনিক সংস্কারে উদ্ভুত নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রে বসা ক্ষমতাধর বড় জমিদারেরা। রাষ্ট্রের রাজস্বের দাবি বাড়তে থাকলে, জমিদারদের ক্ষমতাও সেই অনুপাতে বাড়তে থাকে। বড় জমিদারদের ইতিহাস সূত্রে আমরা দখতে পাচ্ছি, মুর্শিদকুলি পরিকল্পনা করে তাঁর পক্ষে থাকা বড় জমিদারদের ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেন। নতুন ক্ষমতা গোষ্ঠীতে জমিদারেরা নতুন জোট হিসেবে আবির্ভূত হলেন। একইভাবে আগের সময়ের নিষ্প্রভ সওদাগর-ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, মুর্শিদকুলির নব্য প্রশাসনিক রাজস্ব সংস্কারে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ে বড় ভূমিকা পালন করলেন, তারাও নতুন ক্ষমতার গোষ্ঠীকেন্দ্রে গুরুত্ব পেলেন। অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে বাংলার রাজনীতিতে নতুন নতুন ক্ষমতা গোষ্ঠী তৈরি হল।

তবে এটাও মনে করা ঠিক হবে না নতুন তৈরি হওয়া ক্ষমতা গোষ্ঠীগুলো একদেহী হয়ে একক প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দরকষাকষির সুযোগ নিয়ে একদেহী গোষ্ঠীস্বার্থভূক্ত হয়ে উঠতে পারল। এরা বিভিন্ন দলের, বিভিন্ন ব্যক্তির, নানান পরস্পর বিরোধী ব্যক্তিস্বার্থ সম্পাদন করতে নিজামতের তলায় একজোট হল। বাংলার রাজনীতির নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনায় তাদের উদ্দেশ্য হল একদিকে নতুন নবাবের হাত শক্ত করা, অন্যদিকে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করা। নাজিম বা নবাব বা সুবাদার সুবায় নিজের হাত শক্ত করতে দিল্লি-বিচ্ছিন্ন মনসবদার, সওদাগর ব্যবসায়ী আর জমিদারদের তাঁর পাশে চাইলেন প্রশাসনিক কাঠামো সুষ্ঠুভাবে চালাতে, অর্থনৈতিক সম্পদ তৈরি করতে, প্রশাসনের নবাব বিরোধিতা নাশ করতে। মুর্শিদকুলি খাঁ দেখলেন এই স্বার্থগোষ্ঠীর ক্ষমতাশালী মানুষেরা তাঁকে প্রশাসনের প্রধান হিসেবে, তাদের উদ্ধারকর্তা হিসেবে দেখছেন। অষ্টাদশ শতকের প্রথমপাদ থেকে বেশ কিছু ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বাংলায় বিপুল রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হলে, মুর্শিদকুলি খাঁ এবং তার উত্তরাধিকারীরা এই গোষ্ঠী, দলগুলোর সেবা, আনুগত্য ব্যবহার করে রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করেছেন। বাংলার ক্ষমতাকেন্দ্রে একটা দীর্ঘ লম্বা চুড়োওয়ালা ত্রিভূজাকৃতি কাঠামো তৈরি হল। নবাব সেই চূড়োয় একাকী বসে রইলেন। শাসক জোটের সদস্যরা তার নিচে, ভূমিতলে সারবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থেকে নিরন্তর ব্যস্ত রইল ক্ষমতার মধু আহরণে।

নিজামতের পক্ষ থেকে বুঝেশুনেই হয়ত এই স্বার্থগোষ্ঠীদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার, তাদের ক্ষমতার অংশীদার করে নেওয়ার সচেতন চেষ্টা জারি ছিল না। মুর্শিদকুলির রাজস্ব তোলার প্রশাসনিক সংস্কার উদ্যমের ফলে বড় জমিদারদের উত্থান ঘটেছিল। সওদাগর-মহাজন শ্রেণীর উত্থান ঘটল প্রশাসনিক উথাল-পাথালের ফলে বাংলা নির্ভর করে ব্যবসাবাণিজ্যের যে বিপুল বিস্তার ঘটল, তাকে সামাল দিতে। কেন্দ্রিয় শক্তি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ায় মনসবদারেরা বাংলায় তুলনামূলকভাবে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে নতুন ক্ষমতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। নিজামতের সঙ্গে এই গোষ্ঠী সম্পর্কের বোঝাপড়াটা ব্যক্তিগত স্তরেই ঘটছিল (M. Mazibor Rahman, ‘Nizamat in Bengal’, unpublished M. Phil. thesis, JNU, 1988)।

এই গোষ্ঠীসমঝোতা রাষ্ট্রীয় দাবি মান্য করেও নতুন দিনগুলির আহ্বানে নতুন দুঃসাহসী সময়ের উন্মেষ ঘটাতে থাকে। একই সময়ে নব্য রাজনৈতিক অবস্থাকে মান্যতা দিয়ে, নতুন ব্যবস্থায় লাভবান হওয়া গোষ্ঠীদের সম্পূর্ণ সহায়তা, সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয় নতুন রাষ্ট্র। এই সময়ের গোষ্ঠীবন্ধনের ব্যক্তিস্বার্থিক লাভ করার সব থেকে বড় উদাহরণ হল জগতশেঠের গদির বাড়বাড়ন্ত। সাধারণ সুদি ব্যবসায়ী হিসেবে জীবন শুরু করে নিজামতের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করে, নবাব-নাজিমের অক্ষয় হাত মাথায় নিয়ে জগতশেঠ পরিবার হয়ে উঠল নতুন রাষ্ট্রের প্রধান বেনিফিসিয়ারি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দিল্লি-বাংলা যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে মুর্শিদাবাদকে কেন্দ্র করে সব থেকে ধনবান, ক্ষমতাবান মহাজনী গদি তৈরি করলেন জগতশেঠের পরিবার।

যেহেতু ক্ষমতার সঙ্গে নতুন উদ্ভুত গঠিত স্বার্থগোষ্ঠীর সম্পর্ক দাঁড়িয়েছিল পুরোপুরি ব্যক্তিস্বার্থপূরণের ওপর নির্ভর করে, তাই প্রত্যেক দলের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নিজের স্বার্থ-তাঁবুর ব্যবস্থাপনার সুরক্ষা ঢাল যতদূরসম্ভব নিরাপদ রাখা। যদি দেখা যেত ব্যক্তি স্বার্থ রক্ষা অসম্ভব হয়ে পড়ছে, তাহলে তারা দল পরিবর্তন করত। এই বিষয়টা আমারা দেখি শতাব্দের প্রথম পাদে। মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর তার ইচ্ছার বিপরীতে নাতি সরফরাজ খান মসনদে আরোহন করেন। সরফরাজের পিতা ওডিসার উপসুবাদার সুজাউদ্দিন নিজের জন্যে মসনদ চেয়ে মুর্শিদকুলির স্ত্রীকে আবেদন করলেন। মুর্শিদকুলির স্ত্রীর (Riyaz, p. 288.) হস্তক্ষেপে সরফরাজ মসনদ ছেড়ে দিলেন। এই রাজনৈতিক ডামাডোলে নতুন অভিজাতরা কীভাবে ক্ষমতার রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবেন বুঝতেই পারছিলেন না। ব্রিটিশ কুঠির কাজগপত্র সূত্রে জানতে পারছি, প্রতিপত্তিওয়ালা ব্যাঙ্কার জগতশেঠ শুরুতে বুঝতে পারছিলেন না এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোন দিকে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত (BPC, vol. 6, f.490, 14 Aug. 1727)। এই দলীয় এবং গোষ্ঠীস্বার্থ যে সম্পূর্ণ ব্যক্তি যোগাযোগ আর স্বার্থ নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল তার আরও একটা প্রমান, সুজাউদ্দিনকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বাংলার রাজনীতিক ক্ষমতা দখল করা দুই প্রখ্যাত ভ্রাতা হাজি আহমদ এবং আলিবর্দি খান, সুজাউদ্দিনের ব্যক্তিগত বন্ধু হিসেবেই উচ্চপদে বৃত হলেন (Riyaz, pp. 294-95)। দুই বিখ্যাত ভাই এমন এক সময়ে প্রশাসনিক সেবায় যুক্ত হচ্ছেন, যখন এদের মধ্যে কেউই গুরুত্বপূর্ণ মনসবদার বা জমিদার গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন না।

এই যে নতুন স্বার্থগোষ্ঠীবদ্ধ মানুষেরা একদেহী হলেন না। বিভিন্ন সময়ে চাপের মুখে পড়ে গোষ্ঠীবদ্ধ বিভিন্ন মানুষ নানান রকমের স্বার্থসমঝোতা করতে শুরু করলেন। সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পরে যখন সরফরাজ নবাব হলেন, তিনি পিতার পুরোনো মনসবদারদের পদোন্নতি ঘটাতে চাইলেন। সেই সময়ের বাংলার রাজনীতিতে অসামান্য গুরুত্বপূর্ণ ত্রিমূর্তি হাজি আহমদ, দেওয়ান আলমচাঁদ এবং জগতশেঠ, যাদের তিনি তার পিতার শেষ ইচ্ছে শিরোধার্য করে নিজের পরামর্শ দাতা নিয়োগ করেছেন, নবাবের প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রস্তাবে রাজি হলেন না। দরবারের স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্যের সূচনা হল। বাংলার ইতিহাসে প্রখ্যাত তিনমূর্তি ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণের জন্যে ১৭৪০-এ বিপ্লব ঘাটালেন। বিপ্লবে আহুতি দিলেন সরফরাজ আর অভিষেক হল আলিবর্দি খানের। মুর্শিদাবাদের চেহেল সেতুনের মসনদে বসলেন নামগোত্রহীন বঙ্গ প্রশাসনের এক আমলা। কয়েকজন মানুষের ব্যক্তিগত উচ্চাশা এবং শুধুই ব্যক্তিগত স্বার্থপূরণের জন্যে সরফরাজ খাঁ সিংহাসনচ্যুত হলেন। তিনি ক্ষমতা হারালেন অদক্ষতা বা দুর্নীতির দায়ে নয় অথবা সামগ্রিকভাবে নতুন শাসক গোষ্ঠীর স্বার্থে আড় হয়ে দাঁড়ানোর জন্যেও নয়। রিয়াজের লেখক লিখছেন, This Revolution in the Government threw the City (Murshidabad-the capital) as well as the Army and the people of Bengal, into a general and deep convulsion(Ibid., p. 320)। এমন কি গিরিয়ার যুদ্ধে, ঘাউস খান, মীর সারাফুদ্দিন, মীর মহম্মদ বাকির খান, বিজয় সিংহ, রাজা ঘনদরব সিং ইত্যাদি সেনাপতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে সরফরাজ মারা গেলে তার সৈন্যবাহনীর একটি দল আলিবর্দির দলের সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। এই ঘটনা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার মনসবদার-জমিদার জোটের মধ্যে একতা ছিল না, জোটগুলি আবর্তিত হত ব্যক্তিগত উচ্চাশা এবং অন্যান্য উদ্দেশ্যপূরণের উদ্দেশ্যে (Ibid., pp. 311, 314-15, 319-20)। ব্যক্তিগত উচ্চাশাই ছিল যে কোন জোটের মুল লক্ষ্য — জোটের জোটসঙ্গীদের সার্বিক স্বার্থ বিকাশ নয়, এটা প্রমানিত হয় আলবর্দির প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের ১৭৪৭-এ আলিবর্দী বিরোধী চক্রান্তের ঘটনায় (K.K. Datta, Alivardi, p. 81.)।

দুই.দুই নবাবি বাংলা, ১৭০০-১৭৫৭

১৭০০ সালে বাংলায় এসে মুর্শিদকুলি খাঁ একাদিক্রমে ১৭২৭ সালের তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত (মাঝখানে ১৭০৮-০৯ দু-বছর বাদ দিয়ে) মুঘল সুবার গুরুত্বপূর্ণতম প্রশাসক হিসেবে আজও মানুতা পান। প্রথমে তিনি দেওয়ান পদে ছিলেন, ১৭১৭-র পরে তিনি সুবাদার পদ পেলেন। দেওয়ান পদে যোগ দিয়ে তার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল বাংলার রাজস্ব বৃদ্ধি। এই দিকে লক্ষ্য রেখে তিনি রাজস্ব-প্রশাসনে পকড় দৃঢ় করেন এবং যে উদ্বৃত্ত জমিদার এবং অন্যান্য ছোট জমিদার/সুবাদার উসুল করছে, সেগুলো রাষ্ট্রের কোষাগারে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন। তিনটি সহজ পদ্ধতিতে তিনি রাজস্ব আদায় কাঠামো নির্ণয় করেন। প্রথমত তিনি বাংলার উর্বরতম যে সব জমি মনসবদারদের জায়গির হিসেবে রোজগারের জন্যে দেওয়া ছিল সে সময় সেগুলি কেড়ে নিয়ে তাদের কম উর্বর জায়গির জমি উড়িষ্যায় বরাদ্দ করেন। রাষ্ট্র সব পড়ে থাকা জায়গির জমির দখল নেয়। দ্বিতীয়ত তিনি বলপ্রয়োগ করে জমিদারদের নিয়মিত বরাদ্দ রাজস্ব প্রদান করতে বাধ্য করলেন। তারা রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হলে, কয়েদ করতেন অথবা তাদের ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনতেন। অবসর নেওয়া এবং অন্যান্য কার্যকরী আমলাদের প্রত্যেক রাজস্ব প্রদায়ী এলাকায় পাঠালেন, যাতে তারা সেই এলাকার রাজস্বের উপযুক্ত সমীক্ষা/জরিপ করতে পারেন। মাঠে কাজ করা কর্মচারী-আমলাদের সহযোগিতায় তিনি বাংলার উপযুক্ত রাজস্ব খাত তৈরি করলেন এবং প্রত্যেকটি জমির উর্বরতা নির্ধারণ করে প্রতিটি রায়ত/কৃষক সম্ভাব্য সর্বোচ্চ কত রাজস্ব দিতে পারে, সে অঙ্ক কষলেন (Riyaz, 248-49, 255-56; Salimullah, Tarikh-i-Bangala, pp. 32-33, 43-45)। তার সময়ে পারসিক ঐতিহাসিক সালিমুল্লার বর্ণনা অনুযায়ী, মুর্শিদকুলি যদিও জমি জরিপের কাজে যতটা যাওয়ার কথা ছিল ততটা গভীরে যেতে পারে নি, কিন্তু আজ আমরা বলতে পারি, পুরোনো সমীক্ষা এবং তার সময়ের জরিপের নানান তথ্য অবলম্বন করে, তিনি এই জরিপে মোটামুটি ঠিকঠাক রাজস্ব খাত তৈরি করলেন।

নবাব মুর্শিদকুলির বর্ধিত রাজস্ব চাহিদা মেটানোর শর্ত অনুযায়ী জমিদারদের এখন সমস্ত রাজস্ব প্রদান করতে বাধ্য হলেন। না হলে তারা হয় মহাজনের হাতে অথবা সরকারকে জমিদারি সম্পর্পণ করতে বাধ্য হবে। রাজস্ব বকেয়ার দায়ে ক্রোক হওয়া জমিদারির রাজস্ব যে জমিদার মেটাতে পারবে, ক্রোক হওয়া জমিদারিটি তার নামে লিখে দেওয়ার নীতি নিলেন মুর্শিদকুলি (Risala, ff. 7a-9b; also quoted in Calkins, p. 803)। নতুন নীতিতে অধিকাংশ দুর্বল এবং ছোট জমিদার জমিদারির ব্যবস্থাপনা থেকে হঠে যেতে বাধ্য হয়। উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে মুর্শিদকুলি বড় জমিদারির স্বার্থ দেখেই রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাটা তৈরি করলেন। তিনি বড় জমিদারদের ক্ষমতা আর কলেবর বৃদ্ধিতে মন দিলে বাংলা জুড়ে বেশ কিছু বড় জমিদারি তৈরি হয়। এই ধরণের জমিদারির বড় উদাহরণ রাজসাহী জমিদারি। বর্ধমান, নদীয়া, দিনাজপুরের মত বড় জমিদারেরা মুর্শিদকুলির সময়ে নতুন সংস্কারের পক্ষে দাঁড়িয়ে নিজেদের অবস্থান জোরদার করলেন(জমিদারির বৃদ্ধি নিয়ে জানতে পড়তে হবে নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহের Economic History of Bengal, vol. II, pp. 119-22)। ১৭২৭ সালে মুর্শিদকুলি যেদিন মারা যান, সে সময় বাংলার মোট রাজস্বের অর্ধেক অংশ পূরণ করত ১৫টি বাংলার বড় জমিদারি [জমিদারদের জমিদারির বিশদ বিবরণ এবং সেই জমিদারির রাজস্ব জরিপ নিয়ে বিশদ পাবেন (James Grant, ‘Finances of Bengal’, in W.K. Firminger (ed.), Fifth Report, vot. II, pp. 194-9)]।

মুর্শিদকুলি খাঁর নতুন রাজস্ব সংস্কার নীতির উপজাত ফল হিসেবে উঠে এলেন মহাজন এবং মহাজন বা ব্যাঙ্কিং শ্রেণীরা। এরা সেই সময় বাংলা প্রশাসন এবং অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করবেন। মুর্শিদকুলির নতুন নীতিতে কাজের সুযোগ পেয়ে একদল মহাজন একজোট হয়ে একদল জমিদারকে অর্থ সাহায্য দিতে শুরু করে, যাদের মাথাব্যথা ছিল সঠিক সময়ে রাজস্বভাণ্ডারে পূণ্যাহের দিন প্রয়োজনীয় রাজস্ব জমা দেওয়া (Risala, ff, 7a-7b; also quotecf in Calkins, p. 804)। বাংলার মহাজন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্ষমতা আর প্রভাবে জায়মান হয়ে ওঠে জগতশেঠেদের গদির গৌরব। কিন্তু এর সঙ্গে এটাও বলতে হবে জগতশেঠদের কুঠি বাংলায় প্রধানতম ব্যাঙ্কিং গদির অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারার পিছনে অবশ্যই আছে নবাব নাজিম মুর্শিদকুলির অভয় হস্ত। কুঠির একটা বড় রোজগার হত জমিদারদের দেওয়া ঋণের প্রাপ্ত সুদ থেকে (পঞ্চম অধ্যায় দেখুন)। ১৭৩০-এর মধ্যে জগতশেঠেরা নবাব নাজিমের তোষাখানা হিসেবে কাজ করত। জগতশেঠেরা রাজস্ব বকেয়া রাখা জমিদারদের জামিন হিসেবে থাকতেন।

কৌশলী প্রশাসক মুর্শিদকুলি আন্দাজ করেছিলেন, চাকুরিদাতা আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে দিল্লির দরবারে যে অন্তর্বর্তী বিপ্লব ঘটে যায়, তার প্রভাবে সুবার ওপরে কেন্দ্রিয় কর্তৃত্বের পকড় শিথিল হয়ে পড়েছে। সেই সুযোগে দিল্লিতে নিয়মিত রাজস্ব পাঠিয়ে কার্যত এক সুতো আনুগত্য বজায় রেখে বাংলায় স্বশাসনের পরিবেশ তৈরি করে ফেলতে পারবেন তিনি। অর্থের জন্যে উদ্বিগ্ন দিল্লির সম্রাটকে নিয়মিত রাজস্ব পাঠিয়ে, শিথিল শাসন, ভেঙেপড়া কাঠামো তবুও জনমানসের চোখে ক্ষমতাশালী দিল্লির মুঘল দরবারে বাংলা শাসনের অধিকার যেমন কায়েম রাখতেন তেমনি বাংলা নিজামতে জমিদার, আমলা এবং সওদাগর ব্যবসায়ীদেরও আনুগত্য অর্জন করে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করলেন। পছন্দের ক্ষমতাশালী আমলাদের তাঁর মত করে যেমন গুরুত্বপূর্ণ পদ পাইয়ে দিয়েছিলেন, একই সঙ্গে, তার প্রতি বিক্ষুব্ধ মনসবদারদেরও উপযুক্ত পুনর্বাসন দিয়েছিলেন বাংলার প্রশাসনে (Salimullah;Tarikh-i-Bangala, pp. 42-43)। বড় জমিদারেরা তার প্রতি অনুগত ছিল কারণ তিনি তাদের ভূমি আগ্রাসনে সহায়তা করেছিলেন। যে পদ্ধতিতে তাদের জমিদারির বাড়বাড়ন্ত হবে সেই প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে তিনি ত্বরান্বিত করেছিলেন। ব্যাঙ্কিং/মহাজনী এবং আর্থিক সেবাদান গোষ্ঠীগুলোও নাজিমের দ্বারা পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল, যার রাজস্ব নীতি তাদের ব্যাপক লাভের সুযোগ করে দেয়।

মুর্শিদকুলি খাঁ শুধু রাজস্ব প্রশাসন সংস্কার করেছিলেন তাই নয়, সাধারণ প্রশাসনকেও ঢেলে সাজিয়েছিলেন তার মত করে। তিনি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তার কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছেন সালিমুল্লাহ। বাংলার নবাব রাজপথে ডাকাতি রোধ করেছিলেন। ধরাপড়া ডাকাত আর চোরদের কড়া শাস্তি দেওয়া হত। শান্তি রক্ষার জন্যে তিনি বিভিন্ন এলাকায় থানা বসিয়েছিলেন (Ibid., p. 108)। সালিমুল্লাহ বিশদে বলছেন মুর্শিদকুলি কিভাবে সাধারণ পণ্যের বাজারদর ঠিক রাখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন যাতে গরীবদের নিত্যদিনের পণ্য কিনতে সমস্যা না হয়। মন্বন্তর রুখতে সাধারণ দানা শস্যের একচেটিয়া কারবার বন্ধ করেছিলেন (Ibid., p. 112)। কিন্তু মুর্শিদকুলি খাঁ’র সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল, তিনি বাংলাকে এমন সময় শান্তি আর স্থায়িত্বের পরিবেশ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, যখন দিল্লি এবং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত বিশৃঙ্খলা আর বিভ্রান্তি আর অস্থিরতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। মুর্শিদিকুলির কাছাকাছি সময়ে লেখা ইতিহাস, রিয়াজএর লেখক লিখছেন — The Khan, [Murshid Quli] having introduced order in the financial condition of the Mahals of Bengal, devoted his attention to the improvement of other administrative and internal affairs. His administration was so vigorous and successful that there was no foreign incursion nor internal disturbance, and consequently the military expenditure was nearly abolished.(Riyaz, p.257)। সংক্ষেপে মুর্শিদকুলি বাংলায় একটা স্থায়ী এবং শক্তিশালী সরকারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দিয়েগিয়েছিলেন। সেটাই ছিল পলাশী পূর্ব বাংলার অর্থনীতির ভিত্তি। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev