সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
সপ্তম অধ্যায়
কাপড় রপ্তানি – তাঁতি এবং এশিয় ব্যবসায়ী
তাঁতপণ্য রপ্তানিতে কোম্পানিগুলি
অষ্টাদশ শতকের গোড়ার সময়ে কোম্পানির রপ্তানির তালিকায় কাপড় পণ্যটির গুরুত্ব আমরা বুঝতে পারব যদি আমরা বাংলা থেকে কোম্পানির মোট রপ্তানি করা পণ্যের মোট মুল্যের সঙ্গে যদি কাপড় রপ্তানির মোট মূল্যের তুলনা করি (তালিকা ৭.২)। এই সময়ে কোম্পানির রপ্তানির মোট অঙ্কে বাংলার কাপড়ের অংশিদারি ছিল সব থেকে বেশি। অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদের প্রত্যেক বছরে ডাচ কোম্পানির মোট রপ্তানির পরিমানের তুলনায় বস্ত্রের অংশিদারি ছিল ৫৪ শতাংশ, ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এটা ৭১ শতাংশ। আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদের শেষের দিকে ডাচ কোম্পানির ক্ষেত্রে এই অঙ্কটা দাঁড়ায় ৭৪ থেকে ৭৮ শতাংশ এবং ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ৮২ শতাংশ। এই অংশিদারি থেকে প্রমান হয় অষ্টাদশ শতাব্দের প্রথম পাদে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলিতে বাংলার কাপড়ের অংশিদারি ছিল সব থেকে বেশি।

বাংলার কাপড়ের বিপুল চাহিদার উদাহরণ পাই আবার অন্য দিক থেকেও। ইওরোপ থেকে কোম্পানির কর্তাদের পাঠানো বাংলার কাপড়ের চাহিদার পরিমান থেকে। নির্দিষ্ট বছরের চাহিদা বাংলায় পাঠানো হত দুবছর আগেই। ইওরোপ থেকে পাঠানো কাপড়ের তালিকা থেকে আমরা বিভিন্ন প্রকার কাপড়ের ইওরোপে চাহিদার পরিমানের ওঠাপড়ার একটা আন্দাজ পাচ্ছি। ইওরোপ থেকে পাঠানো বাংলা কাপড়ের বরাতের তালিকায় আমরা জানতে পারছি কাপড়ের চরিত্র, প্রত্যেক বস্ত্রের নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং বহু সময় কাপড়ের দামও উল্লেখ করা থাকত। কেন্দ্রিয় সংগঠন থেকে এই বিস্তৃত চাহিদার বরাত আসা সত্ত্বেও আমরা দেখছি, রপ্তানির সময়ে কিছু কিছু কাপড় চাহিদার তুলনায় বেশ বেশি পরিমানে পাঠানো হয়েছে, কিছু কিছু কাপড় কম পরিমানে পাঠানো হয়েছে। এর একটা কারণ ছিল ইওরোপে চাহিদার ওঠাপড়া, অন্য কারণটা ছিল বাংলার দাদনি বণিকদের ইচ্ছে, বিশেষ করে যে সব কাপড়ে তাদের খুব বেশি লাভ থাকত না, সেগুলো তারা কোম্পানি কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজসে কম সরবরাহ করত, আর যেগুলোতে লাভ বেশি থাকত সেগুলো বেশি করে কোম্পানিকে চাপিয়ে দিত। এমনও হয়েছে চাপিয়ে দেওয়া কাপড়ের মধ্যে বেশ কিছু কাপড় ইওরোপ থেকে বরাত করা তালিকায় ছিল না। এই রকম এক প্রেক্ষিতে ১৭২৭-২৮ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের প্রধান উইলিয়াম ফ্রাঙ্কল্যাণ্ডকে পদচ্যুত করা হয় (K.N Chaudhuri, Trading World, p. 253)। এটা যে শুধু ব্রিটিশ ইওরোপিয় কোম্পানিতে ঘটত এমন নয়, সব কটা ইওরোপিয় কোম্পানিতে এই রোগ কম-বেশি ছিলই। চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও, বেশ কিছু কাপড় অতিরিক্ত পরিমানে পাঠানোর জন্যে নিলামে বহু ক্ষতি করে Heeren Seventeen — ১৭ জন ডাচ নির্দেশককে সেই কাপড় ছেড়ে দিতে হয় (Glamann, Dutch Asiatic Trade, pp. 145, 150)।
১৭২০ নাগাদ, বাংলা থেকে এই তালিকা ধরে আমরা দেখাতে পারি (তালিকা ৭.৩) যে ডাচেরা এই সময় ব্রিটিশদের তুলনায় অনেক কম পরিমান পণ্য ইওরোপের বাজারে পাঠাচ্ছে এবং আমাদের আলোচ্য সময়ে, অর্থাৎ অষ্টাদশ শতকের প্রথ সময়ে, এমন কী এর পরের বছরগুলিতে একই কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখব।

দুটি কোম্পানির রপ্তানি বাণিজ্যের তুলনা করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ভাবনা উঠে আসে। প্রথমত বাংলার শস্তাতম কাপড় ক্যালিকো সব থেকে বেশি পরিমানে দুটি কোম্পানিই বরাত দিত প্রতি বছর। এর থেকে প্রমান হয় যে এই বস্ত্রের শুধুই যে খুব বেশি চাহিদা ছিল তাই নয়, অন্যান্য কাপড়ের রপ্তানি এবং পুণঃরপ্তানির তুলনায় এই ধরণের কাপড়ে লাভের পরিমান অনেক বেশি ছিল। ডাচেদের ১৭৫০ বছরটিতে ১৭৪০-এর তুলনায় এক তৃতীয়াংশ কম বরাত দেওয়া ছাড়া এই বস্ত্রের রপ্তানির পরিমান দিনের পর দিন বেড়েছে। তৃতীয়ত, বাংলার সব থেকে ভাল এবং সব থেকে দামি কাপড় মসলিনের পরিমান সাধারণ কাপড়ের পরিমানের তুলনায় কম অঙ্কের ছিল। কিন্তু এই দুই চরিত্রের কাপড়ের চাহিদা বছরের পর বছর বাড়তে থাকে, একমাত্র ১৭৩৩ সালে কমে। এই সময় ডাচ আর ব্রিটিশ, দুই কোম্পানিই ১৭২০ সালেরও কম রপ্তানি করেছে। ৭.৩ তালিকায় যে চার বছরের তুলনা টানা হয়েছে, তাতে দেখি ১৭২০ সালে ডাচ ঙ্কোম্পানির মসলিনের চাহিদা সব থেকে বেশি ছিল। প্রথম দুই কাপড়ের তুলনায় অন্য তিনটে চরিত্রের কাপড় ফাইন ক্যালিকো, রেশম এবং মিক্সড পিস গুডসসের বরাত অনেক কম ছিল এবং এই দুএর ক্রমবর্ধিত চাহিদা তুলনায়, এই তিন ধরণের কাপড়ের চাহিদা ওঠা নামা করেছে নিয়মিত।
পাদ টিকা — It should be made explicitly clear that it is extremely difficult and in some cases almost impossible to classify the textiIs into various categories because of their numerous varieties, some of which were extinct long back. So the classification made is only tentative though based on contemporaneous accounts like, Taillerfert’s memorie’ (Hoge Regering van Batavi’a, 246), John Taylor’s Description of Dhaka Cloth Manufacture (Home Misc. 456 F), references in Dutch and English Company records, the price of different varieties worked out fiom export invoices of the Companies and contracts with merchants as well as modern works like John Irwin, K N. Chaudhuri, Hameeda Hossain, etc. The different types, especially those exported by the Companies during the period under review, in each category are, mentioned in alphabetical order:
Muslins: adaties, allabalies, dimities, duriyas (dooreas), humhums, jamdanies, kepers, khasas, mulmuls, milmils, nainsooks, sarbalis, seerbapds, seerhaudcanas, shalbafts, tanjebs, terrindams, etc.
Fine Calicoes: bethilas, chowtars, dysooksies, handcerchieves (cotton), kamkhani, rumals (cotton), sologazis, sanus (sanoes), etc.
Ordinary Calicoes: atchiabanies, baftas, chilas, chints, coopies, dariabadies, dosooties, (Dutch zeijlkleden), emertie! (Dutch amritijs), ga’rras (gurral’ls), guinees, gunnies, fotas (photaes), lakhories, parcallas, salarripuris, tuckeries, etc.
Silk Piece-Goods: alcatives, allegias, armosins, bqndanas, chandrabanies, chapalens, chapasaris, choukutas, cottabarii, dheris, dotanies,fulla chetas,foelies, jamawars, kakatoestaff, (silk) lungies, mohunbanies, momtanies, maypoost, ragiabanies, restas, rudrabanies, (silk) rumals, taffachelas, taffetas, etc.
Mixed Piece-Goods: alliabantes charkanies, chukfu, cushtal, elatchies, ginghams, handkerchief, kharadaries, nillaes, peniascoes, seersucliers, soosies, tepoys, sichterman’s rumal, sichterman’s sai, etc)।
সব শেষে এটাও মনে রাখা দরকার ১৭৩৩-এর বছরটা ছাড়া ডাচ কোম্পানির বরাত মোটামুটি একই ছিল কিন্তু ব্রিটিশদের বরাত বছরের পর বছর বেড়েছে।
এই ৭.৩ তালিকায় যেটা পাই না সেটা হল কোন কোন বস্ত্রের ইওরোপের চাহিদা সর্বাধিক ছিল তার তালিকা। আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই সময়ে দুটি সব থেকে চাহিদাবন্ত প্রকারের কাপড়ে ক্যালিকোর খুব সাধারণ গারা এবং মসলিনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক দামি মসলিন খাসার চাহিদা গোটা সময় ধরে বিপুল পরিমান ছিল।
৭.৪ তালিকায় আমরা দেখি প্রত্যেক বছর যে ৫০-৫৫টা নানান প্রকারের কাপড় বাংলা থেকে ইওরোপিয়রা বরাত দিত, সেগুলির মধ্যে গারা আর খাসার সব থেকে বেশি চাহিদা ছিল।

গারা আর খাসার মত সাদা কাপড়ের চাহিদা তৈরি হয়েছিল ইওরোপের আভ্যন্তরীণ চাহিদার জন্যে। ১৭০০ সালে রেশম এবং পশম তাঁতি আন্দোলন করে আইন তৈরি করে all wrought silks, Bengals and stuffs mixed with silk or herba, of the manufacture of Persia, China and the East Indies and all calicoes painted, dyed or printed or stained there নিষিদ্ধ ঘোষণা করে (S. Bhattacharyya, East India Company, p. 158)। এর ফলে অন্যান্য প্রকারের তুলনায় সাধারণ সাদা খোলের মসলিনের রপ্তানি বেড়েছে। এর সঙ্গে অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে লন্ডনে বাংলার সাদা কাপড়ের চাহিদার বাড়বাড়ন্তের জন্যে আরও একটি কারণ তুলে ধরার দরকার সেটি হল লন্ডন আর তার আশেপাশের অঞ্চলগুলিতে কাপড় ছাপানোর কারখানার পরিমান ক্রমশ বাড়ছিল (Glamann, Dutch Asiatic Trade, p. 151. For the growth of cotton printing industry in London, see S. Aiolfi, Calicos, pp. 192-203)। গারা যেহেতু খুব শস্তা ছিল তাই সাধারণ মসলিন বা ক্যালিকোর চাহিদার তুলনায় স্বাভাবিকভাবে খুব বেশি ছিল। সে সময় যেহেতু তাদের আগের প্রজন্মের তুলনায় কারিগরেরা বেশি বেশি কাজ করতে চাইছিলেন কম খরচে গোটা ইওরোপে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে, তাই তারা দামি কাপড়ের চরিত্রের কাপড়ে খাসার মত তুলনামূলক দামি কাপড়ের চাহিদা দেখিয়েছিলেন, কারণ তারা সেই সব কাপড় তুলনামূলকভাবে দেশের আর বিদেশের বাজারের স্বচ্ছলদের দিকে নজর রেখে ছাপাতেন। ১৭২০ সালে আরও একটা আইন প্রয়োগ হল যেখানে ক্যালিকো কাপড় ইংলন্ডে আমদানি নিষিদ্ধ করা হয় (S. Bhattacharyya, East India company, p. 159)। এতদ সত্বেও ৭.৩ তালিকা থেকে আমরা বুঝতে পারি এই আইন কোম্পানিকে বেশি বেশি কাপড় বাংলা থেকে ইওরোপে আমদানি করতে দমাতে পারে নি। একদিকে কোম্পানি কাপড় ছাপা শিল্পের বিপুল চাহিদা পূরণ করছিল অন্য দিকে কোম্পানি তার পুরোনো ব্যবসা অনুযায়ী বাংলার কাপড় অন্য বাজারে বেশ ভাল লাভে পুনঃরপ্তানি করত। ১৭৩০-এর দশকে ব্রিটিশ কোম্পানির থেকে ডাচ সওদাগরেরা কাপড় কিনেছে (Glamann, Dutch Asiatic Trade, p. 150)। (চলবে)