সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
সপ্তম অধ্যায়
কাপড় রপ্তানি — তাঁতি এবং এশিয় ব্যবসায়ী
তাঁতপণ্য রপ্তানিতে কোম্পানিগুলি
বিভিন্ন ধরণের রপ্তানিযোগ্য কাপড়ের যে অংশিদারি আমরা দেখলাম, এবারে সেই আলোয় ডাচ এবং ব্রিটিশ কোম্পানিগুলির মোট রপ্তানির পরিমান নিয়ে আলোচনা করব। কিন্তু তথ্যের অপ্রতুলতার জন্যে অধিকাংশ বছরের ডাচ কোম্পানির মোট রপ্তানির সংখ্যা পাচ্ছি না, ফলে কিছু সময়ের জন্যে বা আমাদের আলোচ্য সময়ে দুই কোম্পানির মোট রপ্তানির পরিমান তুলনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবে আমরা দুবছরের ১৭৫৩/৫৪ এবং ১৭৫৪/৫৫ ডাচ তথ্য পাচ্ছি। ৭.৮ তালিকায় আমরা এই দুবছরের জন্যে দুই কোম্পানির মোট রপ্তানি মূল্যের এবং সংখ্যার তুলনামূলক তালিকা দিলাম।

৭.৮ তালিকা থেকে পরিষ্কার এই দুবছরের ব্রিটিশ কোম্পানির গড় রপ্তানি ছিল ডাচেদের থেকে ১,১০,২৩৯ পিস বেশি এবং ডাচেদের তুলনায় গড় বাৎসরিক ব্রিটিশ রপ্তানি মূল্য ৯,৭৪,৫৪৬ টাকা বেশি ছিল। পার্থক্যের জন্যে গড় প্রতি পিসের মূল্য হল ৮.৬ টাকা। কিন্তু এই দুবছরে ডাচ কোম্পানির কাপড়ের গড় দাম ছিল ৬ টাকা এবং ব্রিটিশ কোম্পানির ৬.৮ টাকা (কে এন চৌধুরীর ট্রেডিং ওয়ার্ল্ড বইতে ব্যবহৃত তথ্য নির্ভর করে)। কারণ এই বছরগুলিতে তারা শস্তার ক্যালিকো বিপুল পরিমানে রপ্তানি করেছে, অন্য দিকে ব্রিটিশ কোম্পানি দামি মসলিন রপ্তানি করেছে (তালিকা ৭.৭)। ওপরের তথ্য বিশ্লেষণের নিহিতার্থ হল, আমরা যখন বস্ত্রের দাম নির্ধারণ করব, সে ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষ চরিত্রের বস্ত্রের মোট রপ্তানি মূল্য এবং সে সবগুলোর মোট পরিমানের তথ্য থাকা জরুরি। এই সূত্র থেকে আমরা বস্ত্রের মোটামুটি একটি পিসের দাম নির্ধারণ করতে পারলাম। আরেকটি সূত্র থেকে আমরা বস্ত্রের প্রতিটি খণ্ডের দাম নির্ধারণ করতে পারি, সেটি হল আড়ংএ উতপাদিত কাপড়ের দামের তথ্য বিশ্লেষণ। শুধুই মোট রপ্তানির মূল্যের সঙ্গে মোট খণ্ডের তুলনায় বস্ত্রের দাম নির্ধারণের যে কোন সাধারণীকরণ আমাদের সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেবে না, এটা মাথায় রাখতে হবে (খণ্ডের দামের জন্যে কীর্তি নারায়ণ চৌধুরীর ট্রেডিং ওয়ার্ল্ড ৫৪৪-৫৪৫ পাতা দেখা যেতে পারে)।
ডাচ কোম্পানির আন্তঃএশিয় কাপড় বাণিজ্য
সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ডাচ কোম্পানির এশিয় খণ্ডের মোট বাণিজ্য মূল্যে আন্তঃএশিয় বাণিজ্য বড় ভূমিকা পালন করেছে। এই আন্তঃএশিয় বাণিজ্য উদ্যমের একটা বড় পরিমান ছিল বাংলায় উৎপাদিত কাপড়, বিশেষ করে সপ্তদশ শতকের শেষ এবং অষ্টাদশ শতকের প্রথমদিককার দশকগুলিতে। আলোচ্য তথ্য থেকে পরিষ্কার ডাচ কোম্পানির এশিয় রপ্তানি বাণিজ্য মূলত নির্দেশিত ছিল যে সব এলাকায় (কাপড় রপ্তানির কমা সংখ্যায়), তার মধ্যে প্রথম বাটাভিয়া (ইন্দোনেশিয় দ্বীপুঞ্জের জন্যে), দ্বিতীয় স্থানে পারস্য উপসাগর, তৃতীয় স্থানে জাপান; মালাবার, শ্রীলঙ্কা আর করমণ্ডল ইত্যাদি এলাকায় কাপড় রপ্তানি হত কিন্তু খুব বেশি পরিমানে যেত না (Om Prakash, Dutch Company, pp. 138-39, 146-47, 168-69, 178-80)। এখানে আরও একটি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ যে, সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রপ্তানি হওয়া মোট বস্ত্রের তুলনায় অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকের দ্বিতীয় দশকে মোট বস্ত্রের রপ্তানি অনেকটা পরিমান কমে যায়, এই তথ্যটি আমরা ৭.৯ তালিকা থেকে পাই।

ডাচ কোম্পানির এশিয় বাজারে কমতে থাকা রপ্তানিযোগ্য কাপড় খণ্ডের পরিমান আবার নতুন করে বৃদ্ধি পেতে থাকে ১৭৩০-এর দশকের প্রথমার্ধে। কয়েক বছর পর আবার কাপড় রপ্তানির পরিমান ঢালের দিকে গড়াতে থাকে ১৭৪০ এবং ১৭৫০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছরের হিসেবে আমরা দেখব ৭.১০ তালিকায়। ৭.১০ তালিকার ঝোঁকগুলি নিম্নরূপ — ১) এই সময় সারনীতে বাটাভিয়ায় মোট রপ্তানি করা সর্বাধিক পরিমান কাপড় ১৭৩০এর প্রথম পাঁচ বছরের ৫৪ শতাংশ থেকে ১৭৪০-এর প্রথম পাঁচ বছরে বেড়ে হয় ৬৭ শতাংশ এবং ১৭৫০-এর দশকে হয় ৮৭ শতাংশ যদিও অন্যান্য এশিয় বাজারে ডাচেদের মোট রপ্তানি কমেছে; ২) বাটাভিয়ার পরে জাপানের অংশিদারি ছিল ১৭৩০-এর দশকে ২১ শতাংশ, কিন্তু ১৭৪০-এ এটি পারস্যের কাছে হেরে যায় কারণ এর অংশিদারি পড়ে যায় ৬ শতাংশ এবং পারস্যের বেড়ে যায় ১১ শতাংশ। ১৭৫০এর দশকে জাপানে বাজার বাড়ে, যদিও ৫ শতাংশ রপ্তানি পড়ে যায় আর পারস্যে ৩ শতাংশ রপ্তানি কমে যায়। অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে ১৭৩০-এর দশকে মালাবার আর করমণ্ডলের অংশিসারি মোটামুটি ৫ শতাংশ ছিল এবং তার পরে অংশিদারি কমতে থাকে ১৭৫০-এর দিকে এটি প্রায় শুন্যে গিয়ে পৌঁছায়। শ্রীলঙ্কায় এই অংশিদারি ছিল ৩ শতাংশ ১৭৩০-এর দশকে, ১৭৪০-এ এটি বেড়ে হয় ১২ শতাংশ কিন্তু পরের দশকে ১৭৫০-এ কমে হয় ৪ শতাংশ। সিয়াম, কোচিন, মালাক্কা, মোকা, মাকাসর এবং উত্তমাশা অন্তরীপের অংশিদারি খুবই কম ছিল শুধু প্রথম দুটি এলাকা ১৭৩০-এর দশকে ছিল ২ শতাংশ করে।

ডাচ কোম্পানি এশিয় বাজারে যে পরিমান কাপড় রপ্তানি করত তার পরিমান বেশ ভাল, ২,১৫,৩৯৯, ১,২৮,৫৮৫, ৮৫,৭০৪ বিশেষ করে ইওরোপের ১,৬৭,০৭১, ২,০৪,৩৮০, ২,৬৮,৪৪৮-এর সংখ্যার তুলনায় (তালিকা ৭.৫ এবং ৭.১০ দেখুন)। কিন্তু এই সংখ্যার মধ্যে লুকিয়ে আছে এশিয়া আর ইওরোপে বিভিন্ন ধরণের কাপড়ের আলাদা আলাদা রপ্তানি পরিমান — আদতে মনে রাখা দরকার এই সংখ্যার ওপরে রপ্তানির মোট মূল্য কিন্তু নির্ভর করে বিশেষ করে যখন আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই সময়ে প্রতিটা বিশেষ ধরণের কাপড়ের নির্দিষ্ট দামের কোন তালিকা আমাদের হাতে নেই। এই বিশ্লেষণের জন্যে আমরা বেছে নিয়েছি ডাচেদের তিনিটে বড় এশিয় রপ্তানি বাজার বাটাভিয়া, জাপান আর পারস্য। আমাদের আলোচ্য সময়ে এই বাজারগুলিতে যাওয়া বিভিন্ন ধরণের কাপড়ের রপ্তানির অংশিদারির অঙ্ক আমরা ৭.১১ তালিকায় করেছি।

৭.১১ তালিকায় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উঠে আসে সেটি হল, ১৭৩০-১৭৫৫এর তিন দশকের সময় কালের মধ্যে প্রত্যেক দশকের প্রথম পাঁচ বছরের অংশিদারি ছিল ৫৪, ৬৭ এবং ৮৭ শতাংশ, যার মধ্যে সর্বাধিক অংশিদারি ছিল বাংলার গানি আর গানিব্যাগ যার পরিমান যথাক্রমে ৪৫, ৬০ এবং ৬২ শতাংশ। বাটাভিয়ায় বাংলা থেকে রপ্তানি করা বস্ত্রের মধ্যে আমাদের আলোচ্য সময়কালে দ্বিতীয় স্থানে ছিল ক্যালিকো ৪৭, ২২ এবং ২৯ শতাংশ এবং দামি মসলিনের পরিমান ছিল ৫, ১৩ এবং ৫ শতাংশ যথাক্রমে। বাটাভিয়ায় পাঠানো বাংলা বস্ত্রের এগুলি মৌলিক তথ্য। গানি হল মোটা ক্যালিকো এবং এটি ব্যবহৃত হত কাপড়ের গাঁটরি বাঁধার কাপড় হিসেবে, যা পুনঃরপ্তানি করা কাপড় বাঁধার কাজে লাগত। এটির দাম শস্তার ক্যালিকো কাপড়ের থেকেও শস্তা ছিল। ১৭৫০এর দশকের প্রথম পাদে প্রতি খণ্ডের দাম ছিল ১৬ পয়সা থেকে ২০ পয়সার মধ্যে। এর দামের সঙ্গে যদি মোটা ক্যালিকো অর্থাৎ চিন্টজএর তুলনা করি দেখতে পাব প্রতিতা চিন্টজের দাম ছিল ২.৪০টাকা এই সময়টিতে (Brouwer (VOC 2821, ff. 457-59, HB, 20 March 1753) এবং Anna জাহাজের ইনভয়েস থেকে (VOC 2829,f. 275 vo HB, 15 Dec. 1.754)। আমরা ধরে নিতে পারি বাটাভিয়ায় রপ্তানিযোগ্য কাপড়ের পরিমান বিপুল হলেও মোট অর্থ মূল্য কিন্তু খুব বেশি ছিল না কারণ রপ্তানি হত মূলত গানি এবং মোটা ক্যালিকো যেগুলোর মোট রপ্তানির অংশিদারি ছিল ৯২, ৮২ এবং ৯১ শতাংশ আমাদের আলোচ্য তিন দশকের প্রথম পাঁচ বছরের আলোচনায় (৭.১১ তালিকার গানি এবং সাধারণ ক্যালিকোর অংশিদারিগুলি যোগ করে এই অঙ্কে উপনীত হওয়া গিয়েছে)।

বাটাভিয়ার পরে ডাচ কোম্পানির রপ্তানিযোগ্য বস্ত্রের সর্বাধিক এশিয় বাজার ছিল জাপান। এই বাজারে মূলত রেশম কাপড় যার বাণিজ্যিক নাম সিল্ক-পিস গুডস রপ্তানি হত; মোট রপ্তানিতে এর অংশিদারি ছিল যথাক্রমে ৫২, ৫৯ এবং ৪৬ শতাংশ, ১৭৩০, ৪০ এবং ৫০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছরের হিসেবে। পরের পরিমানের কাপড়টি ছিল রেশম এবং সুতির মেলানো মিক্সড পিস গুডস যা ১৭৩০ এবং ৪০এর দশকে ৩২ এবং ২৯ শতাংশ ছিল এবং ১৭৫০-এর দশকে কমে হয় ১১ শতাংশ, যে সময় সাধারণ ক্যালিকোর চাহিদা আগের দু দশকের অর্থাৎ ১৭৩০ এবং ১৭৪০-এর দশকের ১২ এবং ৮ শতাংশের তুলনায় ১৭৫০-এর দশকে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে। সাধারণ ক্যালিকো আর মিক্সড পিস গুডসের তুলনায় সিল্ক কাপড়ের দাম বেশ বেশি ছিল, যেটি মূলত জাপানে রপ্তানি হত চন্দ্রবানী, রুদ্রবাণী, রাগিয়াবাণী (১৭৫০-এর দশকে যেগুলির গড় দাম ছিল (f৬.৫), তাফেতা (f৪.৫) ইত্যাদি যা আরমোসিন (armosins) (effene dubbelde’এর armosinsএর দাম ছিল f১৭.৮) বা ধেরি (ডুরে আরমোসিন, দাম ছিল f১৭.৯৫)এর থেকে দামে কম ছিল এবং এই দামিগুলি খুব কম পরিমানে রপ্তানি হত (Brouwer, জাহাজের ইনভয়েসের সংখ্যা জুড়ে এই অঙ্কে উপনীত হওয়া গিয়েছে VOC 2821, ff. 457-59, HB, 20 March 1753)।
পারস্যের উপসাগর অঞ্চলের প্রবণতাটা বাটাভিয়া বা জাপানের থেকে বেশ আলাদা ছিল, সাধারণ ক্যালিকোর চাহিদা ১৭৩০-এর (৩৫ শতাংশ) এবং ১৭৫০-এর দশকে (২৩ শতাংশ) যা ছিল, ১৭৪০-এর দশকে ছিল ৫ শতাংশ। গানির অংশিদারি ছিল ২১ এবং ৪৭ শতাংশ ১৭৩০ এবং ৪০-এর দশকে এবং ১৭৫০-এর দশকের হিসেব পাওয়া যায় না। অন্যভাষায় বলতে গেলে শস্তার মোটা ক্যালিকো (গানি এবং সাধারণ ক্যালিকো)-র তিন আলোচ্য দশকের প্রথম পাঁচ বছরের মোট রপ্তানির অংশিদারি ছিল যথাক্রমে ৫৬, ৫২ এবং ২৩ শতাংশ। মসলিনের অংশিদারি বাড়তে থাকে নিয়মিতভাবে ১৭৩০-এ ২১ শতাংশ ১৭৪০-এ ৩৪ শতাংশ এবং ১৭৫০-এ ৫৮ শতাংশে। কিন্তু সংখ্যায় মোট বস্ত্রের পরিমান কমতে থাকে — ১৭৩০-এ ছিল ৬৫,৩৮২, ১৭৪০-এ ছিল ৬৮,৬৫০ এবং ১৭৫০-এ কমে দাঁড়ায় ১৪,১৭৪টিতে। মোটমূল্যে এটা খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। এই বিশ্লেষণ থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, ১৭৩০-এর দশকে ডাচ কোম্পানি বিভিন্ন এশিয় বাজারে যে পরিমান বাংলার কাপড় রপ্তানি করছে, তার পরিমান বেশ বড় কিন্তু তারপরে এই পরিমান কমতে থাকে এবং এই সময়ের মোট রপ্তানির মূল্যও খুব বেশি পরিমান বাড়ছে না। আমরা যে বিষটি নিয়ে আলোচনা করলাম, তাতে পরিষ্কার ডাচেদের বাংলা কাপড়ের এশিয়ার দ্বিতীয় বড় কাপড় বাজার জাপানে তুলনামূলক দামি সিল্ক গুডস রপ্তানি হত তার পরিমান ১৭৫০-এর প্রথম পাঁচ বছরে ছিল ২৮,৬৫০ টাকা মূল্যের। আমরা একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই সময়ে ডাচ কোম্পানির বাংলা কাপড়ের ইওরোপে রপ্তানির তুলনায় এশিয় দেশগুলোর রপ্তানির পরিমান অনেক কম ছিল। (চলবে)