সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
ষষ্ঠ অধ্যায়
উৎপাদন ব্যবস্থার একক
তুলো থেকে সুতো তৈরি করা আর চরকা কাটনা/কাটনি (spinning), কাপড় তৈরির প্রক্রিয়ায় দুটো আলাদা আলাদা পেশা হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। কাপড় উতপাদন ব্যবস্থায় এ দুটি পেশা তাঁতি পরিবারের সদস্যদের আনুষঙ্গিক জীবিকা ছিল। বাড়ির সব কাজ সামলে চরকা কাটনারা চরকা চালানোর কাজ করতেন। সুতো তৈরিও চাষী-কৃষক পরিবারের অন্যতম জীবিকা হয়ে উঠেছিল। আমাদের মনে হয়, যে সব তাঁতি শুধুই বাজারজাত কাপড়ের চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে কাপড় উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জুড়ে থাকতেন, তারা সাধারণত খোলা বাজার থেকেই সুতো কিনতেন, সুতো বাড়িতে তৈরি করতেন না। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে বাড়িতে তুলো পেঁজে তাঁতিদের জন্যে চরকায় সুতো তৈরি করা বাংলাজড়া গ্রামীনদের স্বাধীন পেশা ছিল। যদিও বাংলায় কাপড় উৎপাদন ছিল বংশপরম্পরার জাত ভিত্তিক পেশা, কিন্তু চরকা কেটে সুতো তৈরিতে জাতের থাকবন্দীত্বের নির্দেশ মানা হত না, এমন কী যুগি, তাঁতি, জুলুয়া সমাজ পরিবারের মহিলাদের মতই সমান্তরালভাবে উচ্চবংশের ব্রাহ্মণ ইত্যাদি বর্ণের কন্যারাও চরকা চালিয়ে অবলীলায় সুতো কাটতেন। চরকা কাটা খুব সহজ কাজ ছিল না, এর জন্যে বহু পরিশ্রমে দক্ষতা অর্জন করতে হত। যদিও সুতো সব কটা আড়ংএই তৈরি হত, কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া ঢাকার জঙ্গলবাড়ি আর বাজিতপুরে বাংলার দক্ষতম চরকা কাটনি মহিলাদের বাস ছিল। এই আড়ংগুলোয় কাটনাদের চরকা চালানোর অসামান্য দক্ষতার জন্যে খুবই নরম চরিত্রের সুতো তৈরি হত। ঢাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ১৮০০ চরকা কাটনির মধ্যে এই ধরণের দক্ষতাওয়ালী কাটনির সংখ্যা ৩০-এর বেশি ছিল না (Ibid., ff. 129-31)।
চরকা কাটা ছিল অসম্ভব শ্রম নিবিড় দক্ষতাপূর্ণ উদ্যম। দীর্ঘ এবং শ্রমসাধ্য সময় ব্যয় করে সুতো কাটা হত কিন্তু পারিবারিক নানান কাজে ডুবে থাকা চরকা কাটনির পক্ষে দীর্ঘ সময় চরকায় কাজ করা সম্ভব হত না। সকালে কয়েক ঘন্টা এবং সন্ধ্যেয় কয়েক ঘন্টা চরকায় তুলো থেকে সুতো কাটা হত যখন পরিবেশের তাপ খুব বেশি থাকে না; মধ্যদিনে সুতো কাটলে সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। জন টেলর বলছেন একজন ভাল দরের কাটনি যদি সারা মাসে সারা দিনের সব কটি সময় ব্যয় করে সুতো কাটে আট আনা (আধ টাকা ওজনের) ওজনের বেশি সুতো কাটতে পারবেন না। কিন্তু কাটনি যেহেতু অন্যান্য পারিবারিক কাজকর্মতে নিযুক্ত থাকে, তাই তার পক্ষে দৈনন্দিন ৩ ঘণ্টার বেশি সুতো কাটার কাজে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে কোন সুতো কাটনির থেকে এক মাসে এক সিক্কার (এক সিক্কা টাকার এক চতুর্থাংশ অর্থাৎ ২/৫ আউন্স) বেশি ওজনের সুতো কাটা সম্ভব হয় না (Ibid., ff. 131-35)। উপরন্তু দীর্ঘ সময় ধরে চরকায় মিহি সুতো কাটায় যেহেতু চোখের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে, তাই ৩০ বছর পরে একজন মহিলার চরকা কাটার কাজের ক্ষমতা ক্রমশ কমে যেতে থাকে। সুতো কেটে তার রোজগার তুলনামূলকভাবে কম হত, ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার অতিরিক্ত উৎসাহ জাগত না কাটনির অন্তরে। কিন্তু কাপড়ের চাহিদা বাড়ায় সুতোরও চাহিদা বাড়তে থাকল, কিন্তু সেই তুলনায় রোজগার না বাড়ায় কাটনিদের দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে চাষের দিকে ঝুঁকতে হয়।
শ্রমের বিভাজন এবং কাপড় বোনার কাজের সঙ্গে জুড়ে থাকা বিভিন্ন স্তরে কারিগরদের আর কারিগরির চরমতম দক্ষতা আর প্রযুক্তির বিকাশ আদতে অষ্টাদশ শতকের বাংলার কাপড় শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল। উদাহরণ স্বরূপ কাপড় ধোয়া এক ধরণের পেশাদার প্রযুক্তিবিদদের দিয়ে করানো হত এবং ড্যানিশ সমীক্ষা বলছে, এই ধরণের এটা একটা পেশাদারি শিল্পকলায় রূপান্তরিত হয়েছিল, প্রতিটা উৎপাদন জেলায় বহু কাপড় নির্দিষ্ট ধরণের ধোপা দিয়ে ধোয়াতে হত, এবং তাঁদের কাপড় ধোয়ার দক্ষতা অন্য কারোর পক্ষে অর্জন করা সহজ ছিল না (Ole Feldbaeck, ‘Cloth Production in Bengal’, BPP, vol. LXXXVI, July-Dec. 1967, p. 132)। কাপড় ধোয়া আর ব্লিচিং করার পর ছেঁড়া সুতোয় রিফুকর্ম (darning) করার কাজ করতেন চরমতম দক্ষ রফুগরেরা এবং কাপড়ে থেকে যাওয়া ছোপ আর দাগ তোলায় দক্ষ ছিলেন দাগ ধোবিরা। তসর আর মুগায় কশিদা নামক সূচীকর্ম হত; এছাড়াও আরেক ধরণের সূচীকর্ম হত ডুরিয়া আর মলমলের ওপর এবং এই কাজের বিপুল চাহিদা ছিল বলে ঢাকার প্রচুর মহিলা এই ধরণের কাজ করে রোজগার করতেন। ১৭৩০-এর শেষে এবং ১৭৪০-এর প্রথম দিকে ঢাকার কুঠিয়ালেরা কশিদার কারিগর পেতে হয়রান হয়ে গিয়েছিল কারণ এই ধরণের কারিগরদের সংখ্যা খুব কমে গিয়েছিল এবং এই কাজ করতেন মূলত পর্দার আড়ালে (Junnannaes) থাকা মহিলারা তাই কুঠিয়ালেরা তাদের নতুন করে কিভাবে খুঁজে বার করা যায় তা বুঝতে পারে নি (Fact. Records, Dacca, vol. 2, 10 Feb. 1737; BPC, vol.12, f.137, 16 April 1737; vol. 14, f.158vo, 27 Jan. 1740; C & B. Abstr., vol. 4, f.380, para. 65, 11 Dec. 1741)।
তাঁতি, মজুরি এবং গতিশীলতা
তাঁতিদের অবস্থান
যদিও আজ সে সময়ের তাঁতিদের আর্থিক বা সামাজিক অবস্থান বোঝা বেশ কঠিন, অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে এক গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিক তাঁতিদের সম্বন্ধে বলেছিলেন তাঁতিরা ছিলেন বাংলা অর্থনীতির কব্জামাত্র। তাঁর বক্তব্য সত্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে মনে হয় না। মনে রাখা দরকার আমরা যে সময়ের কথা আলোচনা করছি, সেই অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে বাংলার কাপড় উৎপাদন এবং কাপড় নির্ভর ব্যবসা দেশিয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করেছিল। বাংলার তাঁতিদের তৈরি পিস-গুডস ছিল ইওরোপিয় কোম্পানি এবং এশিয় ব্যবসায়ীদের মুল রপ্তানি পণ্য। কাপড়ের ব্যবসার জন্যে, বিশেষ করে পিস-গুডসের ব্যবসা বাংলায় সোনা রূপার প্রবাহ নিশ্চিত করত। বাংলায় রূপো আমদানি করে বাংলাকে সোনার বাংলায় রূপান্তর করার কাজে তাঁতিদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। পারম্পরিকভাবে তাঁত বোনা জাত এবং বংশ নির্ভর পেশা ছিল। হাতে যদিও প্রমান করার জন্যে যথেষ্ট মালমশনা তাই আজ আর ঠিকঠাকভাবে হয়ত বলা যাবে না বাড়তে থাকা বাংলা কাপড়ের বিশ্ব চাহিদার জন্যে জাতের থাকবন্দী আদৌ ভেঙে ছিল কী না; এবং বাংলার কাপড় উৎপাদন ব্যবস্থায় সমাজের ওপরের আর নিচের স্তরের সব ধরণের মানুষকে জুড়তে পেরেছিল কি না। সাধারণ যুক্তি হল ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর রপ্তানি কাজে বাংলার কাপড় শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছিল, তাই চাহিদা বাড়ায় উৎপাদন ব্যবস্থায় যেহেতু নতুন কারিগর ঢুকল, সেই ব্যবস্থায় থাকবন্দী ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হল (P. J. Thomas, ‘The. Indian Cotton Industry, jlbout 1700 A.D. Modern Review, Feb. 1924, pp. 45, 134-35; D B Mitra, Cotton. Weavers, p.39; Hameeda Hossain, Company Weavers,. pp. 47, 174)। আমাদের হাতে মাত্র একটাই পরস্পর বিরোধী চরিত্রের উদাহরণ আছে, সেটা আবার অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে। ১৭৯০ সালে কোলব্রুক লিখলেন পেশাদারেরা বংশ পরম্পরাতেই তৈরি হয় এই দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তি নেই এবং পেশাদারেরা [জাতের] লক্ষ্মণরেখায় সীমাবদ্ধ নন, কয়েকটা হাতে গোনা ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রত্যেকটি পেশা প্রতিটি [জাতের] মানুষের জন্যে উন্মুক্ত ছিল (H.T. Colebrooke, Remarks on the Husbandry, pp. 170-71, 174)। অন্যদিকে ১৭৮৯এর পুর্বে আলোচ্য ড্যানিশ রিপোর্টে বিশেষ করে বলা হল তাঁতিদের পেশায় অন্য জাতের প্রবেশের সুযোগ নেই (Ole Feldbaeck, ‘Cloth Production in Bengal’, BPP, vol. LXXXVI, JuJy-Dec. 1967, p. 126)। বাংলার কাপড় উৎপাদন ব্যবস্থায় থাকবন্দী আদৌ ভেঙেছিল কী না যে বিষয়ে আজ নির্দিষ্টভাবে কিছু বলাটা উচিত হবে না। এই বিষয়ে ওর্মের ১৭৫০ সালে লেখা দৃষ্টিভিঙ্গীটি আলোচনা করা যাক জেন্টুদের [ভদ্রবিত্তদের] মধ্যে তাঁতিরা অভদ্র হিসেবে গণ্য হন না। তিনি কায়স্থদের নিচের ধাপে এবং অন্যান্য কারিগরের ওপরে ধাপের থাকবন্দীত্বে অবস্থান করেন। তবে তিনি যদি জাতের বাইরের কাজের উঞ্ছবৃত্তি করেন তাহলে তিনি জাতকুলমান হারা হবেন (Orme, Historical Fragments, p. 410)।
উল্লিখিত উক্তিগুলোকে যদি সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, এবং কৃষির পাশাপাশি যদি তাঁতের কাজও তাঁতি-চাষী-কৃষক সমান্তরালভাবে সম্পাদন করে থাকতেন, তাহলে তাঁতির ছোট্ট পরিবার ভিত্তিক কাপড় উৎপাদন ব্যবস্থা একক, তাঁতির বাড়িটি মনে হয় না সে যুগের উৎপাদন ব্যবস্থার একক হিসেবে প্রাধান্যচ্যুত হয়েছিল বলে (displaced from its position of primacy)। সাধারণভাবে এমন কী মধ্য অষ্টাদশ শতকেও তাঁত চালানো জাতিভিত্তিক বংশপরম্পরার পেশা হিসেবে বাংলার জাত ব্যবস্থার থাকবন্দীত্বে থানা গেড়ে বসেছিল। একই সময়ে চাহিদা বাড়লে জাতের কৃষক-চাষী তাঁত শিল্পের কারিগর হিসেবে জুড়ে যেতেন। কিন্তু এই ধরণের কত অতিরিক্ত কারিগর, চাষ বা অন্যান্য পেশা, কাজ, গোষ্ঠী থেকে তাঁতের কাজ করতে এসে মুল তাঁতি গোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যেত, তার কোন উদাহরণ বা তথ্য আজ আর পাওয়া যায় না। এটাও মাথায় রাখা দরকার, এর আগে আমরা আলোচনা করেছি, সুতো কাটার কাজ বাংলায় থাকবন্দীত্বের ঘেরাটোপে পড়ে নি নি, ছড়িয়ে গিয়েছিল সমাজের প্রত্যেকস্তরে। এই উদাহরণ থেকে একটা সিদ্ধান্ত করাই যায় প্রয়োজনে কাপড় উতপাদনের চাহিদা মেটাতে হয়ত অন্যান্য জাতের দক্ষ মানুষ তাঁত চালানোর পেশায় লিপ্ত হত।
আবার বলা যাক, যেহেতু প্রায় সব কটি পেশা মূলত জাতি ভিত্তিক, তাই হয়ত উৎপাদন ব্যবস্থায় থাকবন্দীত্ব খুব কড়াভাবে নিয়ন্ত্রিত হত না। এই থাকবন্দী থেকে বেরিয়ে এসে সামাজিক উত্তরণের একটা চমৎকার উদাহরণ দেওয়া যায় অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদের কলকাতায় দাদনি বণিকদের সামাজিক স্বীকৃতিতে, বিশেষ করে শেঠ আর বসাকের মত তাঁতি সমাজের দাদনি বণিকদের উদাহরণে। কলকাতার মতই কাশিমবাজারেও অন্যান্য উচ্চ জাত যেমন বসু, সেন ইত্যাদির সঙ্গে দাদনি বণিকদের উপাধি পাওয়া যাচ্ছে পরামানিক (নাপিত), নাথ (তাঁতি), তেলি (তেল উৎপাদক) ইত্যাদি। আমরা জানিনা এ সব ব্যতিক্রম না নিয়ম ছিল। বিশেষজ্ঞদের মত, তাঁতিদের পেশাদার সংগঠন, গিল্ড/শ্রেণী, অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত কার্যকর ছিল, যদিও আমাদের সূত্র এ বিষয়ে বিষ্ময়করভাবে নীরব, যদিও আমরা আমাদের আলোচ্য সময়ে ব্যবসায়ীদের পঞ্চায়েত নিয়ে কিছু তথ্য জানতে পারি (P. J. Thomas, ‘Indian Cotton Industry’, Modern Review, Feb. 1924, p. 134-35)। এমন কি এই ধরণের সঙ্গঠনও যদি থেকে থাকত, সেগুলি মূলত জাত ভিত্তিক থাকবন্দী এবং এরা শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল, এবং এদের কাজ কোনওভাবেই প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক ছিল না। এটা হয়ত কাপড় উতপাদনের ক্ষেত্রে সত্য কারণ এটি মূলত গ্রাম ভিত্তিক উৎপাদন কর্ম ছিল। (চলবে)