সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
সপ্তম অধ্যায়
কাপড় রপ্তানি – তাঁতি এবং এশিয় ব্যবসায়ী
তাঁতপণ্য রপ্তানিতে কোম্পানিগুলি
ব্রিটিশ আর ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আলাদা আলাদা করে বাংলা থেকে ইওরোপে পাঠানো কাপড়ের তুলনা করলে দেখব ১৭৩০ সালের প্রথম সময় থেকে শুরু করে মধ্য অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ব্রিটিশ কোম্পানির, ডাচ কোম্পানির তুলনায় অনেক বেশি কাপড় রপ্তানি করেছে। সপ্তদশ শতকের শেষ পাদ এবং অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদ পর্যন্ত ঠিক উল্টো প্রবণতা ছিল – সে সময় ডাচেরা ব্রিটিশদের তুলনায় অনেক বেশি কাপড় ইওরোপে পাঠিয়েছিল। ৭.৫ তালিকায় বাংলা থেকে রপ্তানি করা কাপড়ের এই তুলনাটা পাব।

৭.৫ তালিকা থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আমরা পৌঁছনো যায়। ১৭৫০ পর্যন্ত ডাচ কোম্পানির কাপড় রপ্তানি নির্দিষ্ট হারে বেড়েছে। ১৭৩০ এবং ৪০ এর দশকে ব্রিটিশ আর ডাচেদের রপ্তানির গ্যাপটা বিপুলভাবে কমতে শুরু করেছে এবং এক সময় সামগ্রিক রপ্তানি প্রায় ছুঁয়ে ফেলার অবস্থায় চলে আসে। আবার ১৭৫০-এর দশকের প্রথম পাদে বার্ষিক ব্রিটিশ রপ্তানির পরিমান কমতে থাকে লক্ষ্যণীয় পরিমানে এবং ডাচেদের রপ্তানি বাড়তে থাকে। এক দিকে গড় ব্রিটিশ বার্ষিক রপ্তানি ১৭৩০ এবং ১৭৪০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছরের স্তরে থেকে যায় তেমনি ১৭৫০-এর দশকে পূর্বের স্তর থেকে ৩৫% কমে যায়। ৭.৩ তালিকায় আমরা এই বছরগুলোতে দেখছি ডাচেদের ইওরোপ থেকে আসা বরাতের হ্রাসবৃদ্ধি যেমন নির্দিষ্ট স্তরে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যার মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে, কিন্তুব্রিটিশ রপ্তানি প্রত্যেক বছর ১ লক্ষ পিসের আশেপাশের হিসেবে বেড়েছে।
প্রশ্ন হল ১৭৫০-এর প্রথম পাদে ইংলন্ড থেকে আসা বরাত অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি হলেও কেন বাংলা থেকে ব্রিটিশ কোম্পানির বাংলার কাপড়ের রপ্তানি সংখ্যা কমল । এর উত্তর দিতে গিয়ে সাধারণভাবে ধারণা করে নেওয়া হয় যে ১৭৪০-এর দশকে মারাঠা বর্গিরদের নিয়মিত যে আক্রমন ঘটতে ঠ্যাকায় তাতে বাংলার অর্থনীতিতে, বিশেষ করে কাপড়বয়ন শিল্পে বিপুল ধাক্কা লাগে, যার ফলে বাংলা থেকে ব্রিটিশ রপ্তানি লক্ষ্যণীয়ভাবে কমে যায় (K.K. Datta, Alivardi, pp. 92, 157-59; K.N. Chaudhuri, Trading World, pp. 253, 308, 310; P.J. Marshall, Bengal, pp. 71-73)। কিন্তু এই ব্যাখ্যা, সামগ্রিক অবস্থা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। অস্বীকার করা উপায় নেই মারাঠা হ্যাঙ্গাম বাংলার অর্থনীতিতে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু এটির প্রভাব ছিল স্থানিক এবং খুবই কম সময়ের জন্যে এই ধাক্কা লেগেছিল। বাংলার অর্থনীতি এবং উৎপাদন ব্যবস্থা এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠে খুব শীঘ্রই এবং বলা দরকার এই হ্যাঙ্গামকে যে ব্যাপ্তিতে দেখানো হয়, সেই ব্যপ্তি বাংলায় ঘটে নি। সত্যই যদি বাংলার অর্থনীতিতে বর্গীর হ্যাঙ্গাম বিপুল প্রভাব ফেলত তাহলে স্বাভাবিকভাবে ৭.৫ তালিকায় দেখানো ১৭৪০ এবং ৫০-এর দশকের ডাচ কোম্পানির রপ্তানি বাণিজ্যও মার খেত। মারাঠা আগ্রাসনের যুক্তিতে ১৭৫০-এর দশকে ব্রিটিশ কোম্পানির মোট পিস গুডস সরবরাহের কমার তথ্য কিছুটা হলেও প্রমান করা যায়, কিন্তু এটাও মনে রাখা দরকার এই সময়ক্রমে অন্যান্য পিসগুডস রপ্তানি (এবং স্বাভাবিকভাবে উতপাদনও) বেড়েছে নিয়মিতভাবে। ৭.৭ তালিকা থেকে আরও স্পষ্ট হবে, ১৭৩০-এর দশকে সাধারণ মোটা শস্তার ক্যালিকোর অংশিদারি ছিল ৪৬ শতাংশ, সেটি মোট রপ্তানির তুলনায় ১৭৪০ এবং ৫০-এর প্রথম পাঁচ দশকে কমে আসে ৩১ শতাংশে। কিন্তু আশ্চর্যের হল ১৭৩০-এর দশকে মসলিনের অংশিদারি যেখানে ছিল ২৪ শতাংশ, সেই পরিমান ১৭৪০-এর দশকে বেড়ে হয় ৩৪ শতাংশ এবং ৫০-এর দশকে হয় ৩৯ শতাংশ। এর কারণ দুটি, প্রথমত ইংলন্ড থেকে খাসা মসলিনের বরাত ৭.৯৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হল ১৭.৬২ শতাংশ কিন্তু মোটা ক্যালিকোর বরাত বৃদ্ধি ঘটল খুব কম ১৯.১৯ শতাংশ থেকে ২৩.৩৩ শতাংশে (৭.৭ তালিকা দেখুন)। দ্বিতীয়ত এই রপ্তানির পরিমান পড়ে যাওয়ার আরেকটি অর্থ করা যায়, বীরভূম, বর্ধমান এবং কাশিমবাজারের গারা এবং দোসুতির মত সাধারণ ক্যালিকো উৎপাদন মধ্য ১৭৪০-এর দশকে বর্গির আক্রমনের জন্যে মার খাওয়া (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 6, Consult., 2 July 1743, 1 March 1744; vol. 10, Consult., 23 April 1751; BPC, voL 16, f. 211, 14 July 1743)।
গারার মত সাধারণ ক্যালকোর তুলনায় মসলিন যেহেতু তুলনামূলকভাবে দামি পণ্য, তাই সামগ্রিকভাবে মোট রপ্তানির অঙ্ক ঠিক রাখতে মসলিনের রপ্তানির পরিমান বৃদ্ধি ঘটলে গারা কেনার পরিমান যথেষ্ট কমিয়ে দিতে হয়। ঠিক এই জন্যেই ১৭৪০ এবং ৫০-এর দশকের প্রথম পাদে মোট পিসগুডস রপ্তানির পরিমানে ঘাটতি আসে নি। তাই আমরা যদি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৭৪০/৪১ থেকে ১৭৪৪/৪৫ এবং ১৭৪৮/৪৯ থেকে ১৭৫২/৫৩ পর্বে রপ্তানির মোট ভলিউম(পরিমান) আর মোট ভ্যালুর(মূল্যমান)র তুলনামূলক আলোচনা করি, তাহলে দেখব মারাঠা হ্যাঙ্গাম বাংলার কাপড় শিল্পের বিপুল বৈচিত্রের উতপাদনে এবং মূল্যমানে খুব বেশি দাঁত ফোটাতে পারে নি। আমাদের এই আলোচনায় ওপরে উল্লিখিত বছরগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেন না মারাঠা হ্যাঙ্গাম শুরু হয় ১৭৪২-এর এপ্রিলে এবং শেষ হয় ১৭৫১-র মে/জুন মাসে। এই জন্যে আমরা হ্যাঙ্গাম শুরুর কিছু আগের এবং হ্যাঙ্গাম চলাকালীন এবং হ্যাঙ্গাম শেষ হওয়ার কিছু পরের সময় বেছে নিয়েছি। এই সময়টা বেছে নেওয়ার গুরুত্ব আরও একটা হল ১৭৫২/৫৩ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি দাদনি ব্যবস্থা থেকে গোমস্তা ব্যবস্থায় সরে যায় এবং হয়ত এর জন্যেই ১৭৫৩/৫৪র পরের সময় কিছুটা রপ্তানির পরিমানে প্রভাব ফেলে।

এখানে সম্ভাব্য যুক্তি হল ১৭৪৮/৪৯ থেকে ১৭৫৩/৫৩ সময়ে মোট কাপড় রপ্তানি সংখ্যা কমলেও মোট মূল্যমানে মোট রপ্তানি কমে নি। হয়ত এই সময়ে কাপড়ের দাম বেড়ে গিয়ে থাকবে। আমরা পরে দেখাব কছু কমদামি কাপড়ের দাম হাল্কাভাবে বাড়া ছাড়া সামগ্রিক বস্ত্রের দামের বৃদ্ধি কিন্তু এই সময়ে খুব বেশি ঘটে নি।

৭.৭ তালিকায় আমরা দেখব দুটি কোম্পানি কিন্তু লক্ষ্যণীয়ভাবে বিভিন্ন বিভিন্ন ধরণের কাপড় ভিন্ন ভিন্ন পরিমানে বরাত দিচ্ছে। এই তালিকা থেকে আমরা বুঝতে পারব, আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে ভিন্ন ভিন্ন ধারার কাপড়ের মোট রপ্তানি মূল্যের অংশিদারিটি (এই শ্রেণী বিন্যাসের ভিত্তিটা বুঝতে এই অধ্যায়ের প্রথম দিকে বাংলায় উতপন্ন কাপড়ের শ্রেণীবিভাগ করেছি সেখানে দেখব, কোম্পানিগুলো রপ্তানি কাপড়ের তালিকার ওপরের দিকে থাকা ডুরিয়াকে মসলিনের শ্রেণীতে রেখেছে। আরউইন এবং কীর্তি নারায়ণ চৌধুরীর ধারণা এটি মিক্সড পিস গুডস হলেও হতে পারে। টেলর তার টপোগ্রাফিতে বলছেন এটির মানে দোসুতি double threads (Taylor, Topqgraphy, p.173)। কিন্তু আমার মনে হয় এটি বাংলা ডুরে কাপড়ের চলতি লব্জ যার মানে striped এবং এই ‘dure’ কাপড় মূলত সুতির শাড়ি, আজও বাজারে পাওয়া যায়। ১৮১২ সালে বুকানন হ্যামিলটন যদিও বলছেন duriyas ভাগলপুরে তৈরি হয় এবং এটি মিক্সড পিস গুডস, কিন্তু Ain-i-Akbari (vol.l, p.95) তে একে সুতি কাপড়ের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে (Irwin, p.63)।
১৭৫০ সালের ডুরিয়ার দাম থেকে পরিষ্কার এটা শুধু মসলিনই নয়, মসলিনের দামি প্রজাতির কাপড়। ডুরিয়া তৈরি হত হুগলি এলাকায়। এর দাম ছিল ২৫ থেকে ২৯f, অন্যদিকে ঢাকার বৈচিত্রেরর ডুরিয়ার দাম ছিল ৪৬ থেকে ৫১ টাকার মধ্যে। ডুরিয়ার সাধারণ মিক্সড পিস গুডস এলবানি (allibanny) দাম ছিল ৮.৯, আর এর দামি ভ্যারাইটি শিরসকার-এর (seersuckers) দাম ছিল ১৫ থেকে ১৮ (হিসেবটি করা হয়েছে Bevalligheia এবং Ruijskenstein জাহাজের ইনভয়েস সূত্রে, VOC,2794,ff. 7vo-8; 2829, ff. 134vo- 135vo; ff. 185-85vo)। ডুরিয়া ঢাকায় তৈরি হত এবং ঢাকা যেহেতু কোন মিক্সড পিস গুডস তৈরি করত না, আমরা ধরে নিতে পারি এটি মসলিনের একটি ভ্যারাইটি। কামখানি (kamkhani) রপ্তানি হত খুব কম পরিমানে এবং মসলিনের তালিকায় এটি ছিল না, যদিও আরউইন এবং ওম প্রকাশ দুজনেই একে মসলিন ঠাউরেছেন। Taillefert বলছেন কামখানিকে বিহারের মসলিন কিন্তু স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছেন এটি ততটা মিহি নয় মোটা চরিত্রের কাপড়। যদিও বিহার খাসা এবং মলমলের মত মসলিনও তৈরি করত কিন্তু এই কাপড়গুলো ছিল সাধারণ মানের এবং বাংলার মসলিনের তুলনায় অনেক শস্তাদরের। কামখানির দাম মোটামুটি ছিল ৪.৫ (VOC 2617, HB 24Jan. 1745, Hofwegen জাহাজের ইনভয়েস) কিন্তু এই সময়ে মসলিনের দাম হত খুব কম করে ১৫ থেকে ২০ (VOC 2629, HB, 4 January 1744, ff.199-218, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তি)।
৭.৭ তালিকা থেকে স্পষ্ট ডাচেদের সব থেকে বেশি রপ্তানি ছিল সাধারণ ক্যালিকো আর ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে মসলিন। আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই অষতাদশ শতকের প্রথম পাদে ডাচেদের মোট রপ্তানির পরিমানে ক্যালিকোর অংশিদারি ছিল ৪০ থেকে ৫৬ শতাংশ, ১৭৩০ থেকে ১৭৫৫-এর তিন দশকের প্রথম পাঁচ বছরের অংশিদারি হল যথাক্রমে ৪৬, ৪০ এবং ৫৬ শতাংশ। ব্রিটিশদের মোটা ক্যালিকোর অংশিদারি ছিল ৪৬ শতাংশ ১৭৩০-এ, ১৭৪০ এবং ৫০-এর দশকে ৩১ শতাংশ। উচ্চমানের ক্যালিকোর ভ্যারাইটির বরাতের পরিমান খুব পরিবর্তিত হয় নি, ডাচেদের ক্ষেত্রে ১৩ থেকে ২০ শতাংশ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে ১৯ থেকে ২২ শতাংশ। মসলিনের ক্ষেত্রে ডাচ অংশিদারি ১৮ থেকে ২৬ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করলেও ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে ১৭৪০-এর দশকে বেড়েছিল ১০ শতাংশ, ১৭৫০-এর দশকে ৫ শতাংশ। সিল্কপিস গুডসের ডাচ অংশিদারি ছিল ১০-১১ শতাংশ বৃদ্ধি, সেটা ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে ছিল ১ থেকে ২ শতাংশ। মিক্সড পিস গুডসে ডাচেদের রপ্তানি অংশিদারি কমে আসতে থাকে নিয়মিতভাবে এবং ব্রিটিশদের রপ্তনির পরিমান ওঠানামা করেছে। এই যে সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে আমরা আলোচনা করলাম, এর অর্থ কি দাঁড়াল? আমাদের আলোচ্য সময়ে দুই কোম্পানির দুটি প্রধান কাপড় পণ্য রপ্তানি ছিল এক্কেবারে সাধারণ শস্তার ক্যালিকো এবং খুব দামি মসলিন। কোম্পানিরা যে শুধুই শস্তার কাপড় রপ্তানি করত এই তত্ত্বটা আমাদের দেওয়া সংখ্যাতত্ত্বের সঙ্গে মেলেনা। তারা মাঝারি গোছের মিহি ক্যালিকো, বা রেশম গুডস বা মিক্সড পিস গুডসের মত কাপড়ের সঙ্গে এক্কেবারে শস্তা এবং এক্কেবারে দামি – দুই ধরণের কাপড়ই খুব বেশি পরিমানে রপ্তানি করত। এই ধরণের রপ্তানির কারণ হল যতদূর সম্ভব তারা ইংলন্ডে কাপড় ছাপা ছোপানো কোম্পানিগুলির চাহিদা পূরণ করত, যারা এক্কেবারে দরিদ্র থেকে উচ্চতম ধনীদের ছাপা কাপড়ের চাহিদা পূরণ করত। আগেও আমরা আলোচনা করেছি ছাপা কাপড়ের জন্যে লন্ডন বা ইওরোপিয় কাপড় ছাপাই কারখানাগুলি খুব শস্তা এবং খুব দামি দুধরণের কাপড়ই ব্যবহার করত। (চলবে)