সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
দুই.দুই নবাবি বাংলা, ১৭০০-১৭৫৭
মুর্শিদকুলির প্রয়াণের পরে সুজাউদ্দিন খান বাংলার নায়েব-নাজিম হলেন। প্রশাসনিক বিষয়ে তাঁর যথেষ্ট দক্ষতা থাকলেও শ্বশুরের মত সময়কে বোঝার, চালনা করার ক্ষমতা এবং নবাবি ব্যক্তিত্বের অভাব ছিল। দিল্লির দরবারে নিয়মিত ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা রাজস্ব পাঠিয়ে বাংলায় শ্বশুরের পদ্ধতিতে শান্তি কিনে বাংলা নির্ভয়ে শাসন করেছেন (ঐ p.289, বলছে মুর্শিদকুলি দিল্লিতে নিয়মিত ১ কোটি ৩ লক্ষ টাকা রাজস্ব হিসেবে পাঠাতেন কিন্তু সালিমুল্লাহ ৬৩-৬৪ পাতায় বলছেন পরিমাণটা ছিল ১ কোটি ৩০ লক্ষ)। শাসন ক্ষমতায় বসেই তিনি সে সময়ের বাংলার রাজনীতি এবং অর্থনীতির তিনি প্রধান অনুঘটক হাজি আহমেদ, দেওয়ান আলম চাঁদ এবং ব্যাঙ্কার জগতশেঠকে তার পরামর্শদাতা সভায় নিয়োগ করলেন। তার মত করে বাংলা প্রশাসনের লাগাম নিজের হাতে রেখেছিলেন (Riyaz, 291-92; Saluimullah, Tarikh-i-Bangala, p.133; Sier, vol.I, pp.279, 281; J.N. Sarkar (ed.), History of Bengal, vol.II, pp. 423,425.)।
১৭৩০এর সুজাউদ্দিনের বাংলার সরকার সমঝোতার সরকার বলে যে একটা তত্ত্ব কয়েকজন ঐতিহাসিক দেন, সেটা পুরপুরি ঠিক নয়। তবে এই তত্ত্ব থেকে একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে সময় রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং নবাবি সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় জমিদার-মনসবদার-ব্যাঙ্কার গোষ্ঠীর ক্ষমতা আর প্রভাব ক্রমশ বেড়ে চলেছে। তার ফলে সুজাউদ্দিনকে এই গোষ্ঠী থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত করে পরামর্শদাতা সভা বানাতে হচ্ছে (Calkins, ‘Ruling Group’, p. 805)। বাংলার সঙ্গে সম্পর্কহীন এবং সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা মনসবদার-জমিদার গোষ্ঠীরও অংশ না হয়েও আলিবর্দি আর হাজি আহমদ, দুজনের উচ্চপদে বৃত হলেন সুজাউদ্দিন ক্ষমতায় বসতেই। শ্বশুরের উল্টো পথে হেঁটে আমোদ আহ্লাদ আশনাইতে ভেসে থাকতে চাওয়া সুজাউদ্দিন নিজেকে দৈনন্দিনের দরবারি রাজকর্ম থেকে সরিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন বলেই তিনি দৈন্দিনের কাজ দেখাশোনা করতে পরামমর্শদাতা গোষ্ঠী গঠন করেন। এরা সরকারের প্রশাসনের লাগাম নিজেদের হাতে তুলে নিল (Riyaz, p.292-93.)। তবে পারসিক ঐতিহাসিকের মতে সুজাউদ্দিনের শাসনকাল (১৭২৭-১৭৩৯) মোটামুটি স্থায়িত্ব আর বিকাশের সময়। রিয়াজের লেখক বলছেন, Constantly animated by a scrupulous regard for justice, and always inspired by fear of God, he uprooted from his realm the foundations of oppression and tyranny (Ibid., pp. 290-91)। গোলাম হুসেইন খান বলছেন, সুজাউদ্দিনের রাজত্বে বাংলা came to enjoy so much prosperity, as to exhibit everywhere an air of plenty and happiness(Sier, vol.I, p.280)। জন শোরও প্রায় ৫০ বছর পরে সুজাউদ্দিনের সময় আলোচনা করতে গিয়ে বলছেন, তার সময় ছিল moderate, firm and vigilant, and seems the only part of the whole period(from Murshid Quli to Mir Qasim), with an exception of the last years of Alivardi Khan, in which the conduct of the government was in any respect calculated for the improvement of the country(Minute of Sir John Shore, W.K. Firminger (ed.), Fifth Report, vol.II, p.9)।
সুজাউদ্দিন খানের স্থলাভিষিক্ত হলেন সরফরাজ খান। প্রবীণ আমলা আলিবর্দি খান সুজাউদ্দিনকে গিরিয়ার যুদ্ধে পরাস্ত করে ষোল বছরের জন্যে (১৭৪০-১৭৫৬) বাংলার মসনদে আসীন হলেন। আলিবর্দির সময় নিয়ে উচ্ছসিত ঐতিহাসিক গুলাম হুসেন বললেন, তাঁর সময় বাংলার প্রতিটি ক্ষেত্রে এতই স্বচ্ছলতার মুখ দেখেছিল যে তার সাম্রাজ্যে প্রতিটা রায়ত সুখী ছিল এবং তাদের সক্কলের জন্যে তিনি বহু জনকল্যাণকর প্রকল্প চালু করেন। তার সময়ে রায়তেরা বিশেষ করে চাষীরা ব্যাপক নিরাপদ ছিল (Sier, quoted in K.K. Datta, Alivardi, p.140.)। কিন্তু তার শাসনের প্রথম কয়েক বছর বাংলার প্রশাসন ব্যাপক চাপে পড়ে যায় মারাঠাদের আর আফগানদের ঝটিকা আক্রমন (১৭৪২-৫১) সামলাতে গিয়ে। সে সময় তিনি প্রজাদের জন্যে জনকল্যাণকর কাজ করার সময় পান নি। ১৭৫১-র মে-জুন মাসে মারাঠাদের বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা চৌথ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুক্তি করলেও বুঝলেন যে দীর্ঘকাল ধরে বাংলার একটী অঞ্চলের গায়ে যে যুদ্ধের ক্ষত তৈরি হয়েছে, সে সব সারাতে বেশ বহু প্রকার জনকল্যানকর প্রকল্প নেওয়া দরকার। বিচার বুদ্ধি আর প্রজ্ঞান দিয়ে সময়কে বিশ্লেষণ করে তার প্রজাদের নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধির কাজে নিজেকে নিয়োগ করলেন এবং সেই কাজেই তিনি তার বাকি জীবন উতসর্গ করেছিলেন (Calendar of Persian Correspondence, vol. II, pp.191, 197, quoted in K.K. Datta, Alivardi, p.140)। মারাঠাদের হাতে সম্পূর্ণ বা আংশিক নষ্ট হয়ে যাওয়া শহর আর গ্রামগুলি নতুন করে গড়ে তুলতে পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন।
আলিবর্দি ছিলেন প্রাজ্ঞতম জনকল্যাণমুখী শাসক যিনি গ্রামীনদের বিকাশ এবং চাষবাসের কাজে সহায়তা করার জন্যে দরাজ হাতে অর্থ সাহায্য করতে দ্বিধা বোধ করলেন না। আলিবর্দি মারাঠা হ্যাঙ্গাম থেকে বাংলার ক্ষত সারাতে এবং নির্দিষ্ট কাল শান্তি সমৃদ্ধি বজায় রাখতে কি কি করেছিলেন, তার বর্ণনা আমরা পাচ্ছি করম আলির বর্ণনায়, কিভাবে তার রাজত্বের শেষ কালে রাজধানী শহর মুর্শিদাবাদের বিস্তৃতি ঘটছে এবং বিকাশলাভ করছে (Muzaffarnama, quoted in K.K. Datta, Alivardi, p.140)। তার পরের নবাব সিরাজদ্দৌল্লা মাত্র ষোল মাসের জন্য নবাবি করার সুযোগ পান এবং ১৭৫৭র বর্ষায় বাংলার সার্বভৌম নিজামতের পতন ঘটে পলাশি যুদ্ধে এবং তারপরেই ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনা ঘটে বাংলাজুড়ে।
অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদের বাংলার ইতিহাসের আরেকটা অস্বস্তিকর চিত্র ছিল আবওয়াব আদায়। আবওয়াব হল রাজস্বের ওপরে আরও কিছু অতিরিক্ত শতাংশ হারে রাজস্ব আদায় অথবা রাজস্বের ওপরে আরও একটা কর আরোপ করা। রাজস্ব আদায় হত তুমার (তোমার) জমা বা সাধারণ জরিপ অনুযায়ী আর আবওয়াব হল বরাদ্দ রাজস্বের ওপর নির্দিষ্ট হারে অতিরিক্ত রাজস্ব। মুর্শিদকুলির আমলে ১৭২৮ সাল পর্যন্ত তুমার জমার পরিমান ছিল ১,৪২,৪৫,৫৬১ টাকা (Minute of John Shore, in Firminger (ed.), Fifth Report, volII, p.7)। সুজাউদ্দিন এর ওপরে ১৯,১৪,০৯৫ টাকা আবওয়াব আরোপ করেন মুর্শিদকুলি খানের প্রথা অনুসরণ করে (Ibid., vol.II, pp.209-12 মুর্শিদকুলির আবওয়াব ২,৫৮,৮৫৭ টাকার বেশি বাড়ে নি Sinha, Economic History of Bengal, vol.lr, p.5)। প্রত্যেক জমিদারের জমিদারির জরিপ অনুযায়ী তাদের ওপর অতিরিক্ত আবওয়াব আরোপ করা হত এবং এই পরিমান অতিরিক্ত রাজস্ব হিসেবে রায়তদের থেকে আদায় করে নেওয়ার অধিকার দেওয়া হত জমিদারদের। আলিবর্দির সময় অতিরিক্ত ২,২২,৫৫৪ টাকা আবওয়াব ওঠে। বাংলার অর্থনীতিতে এই আবওয়াব আদায়ের ফল কি ফলেছিল তার প্রভাব আজ মাপা খুব কঠিন, কিন্তু যারা বলছেন এই আবওয়াব জারির ফলে বাংলার অর্থনীতি অধঃপাতে যায়, পণ্যের দাম বাড়ে, উৎপাদন কমে, তাদের যুক্তির সারবত্তা আছে কী না সন্দেহ (Brijen K. Gupta, Sirajuddaulla’h, p.33. এবং দাম বৃদ্ধির প্রশ্নে দশম অধ্যায় দেখুন)। জন শোর বলছেন, — আবওয়াব জারির প্রভাব হয়ত সমাজে খুব বেশি অনুভূত হয় নি it may be that, due to the growth of commerce and, increased imports of specie, the resources of the country were at that period adequate to the measure of exactions (Minute of John Shore, in Firminger (ed.), Fifth Report, volII, pp. 11-12.)। এই সময়ে রাষ্ট্রের পক্ষে একটা ক্ষতিপূরণীয় চরিত্র হল, রাজস্ব কর্মীদের অধিকার ছিল গরীব চাষীদের তাকাভি নামক সহজ সুদে চাষের যন্ত্রপাতি কেনার ঋণ দেওয়ার প্রকরণ। সেই প্রথা তার পরের সব ক’জন নবাব অনুসরণ করেছেন (Abdul Karim, Murshid Quli, p.90; Salimullah, Tarikh-i-Bangala, p.45; J.N. Sarkar (ed.), History of Bengal, vol.II, p.4.12)।
দুই.তিন অর্থনৈতিক পরিবেশ
মুর্শিদকুলি খাঁ আর তার উত্তরাধিকারীদের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে দেখেছি, অতীতে মুঘল সুবা বাংলা ভূখণ্ড যে স্থায়িত্বের ভিত্তি অর্জন করেছিল, সেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রবাহটি সফলভাবে নবাবি আমলে বয়ে আসবে মুর্শিদকুলি খাঁর অনমনীয় প্রচেষ্টা সূত্রে। তাঁর আমলে শান্তিপূর্ণ স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবেশের তৈরি হওয়ার ফলে বাংলায় শক্তিশালী নিজামতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হল, শিল্পের বিকাশ ঘটল, ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি পেল এবং উদ্যমী রাজস্ব আদায়ের ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটল। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাজোরদার হওয়ায় বাংলার নিজামতের বাজারগুলোও চাঙ্গা হতে শুরু করে। অষ্টাদশ শতকের প্রথমপাদে রাজনৈতিকভাবে শান্ত বাংলায় ব্যবসা বাণিজ্য এবং শিল্প সমৃদ্ধির আকর্ষণে ভারতবর্ষের নানান প্রান্ত, এশিয়ার নানা দেশ এমন কি ইওরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বণিকেরা বাংলায় উদ্বৃত্ত তৈরির লক্ষ্যে বসতি তৈরি করে। ১৭৫৬-৫৭ সালে বাংলায় আসা মুসাফির গ্রাউস লিখছেন — foreign and domestic trade of Bengal are very considerable; as may appear from the great number of Persians, Abyssinians, Arabs, Chinese, Gujarats, Malabarians, Turks, Moors, Jews, Georgians, Armenians and merchants from “all parts of Asia’who resort there” (Grose, East Indies, vol.II, p.234.)। এই ধরণের বর্ণনা আমরা সেই সময়ের বিভিন্ন মুসাফিরের লেখালিখিতে পাচ্ছি (S.C. Hill, Bengal in 1756-57, vol.Ill, p.390; Orme, Military Transactions, vol.II p.4)।
সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে বাংলার সমৃদ্ধি প্রায় উপকথাসুলভ মিথে পরিণত হয়। বাংলার বাজারে পণ্যের কিফায়তি দামের তথ্য বিভিন্ন বৈদেশিক মুসাফিরের লেখাপত্রে হামেশাই উল্লিখিত হয়েছে। রিয়াজের লেখক বাংলাকে বলছেন জিন্নাতুলবিলাদ, স্বর্গের প্রদেশ, আওরঙ্গজেব বাংলা সম্বন্ধে বলছেন সুবাগুলোর স্বর্গ (Riyaz, p.4)। একটিও মুঘল ফরমান বা পরওয়ানা বাংলাকে ভারতের স্বর্গ সম্বোধন না করে লেখা হত না। অষ্টাদশ শতকের পাঁচের দশকে কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান কুঠিয়াল জাঁ ল বাংলাকে বলছেন পার এক্সেলেন্স, সর্বোতকৃষ্ট প্রদেশ (Hill, Bengalin 1756-57, vol.III, p.160)। ১৬৬০-এ ফরাসী মুসাফির বার্নিয়ে বাংলা সম্বন্ধে লিখছেন, — the rich exuberance of the country … has given rise to a proverb … that the Kingdom of Bengal has a hundred gates open for entrance, but not one for departure (Bernier, Travels, p.440.)। বাংলার পণ্যের বৈচিত্র যেমন প্রবাদপ্রতীম, তেমনি তার কৃষিজ উতপাদনের উতকর্ষও বিপুল ব্যপ্ত। ভারতের অন্যান্য এলাকার মত বাংলাও ছিল কৃষি অর্থনীতি নির্ভর সুবা। কিন্তু কৃষি অর্থনীতির বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেও সে কৃষি উতপাদনগুলিকে বিপুল দক্ষতায় প্রক্রিয়াকরণ করিয়ে সফলভাবে বাজার ভিত্তিক পণ্যায়ন ঘটাতে পেরেছিল। একই সঙ্গে পণ্য আদান প্রদানের উপযোগী কাঠামো তৈরি করে। পণ্যবাহী যান বাহন যাতে সহজে বিভিন্ন এলাকার যাতায়াত করতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে বাংলাজুড়ে সুলভ যোগাযোগ জাল গড়ে উঠেছিল।
বাংলার শিল্প সম্বন্ধে বার্নিয়ে লিখছেন, — there is in Bengale such a quality of cotton and silk that the Kingdom may be called the common storehouse for these two kinds of merchandise, not of Hindoustan or of the Empire of the Great Mogul only, but of all the neighbouring Kingdoms, and even Europe (Ibid., p.439)। কারিগরিতেও বাংলা দক্ষতার শৃঙ্গে উঠে সবার ঈর্ষার কারণ হয়েছে। Pyrard de Laval লিখছেন, — The inhabitants, both men and women, are wondrously adroit in all such manufactures such as of cotton, cloth. And Silks and in needlework such as embroideries which are worked so skillfully down to the smallest stitches that nothing prettier is to be seen anywhere (Pyrard de Laval, Voyages, vol.I, p.329)। এর ফলে উপনিবেশপূর্ব সময়ে the balance of trade was against all nations in favour of Bengal; and it was the sink where gold and silver disappeared withotit the least prospect of return (Dow, Hindostan, vol. I, p.ciii)।
১৭৩০ পর্যন্ত হুগলি ছিল বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অঞ্চল, বাংলার অর্থনৈতিক রাজধানী। মধ্য ১৭৩০ উত্তর সময়ে ক্রমশ কলকাতার উত্থানের ফলে হুগলির চাকচিক্য ম্লান হয়ে থাকে। ১৬৩২ সালের পরে সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের প্রধান বন্দর হিসেবে সাতগাঁয়ের পতনের পরে হুগলির উত্থান ঘটে সপ্তদশ শতক জুড়ে এবং অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদ পর্যন্ত (সাতগাঁর পতন এবং হুগলির উত্থান বিষয়ে মতামত জানতে S. Chaudhury, ‘Rise and Decline of Hughli’, BPP, Jan-June 1967, pp. 33-67 দেখতে পারেন)।
মুর্শিদকুলি খাঁকে বাংলার সুবাদার হিসেবে নিয়োগের আগে পর্যন্ত হুগলির ফৌজদার কিন্তু সরাসরি সম্রাট আওরঙ্গজেবের ফরমানে নিযুক্ত হতেন (এতটাই ছিল হুগলি অঞ্চলের গুরুত্ব — অনুবাদক)। হুগলী বন্দর বা বন্দর পরিচালনায় আমলা নিয়োগের ক্ষমতা বাংলার সুবাদারের ছিল না। মুর্শিদকুলি বাংলার সুবাদার হয়ে, নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে হুগলির ফৌজদারি দপ্তরকে বাংলার নিজামত এবং দেওয়ানির অধীনে নিয়ে এলেন (Riyaz, pp. 30, 262-63)। রিয়াজের লেখক বলছেন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে শান্তিপুর্ণ ও খোলামেলা আলোচনার তরিকায় সম্পর্ক তৈরিতে মুর্শিদকুলি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। বিশ্বের সব এলাকার সব ধরণের বণিকের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক বজায় রাখতেন। কোনো বণিক প্রতিষ্ঠানে এক দামও (মুঘল মুদ্রা ব্যবস্থায় তামার সর্বনিম্ন মুদ্রা, আজকে পয়সার সমান) অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতেন না। গোলাম হুসেন সালিম বলছেন, মুর্শিদকুলির সময় হুগলি বন্দরে সব থেকে বেশি বণিক, ব্যবসায়ী আসতে শুরু করে (Riyaz, p.30.)। সালিমুল্লাহ লিখলেন — The encouragement which was given to trade by Jaffer Khan [M’urshid Qμli], who directed that nothing but the established rate of duties should, be exacted, soon made the port of Hooghly a place of great importance. Many wealthy merchants, who resided there, had ships of their own which they traded to Arabia, Persia and other countries (Salimullah, Tarikh-i-Bangala, p.81)।
বস্তবিকই মুর্শিদাবাদ রাজধানী শহর হিসেবে বেড়ে ওঠার আগেই, অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে হুগলি বন্দর অঞ্চলে বিপুল শিয়া বসতি স্থাপন হয়েছিল। বাংলায় শিয়া রাজত্ব গড়ে ওঠায় বহু পারসিক আগন্তুক হুগলী আঞ্চলে আসতেন জীবিকা নির্বাহের খোঁজে। পরের দিকে এই বহুজাতিক বন্দরের সঙ্গে সমান্তরালভাবে আন্তর্জাতিক রাজধানী শহর মুর্শিদাবাদ গড়ে উঠল। কিন্তু ভাগ্যসন্ধানীরা বাংলার রাজনৈতিক রাজধানী মুর্শিদাবাদের থেকেও হুগলি বন্দরকে ভাগ্য ফেরাবার এলাকা হিসেবে বেছে নিতেন (J.N. Sarkar (ed.), History of Bengal, vol.II, p.419)। কলকাতার উত্থান হুগলির ঔজ্জ্বল্য ম্লান করে দিচ্ছিল। এর একটা বড় কারণ হল কলকাতাভিত্তিক ইওরোপিয় কোম্পানির আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার ধাক্কা। এই প্রতিযোগিতায় হুগলি ভিত্তিক এশিয় বণিকেরা আন্তঃএশিয় ব্যবসায় দাঁড়াতে পারল না। কিন্তু অষ্টাদশ শতকের পারসিক ঐতিহাসিকেরা অন্য মত পোষণ করছেন। তাদের মতে ফৌজদারদের কঠোর বেআইনি রূপিয়া আদায়ের বিরক্ত হয়ে বণিকেরা ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠিত কলকাতা শহর সংলগ্ন কম শুল্কের বন্দর এবং তাদের মুক্ত বাণিজ্য নীতির প্রতি আকর্ষিত হয় (Riyaz, p.30; Salimullah, p.136)। তবে ডাচ নথি থেকে উদ্ধার করা হুগলী বন্দরে আসা আর বন্দর ছেড়ে যাওয়া জাহাজের তালিকা থেকে একটা বিষয় স্পষ্টভাবে বলা যায় ১৭১৫-র পরে হুগলির পতনের যে তত্ত্ব প্রচার করা হয়েছে তার ঐতিহাসিকতা বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করার অবকাশ রয়ে যায় (P.J. Marshall, Bengal, p.65; East Indian Fortunes, chapter 3)। ১৭২৮-এ হুগলি বন্দরে ব্যবসার পরিমান আন্দাজ করা যায় ‘সায়ের বক্সবন্দর’এর হিসেব থেকে।‘সায়ের বক্সবন্দর’ হল হগলী বন্দরের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী আমলা মীর বক্সীর দপ্তরের বিদেশী বণিকদের থেকে আমদানি রপ্তানি শুল্ক সায়ের আদায়। সে বছরে অঙ্কের পরিমান ছিল বিদেশে যাওয়া পণ্যের মূল্যের ওপরে ২.৫% শুল্ক ধরে ২,২১,৯৭৫ টাকা (O’Mally and M.M. Chakraborty, Hugli District Gazetteer, p.47; J.C. Sinha, Economic Annals, p. 7. তবে Fifth Reportএ ‘Syer Bakshbandar’ হিসেবে দেখানো হয়েছে Rs.2,97,941, W.K. Firniinger (ed.) Fifth Report, vol. II, p.199)। এই হিসেবে হুগলির বাৎসরিক ব্যবসা ৮৯ লক্ষ টাকা। আজ থেকে ৩০০ বছরেরও বেশি সময় আগে ৮৯ লক্ষ টাকা, আজকের বাজার দামে বিশাল অঙ্ক। তাই আমরা যদি এই সংখাকে অত্যুক্তি হিসেবেও ধরে নিই, তাহলে বলা যায় ৩.৫ শতাংশ শুল্কবিভাগের চাপানো কর হিসেব করলে (যদিও বলা হয়েছে এটি ২.৫ শতাংশ) দেখা যাবে হুগলির বাৎসরিক মোট ব্যবসার পরিমান ৬৩ লক্ষ টাকা। সে যুগে বার্ষিক ৬৩ লক্ষ টাকা মোট ব্যবসায় হুগলি কলকাতার তুলনায় অনেকটা এগিয়ে থাকছে। হুগলি কলকাতার কাছে গুরুত্ব হারাতে থাকে ১৭৩০-এর মাঝামাঝি সময়ে।
যাই হোক, বাংলার এশিয় বণিকেরা কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দজুড়ে দীর্ঘকালের সমুদ্র এবং রাজপথের বাণিজ্যের পিলসুজ জ্বালিয়ে রেখেছিল। পাশাপাশি ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোও এই সময়ে বিপুল লাভজনক রপ্তানি বাণিজ্যে অংশ নিচ্ছে। তাই অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে বাংলায় বাণিজ্যের পরিমান ছিল বিশাল অঙ্কের। বাংলার পণ্য শস্তা, ভারতের অন্যান্য এলাকার থেকেও অনেক শস্তা এবং প্রাচুর্যে ভরপুর। ১৭৩৫-এ কোর্ট অব ডিরেক্টর্স লিখছে Bengal is not only the cheapest part of India to live in, but perhaps the most plentiful country in the whole of the world (DB, vol.106, f.413, para. 41, 31 Jan. 1735.)। পরের বছর কোর্ট অব ডিরেক্টর্স লিখল provisions of all kind are at such low rates in Bengal and …perhaps it is one of the most plentiful parts of the globe (Ibid., vol.106,.f.610, para 79, 23 Jan. 1736)। শ্রমিক প্রচুরও পাওয়া যেত এবং শস্তাও ছিল। বাংলার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দরুন ব্যবসা বাণিজ্যের বিকাশ ঘটছিল দ্রুতলয়ে। বাংলার অর্থনীতি স্বনির্ভর। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে যেমন নিষেধাজ্ঞা ছিল, তেমনি বাংলার জলবায়ু আর জীবনযাত্রার জন্যে এ দেশে আমদানি পণ্যের বাজার ছিল না বললেই চলে। এই সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে আমরা অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে বাংলার ব্যবসা এবং অর্থনীতিকে ধরার চেষ্টা করব এবং দেখার চেষ্টা করব পলাশীর পরে ব্যবসা এবং অর্থনীতি কতটা পরিবর্তিত হয়েছে; যদি পরিবর্তিত হয়েও থাকে, তাহলে অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়পাদে ব্রিটিশ বিজয়ের পরে কী ধরণের পরিবর্তন ঘটছে সেটাও বোঝার চেষ্টা করব। (চলবে)