সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
সপ্তম অধ্যায়
এশিয় সওদাগর এবং কাপড় রপ্তানি
বাংলায় অষ্টাদশ শতকের শেষ পাদে এশিয় বণিকদের আর্থিক অবস্থার পতন হয়েছিল বেশ ভালভাবেই — যে কারণটা আমরা আরও পরে আলোচনা করব নির্দিষ্ট সূত্রে, সে সময়ের Cloth Production and Trade শীর্ষক ড্যানিশ সমীক্ষা থেকে জানতে পারছি বাংলা থেকে গারা রপ্তানি হচ্ছে ৪ লক্ষ খণ্ড যার মধ্যে মাত্র ১ লক্ষ ৬০ হাজার খণ্ড ইওরোপে রপ্তানি হচ্ছে (ie.Feldebeck, ‘Cloth Production and Trade in late Eighteenth Century Bengal’; BPP, July-Dec. 1967, pp.127-29)। আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে রাখতে হবে ঢাকা আড়ং-এর তুলনায় হুগলি, কাশিমবাজার, মালদা এবং পাটনা আড়ং প্রচুর পরিমানে মাঝারি এবং সাধারণ মানের কাপড় উৎপাদন করত। এই বিপুল পরিমান সাধারণ বা মাঝারি মানের কাপড় ছিল বাংলা থেকে এশিয়া এবং ইওরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে কাপড় রপ্তানিকারকদের মুল রোজগারের জায়গা। বাস্তবিকভাবে ডাচ কোম্পানি (এবং হয়ত একই কারণে ব্রিটিশ কোম্পানিও (উদাহরণ স্বরূপ দেখুন the geographical analysis of orders for piecegoods from London in the early 1680s, S.Chaudhuri, Trade and Commercial Organisation, p.201, fn.166.) মধ্য অষ্টাদশ শতকে তাদের মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশ কাপড় হুগলির আড়ংগুলো থেকে, ২৫ থেকে ৩৮ শতাংশ কাশিমবাজার আড়ং থেকে পাটনার আড়ং থেকে ৮ থেকে ১২ শতাংশ এবং ঢাকার আড়ং থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ বরাত দিয়ে বানাত। এই তথ্য আমরা পাচ্ছি ১৭৫৩/৫৪ এবং ১৭৫৪/৫৫ সালে ডাচ কাপড় রপ্তানির এলাকা ধরে ধরে বিশ্লেষণে (দেখুন Table 3, Geographical Distribution, Unit Price and Share of Different Areas in the Total Va1ue of Dutch Textile Export from Bengal to Holland, 1753-54 and 1754-55 in my article ‘European Companies and Bengal Textile Industry’ in MAS, vol. 27, pt. II, May 1993, p. 339)।
ভাগ্যভাল আমরা রেশম পণ্য রপ্তানি করা এশিয় বণিকদের বাংলার সিল্ক-পিস গুডসের বিশদ বিবরণ পাচ্ছি। তথ্যটি পাচ্ছি ১৭৬৯ সালের কাশিমবাজারের ডবলিউ অল্ডারসের (W. Aldersey) রেশম শিল্প সমীক্ষা থেকে। অল্ডারসে’র সমীক্ষা আমাদের জানাচ্ছে, ১৭৪৯ থেকে ১৭৫৩ পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে গড়ে বছরে এশিয় বণিকদের রপ্তানি ছিল ৬৩ লক্ষ এবং ১৭৫৪ থেকে ১৭৫৮ পর্যন্ত ৪৩ লক্ষ। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, যদিও বাংলা প্রায় উত্তম গুণমানের রেশম কাপড় উৎপাদন করত, তা সত্ত্বেও সুতি এবং মেশানো সুতোর কাপড় এশিয় এবং ইওরোপিয় রপ্তানিকারকদের রপ্তানি পণ্য ছিল। তো এই রেশম কাপড় রপ্তানিতেও মধ্য অষ্টাদশ শতকেও ইওরোপিয় বণিকদের তুলনায় এশিয় বণিকদের রপ্তানির পরিমান লক্ষ্যণীয়ভাবে বেশি ছিল বিশেষ করে ১৭৫০/৫১ থেকে ১৭৫৪/৫৫ এই পাঁচ বছরের বিশ্লেষণে।
৭.১২ তালিকা থেকে এটা স্পষ্ট যে, তথ্যের অপ্রতুলতার জন্যে এই সমীক্ষায় ফরাসী রপ্তানি এই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয় নি, তবে এটা পরিষ্কার ফরাসীদের অংশিদারি কোনও ভাবেই ডাচ আর ব্রিটিশদের মোট রপ্তানি অংশিদারির অর্ধেক পরিমানের বেশি হতে পারে না (মার্তিনু-এর অনুসরণে মার্শাল বলছেন ডাচ আর ব্রিটিশদের রপ্তানির তুলনায় ফরাসি কোম্পানি অর্ধেক পরিমান কাপড় রপ্তানি করত, P.J. Marshall, Bengal, p. 66) অর্থাৎ খুব বেশি হলে ১২,০০০ থেকে ১৫০০ পিস। ফলে মোট ইওরোপিয় রেশম রপ্তানি ৬৭,০০০ থেকে ৭০,০০০(তালিকা ৭.১২ অনুযায়ী ডাচ আর ব্রিটিশদের মোট পরিমান ৫৪,৮৮৯ ধরে) পিস ছিল এবং এশিয় রপ্তানি ছিল ৯১,০০০ পিস। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার যে রেশম পণ্য রপ্তানি বাংলার এশিয় বণিকদের মুল অক্ষদণ্ড ছিল না — বরং তারা বিপুল পরিমানে মিহি, মাঝারি এবং মোটা সুতির কাপড় মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়ায় তারা পাঠাত।
এই সব এলাকার সুতির কাপড়ে চাহিদার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা পাচ্ছি ডাচেদের পারস্য উপসাগর এলাকায় রপ্তানির পরিমান। ১৭৪০ এবং ১৭৫০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছরে উপসাগর অঞ্চলের বাজারগুলোয় রেশমের আমদানির অংশিদারি ছিল শূন্য (৭.১১ তালিকা দেখুন)। এই তথ্য আমাদের তত্ত্বকেই প্রমাণিত করে যে মধ্য অষ্টাদশ শতকেও বাংলার কাপড় রপ্তানি বেশ বড় পরিমান ছিল এবং সেটি ইওরোপিয় কোম্পানিগুলিরে থেকে বেশ বেশিই ছিল।
বাস্তব যদি অঙ্কটা সেই পরিমান হয় তাহলে এই তালিকা থেকে আমরা মালদা আর ঢাকা আড়ং-এর কাপড় রপ্তানির একটা রপ্তানির হিসেব পেলাম, এবং বুঝলাম এশিয়রা দাদন দিচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা, যদিও তারা দাদন দেওয়ার তুলনায় খোলা বাজার থেকে নগদ অর্থে আরও অনেক বেশি পরিমান কাপড় কেনে। এই হিসেবে মোট এশিয় রপ্তানির পরিমান হয় ৯০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকার কাছাকাছি। এটা মোটেই ওভারএস্টিমেশন নয়, এই অঙ্ককে আরও পরোক্ষ তথ্য দিয়ে প্রমান করা যায়। ১৭৫০-এর দশকের প্রথমের দিকে যদি ঢাকা থেকে ডাচ আর ব্রিটিশদের রপ্তানি করা বস্ত্রের অংশিদারি ৫ থেকে ১০ শতাংশ হয়, তাহলে মোট এশিয় রপ্তানিতে ঢাকা বস্ত্রের অংশিদারি ১০ শতাংশের বেশি না হওয়ারই কথা। ১৭৪৭ সালের ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঢাকা বস্ত্রের রপ্তানি ছিল ১১ লক্ষ ৫০ হাজার (দিল্লির সম্রাটের বরাত বাদ রেখে এই হিসেবটা দাঁড়াচ্ছে Upper Provinces. Rs 1,00,090; Pathans Rs 1,50,000; Mughals for foreign consumption Rs 4,00,000; Armenians to Basra, Mocha and Jedda Rs 5,00,000)। এর অর্থ বাংলার মোট এশিয় বণিকদের রপ্তানি ছিল ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। এর বিপরীতে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির মোট রপ্তানি মূল্য খুব বেশি হলে ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করত। গবেষকেরা মনে করেন ইওরোপিয় ব্যক্তিগত ব্যবসার পরিমানও অনেকটা পরিমান বেশি ছিল, যদিও আমরা সেই পরিমান আঁচ করতে পারি না তথ্যের অভাবে। কিন্তু আগের সমীক্ষা সূত্রে জানতে পারছি ঢাকা থেকে মোট ব্যক্তিগত ব্যবসার রপ্তানির পরিমান কোনওভাবেই মোট রপ্তানি অঙ্কের ৫ শতাংশের বেশি নয়। এর থেকে আরও একটা সিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হতে পারি সেটা হল, সামগ্রিকভাবে বাংলার অর্থনীতিতে ইওরপিয় আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা খুব বড় কিছু প্রভাব ফেলে নি (Taylor’s report, Home Misc. Series, 456F)। এ প্রসঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার এইসব অঙ্ক হাত গণনার হিসেব (ক্রুড এস্টিমেট) যেখানে ভুলের মার্জিন অনেক বেশিই হতে পারে। তা সত্ত্বেও এই তথ্য থেকে আমরা একটা মধ্য অষ্টাদশ শতকে এশিয় এবং ইওরোপিয় ব্যবসায়ীদের বাংলার কাপড় রপ্তানির একটা তুলনামূলক আন্দাজ দিতে পারি।
ওপরের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সঙ্গে আমরা কাপড় ব্যবসা আর উতপাদনের আরও কিছু তথ্যের দিকে যদি নজর রাখি তাহলে ছবিটা আরও পরিষ্কার হতে পারে। ১৭৩৮ থেকে ১৭৪৭ এই সময়ে ঢাকায় ৪০ লক্ষ টাকার কাপড় তৈরি হয়েছিল (Proceedings of the Board of Trade, vol. 1 56, quoted in N. K. Sinha, Economic History of Bengal, v.ol.Ill, p.4)। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে একটা হিসেব বলছে নিজস্ব ব্যবহারের জন্যে বাংলা ৬ কোটি টাকার (৬০ মিলিয়ন) কাপড় তৈরি করত। এই অংশটা মোটামুটি বাংলাতেই বিক্রি হয়ে যেত। যদি আমরা এই আলোচ্য সময়ে ছিয়াত্তরেরে মন্বন্তর এবং তারপরের বাড়তে থাকা মানুষের মৃত্যুর হারের কথা মনে রাখি, তাহলে হয়ত আরও বেশি পরিমানে কাপড় বিক্রি হত। বহু উদাহরণে আমরা পলাশী পূর্ব সময়ে বাংলায় বহু কাপড় বণিকের উপস্থিতির সূত্র পাচ্ছি। ব্রিটিশ কোম্পানির উচ্চপদস্থ আমলা হ্যারি ভেরলেস্ট লিখছেন the large investment of the European nations, the Bengal raw silk, cloths etc. to a vast amount were dispersed in the West and North inland as far as Guzzrat, Lahore and even ispahan (Verelst to Court of Directors, 2 April 1769, BPC, vol. 44, f.324, para 6)। আরও দুজন উচ্চপদস্থ আমলা লুক স্ক্রাফটন এবং উইলিয়াম বোল্টস বলছেন কিভাবে ভারতের আর এশিয়ার বিভিন্ন এলাকার হাজারো ব্যবসায়ীকে নিয়ে তৈরি ক্যারাভান বাংলায় থামত বাংলার উৎপাদন সংগ্রহ করতে বিশেষ করে রেশম এবং সুতি কাপড় (Bolts, Considerations, p. 200; Scrafton, Reflections, p.20)। সুতরাং আমরা যে সব প্রমান এখানে আলোচনা করলাম, তাতে প্রমান হয় যে বাংলার মোট উতপাদনের একটা ছোট অংশ ছিল ইওরোপিয় রপ্তানি এবং এই তথ্যকে আমাদের যথাযোগ্য প্রেক্ষিতে পেশ করা দরকার।
বাংলায় অষ্টাদশ শতকের শেষ পাদে এশিয় বণিকদের আর্থিক অবস্থার পতন হয়েছিল বেশ ভালভাবেই — যে কারণটা আমরা আরও পরে আলোচনা করব নির্দিষ্ট সূত্রে, সে সময়ের Cloth Production and Trade শীর্ষক ড্যানিশ সমীক্ষা থেকে জানতে পারছি বাংলা থেকে গারা রপ্তানি হচ্ছে ৪ লক্ষ খণ্ড যার মধ্যে মাত্র ১ লক্ষ ৬০ হাজার খণ্ড ইওরোপে রপ্তানি হচ্ছে (ie.Feldebeck, ‘Cloth Production and Trade in late Eighteenth Century Bengal’; BPP, July-Dec. 1967, pp.127-29)। আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে রাখতে হবে ঢাকা আড়ং-এর তুলনায় হুগলি, কাশিমবাজার, মালদা এবং পাটনা আড়ং প্রচুর পরিমানে মাঝারি এবং সাধারণ মানের কাপড় উৎপাদন করত। এই বিপুল পরিমান সাধারণ বা মাঝারি মানের কাপড় ছিল বাংলা থেকে এশিয়া এবং ইওরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে কাপড় রপ্তানিকারকদের মুল রোজগারের জায়গা। বাস্তবিকভাবে ডাচ কোম্পানি (এবং হয়ত একই কারণে ব্রিটিশ কোম্পানিও (উদাহরণ স্বরূপ দেখুন the geographical analysis of orders for piecegoods from London in the early 1680s, S.Chaudhuri, Trade and CommercialOrganisation, p.201, fn.166.) মধ্য অষ্টাদশ শতকে তাদের মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশ কাপড় হুগলির আড়ংগুলো থেকে, ২৫ থেকে ৩৮ শতাংশ কাশিমবাজার আড়ং থেকে পাটনার আড়ং থেকে ৮ থেকে ১২ শতাংশ এবং ঢাকার আড়ং থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ বরাত দিয়ে বানাত। এই তথ্য আমরা পাচ্ছি ১৭৫৩/৫৪ এবং ১৭৫৪/৫৫ সালে ডাচ কাপড় রপ্তানির এলাকা ধরে ধরে বিশ্লেষণে (দেখুন Table 3, Geographical Distribution, Unit Price and Share of Different Areas in the Total Va1ue of Dutch Textile Export from Bengal to Holland, 1753-54 and 1754-55 in my article ‘European Companies and Bengal Textile Industry’ in MAS, vol. 27, pt. II, May 1993, p. 339)।
ভাগ্যভাল আমরা রেশম পণ্য রপ্তানি করা এশিয় বণিকদের বাংলার সিল্ক-পিস গুডসের বিশদ বিবরণ পাচ্ছি। তথ্যটি পাচ্ছি ১৭৬৯ সালের কাশিমবাজারের ডবলিউ অল্ডারসের (W. Aldersey) রেশম শিল্প সমীক্ষা থেকে। অল্ডারসে’র সমীক্ষা আমাদের জানাচ্ছে, ১৭৪৯ থেকে ১৭৫৩ পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে গড়ে বছরে এশিয় বণিকদের রপ্তানি ছিল ৬৩ লক্ষ এবং ১৭৫৪ থেকে ১৭৫৮ পর্যন্ত ৪৩ লক্ষ। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, যদিও বাংলা প্রায় উত্তম গুণমানের রেশম কাপড় উৎপাদন করত, তা সত্ত্বেও সুতি এবং মেশানো সুতোর কাপড় এশিয় এবং ইওরোপিয় রপ্তানিকারকদের রপ্তানি পণ্য ছিল। তো এই রেশম কাপড় রপ্তানিতেও মধ্য অষ্টাদশ শতকেও ইওরোপিয় বণিকদের তুলনায় এশিয় বণিকদের রপ্তানির পরিমান লক্ষ্যণীয়ভাবে বেশি ছিল বিশেষ করে ১৭৫০/৫১ থেকে ১৭৫৪/৫৫ এই পাঁচ বছরের বিশ্লেষণে।
৭.১২ তালিকা থেকে এটা স্পষ্ট যে, তথ্যের অপ্রতুলতার জন্যে এই সমীক্ষায় ফরাসী রপ্তানি এই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয় নি, তবে এটা পরিষ্কার ফরাসীদের অংশিদারি কোনও ভাবেই ডাচ আর ব্রিটিশদের মোট রপ্তানি অংশিদারির অর্ধেক পরিমানের বেশি হতে পারে না (মার্তিনু-এর অনুসরণে মার্শাল বলছেন ডাচ আর ব্রিটিশদের রপ্তানির তুলনায় ফরাসি কোম্পানি অর্ধেক পরিমান কাপড় রপ্তানি করত, P.J. Marshall, Bengal, p. 66) অর্থাৎ খুব বেশি হলে ১২,০০০ থেকে ১,৫০০ পিস। ফলে মোট ইওরোপিয় রেশম রপ্তানি ৬৭,০০০ থেকে ৭০,০০০ (তালিকা ৭.১২ অনুযায়ী ডাচ আর ব্রিটিশদের মোট পরিমান ৫৪,৮৮৯ ধরে) পিস ছিল এবং এশিয় রপ্তানি ছিল ৯১০০০ পিস। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার যে রেশম পণ্য রপ্তানি বাংলার এশিয় বণিকদের মুল অক্ষদণ্ড ছিল না — বরং তারা বিপুল পরিমানে মিহি, মাঝারি এবং মোটা সুতির কাপড় মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়ায় তারা পাঠাত।

এই সব এলাকার সুতির কাপড়ে চাহিদার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা পাচ্ছি ডাচেদের পারস্য উপসাগর এলাকায় রপ্তানির পরিমান। ১৭৪০ এবং ১৭৫০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছরে উপসাগর অঞ্চলের বাজারগুলোয় রেশমের আমদানির অংশিদারি ছিল শূন্য (৭.১১ তালিকা দেখুন)। এই তথ্য আমাদের তত্ত্বকেই প্রমাণিত করে যে মধ্য অষ্টাদশ শতকেও বাংলার কাপড় রপ্তানি বেশ বড় পরিমান ছিল এবং সেটি ইওরোপিয় কোম্পানিগুলিরে থেকে বেশ বেশিই ছিল।


বাস্তব যদি অঙ্কটা সেই পরিমান হয় তাহলে এই তালিকা থেকে আমরা মালদা আর ঢাকা আড়ংএর কাপড় রপ্তানির একটা রপ্তানির হিসেব পেলাম, এবং বুঝলাম এশিয়রা দাদন দিচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা, যদিও তারা দাদন দেওয়ার তুলনায় খোলা বাজার থেকে নগদ অর্থে আরও অনেক বেশি পরিমান কাপড় কেনে। এই হিসেবে মোট এশিয় রপ্তানির পরিমান হয় ৯০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকার কাছাকাছি। এটা মোটেই ওভারএস্টিমেশন নয়, এই অঙ্ককে আরও পরোক্ষ তথ্য দিয়ে প্রমান করা যায়। ১৭৫০-এর দশকের প্রথমের দিকে যদি ঢাকা থেকে ডাচ আর ব্রিটিশদের রপ্তানি করা বস্ত্রের অংশিদারি ৫ থেকে ১০ শতাংশ হয়, তাহলে মোট এশিয় রপ্তানিতে ঢাকা বস্ত্রের অংশিদারি ১০ শতাংশের বেশি না হওয়ারই কথা। ১৭৪৭ সালের ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঢাকা বস্ত্রের রপ্তানি ছিল ১১ লক্ষ ৫০ হাজার (দিল্লির সম্রাটের বরাত বাদ রেখে এই হিসেবটা দাঁড়াচ্ছে Upper Provinces. Rs 1,00,090; Pathans Rs 1,50,000; Mughals for foreign consumption Rs 4,00,000; Armenians to Basra, Mocha and Jedda Rs 5,00,000)। এর অর্থ বাংলার মোট এশিয় বণিকদের রপ্তানি ছিল ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। এর বিপরীতে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির মোট রপ্তানি মূল্য খুব বেশি হলে ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করত। গবেষকেরা মনে করেন ইওরোপিয় ব্যক্তিগত ব্যবসার পরিমানও অনেকটা পরিমান বেশি ছিল, যদিও আমরা সেই পরিমান আঁচ করতে পারি না তথ্যের অভাবে। কিন্তু আগের সমীক্ষা সূত্রে জানতে পারছি ঢাকা থেকে মোট ব্যক্তিগত ব্যবসার রপ্তানির পরিমান কোনওভাবেই মোট রপ্তানি অঙ্কের ৫ শতাংশের বেশি নয়। এর থেকে আরও একটা সিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হতে পারি সেটা হল, সামগ্রিকভাবে বাংলার অর্থনীতিতে ইওরপিয় আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা খুব বড় কিছু প্রভাব ফেলে নি (Taylor’s report, Home Misc. Series, 456F)। এ প্রসঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার এইসব অঙ্ক হাত গণনার হিসেব (ক্রুড এস্টিমেট) যেখানে ভুলের মার্জিন অনেক বেশিই হতে পারে। তা সত্ত্বেও এই তথ্য থেকে আমরা একটা মধ্য অষ্টাদশ শতকে এশিয় এবং ইওরোপিয় ব্যবসায়ীদের বাংলার কাপড় রপ্তানির একটা তুলনামূলক আন্দাজ দিতে পারি।
ওপরের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সঙ্গে আমরা কাপড় ব্যবসা আর উতপাদনের আরও কিছু তথ্যের দিকে যদি নজর রাখি তাহলে ছবিটা আরও পরিষ্কার হতে পারে। ১৭৩৮ থেকে ১৭৪৭ এই সময়ে ঢাকায় ৪০ লক্ষ টাকার কাপড় তৈরি হয়েছিল (Proceedings of the Board of Trade, vol. 1 56, quoted in N. K. Sinha, Economic History of Bengal, v.ol.Ill, p.4)। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে একটা হিসেব বলছে নিজস্ব ব্যবহারের জন্যে বাংলা ৬ কোটি টাকার (৬০ মিলিয়ন) কাপড় তৈরি করত। এই অংশটা মোটামুটি বাংলাতেই বিক্রি হয়ে যেত। যদি আমরা এই আলোচ্য সময়ে ছিয়াত্তরেরে মন্বন্তর এবং তারপরের বাড়তে থাকা মানুষের মৃত্যুর হারের কথা মনে রাখি, তাহলে হয়ত আরও বেশি পরিমানে কাপড় বিক্রি হত। বহু উদাহরণে আমরা পলাশী পূর্ব সময়ে বাংলায় বহু কাপড় বণিকের উপস্থিতির সূত্র পাচ্ছি। ব্রিটিশ কোম্পানির উচ্চপদস্থ আমলা হ্যারি ভেরলেস্ট লিখছেন the large investment of the European nations, the Bengal raw silk, cloths etc. to a vast amount were dispersed in the West and North inland as far as Guzzrat, Lahore and even ispahan (Verelst to Court of Directors, 2 April 1769, BPC, vol. 44, f.324, para 6)। আরও দুজন উচ্চপদস্থ আমলা লুক স্ক্রাফটন এবং উইলিয়াম বোল্টস বলছেন কিভাবে ভারতের আর এশিয়ার বিভিন্ন এলাকার হাজারো ব্যবসায়ীকে নিয়ে তৈরি ক্যারাভান বাংলায় থামত বাংলার উৎপাদন সংগ্রহ করতে বিশেষ করে রেশম এবং সুতি কাপড় (Bolts, Considerations, p. 200; Scrafton, Reflections, p.20)। সুতরাং আমরা যে সব প্রমান এখানে আলোচনা করলাম, তাতে প্রমান হয় যে বাংলার মোট উতপাদনের একটা ছোট অংশ ছিল ইওরোপিয় রপ্তানি এবং এই তথ্যকে আমাদের যথাযোগ্য প্রেক্ষিতে পেশ করা দরকার। (চলবে)